#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ১৮ (কপি করা নিষেধ)
_________________________________
শেষ বিকেলের হলুদাভ আসমানের আবরণ সরে প্রকৃতি অনেকটা সময় আগেই ধারণ করেছে নিকষ কালো অন্ধকারের রঙ। সেই অন্ধকার ভেদ করে ঢাকা সেনানিবাসের নির্দিষ্ট জায়গায় চট্টগ্রাম থেকে উড়ে এসে হেলিকপ্টার থামে। একে একে নেমে আসে ক্যাপ্টেন তাহমিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার ফারিহা আঞ্জুম, অন্য একজন টিম মেম্বার যার কাছে রয়েছে হাতকড়া পরিয়ে আঁটক করা আ*সা*মী শাকিল রায়হান। যে এখনো নে*শা*র ঘোরেই রয়েছে। তার সাথে কি হচ্ছে কিছু বোঝার মতো অবস্থায় নেয় সে। এরপর নামে ভিজে ইউনিফর্ম পরে মেজর এএকে। আর তার পিছু ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতার অগ্নিকন্যা মাশফিয়া রহমান মীম।
হেলিকপ্টার থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে অপেক্ষায় থাকা সেনাবাহিনীর দক্ষ একটা টিম আর তাদের নেতৃত্বে থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান, সদ্য কন্যা বিয়োগ হওয়া মেজর জেনারেলের নারায়ণ কর্মকার, ও জেনারেল আব্দুর ওয়াহিদ।
নিজ কন্যার উপর সম্পূর্ণ ভরসা আছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের যে সে যখন তখন যেকোনো কিছু করতে পারে। তাই বলে ছদ্মবেশী মেজর আর ক্যাপ্টেনের সাথে এহেন একটা গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের পর মীম থাকবে তা যে ব্রিগেডিয়ার সাহেব কস্মিনকালেও ভাবেনি তা তার মুখাবয়ব দেখেই বোঝা সম্ভব।
মীমকে এখানের পুরনো অনেকেই চেনে। ক্যান্টনমেন্টে তার অবাধ বিচরন ছিলো তিন বছর আগেও। কিন্তু সেই যে ঘটনা ঘটে তারপর সব বদলে গিয়েছে।
.
.
.
.
“বন্ধুদের সাথে ওইদিন ক্লা*বে একটা মেয়ে নিয়ে ঝামেলা হয়। ক্লা*ব থেকে ড্রিং*ক করে রেগেমেগে বের হয়ে গাড়ি নিয়ে কোন দিকে যাচ্ছি কোনো হুশ ছিলো না। রাস্তায় কয়েকবার ট্রাফিক পুলিশ আঁটকালেও টাকা খাইয়ে আবারও চলা শুরু করি। সারা রাত ড্রাইভ করে কোথাও একটা গিয়ে আর না পেরে থেমে যাই। ওখানে কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানিনা। যখন ঘুম ভাঙে তো আশেপাশের দোকানের পোষ্টেরে দেখলাম যে আমি কুমিল্লা পৌঁছে গিয়েছি রাতে। শরীরে একদম কোনো শক্তি ছিলো না যে আবারও ঢাকা ব্যাক করতাম ড্রাইভ করে। তাই গাড়ি থেকে বের হয়ে একটা দোকান থেকে পানি কিনে হাতমুখ ধুয়ে নিলাম। লোকাল একটা হোটেল থেকে নাস্তা করে বের হওয়ার সময় দূর্ভাগ্যবশত একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা লাগে।
আমি সরি বলতেই যাচ্ছিলাম কিন্তু ততক্ষণে মেয়েটা আমাকে থাপ্পড় মারে। তারপর উল্টো পাল্টা অনেক বাজে বাজে কথাও শোনায়। আমি নাকি ইচ্ছা করে তাকে ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য ধাক্কা লাগার নাটক করেছি।
এঁকে তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে এতো এতো মানুষের সামনে ওইটুকু একটা মেয়ে থাপ্পড় মেরেছে। তারপর আবার যা মনে এসেছে তাই বলেছে। ওই মেয়ের কথায় হাসাহাসির রোল পড়ে যায় পুরো জায়গায়। আমি হয়ে উঠলাম হাসির বস্তু।
আগের রাতের ক্লা*বে*র রাগ। ওই মেয়ের কান্ডকারখানায় সেখানেও প্রচন্ড রেগে যায় আমি। গাড়িতে উঠে বসে গাড়িতে আগের রাতের রাখা উ*ই*স্কি আর বি*য়া*র ছিলো কতকগুলান। সেখান থেকে দুইটা বি*য়া*র খেতে খেতে গাড়ি নিয়ে সেই মেয়ে যে বাসে উঠেছে সেটা ফলো করতে থাকি। একটাই উদ্দেশ্যে যে আমি কিছু না করেই যেসব অপবাদ পেয়েছি এবার সত্যি সত্যি সেসব করে দেখাবো।
ওরা যখন বাস থেকে নেমে ঘোরাঘুরি করে তখন আমি আবার পিছিয়ে যেয়ে সেই এলাকার লোকাল কিছু দিনমজুর লোকের সাথে কথা বলি। সমস্ত ব্যবস্থা হয়ে যায় টাকা দিলেই।
তারপর সন্ধ্যার অন্ধকারে বাস আবার শহরে ফেরার সময় সেই লেকগুলোর সাহায্যে সরু রাস্তায় গাছ ফেলে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। বাকি সবার সাথে মেয়েটাও নামে বাস থেকে। আর আমার পরিকল্পনা মতো তাকে অজ্ঞান করে আমার গাড়িতে তুলে দেয় আমার ঠিক করা সেই লোকগুলো।
একটা মেয়ের জায়গায় দুইটা দেখে আমি প্রশ্ন করতেই ওরা বলে যে দ্বিতীয় মেয়েটা তাদের দেখে চেঁচামেচি করতে যাচ্ছিলো তাই তাকেও ধরে এনেছে। আমিও আর কিছু বলিনি। কারণ একের জায়গায় দুই খারাপ নয়।
ওখানকার এক লোকের ফাঁকা বাড়ি রেন্টে নিয়েছিলাম এক রাতের জন্য। প্রচুর পরিমাণে ড্রিং*ক করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটু অতিরিক্ত করে ফেলি।
আর বাচ্চা মেয়েটা সহ্য করতে না পেরে মা*রা যায়। তখনও আমার হুশ নেই। কিন্তু চাহিদা মিটে যাওয়ায় দ্বিতীয় মেয়েটাকে পরের রাতের জন্য সাথেই রাখি। আর ওই তেজী মেয়ের সব তেজ শেষ করে ওর লা*শ পানিতে ফেলে চলে যাই চট্টগ্রাম। সেখান থেকেই আপনারা আমাকে নিয়ে এসেছেন।”
ক্যাপ্টেন তাহমিদের দুইদিনের সামরিক কৌশলের টিকতে না পেরেই শেষমেশ মুখ খুলতে বাধ্য হয়ে উপরিউক্ত স্বীকারোক্তি দেয় শাকিল রায়হান।
দুইদিন পরে তাকে আদালতে উপস্থিত করলে অ*প*হ*র*ণ, ধ*র্ষ*ণ, খু*নে*র অপরাধে তার ফাঁ*সি*র আদেশ দেন বিচারপতি। শাকিল রায়হানের টাকার কুমির বাপও তাকে এযাত্রায় বাঁচাতে পারে না মেজর এএকের থেকে। এবার সত্যের কাছে টাকা হার মানতে বাধ্য হয়।
.
.
.
.
আদালতের বাইরে এসে মীম দৌড়ে যেয়ে গাড়ির দরজা খুলতে থাকা ছদ্মবেশী মুখে মাস্ক পরিহিত মেজরের পিছনে দাঁড়ায়। তারপর বলে,
“এই যে শুনুন।”
এমন ভাবে ডাক টা শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করার সাথে সাথেই কঠোরতার খোলসে আবৃত হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হলেও মুখে কোনো অভিব্যক্তি দেখা যায় না মেজরটার। একটুখানি খুলে যাওয়া গাড়ির দরজা পুনরায় লাগিয়ে পিছনে ফিরে নিজের ঘাড়ের নিচ পর্যন্ত উচ্চতার মেয়ের দিকে শান্ত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকেই বলে,
“জ্বি বলুন মাই হাইনেস। কিভাবে আপনার সেবা করতে পারে আপনার এই একান্ত বাধ্যগত প্রজা?”
লোকটাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করতে এসেছিল মীম। কিন্তু ব্যাটার বাজে কথায় মেজাজটাই খারাপ হয়ে যায় তার। যা তার চেহারায় পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছে অনিল। সে বেশ মজাই পাচ্ছে তেজস্বিনীকে বিরক্ত করে।
মীম নিজের খিঁচ খাওয়া মেজাজকে বুঝিয়ে শুনিয়ে একপাশে রেখেই বলে,
“দেখুন…”
“দেখান।”
মীমকে শেষ করতে না দিয়েই বলে অনিল। এদিকে প্রচন্ড রেগে যায় অনিলের নাম দেওয়া তার হাইনেস বা তেজস্বিনী। সে এবার কাঠকাঠ গলায় বলে,
“আপনি মানুষটা একটা চরম বিরক্তিকর আর অ*স*ভ্য হলেও মেজর হিসেবে উপযুক্ত। নরমালি আমি সকল ডিফেন্সের মানুষ অপছন্দ করলেও আপনার দায়িত্ব, আপনার ক্যাপাবিলিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছি। দুইদিন এর মধ্যেই অ*প*রা*ধী*র শা*স্তি*র ব্যবস্থা করেছেন। যদিও অর্পার জীবন বা সম্মান কোনটাই আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় তবুও তার অ*প*রা*ধী শা*স্তি তো পাবে।
তারপর সেদিন আমার জীবন বাঁচিয়েছেন দুইবার। আমাকে সাথে করে ঢাকা এনেছেন। এসবের জন্য ধন্যবাদ।
ভালো থাকবেন অনিল। আর দোয়া করবেন যে আপনার আর আমার আর কখনো মুখোমুখি না হতে হোক। চিন্তা করবেন না আমি আপনার বা আপনার বন্ধু কারোই পরিচয় বলবো না কাউকে। ছদ্মবেশে তো নিশ্চয় কোনো বড় কারণ ছাড়া চলছেন না আর। সেনানিবাস ছেড়ে সেনাবাহিনীর ভার্সিটি যাওয়ার কারণ সফল হোক সেই দোয়া করবো।
আল্লাহ হাফেজ।”
“কিন্তু আপনার সাথে মুখোমুখি হওয়ার সবরকম ব্যবস্থা যে আমি অলরেডি করে রেখেছি মাই হাইনেস। এতকিছুর পরেও আপনার এই আবদার রাখা যে অসম্ভব আপনার এই একান্ত বাধ্যগত প্রজার। এরপরের বারের আমাদের দুজনের মুখোমুখি কথপোকথন আপনার চিন্তা ভাবনার চেয়ে অনেক অনেক ভিন্ন কিছু হতে যাচ্ছে মাই হাইনেস। অপেক্ষা করুন।”
মাস্কের আঁড়ালে অদ্ভুত হেসে মনে মনে বলে অনিল। তবে মুখে কিছুই না বলে চুপচাপ মীমের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনে গেলো।
মীম নিজের বাইক নিয়ে অনিলের সামনে থেকে চলে গেলেই এখনো সেদিকেই নির্নিমেষ তাকিয়ে অনিল। এতোটা সময় গাড়িতে বসে তাদের সমস্ত কথোপকথন শুনেছে তাহমিদ। সে অনিলকে ইশারায় ডেকে গাড়িতে বসালে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগেই জীবনে প্রথম বারের মতো অনিল আগে থেকেই তথ্য শেয়ার করে বলে,
“তোরা সবকিছু জানতে পারবি। আমাকে কিছুটা সময় দে প্লিজ। এখনই কিছু জিজ্ঞেস করিস না তাহমিদ। তুই বা তোদের প্রশ্নের উত্তর আপাতত আমার কাছে নেই।”
..
..
..
চলবে___
(আগের পেজের সমস্যার জন্য এই পেজেই এখন থেকে সব গল্প এখানেই পোস্ট করা হবে।)

