#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩০
রিমি আরশানের পাশে হাঁটতে হাঁটতে এক ধরণের অদ্ভুত দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এই মানুষটাকে চেনা বড্ড দায়। সকালে যে মানুষটা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে ফুপুর মতো আপনজনকে বাসা থেকে বিদায় করতে পিছপা হয়নি, এখন সেই মানুষটাই আবার জনসমক্ষে রিমির হাত ধরে আগলে দাঁড়িয়ে আছে। আরশানের হঠাৎ এই বিয়ে নিয়ে উপস্থিত সবার মধ্যেই এক তীব্র কৌতূহল ছিল। রিমি যখন স্টেজে এসে বসল, ও অনুভব করল অনেক উৎসুক দৃষ্টি ওর ওপর বিঁধছে। রিমির পরিচয় কিংবা এই আকস্মিক বিয়ের কারণ নিয়ে অনেকেই আড়ালে গুঞ্জন করছিল। রিমি অস্বস্তিতে নড়াচড়া করছিল, ওর ফ্যাকাশে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু আরশান যেন সবটাই আঁচ করতে পেরেছিল। ও বিন্দুমাত্র সুযোগ দিল না কাউকে কোনো অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করার। আরশান নিজেই অত্যন্ত কৌশলে রিমিকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল এবং আড্ডার মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছিল যাতে কেউ রিমিকে কোনো প্রশ্ন না করতে পারে।আরাফাত সাহেব গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন। সকালে আরশানের করা আচরণ এখনও উনি ভুলতে পারছেন না। উনি নীরব দেখে সুরভী বেগম পাশে বসে মৃদু স্বরে বললেন — “আরশানকে দেখেছ? ছেলেটা কীভাবে আগলে রেখেছে রিমিকে। হয়তো এই বিয়েটা হয়ে ভালোই হয়েছে। আমাদের ছেলে দেখো আগের তুলনায় কতোটা স্বাভাবিক হয়েছে”
আরাফাত সাহেব শুধু স্ত্রীর কথা শুনলেন কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না। ইনায়া আর আয়ান আরশানের নির্দেশ মতোই রিমিকে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখল। ওরা মজার মজার কথা বলে, বারবার ফটোশ্যুট করে রিমির মন ভালো করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। আরশানই ওদের আগেভাগে বলে রেখেছিল যেন রিমিকে এক মুহূর্তের জন্যও একা বা মন খারাপ করে থাকতে না দেওয়া হয়। ভিড়ের মধ্যে আবিদকেও দেখা গেল। ইনায়াই ওকে দাওয়াত দিয়েছিল। রিমিকে স্টেজে দেখে আবিদ এগিয়ে এসে স্বাভাবিকভাবেই শুভেচ্ছা জানাল। রিমির হঠাৎ বিয়ের খবরে ও কিছুটা অবাক হলেও বন্ধু হিসেবে রিমির খুশিতে ও খুশি। রিমি ম্লান হেসে ওর সাথে কথা বলল। আবিদও সবটা সহজভাবে মেনে নিয়ে বেশিক্ষণ ভিড় না বাড়িয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে লাগল। রিমি সবসময়ই ওকে শুধু বন্ধু হিসেবেই দেখেছে, আর আজ সেই বন্ধুত্বটাই অটুট রইল। ফটোগ্রাফারের জোরাজুরিতে আরশান রিমির খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। রিমির কোমর জড়িয়ে ধরে পোজ দিতে দিতে ও ফিসফিস করে বলল…
“বিয়ের পর এটা আমাদের প্রথম অফিসিয়াল ছবি রিমি, স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে। সেখানে তুমি যদি এমন মুখ গোমড়া করে থাকো তাহলে কিভাবে হবে? Give a big smile ok?”
রিমি আরশানের দিকে তাকালো। এই মানুষটা কেন এত করছে ওর জন্য? রিমির দুশ্চিন্তা পুরোপুরি না কাটলেও আরশানের সান্নিধ্যে ও এক ধরণের অঘোষিত নিরাপত্তা অনুভব করতে শুরু করল। অনুষ্ঠানটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলো। সব সম্পন্ন করে বাসায় ফিরতে গভীর রাত হয়েছে। রিসিপশনের ধকল কাটিয়ে ঘরে ফেরার পর এক ধরণের ক্লান্তি শরীরে জেঁকে বসার কথা, কিন্তু রিমির চোখের পাতায় ঘুম নেই। ওর খাটের একপাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে অজস্র গিফট বক্স। আরশান ফ্রেশ হয়েই বাবার ঘরে গিয়েছে কোনো এক কাজে। রিমি একা বসে বোর হচ্ছিল। কৌতূহলবশত ও ভাবল গিফটগুলো খুলেই দেখা যাক। রিমি একটা একটা করে বক্সগুলো খুলে দেখছিল, যদিও এই উপহার দেখার ফাঁকেও রিমির মনে আরশানের থেকে ওই সারপ্রাইজটা কি ছিল সেটা জানার আগ্রহ বেশি! এ কথা মনে হতেই রিমি নিজেই নিজেকে ধমকে বললো…
“লোকটা দুটো মিষ্টি করে কথা বলে দিলেই সব ভুলে যাই কিভাবে আমি? লোকটা আমাকে নিজের হাতের মুঠোয় নেওয়ার চেষ্টায় এসব করছে। যতোই যা করুক আমি ওনার কথায় পটবো না!”
এসব ভাবতে ভাবতে রিমি যখন উপহারসামগ্রী দেখতে ব্যস্ত তখনই দরজায় আরশানের পায়ের শব্দ পাওয়া গেল।আরশান ঘরে ঢুকেই দেখল মেঝেতে গিফটের পাহাড়ের মাঝে ওর ছোট্ট বউটা বসে আছে। আরশানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। ও গলার টাইটা আলগা করে রিমির একদম গা ঘেঁষে মেঝেতে বেশ আয়েশ করে বসে পড়ল।
“একা একাই সব দখল করছো? অর্ধেক কিন্তু আমার প্রাপ্য”
রিমি একটু নড়েচড়ে বসে বলল — “আপনার যা যা পছন্দ নিয়ে নেবেন, আমি তো আর সব সব নিয়ে কোথাও চলে যাচ্ছি না।”
আরশান একটা সুন্দর পারফিউমের বক্স দেখলো, সেখান থেকে পারফিউম বোতলটা নিয়ে নাকের কাছে ধরে দেখলো, তারপর রিমির দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল — “কোথায় যাওয়ার কথা ভুলেও মাথায় এনো না। এখন থেকে এই ঘর, এই বিছানা আর এই যে তোমার সামনে বসে থাকা আমি এসবই তোমার Permanent Address”
রিমি ওর কথার উত্তর দিলো না কারণ ও কোথাও যেতে চাইলে বা কি? আরশান যেতে দেবে? তো দেখতে দেখতে রিমি একটা দামী হাতঘড়ির বক্স খুলে সেদিকে তাকিয়ে থেকে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করল— “এটা দেখুন, এই ঘড়িটা সুন্দর”
আরশান ঘড়িটার দিকে না তাকিয়ে অত্যন্ত ধীরলয়ে রিমির সেই ব্যান্ডেজ করা হাতটা নিজের হাতের ওপর রাখল। ওর স্পর্শে এক অদ্ভুত উষ্ণতা আছে, যা রিমির পুরো শরীরে এক ধরণের শিহরণ বইয়ে দিল। আরশান ওর ব্যান্ডেজ করা আঙুলগুলোর ওপর খুব সাবধানে বৃদ্ধাঙ্গুলি বুলিয়ে দিতে দিতে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল…
“এখনও ব্যথা করছে? জ্বালাপোড়া আছে কোনো?”
আরশানের এই যত্নটুকু রিমির বুকের ভেতর কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথার সৃষ্টি করল। ছোটবেলা থেকে আগলে রাখার মতো কেউ ছিল না বলে ও নিজেকে বড্ড শক্ত করে গড়ে তুলেছিল। কারো ওপর নির্ভর করা ওর ধাতে নেই। অথচ এই মানুষটা, যাকে ও এক প্রকার নিজের শত্রু বা জবরদস্তিকারী বলে মেনে নিয়েছে, সে-ই এখন ওর ছোট্ট একটু চোট নিয়ে এতটা বিচলিত! রিমির মনে হলো ওর মনের শক্ত দেয়ালটা যেন একটু একটু করে নড়বড়ে হয়ে উঠছে। ও ঘোরের মধ্যে আরশানের দিকে তাকিয়ে রইল। রিমিকে ওভাবে নিজের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতে দেখে আরশানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল। ও এক ভ্রু উঁচিয়ে একটু ঝুঁকলো…
“Am I looking very handsome, রিমি? যে আমার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছো না?”
চট করে রিমির ঘোর কাটল। লজ্জায় আর অস্বস্তিতে ও দ্রুত নিজের চোখ নামিয়ে নিল। লোকটাকে যে একটা কড়া জবাব দেবে, সেই সুযোগও নেই। কারণ আরশান সত্যিই হ্যান্ডসাম, ওকে কুৎসিত বলার মতো হিম্মত কেউই করবে না। রিমি যখন নিজের লজ্জা ঢাকার জন্য কোনো একটা গিফট বক্স নিয়ে টানাটানি করছে, তখনই আরশান ওর কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে এল। ওর তপ্ত নিশ্বাস রিমির ঘাড়ে এসে লাগতেই রিমি আড়ষ্ট হয়ে গেল। আরশান ফিসফিস করে বললো…
“I was planning for a beautiful night together…”
কথাটা শোনামাত্রই রিমির হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ও আতঙ্কিত চোখে আরশানের দিকে বড় বড় করে তাকাতেই আরশান শব্দ করে হেসে হাত বাড়িয়ে রিমির গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে বললো…
“তোমার হাত ঠিক হোক আগে, এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। After all, I’m a patient person. So, I’ll wait…”
আরশানের এই অপেক্ষা করার আশ্বাসটুকু রিমির মনে যেমন স্বস্তি দিল, তেমনি এক অদ্ভুত অস্বস্তিও জাগিয়ে রাখল!
____________________________________
বিকেলের পড়ন্ত রোদ আরশানের অফিসের জানলা দিয়ে এসে ওর টেবিলের ওপর পড়েছে। আরশান খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু ফাইল দেখছিল, ঠিক তখনই ইয়াসির ঘরে ঢুকল। ইয়াসিরের হাতে একটা চামড়ার ফোল্ডার। ওটা টেবিলের ওপর রেখে ইয়াসির বিনীতভাবে বলল — “স্যার, সব কাজ শেষ। জমির দলিল এখন আপনার হাতে। মিউটেশন থেকে শুরু করে যা যা প্রসেস ছিল, সব কমপ্লিট।”
আরশান ফোল্ডারটা খুলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজের ওপর চোখ বোলালো। দলিলের ওপর রিমির নামটা জ্বলজ্বল করছে। শহরের অদূরে এক শান্ত ও মনোরম পরিবেশে এই বিশাল জমিটা এখন রিমির নিজস্ব সম্পত্তি। আরশান একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হেলান দিয়ে বসল। ইয়াসির ব্যাপারটা জানত যে আরশান এই জমিটা রিমিকে সারপ্রাইজ হিসেবে দেবে। ও একটু ইতস্তত করে বলল — “স্যার, একটা কথা বলব? ম্যাডামকে শুধু ফাঁকা জমি না দিয়ে ওখানে যদি একটা ডুপ্লেক্স বা সুন্দর কোনো কটেজ বানিয়ে গিফট করতেন, তবে বোধহয় বেশি ভালো হতো।”
আরশান ফাইলের ওপর হাত রেখে শান্ত গলায় বলল— “না ইয়াসির। আমি চাই ও নিজের ইচ্ছেমতো এই জমি ব্যবহার করুক। Her decision regarding this land will be the final decision.”
আরশান আসলে চায় রিমি যেন এই জীবনে কখনও কোনো কিছুর অভাব বোধ না করে। ও একটু একটু করে রিমির চারপাশে এক নিরাপত্তার দেয়াল তুলে দিতে চায়, যেখানে দুনিয়ার কোনো ঝড় রিমিকে স্পর্শ করতে পারবে না। ওদিকে… ভার্সিটিতে গিয়ে রিমির মনটা হঠাতই ফুরফুরে হয়ে উঠল। ডিপার্টমেন্ট থেকে অ্যানুয়াল পিকনিকের ঘোষণা এসেছে। ক্লাসের প্রায় সবাই যাচ্ছে, ইনায়া তো সেই সকাল থেকেই লাফালাফি শুরু করেছে। রিমিরও খুব ইচ্ছে করছিল সবার সাথে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসতে, কিন্তু মনের কোণায় একটা ভয়, আরশান কি রাজি হবে? লোকটা তো রিমির ওপর এক অদৃশ্য ছায়ার মতো নজর রাখে। তবুও ও ঠিক করল, একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে।রাতে আরশান যখন ওর স্টাডি রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল, তখন রিমি দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। আরশান মাথা তুলে রিমিকে দেখে বেশ অবাক হলো। রিমি ভুলেও এই ঘরটার দিকে পা বাড়ায় না! আরশান চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল — “কী ব্যাপার রিমি? আজ সূর্য কোন দিক দিয়ে ডুবলো যে তুমি আমার স্টাডি রুমে?”
রিমি একটু ইতস্তত করে ঘরে ঢুকল। ওর দুই হাত পেছনে জড়ো করা, যেন খুব দ্বিধায় আছে — “আসলে একটা কথা বলতে এসেছিলাম। আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে পিকনিকে যাচ্ছে সবাই।”
আরশান কথা শেষ করতে না দিয়েই নির্লিপ্ত গলায় বলল — “না।”
রিমির মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল।
“কেন না? ক্লাসের সবাই যাচ্ছে, এমনকি ইনায়াও যাবে। আমি কেন যেতে পারব না?”
আরশান গম্ভীর হয়ে বলল — “তোমার কোথাও ঘুরতে যেতে ইচ্ছে হলে আমাকে বলো, আমি তোমাকে নিয়ে যাব। ওইরকম শয়ে শয়ে মানুষের সাথে ঝাঁক বেঁধে কোথাও গিয়ে কী এমন মজা পাবে তুমি?”
“আমি সবার সাথে সময় কাটাতে চাই আরশান। এটা তো শুধু ঘোরাঘুরি নয়, একটা সুন্দর মেমোরিও তৈরি হবে।”
আরশান আবার ল্যাপটপের দিকে মন দিকে চোখ রেখে উত্তর দিলো — “দরকার নেই এমন মেমোরির। বাইরে যাওয়া মানেই হাজারটা রিস্ক। আমি তোমাকে অনুমতি দিতে পারছি না।”
রিমি এবার একটু তেজ দেখিয়ে বলল — “আরশান প্লিজ! সবসময় আমি আপনার প্রতিটি হুকুম মেনে চলছি, আপনার মর্জিমতো জীবন কাটাচ্ছি। তার বদলে কি একদিনের জন্য নিজের বন্ধুদের সাথে কোথাও যাওয়ার অনুমতি আমি পেতে পারি না? আপনি কি আমাকে এই ঘরের ভেতর বন্দি করে রাখতেই বিয়ে করেছেন?”
রিমির কথায় আরশানের মেজাজ চড়ে গেল। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে রিমির খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ওর দীর্ঘদেহী অবয়ব রিমির ওপর এক ধরণের ভীতি সৃষ্টি করল।
“বন্দি মানে কী? আমি তোমার সুরক্ষার কথা ভেবেই কথাটা বলছি”
অনেকক্ষণ নানাভাবে বোঝানোর পরেও আরশান যখন ওর কথা পাত্তাই দিলো না তখন রিমির চোখে পানি চলে এলো। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল — “সুরক্ষা আর দম বন্ধ হয়ে আসার মধ্যে খুব সামান্য পার্থক্য আছে আরশান। আপনি যদি আমাকে বিশ্বাস না করেন, তবে এই সম্পর্কের কোনো মানে হয় না।”
পরবর্তী দশ মিনিট দুজনের মধ্যে বেশ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলো। আরশান কিছুতেই বুঝতে চাইছিল না, আর রিমি নাছোড়বান্দার মতো নিজের অবস্থানে অনড় ছিল। এক পর্যায়ে রিমির কান্নাভেজা করুণ মুখটা দেখে আরশানের পাথরের মতো মনটা একটু গলল। ও জানে রিমিকে বেশি চাপ দিলে ও যদি হিতে বিপরীত কিছু করে? আরশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত ঘষে বলল— “okay fine, যাও তুমি। কিন্তু শর্ত একটাই, সবসময় ইনায়ার সঙ্গে থাকবে একটা কোথাও যাবেনা। আর প্রতি এক ঘণ্টা পরপর আমাকে আপডেট দেবে। আমি যদি একবারও তোমার ফোন বন্ধ পাই, তবে আমি নিজে গিয়ে তোমাকে ওখান থেকে তুলে নিয়ে আসব। বুঝলে?”
রিমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে আরশানের দিকে তাকালো। এই খিটখিটে লোকটার কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া যে কতটা যুদ্ধের কাজ, তা ও ভালো করেই জানে। ও মৃদু হেসে বলল — “থ্যাঙ্ক ইউ! আমি নিজের খেয়াল রাখতে পারি তাই আপনাকে চিন্তা করতে হবেনা!”
রিমি তো খুশিমনে ওখান থেকে চলে এলো, ও যাওয়ার পর আরশান জানালার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল — “আমার চোখের আড়াল হতে পারলেই তুমি শান্তি পাও রিমি কিন্তু তোমাকে একটু চোখের আড়াল করলেই যে আমার শান্তি অশান্তিতে পরিণত হয় তুমি সেটা বুঝবে কবে?”
দেখতে দেখতে পিকনিকের আগেরদিন চলে এলো। সেই সন্ধ্যা থেকেই রিমি বেশ ব্যস্ত, এর মধ্যে ইনায়ার ঘরে কয়েকবার যাওয়া আসা হয়ে গেছে। দুই বান্ধবী মিলে ঠিক করেছে ম্যাচিং জিনিস নেবে। ড্রয়ার থেকে পোশাক বের করা, টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখা ওর প্রতিটি কাজ আর চলায় এক ধরণের চপলতা ফুটে উঠছে। সারা ঘরজুড়ে রিমির এই আনন্দময় ছোটাছুটি আরশানের চোখ এড়াল না। আরশান চেয়ারে বসে একটা ম্যাগাজিনে চোখ বোলাচ্ছিল, কিন্তু ওর মন পড়ে ছিল রিমির দিকে। আরশান আর থাকতে না পেরে ম্যাগাজিনটা টেবিলের ওপর ছুড়ে দিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল— “Why are you so damn excited?”
রিমি থমকে দাঁড়াল। ব্যাগের চেইন লাগাতে লাগাতে ও অবাক হয়ে আরশানের দিকে তাকালো। আরশানের চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি আর তাচ্ছিল্য। রিমি একটু হেসে জিজ্ঞাসা করল — “আপনি কোনোদিন বন্ধুদের নিয়ে পিকনিকে যাননি আরশান? দল বেঁধে গান গাওয়া, একসাথে খাওয়া-দাওয়া করা এসবের মধ্যে যে কী আনন্দ তা কি আপনি জানেন না?”
আরশান ভ্রু কুঁচকে ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব নিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। ওর দু-হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা। অত্যন্ত নির্লিপ্ত গলায় ও বলল — “আমার ইচ্ছে হলে আমি একাই অ্যাডভেঞ্চারে চলে যেতাম, দুর্গম পাহাড় কিংবা অন্যকোথাও। সেখানে আমি একাই যথেষ্ট। I don’t need friends or a crowd to enjoy myself.”
রিমির হাসিটা এবার একটু ম্লান হয়ে গেল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরশানের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাল। নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে খাটের একপাশে রাখতে রাখতে ও নিচু স্বরে বলল — “তাহলে আপনাকে বলে লাভ নেই আরশান। একা থাকার মধ্যে হয়তো শান্তি আছে, কিন্তু সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়া আনন্দের যে অন্যরকম একটা আমেজ থাকে, সেটা বোঝার মতো মন বোধহয় আপনার নেই। আপনি বুঝবেন না পিকনিকের ওই হৈ-হুল্লোড় আর ফেরার পথের সেই ক্লান্তিমাখা সুখের অনুভূতিটা আসলে কী!”
রিমির এই ‘আপনি বুঝবেন না’ কথাটি আরশানের অহংকারে গিয়ে বিঁধল। ও রিমিকে নিজের আওতার মধ্যে রাখতে চায়, নিজের মতো করে চালাতে চায়। অথচ এই মেয়েটি খুব সহজেই আরশানের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে। আরশানের ইচ্ছে করছিল এখনই অনুমতিটা বাতিল করে দিতে, কিন্তু রিমির চোখের মায়া ওকে আটকে দিল। আরশান নীরবে ওকে দেখছিল, ওর মনে হচ্ছিল রিমি যেন এই ঘর থেকে কিছু সময় মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। আরশানের মনটা এবার একটু খারাপ হলো। ও বুঝতে পারল, রিমিকে ও যতোই আগলে রাখুক না কেন, রিমির মনের চাবিকাঠি এখনো ওর হাতে আসেনি!
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/18dfdBwH9g/?mibextid=oFDknk

