মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_৩৩

0
21

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_৩৩

সকালের নরম রোদের আলো জানলার ভারী পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতর এক চিলতে ম্লান উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে দিয়েছে। আরশানের ঘুমটা খুব একটা গভীর ছিল না বিধায় ওই আলো একটু চোখে এসে পড়তেই ওর দুচোখের পাতা সজাগ হয়ে উঠল। চোখ খুলেই ওর প্রথম দৃষ্টি পড়ল পাশে শুয়ে থাকা রিমির দিকে। রিমি এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আরশান অতি সন্তর্পণে নিজের হাতের উল্টো পিঠটা রিমির কপালে আর গলায় ছোঁয়াল। ও মনে মনে ভয় পাচ্ছিল, কাল রাতের সেই ঠান্ডা নদীর পানির প্রকোপে মেয়েটার না জানি জ্বর চলে আসে। কিন্তু রিমির শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক দেখে আরশান একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।স্বস্তিটুকু পাওয়ার ঠিক পরমুহূর্তেই আরশানের মনে এক তীব্র অস্বস্তি হানা দিল। কাল রিমির ওই অবস্থা দেখে ওর হিতাহিত জ্ঞান ছিল না, তাই নদীর পাড়ের সেই কাদামাটির আর ময়লা ওর পোশাকে বা শরীরে মাখামাখি হলেও ও সেটা ভ্রুক্ষেপ করেনি। রাতে বাসায় ফিরে কোনোমতে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখন পূর্ণ চেতনায় আসতেই আরশানের OCD-র সমস্যাটা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শৈশব থেকেই আরশান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অবিশ্বাস্য রকমের খুঁতখুঁতে। সামান্য এক ফোঁটা ধুলো বা পানির দাগও ওর সহ্য হয় না। সেখানে কাল ও নদীর পচা কাদা, শ্যাওলা আর কর্দমাক্ত মাটির সংস্পর্শে ছিল অনেকটা সময়। ভাবতেই ওর সমস্ত শরীর ঘিনঘিন করে উঠল। ওর মনে হতে লাগল, কালকের সেই নোংরা আবর্জনাগুলো এখনো ওর ত্বকের কোষে কোষে মিশে আছে। এক ধরণের অদৃশ্য অস্বস্তিতে ওর হাত-পা নিশপিশ করতে লাগল। আরশান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সোজা শাওয়ার নিতে চলে গেল। ও বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারটা ছেড়ে দিয়ে ঝরনার তীব্র পানির নিচে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জলের ধারা ওর শরীর বেয়ে নামলেও ওর মনের ভেতরের সেই খুঁতখুঁতে ভাবটা কাটছিল না। ও বডি ওয়াশ দিয়ে নিজের শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি যেন আক্রোশ নিয়ে ঘষতে শুরু করল। একবার, দুবার নয় ও বারবার নিজের হাত, ঘাড় আর বুক ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছিল। ওর মনে হচ্ছিল, যতক্ষণ না গায়ের চামড়া লাল হয়ে উঠছে, ততক্ষণ এই ময়লাগুলো দূর হবে না। ঠিক কতক্ষণ ধরে ও নিজেকে পরিচ্ছন্ন করার এই যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, তার কোনো হিসেব নেই। শাওয়ারের বাষ্পে বাথরুমটা ভরে উঠেছে, কিন্তু আরশানের তৃপ্তি হচ্ছিল না।

শেষে যখন শাওয়ার শেষ করে ও বেরিয়ে এল, ওর গায়ের চামড়া ঘষার চোটে বেশ লালচে হয়ে উঠেছে কিন্তু ওর মেজাজ আর শরীর দুটোই এখন সতেজ লাগছে। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ও ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালো। নিজের ফ্রেশ আর পরিপাটি অবয়বটা দেখে ওর অস্বস্তি কিছুটা কমল! তার পরনে কেবল একটা গাঢ় ধূসর রঙের ট্রাউজার। হাতের তোয়ালেটা দিয়ে ভেজা চুলে হালকা ঝাপটা দিতে দিতে ও যখন আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো, তখনো ওর চওড়া কাঁধ আর পেশিবহুল পিঠ বেয়ে জলের কণা গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই রিমির ঘুমটা ভাঙল। কালকের সেই অবশ করা ক্লান্তি কাটিয়ে ও যখন খুব ধীরে চোখ মেলল, ওর ঝাপসা দৃষ্টির সামনে ফুটে উঠল এক পুরুষালি অবয়ব। রিমি বিছানায় শুয়েই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্তের জন্য ওর মনে হলো ও হয়তো কোনো ঘোরের মধ্যে আছে। আরশান তোয়ালেটা একপাশে রেখে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে মুখে ক্রিম মাখছে। আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া আরশানের সুগঠিত শরীরের দিকে তাকিয়ে রিমি পলক ফেলতে ভুলে গেল। আরশানের প্রতি ওর মনে যতোই বিদ্বেষ বা রাগ থাকুক, মানুষটা যে মারাত্মক হ্যান্ডসাম সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। লোকটার দিক থেকে চোখ ফেরানো যেন এক অসম্ভব! আরশান আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিল, কিন্তু হঠাতই ওর নজরে এল বিছানায় শুয়ে থাকা এক জোড়া বড় বড় চোখ। রিমি যে জেগে উঠেছে এবং ওকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, সেটা বুঝতে আরশানের এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। ও আয়নার মাধ্যমেই সরাসরি রিমির চোখের দিকে তাকালো। ওর দৃষ্টিতে তখন চাপা রাগ। আরশান আয়না থেকে না ফিরেই গম্ভীর গলায় বলল — “দেখা শেষ হয়েছে? নাকি এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুমি নিজের ঘরে, আমার সামনে আছো?”

রিমির হুশ ফিরে এল তখন। ও চট করে চাদরটা মাথা অব্দি টেনে নিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। আরশান এবার ঘুরে ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এসে টেনে রিমির মুখ থেকে চাদর নামিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করলো — “are you feeling alright?”

রিমি শুধু মাথা নাড়ল, আরশান তখন বললো…

“আমি তোমাকে বারণ করেছিলাম না রিমি? বলেছিলাম যে পিকনিকে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু না, তোমার তো স্বাধীনতা উপভোগ করার ইচ্ছা ছিলো। নিজের জেদ বজায় রাখতে গিয়ে কাল যা হলো, তার জন্য দায়ী কে হতো?”

রিমির ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। ও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু আরশানের রাগী চাহনি দেখে গলার স্বর আটকে গেল। আরশান এক পা এগিয়ে এসে নিচু হলো। ওর শরীর থেকে আসা শাওয়ার জেলের সতেজ ঘ্রাণ রিমির নাকে ধাক্কা দিল। ও রিমির চোখের ওপর চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল — “কাল যদি আমি ঠিক সময়ে না পৌঁছাতাম, তবে আজ তুমি কোথায় থাকতে কোনো আইডিয়া আছে? তোমার মাথায় যদি আবারো একা স্বাধীনতা ভোগ করার ভুত চাপে, then I will personally break your legs and make sure you never walk out of this house. Mark my words!”

আরশানের সেই বরফশীতল কণ্ঠস্বর আর চোখের প্রখরতা রিমিকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। রিমি অপরাধবোধ আর ভয়ের এক মিশ্র অনুভূতিতে খুব ক্ষীণ স্বরে অস্ফুট গলায় বলল — “Sorry”

আরশান তৎক্ষণাৎ ওর ঘাড় থেকে হাত সরিয়ে নিল। ও একবার রিমির ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল — “এখন ফ্রেশ হয়ে নিচে যাও। কাল থেকে না খেয়ে আছো”

আরশান কথাটুকু বলেই ঝটকা দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। রিমি আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। ফ্রেশ হয়ে খাওয়ার টেবিলে আসতেই দেখলো এক গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে। আরশান এর মধ্যেই ওর মা-বাবাকে কাল রাতের আসল সত্যটা জানিয়ে দিয়েছে। ও খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছে যে, রিমি পানিতে পড়ে যায়নি বরং কেউ একজন ওকে ধাক্কা দিয়ে মে’রে ফেলার চেষ্টা করেছে। সুরভী বেগম তো ভয়ে নীল হয়ে গেছিলেন!

“একি বলছিস আরশান! আমাদের রিমির সাথে কার এমন শত্রুতা? কে এমন জঘন্য কাজ করতে যাবে?”

আরাফাত সাহেবও স্তম্ভিত। আরশান ওনাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছে — “তোমরা এই নিয়ে রিমিকে কোনো প্রশ্ন করে ওর ট্রমা বাড়াবে না।”

রিমি যখন ডাইনিং টেবিলে এসে বসল, তখন ওর চারপাশটা বড্ড নিস্তব্ধ। সুরভী বেগম রিমির সামনে খাবার গুছিয়ে দিচ্ছিলেন। রিমির করুণ মুখটা দেখে ওনার মায়া হলো। তিনি পরম মমতায় জিজ্ঞেস করলেন — “এখন শরীরটা কেমন লাগছে?”

রিমি ম্লান হেসে উত্তর দিল — “জি অ্যান্টি, অনেকটা ভালো লাগছে এখন। আগের মতো অতটা দুর্বল লাগছে না।”

ইনায়া পাশে বসে চামচ দিয়ে প্লেটে নাড়াচাড়া করছিল। ওর মুখটা আজ বড্ড গোমড়া। শাফিনের মতো একজন যে এমন কাজ করতে পারে, সেটা ও ভাবতেই পারছে না। মানুষের ওপর থেকে যেন ওর বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। আরাফাত সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খবরের কাগজটা পাশে রেখে বললে…

“আজকাল যে কি হচ্ছে কে জানে। আগে আমরা আশেপাশের কোথাও পিকনিকে যেতাম। কোনো দুর্ঘটনা বা কিছুই হতো না আর এখন এতো টাকা খরচ করে এতো সেফটি নিয়ে লাক্সারিয়াস জায়গায় যাওয়ার পরেও অ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে। আসলে সবই এখনকার ছেলেমেয়েদের অসাবধানতার ফল”

সুরভী বেগম তখন ইশারায় আরাফাত সাহেবকে চুপ করতে বললেন। রিমির সামনে এসব কথা বললে ও হয়তো আবার আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। রিমি যদিও বুঝেই গেছে যে আরাফাত সাহেবও অসাবধানতার বিষয়টা ওকেই শোনাচ্ছে। ও সব শুনেও মাথা নিচু করে খাচ্ছিল, কিন্তু ওর চোখ জোড়া বারবার ডাইনিং টেবিলের ওই শূন্য চেয়ারটার দিকে চলে যাচ্ছিল যেখানে আরশান বসার কথা। আরশান আজ কারো সাথে কথা না বলে, না খেয়েই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। রিমি টেরও পায়নি কখন লোকটা চলে গেল। কাল রাত থেকে এই সকাল পর্যন্ত আরশান ওর জন্য যা যা করেছে, তার জন্য একটা ‘ধন্যবাদ’ ওর প্রাপ্য ছিল। অন্তত একবার কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত ছিল লোকটাকে। কিন্তু সেই সুযোগই পেলো না। রিমি খেতে খেতে ভাবছিল আরশানের ক্রোধ থেকে বাঁচা হয়তো সম্ভব, কিন্তু ওর ওই আগলে রাখা শাসনের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার সাধ্য হয়তো ওর নেই!
____________________________________

আজকের দিনটা অন্য দিনের মতো ব্যস্ত নয়। আরশানের কড়া নির্দেশে রিমি ভার্সিটিতে যায়নি, ইনায়ারও আর যেতে ইচ্ছা হয়নি। আরশান যাওয়ার আগে ইনায়াকে দায়িত্ব দিয়ে গেছে যেন পুরোটা সময় ও রিমির পাশে থাকে। বাড়ির বড় ছেলের আদেশ অমান্য করার সাধ্য কারো নেই। সারাটা দুপুর ইনায়া রিমির ঘরেই ছিল কখনো গেমস খেলে, কখনো বা পুরনো সব মজার গল্প করে ও রিমির মন ভালো করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু রিমির মনের ভেতরের সেই অস্থিরতা যেন কিছুতেই কমছে না। কাল রাতের সেই বরফশীতল পানির স্পর্শ আর শাফিনের সেই হিংস্র ধাক্কাটা ওর স্মৃতির আয়নায় বারবার ভেসে উঠছে। দুপুরের খাবারের পর রিমি যখন জানালার পাশে বসে ছিল, তখন হুট করেই দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে বলে উঠল — “জানিস ইনায়া, কাল আমি পা পিছলে পড়ে যাইনি। শাফিন আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল”

ইনায়া ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল — “হ্যাঁ, জানি।”

রিমি চমকে গিয়ে ইনায়ার দিকে ফিরল। ওর চোখেমুখে বিস্ময়!

“তুই… তুই কীভাবে জানলি? ওখানে তো তখন আর কেউ ছিল না।”

ইনায়া এবার ফোনটা বিছানায় রেখে রিমির দিকে তাকালো। ওর কণ্ঠস্বরে এক ধরণের বিষণ্ণতা!

“আমিও ভাবিনি যে শাফিন এত নিচ হতে পারে। কিন্তু ভাইয়া কীভাবে যেন সব বুঝে গিয়েছিল। ভাইয়া না বললে তো বুঝতেই পারতাম না আমরা।”

রিমির হূৎস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ও অস্ফুট স্বরে বলল — “কী? আরশান জানে এটা শাফিন করেছে?”

“শুধু জানেই না রিমি, কাল রাতে রিসোর্টের সবার সামনে ও শাফিনকে প্রায় ধরে ফেলেছিল। ভাইয়ার নজর বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ, কোনো কিছুই ওর চোখ এড়ায় না। ভাইয়া যখন শাফিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন দেখছিলাম ছেলেটা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমি তখনই শিওর হয়ে গিয়েছিলাম যে এটা ওরই কাজ। তুই ওকে থা’প্পড় দিয়ে সবার সামনে অপমান করেছিলি না? সেটারই বদলা নেওয়ার জন্য ও এই জঘন্য কাজটা করেছে।”

রিমি এবার সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়ল। ও ইনায়ার হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলো — “আরশান কি ওকে কিছু বলেছে? সেখানে আর কী কী হয়েছিল আমাকে সবটা বল ইনায়া। প্লিজ!”

ইনায়া একটু ভেবে বলল — “ওখানে তেমন কিছুই হয়নি। ভাইয়া সবাইকে ডেকে জাস্ট কিছু কথা বলেছে কিন্তু শাফিনকে সরাসরি কিছুই বলেনি। পরে আমাকেও নিয়ে এলো ওখান থেকে। কেন যে ভাইয়া ওকে ওভাবে ছেড়ে দিল, সেটাই আমার মাথায় খেলছে না।”

রিমি বিছানায় হেলান দিয়ে বসল। ওর মন কু গাইতে শুরু করেছে। আরশানকে ও যতটুকু চিনেছে, তাতে এটুকু ও নিশ্চিত যে লোকটা এত সহজে কাউকে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তাহলে সব বুঝেও এতো সহজে ছেড়ে দিল শাফিনকে? ইনায়া রিমির চিন্তিত মুখ দেখে ওর কাঁধে হাত রাখল। সান্ত্বনার সুরে বলল…

“দেখ যা হওয়ার হয়ে গেছে। ওসব বজ্জাত ছেলের আলাপ করে নিজের মাথা খারাপ করার দরকার নেই। তুই যে সেফ আছিস, সহি-সালামতে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছিস, এটাই অনেক”

রিমি মাথা নাড়ল ঠিকই, কিন্তু ওর মনের গভীর থেকে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিচ্ছে আরশান কি সত্যিই শাফিনকে ক্ষমা করে ছেড়ে দিলো, নাকি লোকটার মাথায় অন্যকিছু চলছে? ওদিকে…অফিস কেবিনে বিকেলের পড়ন্ত রোদ তখন ফিকে হয়ে আসছে। আরশানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা কিছুক্ষণ আগে কথা শেষ করে বেরিয়ে গেছে। ইয়াসির কিছু কাগজ নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, আরশান খুব স্থির হয়ে টেবিলের ওপর রাখা একটা ছবি আর একটা কাগজের দিকে তাকিয়ে আছে। কাগজের লেখাগুলোয় আরশানের দৃষ্টি এতটাই নিবদ্ধ যে ইয়াসিরের উপস্থিতি ও টের পেল কি না বোঝা গেল না। বাইরে গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে। ইয়াসির গলা খাঁকারি দিয়ে বলল — “স্যার, কিছুক্ষণ পরেই জাপানি ক্লায়েন্টদের সাথে সেই ভিডিও কনফারেন্সটা শুরু হওয়ার কথা। সব রেডি আছে, আপনি কি…”

আরশান ছবিটা থেকে নজর না সরিয়েই শীতল গলায় বললো — “Cancel all my meetings for today”

ইয়াসির কিছুটা অবাক হলো — “কিন্তু স্যার, এটা তো অনেক জরুরি প্রজেক্ট ছিল। ওনারা গত এক মাস ধরে এই মিটিংটার জন্য অপেক্ষা করছেন!”

“তার চেয়েও জরুরি একটা কাজ আছে আমার।”

ইয়াসিরের এবার একটু কৌতূহল জাগলো যে কি এমন কাজ যার জন্যে আরশান এতো জরুরি মিটিং ছেড়ে দিচ্ছে? সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল — “স্যার, কাজটা কী বলা যাবে?”

আরশান খুব স্বাভাবিক স্বরে উত্তর দিল — “একজনকে তুলে আনতে পাঠিয়েছি। তার সাথে কিছু হিসেব মেটানোর আছে। পাওনাটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে তো, তাই আর দেরি করতে ইচ্ছে করছে না।”

তুলে আনা! ইয়াসিরের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তার মানে আবার কোনো অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। তবে নিজের দায়িত্বের কথা মনে পড়তেই ও একটু স্বস্তির স্বরে বলল — “স..স্যার, আমাকে এবার অন্তত এমন কাজের বাইরে রাখার জন্য ধন্যবাদ। গতবার আপনার ওই চাচা শ্বশুরকে তুলে আনতে গিয়েই আমার যে অবস্থা হয়েছিল, তা ভুলতে পারছি না।”

“এত খুশি হওয়ার কিছু নেই মি. ইয়াসির। You are my PA, and as my personal secretary, it’s part of your job to help me with my personal matters too”

ইয়াসির চুপসে গেল। আরশান এবার টেবিলের কাছে ফিরে এসে ডেস্কের ওপর রাখা কাগজটা আলতো করে সরালো। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল — “ঠিক রাত নয়টায় রিমিকে আমাদের সবচেয়ে পুরনো যে গোডাউনটা আছে, ওখানে চলে আসবেন।”

ইয়াসির আকাশ থেকে পড়ল। চোখ বড় বড় করে বলল — “ম্যাডামকেও তুলে আনতে হবে?”

আরশান কাগজটা ডেস্কের ওপর রেখে চেয়ারে গা এলিয়ে বসল। ওর চেহারায় এখন এক অদ্ভুত প্রসন্নতা! ও মৃদু হেসে বলল — “She is my wife. So, bring her with utmost respect”

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/17Je4JQE1e/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here