প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ২০

0
21

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ২০ (কপি করা নিষেধ)
________________________________

চট্টগ্রামের একটা নিউজ কভার করতে সাদাফকে পাঠিয়েছেন চ্যানেলের হেড আর তার ডিপার্টমেন্ট হেড। ডিপার্টমেন্ট হেড চল্লিশের কোঠা পার করা কনিকা আহমেদের সাথে দেশের সবথেকে পপুলার আর আলোচিত ক্রাইম রিপোর্টার সাদাফ আদনানের আবার দাঁ-কুমড়ো সম্পর্ক।
সাদাফের অল্প বয়সে এতো সাফল্য তিনি কোনভাবেই মানতে পারেন না। দেশ সেরা এই চ্যানেলের চাকরি সে বছর কুড়ি ধরে অনেক কষ্ট করে করে আসছে। কুড়ি বছরের মেহনতের ফলস্বরূপ সে আজ তার এই পজিশন তৈরি করে নিয়েছে। অথচ দুইদিনের এই ছেলে মাত্র কয়েকবছরে করেছে কতশত অসম্ভবকে সম্ভব। তার পজিশনের জন্য এই সাদাফ আদনান হুমকি স্বরুপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তো সামান্য সুযোগ ও কনিকা আহমেদ হাতছাড়া করেন না সাদাফের চাকরি খেয়ে দেওয়ার।

সাদাফ ও অবুঝ নয় বরং পাঁচ বন্ধুর মধ্যে সর্বদা সর্বোচ্চ বুদ্ধিমান হিসেবে প্রমাণ করেছে নিজেকে। যেখানে মেজর এএকের মতো গভীর জলের মাছ, অত্যন্ত খুরধার মস্তিষ্কের মানুষ তার সাথে বুদ্ধির টক্করে পেরে ওঠে না সেখানে এই কনিকা আহমেদের মস্তিষ্ক পড়তে সাদাফের খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়নি। সাদাফ বেশ মজাই পায় মাঝে মাঝে এই মহিলার কর্মকাণ্ড আর বোকা বোকা বুদ্ধি দেখে।
এই বুদ্ধি নিয়ে নাকি সাদাফের পিছনে লেগেছে। অথচ সাদাফ এইসব পজিশন নিয়ে কখনো কিছু ভাবেই নাই। ও শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে এই সাংবাদিকতার পেশা বেছে নিয়েছে।
আর তাছাড়া “আর এ – RA” ইন্ডাস্ট্রি পুরোটা সাদাফের হবে সেখানে শুধুমাত্র আর এ নিউজ চ্যানেলের ডিপার্টমেন্ট হেড চেয়ারের দিকে সে নজর দিবেই বা কোন দুঃখে।

হ্যা সাদাফ যে চ্যানেলে কাজ করে তার নাম “RA News” যা সাদাফ দের পারিবারিক ব্যাবসা “RA Industry” এর ছোট একটা অংশ মাত্র। যার মালিক তার মা রশিদা খানম। আর তার বস তার মায়ের মাধ্যমেই সাদাফের ক্ষতি করতে উঠে পড়ে লেগেছে। ইশ মহিলা যখন জানবে যে সাদাফ আসলে এসব কিছুর মালিক তখন তার অবস্থা কি হবে? অথবা তার অতি সরল সোজা ছেলে ভক্ত মা যখন বুঝতে পারবে যে এই মহিলা তার মাধ্যমে তারই একমাত্র ছেলের ক্ষতি করতে চাইছে তখন তার জননী রশিদা খানম এই মহলার কি হাল করবে? সাদাফ কখনো কখনো এসব ভেবেও হেসে ফেলে। কারণ তার মা যেমন বোকা রমণী তেমনি ছেলের দিকে কেউ তাকালে একদম ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সাদাফকে সে কতো করে বলেছে যে নিজের চ্যানেলে কেন বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়ে কাজ করতে হবে? কিন্তু সাদাফ তো নিজের যোগ্যতায় কিছু করতে চেয়েছে তাই সে যে মালিকের ছেলে বা ভবিষ্যত মালিক তা কাউকে জানাতে নারাজ। না নিজে তেমন কোনো সুবিধা নিয়েছে আর না মাকে দিতে দিয়েছে।

তাই ডিপার্টমেন্ট হেড যখন রশিদা খানমকে বললেন সাদাফের চট্টগ্রামের নিউজ কভার করা খুবই প্রয়োজন তখন তিনি একটু আমতা আমতা করলেও কনিকা আহমেদ যখনই বললেন সাদাফের মতো একজন সাংবাদিকের দরকার সে খবরের জন্য তখন সে ছেলের জন্য গর্বের ঠ্যালাতেই মমতা পাশে রেখে সাদাফকে অফিসিয়াল অর্ডার পাঠায়। সাদাফ মেইল পেয়ে নিজ মায়ের বোকামির উপর একটুও বিরক্ত না হয়ে বরং ফোস করে শ্বাস ছেড়ে দিয়ে তৈরি হয় চট্টগ্রাম যেতে। কারণ তার অবুঝ মা কিছুতেই কনিকা আহমেদ নামক মহিলাকে বুঝবে না। অগত্যা সে নিজেও আর সাথে করে তার ক্যামেরাম্যান আশিককে নিয়ে রওনা করে।

চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় একটা পরিবারের সাতজন একই সাথে একই ভাবে আ*ত্ম*হ*ত্যা করে মা*রা গিয়েছে। আর তার জন্য পুলিশ সেই বাড়ির বাচ্চাদের পড়াতে যাওয়া শিক্ষিকাকে আঁটক করেছে।
এই কে*সে*র জন্যই সাদাফের চট্টগ্রাম যাওয়া।
.
.
.
.

মীম, অনিল আর ইবনাত তিনজনই অদ্ভুতভাবে মৌনতার কথা শুনছিলো এতো সময় ধরে। মৌনতা অস্থির হয়ে যায়। সে মীমকে বলে,

“আমার ফোন নিতে ভুলে গিয়েছিলাম সকালে। তোর ফোন দে আমাকে।”

মীম বিনা বাক্যে নিজের ফোন এগিয়ে দিতেই মৌনতা লক খুলে ফেলে। অনিল ব্যাপারটা খেয়াল করে মনে মনে বলে ‘এমন চালাক মেয়ের ফোনের পাসওয়ার্ড দেখি অন্যকেউ জানে। এতো এতো আকাম করে বেড়ায় তাও নিজের প্রাইভেসি বলে কিছুই নেই দেখছি। সবকিছুই মৌনতার কাছে ওপেন করে রেখেছে। ইন্টারেস্টিং!’

মৌনতা কন্টাক লিস্টে যেয়ে সার্চ করলে ‘PAPA’ দিয়ে সেভ করা নাম্বারে কল দিতে গেলেই মীম দ্রুত ফোন নিয়েই কল কেটে দেয়। তারপর বলে,

“কি করছিস মৌ?”

“বড় পাপাকে ব্যাপারটা জানাতে হবে। এভাবে তো আর এমন একটা বিষয় জেনেও চুপ থাকা যায় না তাইনা?” (মৌনতা)

“এর জন্য স্যারকে বলার কি প্রয়োজন? তোমার কেন মনে হচ্ছে এগুলো জেনেও তদন্ত না করে ফেলে রাখা হবে মেয়ে?” (ইবনাত)

ইবনাতের কথায় পাত্তা দিলো না মৌনতা। কিন্তু মীম একটু কনফিউশান নিয়ে প্রথমে ইবনাতের দিকে একটু দেখে নিয়ে তাকায় নির্বিকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেজরের দিকে। অনিলও তার দিকে তাঁকিয়ে থাকায় চোখাচোখি হয়। অনিল এক ভ্রু উঁচু করে ইশারায় জিজ্ঞেস করে ‘কি?’
মীমের রাগ হয় এই লোকের ভাব দেখে। মীম মনে মনে অনিলকে কঠিন একটা গালি ছুড়ে মারে। মনে মনে বিড়বিড় করে, ‘ আরে ব্যাটা ঢংগী আপনি ই তো মানা করলেন যে আপনার পরিচয় সম্পর্কে কেউ যেন না জানে। এমনকি মৌনতাও না। তাইতো আমি এতো কষ্টে আমার জানুর থেকেও লুকিয়ে রেখেছি। কিন্তু ব্যাটা বজ্জাত এখন যে আপনার নিজের বন্ধু হাটে হাড়ি ভেঙে দিচ্ছে তা তুই ব্যাটা চুপচাপ দেখিস ক্যান? নিজের বেলা ষোল আনা ক্র আমার বেলা এক আনাও না! ব্যাটা খারুস, বদমাশ, ইন্দুরের জামাই, তেলাপোকার বাপ জীবনেও তুই বউ পাবি না এই ভাব নিয়ে। যত্তসব।’

মীমের দিকে তাকিয়ে থাকায় তার মুখের এই ক্ষনে ক্ষনে অভিব্যক্তি বদল ভালো করেই লক্ষ করে চলেছে তার বজ্জাত, খারুস উপাধি দেওয়া মেজর এএকে। বেশ বুঝতেও পারছে যে মেয়েটা তাকে মনে মনে গালি দিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে। অধরকোন সামান্য বেঁকে যায় মেজরের। তবে তা পলক ফেলতেই আবার ঠিকঠাক হয়ে যায়। তারপর এগিয়ে এসে মীমের পাশেই বসে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,

“আমায় গালি দেওয়া শেষ হয়েছে মাই হাইনেস? তবে কি এবার আমি কথা বলতে পারি আপনার ফ্রেন্ডের সাথে?”

অনিলের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে মীম ও ফিসফিস করে বলে,

“ফ্রেন্ড নয় মেজর she is my sister।”

“আমি একজন মেজর মৌনতা। মেজর এএকে। হয়তো নাম শুনেছো যেহেতু আর্মি ফ্যামিলি থেকে তোমরা। আর এই যে ইবনাত সে একজন ফরেনসিক ডাক্তার সেনাবাহিনীর। আর আমার বন্ধু আহনাফ তাহমিদ একজন ক্যাপ্টেন। আমরা কিছু সিক্রেট কারণ বশত আসল পরিচয় গোপন করে ভার্সিটির স্টুডেন্ট হয়ে আছি। তোমার বোন সেদিন চট্টগ্রাম থেকেই জেনেছে আর আজ তুমি। তাই এই ব্যাপারটার জন্য তোমার ব্রিগেডিয়ার স্যারকে ফোন করার দরকার নেই। ব্যাপারটা আমিই দেখে নিচ্ছি আর স্যারকেও আমি জানাবো।” (অনিল)

মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোধক উত্তর করে মৌনতা। হুট করেই ইবনাতের মাথায় কিছু আসে। সে মৌনতার কাছে জিজ্ঞেস করে,

“ওদের দেখে তুমি চুপচাপ ফিরে না এসে ওভাবে ছুটছিলে কেনো? ওরা যেভাবে তোমার পিছু নিয়েছিলো তাতে আমি না থাকলে আজ তোমাকেই সবার আগে ওই মানুষ খেঁকো গুলোর পেটে যেতে হতো। এবং কাঁটাছেড়া করার জন্য আমি তোমার এক টুকরো মাংস ও পেতাম কিনা আল্লাহ জানে।”

শেষ লাইনটা অনেক আফসোসের সুরে বলে ইবনাত। এমন কৌতুক পূর্ণ কথায় মুচকি হেসে ফেলে মীম। আর মৌনতা রেগে যায়। আর খারুস মেজর, সে তো কারো এক ঝলক হাসিতেই কেমন করে যেন দেখেই চলেছে।
মৌনতা রেগে একটু জোরেই বলে উঠলো,

“মানুষের মাংস খাওয়া দেখে আমি ফিরেই যাচ্ছিলাম কিন্তু তখনই কেউ একজন আমাকে দেখে ডেকে উঠলো। আমি দৌড় দিলাম আর ওরাও আমার পিছু নিয়েছিলো।

আমাকে বাঁচিয়ে এখন আবার আমাকে কাঁটাছেড়া করার শখ জাগলো কেন আপনার?”

ভ্রু কুঁচকে ইবনাত জবাব দেয়,

“ফরেনসিক এক্সপার্ট থেকে আর কি আশা করো? আজব তো!”

..
..
..
চলবে___

.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here