#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩১
পিকনিকের ভেন্যু ঠিক হয়েছে শহর থেকে বেশ দূরে, এক নদীর তীরবর্তী মনোরম এক স্পটে। পাশেই একটা অভিজাত রিসোর্ট বুকিং করা হয়েছে, সেখানেই দু-দিন থাকবে সবাই। যাওয়ার আগের রাতে ডিনার টেবিলে এক অদ্ভুত আবহাওয়া বিরাজ করছিল। ইনায়া উত্তেজনায় কাঁপছে, আর আরশানের মুখে মেঘলা দিনের গাম্ভীর্য। আয়ান গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বোনকে উদ্দেশ্য করে টিপ্পনী কাটল।
“এই বৃষ্টি-বাদলের দিনে তোরা পিকনিক করার জন্য আর জায়গা পেলি না? যে নদীটার পাড়ে যাচ্ছিস, ওখানে তো বৃষ্টির তোড় আরও বেশি হয়। আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে তোদের সব আনন্দ একদম কাদা হয়ে যাবে দেখিস।”
ইনায়া মুখ কুঁচকে বলল — “আমি কি আর সাধ করে ওখানে যেতে চেয়েছি? আমি তো অন্য স্পটের কথা বলেছিলাম। কিন্তু মেজরিটি স্টুডেন্ট ওখানে যেতে চাইছে। জায়গাটা নাকি খুব সুন্দর আর নদীটা এ সময়ে অনেক বেশি যৌবনবতী থাকে।”
নদীর কথা শুনতেই আরশান খাওয়া থামিয়ে সরাসরি বোন আর রিমির দিকে তাকালো। ওর চোখে তীক্ষ্ণ সতর্কবাণী!
“ভুলেও নদীর আশেপাশে যাবে না তোমরা। এখনকার আবহাওয়া ভালো না”
ইনায়া মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করল — “হ্যাঁ ভাইয়া, আমি তো সাঁতার জানি না। ওদিকে ভুলেও যাব না।”
রিমি একপাশে চুপচাপ মাথা নিচু করে খাচ্ছিল। আরশান এবার ওর দিকে ঝুঁকে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল — “Did you hear what I said, Rimi?”
রিমি ওর চোখের দিকে না তাকিয়েই প্লেটে ভাতের লোকমা নাড়তে নাড়তে বিড়বিড় করে বলল — “এই লোকটা কি আমাকে দুধের বাচ্চা ভাবে? নদীর পাড়ে গেলে কি আমি ধপাস করে পড়ে যাব? সারাক্ষণ শুধু শাসন আর হুকুম!”
কথাটা ও খুবই আস্তে বলেছিল, যাতে কারও কানে না পৌঁছায়। কিন্তু আরশানের কান যেন অতীন্দ্রিয়। ও রিমির অস্ফুট কথাটা ঠিকই শুনে ফেলল!
“তোমার যদি নদীর পাড়ে যাওয়ার খুব বেশি শখ হয়, তবে সাথে করে একটা লাইফ জ্যাকেট নিয়ে যেও। অন্তত ডুবে গেলে ভেসে তো থাকবে, খুঁজে পেতে সুবিধা হবে।”
আরশানের এমন কথা শুনে আয়ান ফিক করে হেসে দিল!
“দারুণ বলেছ ভাইয়া! ভাবী তো এইটুকু একটা মানুষ, একবার যদি পা ফসকে তলিয়ে যায়, তবে দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
ইনায়াও এবার হাসি চেপে রাখতে পারল না। ডিনার টেবিলের এই হাসি-ঠাট্টা দেখে রিমি রাগে আরশানের দিকে একবার অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো আর মনে মনে ভাবল এই লোকটা কি সবখানে অপমান না করলে শান্তি পায় না? পরদিন সকালে আকাশটা বেশ মেঘলা ছিল। সকাল আটটায় ভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে বাস ছাড়বে। আরশান নিজেই ইনায়া আর রিমিকে পৌঁছে দিতে গেছে। ক্যাম্পাসের গেটে বাস দাঁড়িয়ে আছে, ছাত্রছাত্রীদের হৈ-হুল্লোড়ে পুরো এলাকা মুখরিত। গাড়ি থামতেই রিমি দ্রুত নেমে পড়ল। ওর চোখেমুখে এক ধরণের মুক্তির আনন্দ। আরশানের দিকে একবার না তাকিয়েই ও বাসের দিকে রওনা হতে চাইল। কিন্তু ও বড়জোর দুই পা এগোতে পেরেছিল, এর মধ্যেই আরশানের লম্বা হাতটা ওর কবজি চেপে ধরল। এক টানে ওকে নিজের কাছে ফিরিয়ে এনে আরশান নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল….
“Are you in such a hurry to escape from me that you don’t even feel the need to say a simple ‘goodbye’?”
আরশানের বলার ভঙ্গিটা এমন ছিল যে আশেপাশে দু-একজন স্টুডেন্ট উৎসুক হয়ে তাকালো। রিমি অপ্রস্তুত হয়ে কবজি ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল — “আমি মাত্র দু-দিনের জন্য যাচ্ছি আর আপনি এমন করছেন যেন কয়েক মাসের জন্য বিদায় নিচ্ছি!”
আরশান ওর চোখের গভীরে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললো…
“সুযোগ থাকলে তো সেটাই করতে, তাই না? আমাকে ছাড়া কয়েক মাস কাটানোর সুযোগ পেলে তুমি নিশ্চয়ই আর ফিরে আসতে চাইতে না।”
রিমির মুডটা সকালে খুব ভালো ছিল, কিন্তু আরশানের এই তর্কের প্যাঁচ ওর মেজাজ বিগড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ও বুঝতে পারল এখানে দাঁড়িয়ে বেশি কথা বাড়ালে পরিস্থিতি নাটকীয় হয়ে উঠবে। তাই ও নিজের রাগ দমিয়ে একটু নরম হলো। আরশানের চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল — “ঠিক আছে, আপনি সাবধানে থাকব। আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন। হয়েছে? এবার যেতে দিন?”
আরশান আলতো করে ওর হাতটা ছেড়ে দিল। ও দেখল রিমি লঘু পায়ে হেঁটে বাসে উঠে গেল। বাসটা যখন স্টার্ট দিল, রিমি জানালার পাশে বসেছে, ইনায়া ওর পাশে। ইনায়া জানালা দিয়ে একবার আরশানের দিকে হাত নাড়ল কিন্তু আরশানের নজর ছিল রিমির দিকে যদিও মেয়েটা ওর দিকে শুধু একবার তাকিয়েছে। একটু পর বাস স্টার্ট দিলো, আরশান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না বাসটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়। রিমির দু-দিনের অনুপস্থিতি যে আরশানের জীবনে কতটা নিস্তব্ধতা নিয়ে আসবে, তা ওর অস্থির মনটা যেনো এখন থেকেই অনুভব করতে পারছিল।
বাসটা যখন মূল রাস্তা ধরে শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে হাইওয়েতে গিয়ে পড়ল, রিমি জানালার কাঁচ সরিয়ে আলতো করে পেছনে তাকালো। আরশানের কালো গাড়িটা এখন ধূসর ধূলিকণার মতো ছোট দেখাচ্ছে, একসময় সেটাও বাঁকের মুখে মিলিয়ে গেল। রিমি সিটে হেলান দিয়ে একটা দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ল। আরশানের ওই শাসনের অদৃশ্য লোহার বেষ্টনী থেকে সাময়িক এই মুক্তিটুকু ওর কাছে মনে হচ্ছে কোনো মস্ত বড় এক যুদ্ধ জয়ের চেয়েও দামী। তবে রিমির এই স্বস্তিটুকু অবশ্য আরশান বেশিক্ষণ নিরবচ্ছিন্ন থাকতে দিল না। গাড়ি চলতে শুরু করার এক ঘণ্টা পার হতে না হতেই রিমির ফোনের ভাইব্রেশনে পুরো শরীর কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ‘আরশান’ নামটা ভেসে উঠতেই রিমির মুখের হাসিটা মুহূর্তেই উবে গেল। আরশান যতবার কল করেছে রিমি দাঁতে দাঁত চেপে সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে ফোন রেখেছে। কিন্তু এটা ছিল কেবল শুরু। প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর আরশানের ফোন আসাটা যেন এক অলিখিত রুটিনে পরিণত হলো। রিমি বিরক্ত হলেও ফোন না ধরে উপায় নেই; কারণ ও জানে একবার ফোন রিসিভ না করলে আরশান পুরো বাস থামিয়ে কিংবা জিপিএস ট্র্যাক করে ওখানে গিয়ে হাজির হওয়ার ক্ষমতা রাখে! অবশেষে ঘণ্টা দুয়েকের যাত্রা শেষে ওরা যখন গন্তব্যে পৌঁছাল, চারদিকের দৃশ্য দেখে রিমির সব বিরক্তি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। নদীর পাড় ঘেঁষে বিশাল এক রিসোর্ট, চারদিকে সবুজের সমারোহ। দুই প্রফেসর ওদের সঙ্গে এসেছে, তাদের নির্দেশনায় স্টুডেন্টরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেদের তল্পিতল্পা নিয়ে। হৈ-হুল্লোড়, গান আর হাসি-ঠাট্টায় পুরো চত্বর মুখরিত। রিমি ভুলেই গেল ওর ফোনের ওপাশে আরশানের তীক্ষ্ণ নজরদারি আছে। ও মেতে উঠল বন্ধুদের সাথে, খোলা হাওয়ায় ওর চুলগুলো উড়তে শুরু করল স্বাধীনতার সুখে। ওদিকে, আরশান তখন একটার পর একটা মিটিং শেষ করছিল। এছাড়া টুকটাক আরো কিছু কাজ ছিলো, সেগুলো শেষ করে যখন ও নিজের কেবিনে ফিরে এসে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। তখনই অভ্যাসবশত ফোনটা হাতে নিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকতেই নিউজফিডের একদম ওপরে ইনায়ার পোস্ট করা একগুচ্ছ ছবি ভেসে উঠল। ছবির ক্যাপশন — “Best picnic ever with my favorites”
আরশান স্ক্রল করতে করতে এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেল। ছবিতে এক দল বন্ধুর মাঝে রিমি দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে খুশির বাঁধভাঙা জোয়ার। ওর হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো ভয় বা আড়ষ্টতা নেই। ও যেন এক অন্য জগতের মানুষ, যে নিজের ডানা খুঁজে পেয়েছে বহু বছর পর। বন্ধুদের সাথে আড্ডারত রিমির ওই প্রাণবন্ত মুখটা দেখে আরশানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক অজানা হাহাকারে ভরে উঠল। আরশান ফোনটা হাতের তালুতে রেখে জানালার বাইরে বিশাল আকাশটার দিকে তাকালো। বিষণ্ণ একটা হাসি ওর ঠোঁটে খেলা করল। ও বিড়বিড় করে আপনমনেই বলল…
“এতো ভিড়ের মাঝেও নিজের জন্যে আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে মেয়েটা অথচ আমার বেলায়? she doesn’t feel good even in the most sophisticated places when she’s with me.”
আরশানের মনে হলো, ও যতোই দামী গিফট, জমি কিংবা রাজকীয় বৈভব রিমির পায়ের কাছে এনে রাখুক না কেন, রিমির ওই হাসির চাবিকাঠিটা ও আজও খুঁজে পায়নি। প্রতিটি ছবিতে থাকা রিমির ওই হাসিমুখখানি আরশানের মনে একই সাথে ভালোলাগা আর এক গভীর বিষণ্ণতার জন্ম দিল!
___________________________________
বিকেলের আকাশটা তখন রোদে ঝলমল করছে। নদীর ধারের স্নিগ্ধ হাওয়া আর পাখির কলকাকলিতে পিকনিক স্পটটা যেন এক অন্যরকম প্রাণ পেয়েছে। দুপুরে সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বেরিয়ে পড়েছে ঘুরতে। পুরো দলকে দুই ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন দুই প্রফেসর। ইনায়া আর রিমি যে দলে আছে, সেই দলের সাথে আবিদও রয়েছে। তবে আবিদ এখন অনেক বেশি সতর্ক। ও জানে আরশানের দখলদারিত্বের সীমা কতখানি, তাই ও যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই চলছিলো।ইনায়ার হাতে দামী ক্যামেরা, কিন্তু ও ছবি তোলার চেয়ে ছবি তোলাতেই বেশি আগ্রহী। ও আবিদকে ডেকে বলল — “আবিদ, তুমি তো ফটোগ্রাফিতে বেশ ভালো। আমাদের কিছু ক্যান্ডিড ছবি নিয়ে দাও তো!”
আবিদ অমত করল না। ও ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে রিমি আর ইনায়ার চমৎকার কিছু ছবি তুলল। কিছুক্ষণ পর প্রফেসর হাঁক দিয়ে বললেন — “সবাই এদিকে এসো! একটা গ্রুপ ফটো হয়ে যাক।”
সবাই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল। ইনায়া রিমির পাশে দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছিল। আবিদকেও যখন সারিতে আসতে বলা হলো, ও গিয়ে রিমির থেকে কয়েক হাত দূরে এক কোণায় দাঁড়াল। শটার টিপার ঠিক আগ মুহূর্তে, আবিদ নিজের অজান্তেই একবার ঘাড় ঘুরিয়ে রিমির দিকে তাকালো। রিমির মুখে তখন এক চিলতে অমলিন হাসি, যা বিকেলের রোদে আরও মায়াবী হয়ে উঠেছিল। আবিদের সেই ক্ষণিকের মুগ্ধ চাহনি আর বাকি সবার ক্যামেরার দিকে তাকানো ঠিক এই মুহূর্তেই ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল। ছবিটা উঠে গেল। ইনায়া এতটাই উত্তেজিত ছিল যে ছবিগুলো চেক করার সময় খুঁটিনাটি খেয়াল করল না। ও কয়েকটা গ্রুপ ফটো আর রিমির একক ছবি নিয়ে তড়িঘড়ি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দিল। ক্যাপশনে লিখল “স্মৃতিময় এক বিকেল!”
অফিসের বড় কাঁচের জানলার ওপাশে গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছে। আরশানের আজকের দিনটা ছিল ভীষণ ব্যস্ততায় ঠাসা। বিদেশের এক বড় ক্লায়েন্টের সাথে দীর্ঘ মিটিং ছিল, যেটা বেশ সফলভাবেই শেষ হয়েছে। মিটিং শেষে বড় একটা প্রজেক্টের কাজ হাতে আসায় আরশান গত কয়েক ঘণ্টা ধরে ফাইলপত্র আর ল্যাপটপে ডুবে ছিল। পেন্ডিং কাজগুলো শেষ না করে ও সাধারণত ওঠে না। কিন্তু কাজের সেই গভীর মনোযোগে ছেদ পড়ল যখন ও রিফ্রেশমেন্টের জন্য ফোনটা হাতে নিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনায়ার পোস্ট করা ছবিগুলো দেখার পর থেকেই আরশানের মাথার রগ দপদপ করছে। হাতের পেনটা ও শক্ত করে ধরে রাখল। ছবিতে বাকি সবার চাহনি ক্যামেরার দিকে থাকলেও, ওই ছেলেটার মানে আবিদের চোখ আটকে আছে রিমির হাসিমুখের ওপর। আরশান ফাইলে সই করতে গিয়েও থেমে গেল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। আবিদকে ও চেনে, ওইদিন রিসিপশনের অনুষ্ঠানে এসেছিলো বন্ধু হিসেবে। কিন্তু আরশানের অভিজ্ঞ চোখ বলে দিচ্ছে, ওই চাহনি কেবল বন্ধুত্বের নয়। ওটা এক ধরণের সশ্রদ্ধ ভালো লাগা, যা আরশানের সহ্যক্ষমতার কয়েক মাইল বাইরে। আরশান চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বুজল। ও জানে ওর এখন অফিসে থাকা উচিত, কারণ কাজের চাপ প্রচুর। কিন্তু ওই ছবিটা ওর মগজে হ্যামারের মতো আঘাত করছে। ও বিড়বিড় করে বলল…
“Does that guy even have a clue whose woman he’s staring at?”
আরশান ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। হাতের ঘড়িটা দেখল। অফিস থেকে ওই পিকনিক স্পটে যেতে অন্তত কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে। ইয়াসির তখন ফাইল নিয়ে ঢুকতেই আরশান হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল।
“বাকি কাজগুলো পরে সকালে দেখব। Cancel my all schedule for tomorrow”
অফিস থেকে যখন আরশান বেরোলো, ওর ভেতরে এক তীব্র দ্বন্দ্ব কাজ করছিল। ও ভেবেছিল এবার রিমির খুশির কথা ভেবে নিজেকে একটু সংযত রাখবে। ওকে কিছুটা স্বাধীনতা দেবে, যাতে রিমি অন্তত এই অপবাদ দিতে না পারে যে আরশান ওকে চার দেয়ালে বন্দি করে রাখে। কিন্তু ওই একটি ছবি আরশানের সব ধৈর্য্য ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। রিমির ওপর অন্য কারো মুগ্ধ চাহনি সইবার মতো উদারতা আরশানের অভিধানে নেই। ও গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে চাপ দিয়ে বিড়বিড় করল…
“I tried to give you space, Rimi. I really tried. But you clearly don’t know how to keep people within their limits”
আরশান ঠিক করল, রাত যতোই হোক ও আজই ওখানে পৌঁছাবে। ওদিকে… ঘুরাঘুরি শেষে ফিরে একটু ফ্রেশ হয়ে বসতেই ইনায়া হঠাৎ খেয়াল করল ও ওর ফোনের চার্জারটা বাসায় ফেলে এসেছে। চার্জ প্রায় শেষ হয়ে আসায় ও পাশের রুমে গেল অন্য এক ক্লাসমেটের থেকে চার্জার নিতে কারণ রিমিসহ ওই রুমে থাকা অন্য কারো ফোনের চার্জারই ওর ফোনে হচ্ছেনা। তো ও যে রুমে গেছিলো ওই রুমেই থাকছে শাফিন। শাফিন আগে থেকেই রিমির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার পথ খুঁজছিল। সেই যে একবার রিমির হাতে চড় খেয়েছিল, সেই অপমানের জ্বালা ও ভুলতে পারেনি। আজ ইনায়াকে ওর রুমে ফোন রেখে যেতে দেখে শাফিনের কুটিল মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়ে উঠল। শাফিন এক সহপাঠিনীকে পটিয়ে ইনায়ার কাছে পাঠাল। মেয়েটি ইনায়াকে এসে বলল — “ইনায়া, শোনো না! আমার একটু তোমার হেল্প লাগবে।”
ইনায়া মেয়েটিকে চিনতো বলে কোনো সন্দেহ করল না। ও ফোনটা চার্জে রেখেই মেয়েটির সাথে বেরিয়ে গেল। ইনায়া আড়াল হওয়া মাত্রই শাফিন ছোঁ মেরে ওর ফোনটা হাতে নিল। ইনায়ার ফোন আনলক করা ছিল। শাফিন চটজলদি রিমির নাম্বারে একটা মেসেজ টাইপ করল — “রিমি, জলদি নদীর পাড়ে আয়। আমি এখানে দারুণ একটা জিনিস দেখেছি, তুই দেখলে অবাক হয়ে যাবি!”
রুমে বসে রিমি মেসেজটা পেয়ে কিছুটা অবাক হলো। ইনায়া তো এইমাত্র রুম থেকে বেরোলো, তাহলে ও নদীর পাড়ে গেল কখন? পরক্ষণেই ও ভাবল, ইনায়ার তো আবার নতুন নতুন পাগলামি করার স্বভাব আছে। হয়তো বিশেষ কিছু দেখেছে তাই দেখাতে ডাকছে। ও সাত-পাঁচ না ভেবেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। অন্ধকার নদীর পাড় যে এই সময়ে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, সেই চিন্তা ওর মাথায় এল না। হোটেলের বাগান পেরিয়ে ও যখন নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালো, তখন নদী একদম শান্ত ছিলো থাকলেও চারপাশে পরিবেশ ছিলো বেশ গুমোট যাতে রিমির বেশ অস্বস্তি হচ্ছিলো। নদীর পাড়টা একটু উঁচু! তাই ও একটু দূরেই দাঁড়িয়ে চারপাশে একনজর চোখ বুলিয়ে একটু জোরেই বললো — “ইনায়া? কোথায় তুই?”
নদীর পাড়ের অন্ধকারটা আজ বড্ড গুমোট। হোটেলের বাগান পেরিয়ে রিমি যখন জলের একদম কিনারে এসে দাঁড়াল, তখন তপ্ত হাওয়ায় ওর মনটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। নদীর ঢেউগুলো পাড়ের পাথরে আছড়ে পড়ে এক ধরণের গম্ভীর গর্জন তুলছে। ইনায়ার ফোন থেকে আসা সেই মেসেজটা রিমির মনে বারবার খটকা জাগাচ্ছিল— *”রিমি, জলদি আয়, দারুণ একটা জিনিস দেখবি!”*
রিমি জানত না, ওর ঠিক কয়েক ফুট পেছনেই অন্ধকারের সাথে মিশে ওত পেতে আছে শাফিন। ওর চোখেমুখে এক পৈশাচিক প্রতিহিংসার ছাপ। রিমির হাতে খাওয়া সেই চড়টা ওর মনে যে ক্ষত তৈরি করেছিল, আজ তার বদলা নিতেই ও এই সুযোগটা বেছে নিয়েছে। শাফিন নিঃশব্দে পা ফেলে রিমির একদম পেছনে এসে দাঁড়াল। রিমি তখন সামনের দিকে ঝুঁকে নদীর অন্ধকারে ইনায়াকে খোঁজার চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই শাফিন ওর দুই হাত বাড়িয়ে সজোরে রিমিকে ধাক্কা দিল।
“আহ্!”— রিমির মুখ দিয়ে একটা তীব্র আর্তনাদ বের হওয়ার আগেই ও ভারসাম্য হারিয়ে ঝপাৎ করে শীতল নদীর স্রোতে আছড়ে পড়ল। সাঁতার না জানা রিমির কাছে এই উত্তাল নদী তখন সাক্ষাৎ মৃত্যু। ও আপ্রাণ চেষ্টা করছিল হাত-পা ছুড়ে ওপরে ওঠার, কিন্তু সাঁতার না জানায় ওর শরীরটা পাথরের মতো নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছিল! ঠিক সেই মুহূর্তেই আরশানের কালো গাড়িটা হোটেলের পোর্চে এসে থামল। লম্বা জার্নির ক্লান্তি আর মনের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা আরশানের চোয়ালে স্পষ্ট। ও গাড়ি থেকে নেমে গটগট করে হোটেলের ভেতরে ঢুকল। রিসিপশনের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ওর ফোনটা বেজে উঠল, কিন্তু ও সেদিকে খেয়াল দিল না।আরশান যখন ম্যানেজারের কাছে নিজের নাম বলতে যাবে, ঠিক তখনই হোটেলের এক মধ্যবয়স্ক ওয়েটার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। লোকটার চোখেমুখে আতঙ্ক, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ও আরশানের সামনে এসেই প্রায় আর্তনাদ করে উঠল…
“সর্বনাশ হয়ে গেছে! স্যার, শিগগির আসুন! কেউ একজন নদীর পানিতে পড়েছে!”
আরশানের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল। ওর সারা শরীরে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। ওয়েটার লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে রিসিপশনিস্টের দিকে তাকিয়ে বলল — “এখানে পিকনিকের জন্য যে বাচ্চারা এসেছে, ওদের মধ্যে কেউ না তো? আমি দূর থেকে শুধু ঝপাৎ করে শব্দ শুনলাম আর একটা ক্ষীণ চিৎকার!”
ওয়েটারের কথা শেষ হওয়ার আগেই আরশানের চোখের সামনে রিমির হাসিমুখটা ভেসে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য ওর মস্তিষ্কের কাজ করার ক্ষমতা যেন লোপ পেল, পরক্ষণেই এক তীব্র উন্মাদনা ওকে গ্রাস করল। কোনো কথা না বলে, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে আরশান শুধু জিজ্ঞাসা করলো রাস্তা কোনদিকে, এরপর কোনোরকম দৌড় দিল। ওর হৃদপিণ্ড তখন গলার কাছে আছড়ে পড়ছে। আরশানের মাথায় কেবল একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে রিমি যেন নিরাপদে থাকে!
চলবে…
আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/18EHG29ZLe/?mibextid=oFDknk

