#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ১৯ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________________
প্রকৃতিতে হালকা শীতের আমেজ। মনুষ্য শরীরে ঠান্ডা না লাগলেও সকালবেলা বাইরে কুয়াশার আনাগোনা শুরু হয়েছে কিছুদিন আগেই। ঢাকা শহরের এই দূষিত পরিবেশের জন্যই হয়তো শীত আসবে আসবে করেও আসতে এতো বেশি সময় নিচ্ছে। অন্তত ভোরের এই কুয়াশা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে মৌনতার। কয়েকদিন আগেই মীম সেই চট্টগ্রামের ঝামেলায় গিয়ে এখন বেশ দূর্বল শারীরিক ভাবে। তার শরীর সামান্য কারণেই বেশ খারাপ হয়। শুধুমাত্র নিজের মনের জোর আর অতিরিক্ত কঠোর হওয়ায় সে এমন ভাবে থাকতে পারে। না হলে এই মেয়ের তো প্রায়ই বিছানায় পড়ে থাকার কথা। মীম এই কঠোর ব্যক্তিত্ব তার বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমানের থেকেই পেয়েছে।
এই ভোরবেলায় কুয়াশায় মোড়া রাস্তায় একা একা হাঁটতে হাঁটতে এসব ভেবে চলেছে মৌনতা।
মৌনতা গিয়েছিল তার বাবা মায়ের করব জিয়ারত করতে। কয়েকদিন হচ্ছে তার মন বেশ খারাপ হয়ে আছে। তারা এখন প্রতিদিন ভার্সিটি যায়। আর তনিমার সূত্রে তার বন্ধুরা এবং অনিল সহ তার বন্ধুরাও একটা বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থায় আছে। যদিও অনিল আর মীম একে অপরের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে দেখে যে মনে হয় দুজনের মধ্যে যখনতখন একটা কোল্ড ওয়্যার শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু কি নিয়ে যে তাদের এই অকথিত কিন্তু প্রকাশিত শত্রুতা তা কিছুতেই বাকী কারো মাথায় ঢোকে না। তাদের চোখে চোখে একজন আরেকজনকে খুন করতে চাওয়া বাকিরা শুধু দেখেই যায়। মাঝে মাঝে তো ওদের আড়ালেই রনি বলে যে সে পপকর্ন নিয়ে বসে বসে এদের এই নজরের সিনেমা দেখতে পারবে। অবশ্য মৌনতা সামনে রাগী চেহারা দেখালেও মনে মনে সে রনির সাথেই সহমত।
কিন্তু তনিমা যে এই ব্যাপারটা পছন্দ করে না এটাও সবার কাছে বেশ পরিষ্কার। আর সে যে অনিল ভাইকে অত্যাধিক পছন্দ করে এটাও সবাই বুঝতে পারে। শুধু অনিল ভাইয়ের ভাবভঙ্গিতেই মনে হয় সে কিছুই বোঝে না। তনিমা অনেক ভাবেই বোঝানোর চেষ্টা করে প্রতিদিন। এমনকি প্রায়ই চেষ্টা করে অনিল ভাইয়ের সাথে একটু আলাদা সময় কাঁটাতে। কিন্তু অনিল ভাই তাও বোঝে না। সে সবসময় সবার সাথেই বসে থাকে। কেন যে সে তনিমার মন টা বোঝে না?
আবার অনিল ভাই তনিমার উপর প্রচন্ডরকম যত্নশীল। তথাকথিত প্রেমিকরাও আজকাল তাদের প্রেমিকার জন্য এমন যত্নশীল হয় না। তনিমার সব ছোট বড় বিষয়ে সে যেভাবে খেয়াল রাখে বা যেভাবে নিজে থেকেই নিজের মতামত দেয় তনিমাকে তাতে কাছের কেউ ছাড়া যে কেউই বলবে তারা কাপল।
অথচ এতো কিছুর পরেও অনিল ভাই তনিমার ভালোবাসা বুঝতে পারে না। মেয়েটার জন্য যথেষ্ট আফসোস হয় মৌনতার।
.
.
.
.
দুইদিন আগেই একটা র*হ*স্য*ম*য় খু*ন হয়েছে শহরে। সেনাবাহিনী লা*শ উদ্ধার করে ফরেনসিকে পাঠিয়েছে। তার পোস্ট*ম*র্টে*ম রিপোর্ট প্রয়োজন যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব। সেনাবাহিনীর ডিমান্ডে ফরেনসিক বিভাগের সবচেয়ে ইয়াং কিন্তু দক্ষ আর বিশ্বস্ত ডাক্তারের কাঁধে পড়েছে এই পোস্ট*ম*র্টে*ম এর গুরু দায়িত্ব। ডাক্তার ইবনাত শাহরিয়ার নিজের দায়িত্ব শেষ করেছে ডাক্তার শাহিদার সাথে।
রাতের শেষ ভাগে সমস্ত রিপোর্ট সাবমিট করে সে ভোর বেলা নিজের গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে তার ধানমণ্ডিতে নিজের বাসার উদ্দেশ্যে।
ঢাকা শহর অতিরিক্ত ট্রাফিকের জন্য বিখ্যাত হলেও এই সকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে একদম জনশূন্যই থাকে রাস্তাঘাট। অতি প্রয়োজন ব্যতীত কেউই এই সকাল বেলা বের হয় না।
ফাঁকা রাস্তা পেয়ে ইবনাত গাড়ির স্পিড কিছুটা বাড়িয়েই দিয়েছে জলদি বাসায় যাওয়ার জন্য। তার শরীরটাও ভালো লাগছে না। নিজে ডাক্তার হওয়ায় সে ভালোই বুঝতে পারছে যে আজ তার জ্বর আসবে। তার বাসায় রান্নার খালা রমেলা আসতে মিস হলেও আজ তার জ্বর আসতে মিস হবে না।
হুট করেই কেউ দৌড়ে আসছে সামনে থেকে মনে হচ্ছে ইবনাতের। সে গাড়ির স্পিড কমিয়ে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে যে হচ্ছে টা কি।
সাদা থ্রিপিস পরে একটা মেয়ে দৌড়ে আসছে। মাথায় দেওয়া সুতি সাদা ওড়না পড়ে যেয়ে দৌঁড়ানোর তালে তার ছোট ছোট চুলগুলো দিয়ে মুখ ঢেকে গেলেও ওই ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা চিনতে ভুল করে না ইবনাত। মেয়েটা তার সদ্য পরিচিতা এক অকুতোভয় দুঃসাহসী মেয়ে মৌনতা শেখ। এমন দুঃসাহসী মেয়ের এভাবে প্রচন্ড ভয়ে পালানোর চেষ্টা দেখে যারপরনাই অবাক হচ্ছে ইবনাত। কিন্তু একটু পরেই দেখতে পায় মৌনতার পিছনে দৌঁড়ানো একঝাঁক ছেলেকে। ওরা যে কোনো ভালো উদ্দেশ্যে মৌনতার পিছনে ছুটছে না তা বুঝতে সময় নেয় না সে। অথচ তার নিজের শরীরের অবস্থাও ওই অতগুলো লোকের সাথে লড়াই করার মতো নেই। তাছাড়া সে একা এতো মানুষের সাথে লড়াই করে পারবেও না তা তো সত্যি। কারণ এটা তো আর সিনেমা চলছে না আর সে কোনো সিনেমার হিরোও নয়। সে একজন অতি সাধারণ ফরেনসিক ডাক্তার। কিন্তু মেয়েটাকেও তো বাঁচাতে হবে। ইবনাত গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে মৌনতার সাইড দিয়ে যেয়ে জলদি গাড়ি ঘুরিয়ে মেয়েটার পাশেই ব্রেক কষলো। এরপর ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজা খুলে এক টানে মৌনতাকে গাড়িতে বসিয়ে জোরে গাড়ি টান দেয়। এবং কিছুখনের মধ্যেই ফাঁকা রাস্তায় লোক গুলোর থেকে অনেকটা এগিয়ে যায়।
মৌনতা যখন তার দিকে একটা গাড়ি অনেক স্পিডে এগিয়ে আসছে দেখে তখনই সে নিজের দুই হাতে কান ঢেকে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে যায়। আর হাতে টান পড়ায় চোখ খুলে যখন নিজেকে সেই গাড়িতেই আবিষ্কার করে তখন পাশে দেখে ইবনাত।
প্রায় বিশ মিনিট ড্রাইভ করে ইবনাত নিজের বাসার সামনে যেয়ে গাড়ি থামায়। বিল্ডিংয়ের দারোয়ান এসে গেট খুলে দিতেই গাড়ি ভিতরে ঢুকে গেলো। এতোক্ষণ কেউ কারো সাথে একটা কথাও বলেনি। দুজনেই চুপ। কিন্তু পার্কিং এরিয়ায় গাড়ি রেখে। ইবনাত নিজে নেমে উল্টো দিকে যেয়ে মৌনতার পাশের দরজা খুলে বলে,
“You are safe now Mounota. I was with you that time and still I’m with you. So don’t worry. Come out of the car.”
মৌনতা তাকায় ইবনাতের দিকে। কি জানি কি ছিলো ওই কয়েকটা বাক্যে যে মৌনতার অশান্ত মন কিছুটা শান্ত হয়। সে বাইরে বেরিয়ে আসে। সন্তুষ্ট হয় ইবনাত। এরপর মৌনতাকে নিয়ে আপাতত নিজের বাসায় যায়। আর মীম অনিলকে ম্যাসেজ করে।
.
.
.
.
“Your friend Mounota need you my highness. I am waiting at your gate. We need to go. Come my highness.
সকাল আটটা বাজে নিজের ফোনে নোটিফিকেশন এর আওয়াজে বালিশের পাশের থেকে ফোন হাতে নিয়ে এই আননৌন নামারের ম্যাসেজ দেখে কিছুটা অবাকই হয় মীম। ‘মাই হাইনেস’ সম্মোধন দেখে যদিও বুজেছে কে করেছে এই ম্যাসেজ তবুও সে নিশ্চয়তার জন্যই উল্টো ম্যাসেজ লিখে বিছানা থেকে নেমে মৌনতার রুমে যায় তাকে দেখেতে।
অনিল গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রেখে বাইরে দেখছিল। তখনই ম্যাসেজ আসে ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষরে লেখা ❝MY HIGHNESSES❞ নামের নাম্বার থেকে।
ম্যাসেজটা ‘Who?’ দেখে হালকা হাসির দেখা মেলে কাঠখোট্টা পুরুষের ঠোঁটে। এবং সেই ঠোঁট হালকা নাড়িয়ে বলে ‘আপনি আমার চিন্তাভাবনার চেয়ে কয়েক ধাপ বেশি চালাক মাই হাইনেস।’
তারপর ম্যাসেজের উত্তরে লেখে পাঠিয়ে দেয়,
” Anil Abrar Khan.”
ম্যাসেজ সিন হয় কিন্তু কোনো রিপ্লাই আসে না। কিন্তু তার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দেখা মেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কন্যার। লম্বা চুল গুলো কোনো রকমে পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে আঁটকে রাখা যা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে যে চিরুনির ছোঁয়া তারা পায়নি। মীমের পরনে একটা কালো লং কামিজ আর ঢোলা ঘরে পরার ট্রাউজার। ওড়না আবার নিয়েছে হলুদ রঙের। মেয়েটার এমন এলোমেলো অবস্থায় মেজরের যে হাসি পাচ্ছে এখন?
কাঠখোট্টা পুরুষের যে হাসি পাচ্ছে মেয়েটার উদাসীনতা দেখে। মীমকে সে যা চিনেছে তাতে এটা নিশ্চিত যে এই মেয়ে অত্যন্ত ফ্যাশন সচেতন। তার চলাচলের মধ্যে রুচিশীলতার দেখা মেলে সবসময়। অথচ সে আজ একটা অর্ধ পরিচিত লোকের গুটিকয়েক কথায় এভাবে বেরিয়ে এসেছে মানে মৌনতা শেখ তার জন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
.
.
.
.
সোফাতে গুটিয়ে বসে আছে মৌনতা। ইবনাতের সাথে তার বাসায় যেয়েও না একটা কথা বলেছে আর না এক ঢোক পানি খেয়েছে। ওই যে বসেছে তারপর থেকে নিজেকে যতটা পেরেছে গুটিয়ে নিয়েছে। ইবনাত প্রথমে অনেক চেষ্টা করেছে মেয়েটাকে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তাই সে এখন এক গ্লাস পানি হাতে এসে তা সেন্টার টেবিলে রেখে বসেছে মৌনতার সামনাসামনি সোফায়। এরমধ্যেই কলিং বেল বাজলে সে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই তাকে সাইড করে এসে মীম ভিতরে ঢুকে সোজা কোনো কথা না বলে মৌনতাকে জড়িয়ে ধরে।
ততক্ষণে অনিল আর ইবনাতও এসে দাঁড়িয়েছে পাশে।
ওভাবে অনেকটা সময় পার হয়। মৌনতা এখনো চুপচাপ। অনিল ইশারায় মীমকে বলে ওর সাথে কথা বলার জন্য।
মীম অত্যন্ত কোমল গলায় ডেকে উঠলো,
“মৌ।”
মৌনতা তাকায় মীমের দিক। তারপর অনিল আর ইবনাতের দিক। আবারও মীমের দিকে তাকিয়ে শেষমেশ বলে,
কবর*স্থান থেকে ফেরার সময় কোনো রিক্সা না পেয়ে হেঁটে বাসায় যাচ্ছিলাম। একটা গলির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় পুরনো একতালা বাড়ির থেকে অদ্ভুত কিছু আওয়াজ শুনে এগিয়ে যেয়ে দেখি আট কিংবা দশজন মানুষ মিলে দুইটা লা*শ কাঁটছে টু*ক*রো করে। কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু ওদের কথা শুনে ফেলি আমি। ওরা বলছিল,
“দুনিয়ার মানুষ যদি মানুষের মাংসের স্বাদ জানতো তাহলে আর অন্য কোনো খাবার কেউ খেতোই না কখনো। যেমন আমরা অন্য কিছু খাইনা।”
..
..
..
চলবে____
.

