মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_২৯

0
21

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_২৯

সকালের শান্ত আলোটা জানালার পর্দা ভেদ করে রিমির মুখের ওপর এসে পড়েছে। হাতের তীব্র ব্যথায় রাতে ঘুমটা ঠিকমতো হয়নি, ভোরের দিকে ক্লান্তিতে চোখ দুটো লেগে এসেছিল। যখন ঘুম ভাঙল, তখন রোদ বেশ চড়া। রিমি চোখ মেলে দেখল আরশান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা ওষুধের প্যাকেট দেখছে। রিমির নড়াচড়া টের পেয়ে ও ঘুরে তাকাল। আরশান এগিয়ে এসে বেডসাইড টেবিলে প্যাকেটটা রেখে বলল…

“এই ওষুধটা খাবে আজকে। গতকাল রাতে যেটা খেয়েছিলে সেটা খুব একটা কার্যকর না, পেইনকিলার হিসেবে ওটা দুর্বল।”

রিমি কোনো উত্তর দিল না। শরীরটা ভীষণ ভারী লাগছে, বিশেষ করে ডান হাতের তালুটা একদম অবশ হয়ে আছে। ও উঠে বসে হাতের ব্যান্ডেজের দিকে তাকাতেই হঠাৎ মনে পড়ল আজ সন্ধ্যায় ওদের রিসিপশন। এই কা’টা হাত নিয়ে মানুষের সামনে কীভাবে দাঁড়াবে? লোকেরা যদি উল্টোপাল্টা কিছু ভাবে? এর মধ্যেই আরশান বললো…

“আরেকটা কথা শুনে রাখো রিমি, ভবিষ্যতে আমার কাছ থেকে আর কোনো কথা গোপন করবে না। এই বাসার কেউ হোক, বা বাইরের কেউ তোমার সাথে যদি কেউ খারাপ ব্যবহার করে, সেটা সরাসরি আমাকে বলবে। I’ll handle them.”

আরশানের কথা শুনে রিমির বুঝতে বাকি রইল না যে লোকটা ইতিমধ্যেই গতকালের পুরো ঘটনার ইতিবৃত্ত জেনে গেছে। রিমিকে নীরব থাকতে দেখে আরশান ওর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ওর দীর্ঘদেহী ছায়াটা রিমির ওপর পড়তেই রিমি এক ধরণের অস্বস্তি বোধ করল।

“আমি তোমার স্বামী, আর এই সত্যটা তুমি কোনক্রমেই অস্বীকার করতে পারবে না। স্ত্রী হিসেবে তোমার প্রথম দায়িত্ব হলো তোমার সমস্যার কথা আমাকে জানানো। এবারও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম, কিন্তু ভবিষ্যতে যদি আর একবার জানতে পারি যে তুমি আমার কাছে কিছু লুকিয়েছ, তবে তার ফল ভালো হবে না।”

রিমি বিছানা থেকে নামতে নামতে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল…

“আমি না জানালেই বা আপনার কী আসবে যাবে? কোনো কিছুই তো আপনার অজানা থাকে না।”

রিমি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু আরশান আচমকা রিমির একটা বাহু চেপে ধরল। এক ঝটকায় ওকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে আরশান ওর চোখের দিকে স্থির চোখে তাকালো!

“I want to hear it from you, Rimi. I want you to depend on me.”

রিমি একবার আরশানের তীব্র চোখের দিকে তাকাল, পরক্ষণেই ওর বাহুতে শক্ত করে চেপে রাখা হাতের দিকে নজর দিল। রিমির জীবনের সবচেয়ে অপছন্দের শব্দ হলো ‘জোর’। জোর করে পাওয়া জিনিসে তৃপ্তি থাকে না, অথচ এই সম্পর্কেও ওকে জোর করে আবদ্ধ করা হয়েছে। আরশানও যেন সেই সম্পর্কের দোহাই দিয়ে প্রতিটা মুহূর্তে ওর ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।

রিমি শীতল গলায় বলল — “এই কথাটা আপনি আমাকে ভালোভাবেও বলতে পারতেন। এভাবে পেশি শক্তি দেখানোর কি খুব প্রয়োজন ছিল?”

আরশান নিরুত্তাপ কণ্ঠে জবাব দিল — “আমি যথেষ্ট ভালোভাবেই বলছি”

রিমি এবার নিজের বাহু ছাড়ানোর চেষ্টা করে রুক্ষভাবে বলল — “আপনি জোর করা ছাড়া আর কিছুই পারেন না আরশান। আপনার কাছে বিয়ে মানে হলো এক ধরণের মালিকানা। আমি আপনার স্ত্রী, তাই আপনি যেভাবে খুশি আমাকে চালাবেন আর আমি সেভাবেই চলব নাহলে আপনার ভালো লাগবে না। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন হুকুমদারিতে চলে না।”

রিমির মেজাজ তখন তুঙ্গে। ও ভেবেছিল আরশান হয়তো রেগে যাবে, কিন্তু আরশান হুট করে একটু বাঁকা হাসল। ওর চোখেমুখে এক ধরণের ফ্লার্ট করার ভঙ্গি ফুটে উঠল। ও রিমির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল…

“In this field, we both are rookies. If we adjust together, with time, we’ll become experts too”

আরশানের কথায় রিমির গা পিত্তি যেনো জ্বলে উঠলো। এই লোকটা কি কোনো কথাই সিরিয়াসলি নেয় না? রিমি যখন একটা গুরুতর বিষয়ে কথা বলছে আরশান কীভাবে রসিকতা করে উড়িয়ে দিচ্ছে! রিমি রেগে গিয়ে বলল — “আপনার সঙ্গে কথা বলাই বেকার!”

ও এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। আরশান দরজার দিকে তাকিয়ে আপনমনে বিড়বিড় করে ইংরেজিতে বলল — “Say whatever you want Rimi, but I won’t let you out of my grasp. Never!”

একটু পর আরশান ড্রয়িংরুমে নামতেই যে দেখল দৃশ্যপট দেখলো তা ওর মোটেও পছন্দ হলো না। ওর ফুপু এখনো এখানে! বেশ আরামে সোফায় বসে চা খাচ্ছেন। আরাফাত সাহেবও সেখানে উপস্থিত। আরশান শুধু একবার ওর বাবার দিকে তাকাল তাতেই বোঝা গেল ওর বাবা কালকে বলা ওর কথাগুলো গুরুত্ব দেয়নি, ফুপুকে চলে যেতে বলেননি। এর মধ্যেই নীরা সুরভী বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললো — “মামি, আজ তো অনুষ্ঠান। কোনো কাজে সাহায্য দরকার হলে আমাকে বলো কিন্তু! আমি তো তোমাদের ঘরের মেয়ের মতোই।”

আরশান ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল — “আমাদের ঘরের মেয়ে শুধু ইনায়া, তুনি নও। জোর করে আমাদের ফ্যামিলি মেম্বার হিসেবে ভাগ বসাতে এসো না”

এ কথা শুনে নীরা চুপ করে গেলো, আরশান এসে সোফায় বসে বললো — “তোমাদের দুজনের এই অনুষ্ঠান নিয়ে এত উত্তেজিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ তোমরা আজ সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানে অ্যাটেন্ড করছ না।”

কথাতা শুনে নীরা আর ফুপুর হাতের চায়ের কাপ থমকে গেল। ফুপু চোখ কপালে তুলে বললেন — “কী বলতে চাইছিস আরশান? তোর রিসিপশনের জন্যেই তো আমরা এখানে এসেছি”

আরাফাত সাহেব এবার অস্বস্তিতে পড়কেন, আরশান রুক্ষ কিছু বলে দিতে পারে ভেবে উনিই আগে বললেন — “আরশান! এই সাত সকালে সিন ক্রিয়েট করো না। আজকের অনুষ্ঠানটা শেষ হতে দাও।”

আরশান একটু ভাবল। তারপর ক্রুর হাসিতে ওর ঠোঁট রঞ্জিত হলো!

“Fine. তোমার বোন আর বোনের মেয়ে যদি আজ অনুষ্ঠানে যেতে চায়, তবে রিমির কাছে ক্ষমা চাইতে বলো।”

ফুপু এবার সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে ফোঁস করে উঠলেন — “কিসের জন্য ক্ষমা চাইব আমি ওই মেয়ের কাছে?”

“ফুপু, তোমার ওর সাথে অন্যায় করতে বাধেনি, অথচ ক্ষমা চাইতে বলায় রাগ হচ্ছে? Not fair!”

ফুপু এবার রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিল চিৎকার করে উঠলেন — “আরশান! তুই আমাকে ওই রাস্তার মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে বলছিস? কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, দুদিন পর দেখবি অন্য কারোর হাত ধরে পালিয়ে….”

“Shut up fupu!”— আরশানের চিৎকারে পুরো ড্রয়িংরুম থমকে গেল। রিমি সম্পর্কে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শোনার পর ও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে ফুপুর দিকে এক পা এগিয়ে গেল, ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এক বীভৎস রূপ নিয়েছে! আরশানের ভেতরটা আগ্নেয়গিরি তখন ফুটছে। ফুপুর মুখ থেকে রিমির চরিত্র নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত শোনা মাত্রই ও হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামছিল রিমি। ড্রয়িংরুমের এই বীভৎস পরিস্থিতি দেখে ও মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আরশান ওর ফুপুর সঙ্গে রিমিকে নিয়ে খুবই বাজেভাবে তর্ক করছে, উচু গলায় কথাও বলছে। ফুপুর সঙ্গে তর্ক লেগে গেছে। রিমি স্পষ্ট শুনেছে যে ওকে নিয়েই ঝামেলা হয়েছে তো ও দ্রুত পায়ে আরশানের কাছে এগিয়ে এল। আরশানের একটা বাহু শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলল— “আরশান! কী করছেন আপনি? প্লিজ থামুন!”

আরশান তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ল। ওর শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছে। ফুপু তখনো থামেননি, উনি রিমির দিকে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আরাফাত সাহেবের দিকে ঘুরলেন…

“দেখলে ভাইজান? দেখলে সুরভী? এই একটা মেয়ের জন্য আজ আরশানের কী দশা হয়েছে!”

আরশান আবারও গর্জে উঠতে চাইল কিন্তু রিমি ওর হাতের ওপর নিজের আঙুলের চাপ বাড়িয়ে দিল। চোখের ইশারায় ও আরশানকে চুপ থাকতে বলল। রিমির সেই চাউনি দেখে আরশান যেন এক নিমেষেই শান্ত হয়ে এল।ফুপুকে আরশান তখন রিমির উপস্থিতিতে ক্ষমা চাইতে বললেই ওই মুহূর্তে ভীষণ অপমান বোধ করছিলেন! নিজের পরাজয় বুঝতে পেরে গটগট করে উনি ঘরে ঢুকলেন। মিনিট দশেকের মধ্যেই সুটকেস গুছিয়ে নীরাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন ড্রয়িংরুমে। যাওয়ার সময় আরাফাত সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে একরাশ আফসোস নিয়ে বললেন — “চললাম ভাইজান। এই বাড়িতে হয়তো আর কোনোদিন আসা হবেনা আমার”

ফুপু আর নীরা বেরিয়ে যাওয়ার পর পুরো বাড়িতে এক গুমোট শান্তি নেমে এল। আরশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় ধপ করে বসল। যদিও ফুপু চলে গেছেন, কিন্তু রিমির কাছে ক্ষমা চেয়ে যাননি এই খচখচানিটা আরশানের মনে রয়েই গেল। আরাফাত সাহেব এতক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে ছিলেন, এবার তিনি ছেলের দিকে ফিরে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত গলায় বললেন — “তোমাদের এই জেদ আর বাড়াবাড়ির জন্য দেখছি আমাদের সাজানো সম্পর্কগুলোও নষ্ট হতে বসেছে। আজ আমার বোন অপদস্থ হয়ে এই বাড়ি থেকে বিদায় নিল।”

ওনার এই বিদ্ধ করা কথাগুলো রিমির কানে তীরের মতো বিঁধল। ঘুরেফিরে দিনশেষে সবাই ওকেই দায়ী করছে। ওর মনে হতে লাগল, ও আসলেই বুঝি এক অলুক্ষুণে উপদ্রব, যার জন্য একটা সুখী পরিবারে ভাঙন ধরছে। রিমি মাথা নিচু করে রইলো, ওর দুচোখ ভিজে এলেও ও সেটা কাউকে দেখাল না।সকাল থেকে সময়টা কিভাবে যে পার হয়ে গেলো রিমি বুঝতে পারেনি। কারণ ওর মাথা থেকে সকালের ঘটনা তখনও বের হয়নি। সন্ধ্যাবেলা…রিসিপশনের ভেন্যুটা আলোর মালায় সেজেছে। এক কোণায় সাজানো একটা কামরায় রিমিকে সাজানোর জন্য বিউটিশিয়ানরা কাজ করছেন। ইনায়া শুরু থেকেই পাশে আছে। রিমির পরনে দামী মেরুন রঙের লেহেঙ্গা, হাতে সেই ব্যান্ডেজটা কোনোমতে ওড়না দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সাজসজ্জার আড়ালেও রিমির মুখটা বড় ম্লান, ফ্যাকাশে। অনুষ্ঠানে লোক আসতে শুরু করেছে। রিমিকে সাজানো শেষ হতেই ওকে নিয়ে স্টেজের দিকে রওনা দিল ইনায়া। যাওয়ার সময় রিমির হাতটা ধরে ও ফিসফিস করে বলল — “রিমি, জানি তোর মন খারাপ। কিন্তু দেখ, ভাইয়া তোর জন্য নিজের ফুপুর সাথেও লড়াই করেছে। তোকে ও কতটা গুরুত্ব দেয় সেটা আজ প্রমাণ হয়ে গেছে। এসব আয়োজন তো তোর জন্যই, একটু হাস না প্লিজ!”

রিমি নিজেকে সামলে নিয়ে একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক অচেনা মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি ওর ওপর পড়ছিল। স্টেজের ঠিক কয়েক ধাপ দূরে থাকতেই পেছন থেকে দ্রুত কারো পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। রিমি পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল আরশান দ্রুত হেঁটে আসছে। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, পরনের স্যুটটা কিছুটা অবিন্যস্ত। দেখে মনে হচ্ছে ও কোনো একটা যুদ্ধের মাঠ থেকে ফিরছে।আরশান কোনো কথা না বলে ইনায়ার হাত থেকে রিমির হাতটা নিজের হাতে টেনে নিল। রিমির শীতল আঙুলগুলো ওর উষ্ণ হাতের ভেতর আসতেই রিমি এক ধরণের অস্থিরতা অনুভব করল। আরশান রিমির চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল — “সরি! আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।”

ঠিক সেই মুহূর্তে আয়ান এগিয়ে এল ভাইয়ের কাছে। আরশানের এই বিধ্বস্ত দশা দেখে ও অবাক হয়ে পকেট থেকে টিস্যু বের করে আরশানের কপাল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল — “কোথায় গেছিলে ভাইয়া? তোমার রিসিপশনে তুমিই লেট?”

আরশান রিমির ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে রহস্যময় হাসি হাসল। ওর চোখ দুটো তখন জ্বলজ্বল করছে। ও রিমির দিকে ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল — “সারপ্রাইজ!”

রিমি শুধু ফ্যালফ্যাল করে আরশানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটা সারাক্ষণ ওকে ধাঁধার মধ্যে রাখে। আরশানের উপহার কেমন হতে পারে সেটা ধারণা করাও দায় কারণ লোকটার সবকিছু ধারণার বাইরে। রিমি ভাবলো, না জানি এবার কোন সারপ্রাইজের কথা বলছে!

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1D9c9q3214/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here