প্রভামঞ্জরী☜ #নওরোজ_মীম পর্বঃ ১৭

0
18

#প্রভামঞ্জরী☜
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ১৭

(কপি করা নিষিদ্ধ)
__________________________

জোয়ারের সময় ছিলো বলে নদীতে পানির প্রবাহ বেশি। পাহাড়ি এলাকায় নদী খরস্রোতাও। স্রোতস্বীনির স্রোতে ঝাপ দিয়ে পড়ে স্রোতে ভেসে ঘটনাস্থল থেকে অনেকটা দূরে যেয়ে পানির উপরে মাথা তোলে অনিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে অন্য কোথাও। পাঁচ ফুট এক ইঞ্চির ছোট খাটো নরম দেহের তেজস্বিনী মেয়েটি অনিলের গলা দু’হাতে পেঁচিয়ে দুই পা দিয়ে অনিলের কোমড় আঁকড়ে চোখ বন্ধ করে দোয়া ইউনুস পড়ছে জোরে জোরে।

ভেঁজা নরম একটা শরীর পানির ভিতরে এভাবে নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে রয়েছে সে দিকে ধ্যানই দিলো না অনিল। সর্বোচ্চ সীমায় অবজ্ঞা করে মেজর নিজের ব্যক্তিত্বে অটল থাকে। এসব ছোটখাটো ব্যাপারে তার কিছুই হয়না এমন বোঝায় নিজেকে।
কিন্তু আসলেই কি তাই?

পানিতে ঝাপ দিয়ে ডুবে ডুবে এতোটা সময় থাকায় মীমের বেঁধে রাখা চুলের থেকে ছোট ছোট চুলগুলো চোখমুখে ভিজে লেপ্টে রয়েছে। যা এই ভেজা তেজস্বিনীকে করে তুলেছে আরও অভূতপূর্ব সুন্দর। দুনিয়ার সব সৌন্দর্য যেনো তেজস্বিনীর ভীতু মুখে খুঁজে পাচ্ছে অনিল। তেজস্বিনী মেয়েটার ভীতু রুপ ঠিক কতখানি মোহনীয় তা হয়তো অনিলের পক্ষে কখনো বলে ওঠা অথবা প্রকাশ করা হবে না। তা যে তার ব্যক্তিত্বের বাইরে।

অনিল সাঁতার কেটে কিনারার দিকে যেয়ে পা ঠেকিয়ে মাটির উপরে দাঁড়ায়। তার বুক পর্যন্ত এখনো পানিতে ডুবে আছে। মীমকে নিরাপত্তা দিতে অনিলের একটা হাত তার কোমরে ধরা ছিলো পুরোটা সময় জুড়ে। অনিল হাত সরিয়ে নিলে মীম আরও তার বুকের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করে। যেনো সে এই পানি থেকে বের হতে ওই চওড়া বুকের মধ্যে ঠাঁই পেতে মরিয়া।

এবার একটু অতিরিক্ত দেখে অনিল গলা খাঁকারি দিয়ে হুশ ফিরাতে চাইলো নিজের সাথে লেপ্টে থাকা মেয়েটার।
কিন্তু হায়!
কোনো লাভ হয়না। মেয়েটা এভাবে আছে যেনো দুনিয়ার কিছুই সে জানে না। জোঁকের মতো আঁকড়ে ধরে থাকা আর্মির মেজর যেনো অস্তিত্বহীন এখানে। অনিল হার মেনে এবার নিজের থেকে সরিয়ে দিতে চাইলো মীমকে। অথচ সে মেয়ে আরও চিপকে যেয়ে ভয়ের রেশে চেঁচিয়ে বলে,

“আশ্চর্য কি করছেন কি? মেরে ফেলবেন নাকি আমাকে? কিনারে তুলুন বলছি। আগে কিনারে তুলুন।”

“আচ্ছা! মহারাণী আপনি? আমি আপনার বাধ্যগত প্রজা? যে আমাকে এভাবে অর্ডার করছেন?”

“হ্যা হ্যা আমি মহারাণী আর আপনি আমার প্রজা। এবার তুলুন।”

এই মেয়ের সাথে পারবে না তা বোঝা হয়ে গিয়েছে অনিলে। ভাঙবে তবু মচকাবে না। তেজ এই মেয়ের কিছুতেই কমবে না। তাই সে হার মেনে নিয়ে আবারও মেয়েটাকে ধরে আলতো করে।
.
.
.
.

“My highness নিজের পজিশন একটু খেয়াল করুন। আপনার সাথে রোম্যান্টিক সময় কাটানোর মতো অতিরিক্ত সময় একদমই নেই আমার এখন। আমাকে যেতে হবে। তাই যদি অনুগ্রহ করে আপনার সামান্য এই প্রজাকে ছাড়েন তবে সে নিজের কাজে যেতে পারবে।”

মেজর এএকের কাঠখোট্টা আওয়াজে রসাত্মক কয়েকটা বাক্য শুনেই চমকে ওঠে মীম। মেজরের গলা থেকে মুখ উঠিয়ে গলায় জড়ানো দুই হাত একটু হালকা করে মেজরের ডার্ক ব্রাউন চোখের দিকে তাকায় মীম। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়েই থাকে। হুট করে বলে উঠলো,

“তো মেজর এএকে! আপনার কি এমন প্রয়োজন পড়লো যে নিজের পরিচয় গোপন করে ভার্সিটি পড়তে যাওয়া লাগলো অনিল হয়ে?”

ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড চমকে গেলেও চেহারায় তার প্রভাব পড়ে না অনিলের। সে আগের মতোই প্রতিক্রিয়াহীন। কারণ অনিল থেকে এএকের রুপ ধারণ করে নিজেকে আড়াল করলে কেউ তাকে অতি সহজে চিনতে পারে না।
যারা সবসময় এভাবে দেখে অভ্যস্ত শুধু তারাই চেনে।
অথচ এই মেয়ে চিনে ফেলেছে!

মীম এই মেজরের উত্তরের অপেক্ষা না করেই তার মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কভার করা মাস্ক খুলে নেয় এক টানে। তারপর তা নদীর পানিতে ছুড়ে মারে। অনিল একবার সেদিক তাকিয়ে আবারও নিজের বাহুবন্ধনে থাকা তেজস্বিনীকে দেখে। তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি ইচ্ছাকৃত আরও কিছুটা তীক্ষ্ণ করে সে বলে,

“এটা ফেলার কারণ?”

“আমি আপনাকে একপলক দেখেই চিনে ফেলেছি। তাই আমার কাছে নিজেকে গোপন করার কিছুই নেই মেজর।”

“তাই বলে ফেলে দিবেন?”

“হ্যা। কারণ আপনার চেহারায় ওটা অনেক ইরিটেট করছিলো আমাকে।”

বাঁকা হেসে অনিল বলে,

“এই যে আপনি এভাবে আমার সাথে চিপকে আছেন আমিও ইরিটেট হচ্ছি অনেক। এখন আপনাকে ওভাবে ছুড়ে ফেলি my highness?”

আবারও অনিলকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে মীম। এবারে গলা কভার করা মাস্ক না থাকায় মেয়েটার উত্তপ্ত শ্বাসপ্রশ্বাস নিজের গলার অনুভব করে অনিল। চোখ বন্ধ করে নেয় সে।
চেঁচিয়ে বলে মীম,

“অসভ্য মেজর। কেউ বিপদে পড়লে বুঝি তাকে এভাবেই ছুড়ে ফেলে সাহায্য করতে শেখানো হয় আপনাদের সেনা ক্যাম্পে?”

ঠোঁট কামড়ে হাসে অনিল। মেয়েটাকে না ধরেই ওভাবে দাঁড়িয়ে রয়। তারপর বলে,

“সেনা ক্যাম্পে অনেক কিছুই শেখানো হয় my highness. অপ*রাধীকে বিচারের আওতায় এনে শা*স্তির ব্যবস্থা করাও শেখানো হয়। Do yo wanna know My Highness?”

চোখমুখ কুঁচকে মীম বলে,

“Excuse me Major. My highness my highness করছেন কেন? I have a name. You can call me Mim or Mashfiya anything you want. আর আমি এমন কিছুই করিনি যার জন্য শা*স্তি পেতে হবে।”

“I see!
I can call you anything!
So I am calling you that, ‘my highness’.
আর অপ*রাধী না হলে আপনি এখানে কি করছেন? আপনার কি এখন এখানে থাকার কথা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কন্যা? এখানে কি করছেন আপনি? এই জায়গার খোঁজ পেলেন কিভাবে?”

“আপনাকে বলতে বাধ্য নই আমি মেজর।”

“আপনাকেও এভাবে জড়িয়ে রেখে নিজের সময় নষ্ট করতে বাধ্য নই আমি ম্যাডাম। সব সত্যি বলেন না হলে ছুড়ে ফেলবো পানিতে।”

এটা বলেই মীমের কোমরের দুইপাশে নিজের দুই হাত দিয়ে ধরে নিজের থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করতেই মীম চেঁচিয়ে বলে,

“বলছিইইইইইই। সব বলছি। আমাকে প্লিজ ছাড়বেন না মেজর। আমি পানি ভীষণ ভয় পাই। প্লিজ ছাড়বেন না আমাকে। আপনি ছেড়ে দিলে আমি ম*রেই যাবো মেজর। প্লিজ ছাড়বেন না আমায়।”

হার্টলেস মেজরের হার্ট ওই সমস্ত কথাকে ছেঁকে ওই গুটিকয়েক বাক্যই শোনে। আর ওখানেই আঁটকে যায়।
নিজের সর্বনাশের আভাস পায় মেজর এএকে ওই যে ওই কয়েকটা বাক্যে~। ❝আমাকে প্লিজ ছাড়বেন না মেজর। প্লিজ ছাড়বেন না আমাকে। আপনি ছেড়ে দিলে আমি ম*রেই যাবো মেজর। প্লিজ ছাড়বেন না আমায়।❞

কাঠখোট্টা মেজরের পক্ষে যে সেই অনুরোধ উপেক্ষা করা অসম্ভব ঠেকলো। জোর করেও নিজের থেকে ওই তেজস্বিনীকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি সে। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে সে মীমকে বলে,

“বলুন আগে সবকিছু।”

অনিলের চওড়া কাঁধে মুখ রেখেই মীম বলে,

“নিউজ দেখেছিলাম অর্পার। আমি অর্পাকে চিনতাম। নারায়ণ আঙ্কেলের মেয়ে। ওর জন্মদিনেও গিয়েছিলাম।
তারউপর কিছু পুরনো ক্ষ*ত তাজা হয়ে গেলে নিজেকে আর এটা থেকে দূরে রাখতে পারিনি। অর্পার ব্যাপারে খোঁজ নিলে নাঈমার ব্যাপারে জানতে পারি। আমি নাঈমাকেও আগে থেকে চিনি। আমার দাদুর ‘আমার বাড়ি’ নামে একটা এতিমখানা আছে সেখানেই বড় হয়েছে মেয়েটা। আঠারো হয়ে গেলে আলাদা থাকা শুরু করে ও মেডিকেলে চান্স পায়। সেখানেই অর্পার সাথে বন্ধুত্ব হয়। তাই ওকে খুঁজতে বের হই।

আমার লন্ডনে একজন সাইবার এক্সপার্ট বন্ধু আছে। তার সাহায্যে নাঈমার ফোন ট্র্যাক করে লোকেশন জানতে পারি। তারপর আমাদের কোম্পানির পার্সোনাল হেলিকপ্টার ও আমার জন্য বরাদ্দকৃত কিছু বডিগার্ড নিয়ে এখানে আসি নাঈমাকে বাঁচাতে।
বাকিটা আপনার জানা মেজর।”

“আপনার কথা আমি বিশ্বাস করবো কেন মাই হাইনেস?”

চরম রেগে যায় মীম। বলে উঠলো,

“বিশ্বাস না করলে মুড়ি খান মিয়া। আগে আমাকে পানি থেকে তুলেন।”

অনিল অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে দেখে তার বুকে পড়ে থাকা মেয়েটাকে। মেয়েটা কি তাকে ধমক দিয়েছে মাত্র?
মেজর এএকে কে ধমক দিয়েছে পাঁচ ফুটের এই মেয়েটা?
.
.
.
.
সেই যে ভার্সিটির ঝামেলার পরে আর অনিলের সাথে দেখা হয়নি তনুর। আজ দুপুর থেকে একের পর এক অনিলকে কল দিয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু প্রতিবার একটা বাক্য ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারে এই মূহুর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর কল করুন।’ শুনতে শুনতে বিরক্ত তনু। দুপুর থেকে কল জরেই যাচ্ছে কিন্তু সেই কিছুক্ষণ পর আর হচ্ছে না।

তনু ভেবেই পাচ্ছে না কি এমন ব্যস্ততা অনিলের যে একটা বার ফোন অন করা সম্ভব হচ্ছে না। না পেরে অনিলের বন্ধু আর পিএ আহনাফের কাছেও কল দিয়েছে
কিন্তু তার ফোনও বন্ধ। এবার রীতিমতো চিন্তা হচ্ছে তনুর
ঠিক আছে তো তার অনিল ভাই? কোনো বিপদাপদ হয়নি তো আবার?
.
.
.
.
ক্যাপ্টেন তাহমিদ মিশন সাকসেসফুলি কমপ্লিট করে নিজেদের হেলিকপ্টার এর কাছে অপেক্ষা করছে মেজরের জন্য। সে ভালো করেই কোনো ঝামেলা ছাড়া নেশায় বুদ হয়ে থাকা শাকিল রায়হানকে ধরে ফেলেছে। এখন এটাকে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে আপ্যায়ন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে সে। এদিকে মেজরের খবর নেই।

কিছুক্ষণ পর সেখানে সম্পূর্ণ ভেজা অবস্থায় আসতে দেখা যায় মেজরকে। কিন্তু আশ্চর্য হয় যখন দেখতে পায় যে, মেজরের পেছনে শীর্ণ একটা দেহ কাঁপতে কাঁপতে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। আরও কিছুটা কাছাকাছি এলেই দেখা যায় কাঁপতে থাকা মানুষটা আর কেউ নয়, সেই অগ্নিকন্যা মাশফিয়া রহমান মীম।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের মেয়ে।
তেজস্বিনী মেয়েটি কেমন কাঁপছে। আবার দুজনেই ভিজে একাকার। মেয়েটার গায়ের ডেনিম জ্যাকেট দিয়ে নিজেকে ঘিরে রেখেছে তাই ভিজে অবস্থায় হলেও অশালীন দেখাচ্ছে না তাকে। মনে অনেক প্রশ্ন থাকলেও নিজের পেশাদারী ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে মেজরের সাথে হেলিকপ্টারে উঠে বসে ক্যাপ্টেন তাহমিদ। সাথে আ*সামি শাকিল রায়হান, ওয়ারেন্ট অফিসার ফারিহা আঞ্জুম আর মাশফিয়া রহমান মীম।
উড়াল দেয় হেলিকপ্টার ঢাকা সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে।

..
..
..
চলবে___

(তনুর জন্য কষ্ট পাবেন না অনিল আবরার এর প্রিয়তারা। তনু ই মেইন আকর্ষণ। অপেক্ষা করুন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here