প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ২২

0
17

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ২২ (কপি করা নিষেধ)
____________________________

ঢাকা ওয়েস্ট ইন। শহর কেন দেশের অন্যতম স্বনামধন্য একটা হোটেল। দেশ বিদেশের বহু মানুষ বহু মানুষ নিজস্ব প্রয়োজনে সেখানে থাকে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিজনেস মিটিং সেখানে সম্পন্ন করে থাকেন অনেকেই। অনেকে আবার সেখানকার বিখ্যাত সুস্বাদু খাবার খাওয়ার জন্য যেয়ে থাকেন। বিদেশি ভিজিটর দের অনেক বড় একটা অংশ ওয়েস্ট ইন এ থাকেন নিজের বরাদ্দকৃত ও প্রয়োজনীয় সময়।

অরুণ দাস নামের একজন বনেদী ব্যবসায়ীর ছেলে অরুপ দাস যে সদ্য বাবার সাথে ব্যবসায়ের হাল ধরেছে। বাবার সাথে তার এখন সমস্ত মিটিংয়ে আনাগোনা প্রচন্ড লক্ষ্যনীয়। এই যে যেমন সে কল্লোল হাসান রনির কোম্পানির সাথে বড় একটা ডিল ফাইনাল করেছে। এর সম্পূর্ণ ক্রেডিট অবশ্য ইয়াং অরুপেরই। তার বুদ্ধি, তার কাজের গুণগত মানের জন্যই রনির কোম্পানি প্রসন্ন হয়ে তাদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কের জন্য ভেবেছে।

আজ বৃহস্পতিবার রাত। আজকেও অরুপ দাস এসেছে ওয়েস্ট ইন। তবে তার আজকের ওয়েস্ট ইন যাওয়ার কারণ কোনো বিজনেস মিটিং বা বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো কারণ নয়। আজ সে গিয়েছে নিজের শারীরিক কিছু অসাধু ইশারায়। সেখানে তার কলেজ লাইফের একটা এক্স গার্লফ্রেন্ড এর সাথে সময় কাটানোর উদ্দেশ্য এসেছে।

বৈশাখী মন্ডল নামের একটা ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে ওয়েস্ট ইন এ এসেছে আজকেই। তার শেষ বর্ষের জন্য ইন্টার্নিশিপ এর প্রয়োজন হওয়ায় ইউনিভার্সিটি থেকেই সে সহ কয়েকজনকে হোটেল ম্যানেজমেন্ট এর উপর ইন্টার্নি করার জন্য ওয়েস্ট ইন এ পাঠানো হয়েছে। সন্ধ্যা সাতটা প্রায় বাজে। আজকের মতো কাজ শেষ করে বৈশাখী ক্লান্ত শরীর নিয়ে হোটেল থেকে বের হওয়ার জন্য ফ্রেস হয়ে বের হয়ে ভি আই পি সেকশনে অরুপকে দেখে হেটে যাচ্ছে। প্রথমে সে ভাবে যে অরুপ হয়তো রেগুলার কোনো মিটিংয়ের জন্য এসেছে। সে জানে যে অরুপ তাদের কোম্পানির কাজে প্রায় প্রায় ওয়েস্ট ইন যাতায়াত করে। তার আর অরুপের প্রায় সাড়ে তিন বছরের প্রেমের সম্পর্ক। তার গ্রাজুয়েশন শেষ হলেই ভিয়ে করার কথা। অরুপকে সে জান প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে। আর আজ অনেক ঝামেলা হওয়ায় সে যে ওয়েস্ট ইন এ এসেছে ইন্টার্নিশিপ এর জন্য তাও অরুপকে জানানো হয়নি। তাই অরুপকে এখানে দেখে খুশি হয়ে যায়। কিন্তু তার থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় অরুপ তাকে দেখতে পায় না।

বৈশাখী নিজের ফোন বের করে অরুপকে কল করে। অরুপ সময় ব্যয় না করে রিসিভ করেই অপরপ্রান্তের কোনো কথা না শুনেই বলে,

“বাবু আমি অফিসে আছি এখনো। অনেক ব্যস্ত। রাতে এখানেই থাকা লাগবে। তোমার সাথে কাল কথা বলি? লাভ ইউ জান।”

সাথে সাথেই কল কেটে দেয়। এবং দেখা যায় তার পিছনে একটা সুন্দরী আঁটোসাটো পোশাকের মেয়ে এসে তাকে সাইড দিয়ে জড়িয়ে ধরে। অরুপ ও তাল মিলিয়ে হেসে সেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। বৈশাখীর পায়ের নিচের মাটি সরে যায়। সে অদ্ভুত ভাবে দেখেই যাচ্ছে। তারা চলে যেতেই সে রিসিপশনের মেয়েকে জিজ্ঞেস করে অরুপ দাস এর চেকিং সম্পর্কে। যেহেতু এখন বৈশাখী একজন স্টাফ তাই তাকে জানানো হয় অরুপ দাস হানিমুন সুইট বুক করেছে এক রাতের জন্য। শুধু আজকেই নয় অরুপ তাদের অনেক পুরনো এবং রেগুলার একজন গেস্ট। সপ্তাহে অন্তত একবার সে এখানে আসেই আসে। মেয়ে মেয়ে এক জায়গায় হলে যেমন গসিপ হয় ঠিক তেমনি রিসিপশনের মেয়েটা নিজের মতো করে তাকে আরও জানালো যে অরুপ এখন এই মেয়ের সাথে প্রায় প্রায় এখানে রাত কাটায়। আর এই মেয়েই একমাত্র মেয়ে নয় বহু মেয়ে নিয়ে সে আসে আর হানিমুন সুইট বুক করে থাকে। এমনকি রিসিপশনের মেয়েটা অরুপকে চরিত্রহীন বলতেও আঁটকায় না নিজেকে। এও জানায় যে,

“এই লোকের যদি প্রেমিকা থাকে তবে তার মতো দূর্ভাগা আর কেউ নেই দুনিয়ায়।”

বৈশাখী মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলে,

“আমিই সেই দূর্ভাগা।”

তড়িৎ বেগে মেয়েটা তার দিকে চেয়ে তার চোখে পানি দেখে কি বলবে বুঝে পায় না। তবে বৈশাখী থামে না। সে রিসিপশনের মেয়েটাকে ইমোশনাল করে তার থেকে অরুরের রুমের এক্সট্রা চাবি নিয়ে উপরে যায়। এবং বুকে পাথর চেপে তাদের কিছু ছবি তুলে চুপচাপ বেরিয়ে এসে কন্ট্রোল রুমে যেয়ে লাস্ট এক মাসে অরুপ কতগুলো মেয়ের সাথে এখানে এসেছে তার ফুটেজ বের করে।

কঠিন এক সিদ্ধান্ত নেয় বৈশাখী। হোটেল থেকে ফেরার সময় পুলিশের কাছে তার সংগ্রহকৃত সকল প্রমাণের এক কপি করে সাবমিট করে আসে। তারপর নিজের ম্যাসেঞ্জার থেকে তার বড় ভাইকে সবকিছু পাঠায়। তার একজন কাছের বান্ধবীকেও সব পাঠায়। কারণ অরুপরা পয়সাওয়ালা লোক। প্রমাণ লোপাট করতে সময় লাগবে না। তাই এসব ব্যবস্থা। একটা না একটা প্রমাণ তো থাকবেই। এতো সব করার পরেও সে সহ্য করতে পারে না। তাইতো সে বাসায় ফিরে ফেসবুক লাইভে যায়। যেয়ে অরুপকে তার সমস্ত কাজের জন্য তুলোধুনো করে। অরুপের সব অপকর্ম ফাঁস করে। তার কাছে যত প্রমাণ ছিলো সব লাইভে দেখিয়ে দেয়। হুড়মুড় করে লাইভে ভিউ সংখ্যা বাড়তেই থাকে। আর অরুপ সহ তার বাপ দাদা পুরো কোম্পানিতে ধস নামে। শেয়ার বাজারে তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়। সেই পর্যন্ত সব ঠিক ছিলো। কিন্তু পয়তাল্লিশ মিনিটের লাইভে হাজার হাজার ভিউয়ার এর সামনে নিজের ঘরের সিলিং ফ্যানে অরুপেরই একটা গিফট করা শাড়ি দিয়ে আ*ত্ম*হ*ত্যা করে।

রাতের মধ্যে পুরো দেশ তোলপাড় হয়ে যায় এক মেয়ের এহেন লাইভে এসে সকল প্রমাণ দিয়ে হাজারো মানুষের সামনে আ*ত্ম*হ*ত্যা করা। অরুপ তখনও এসবের কিছুই জানে না। সে তো সারা রাত ফূর্তি করে ঘুমিয়ে আছে হোটেলেই।
.
.
.
.

এই লাইভ এর খবর অনিলের কানে যেতেই সে ওয়েস্ট ইন এ ছোটে সেই রাতের বেলাতেই। তার সন্দেহ হয় যে এউ খবর যদি খু*নী পর্যন্ত তার আগেই পৌঁছে যায় তবে অরুপ দাস তো শেষ। তাহমিদকে নিয়ে সেই শেষ রাতেই ছোটে মেজর এএকে।

ওয়েস্ট ইন এ যেয়ে রিসিপশনের থেকে অরুপের রুমের চাবি নিয়ে ছুটে যায় সেখানে। রুমের লক খুলে ভেতরে যেয়ে দেখে রুম ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। এবারেও দেরি করে ফেলেছে তারা। হতাশ হয়ে সবকিছু তন্নতন্ন করে খোঁজে অনিল, তাহমিদ। টিমের সাহায্যে অরুপের ফোন ট্র্যাক করলে তা শেষ লোকেশন গুলিস্তান দেখায়। তারপর আর পাওয়া যায় না।

মেজর এএকে চেষ্টা চালিয়ে যায়। চালিয়ে যাচ্ছে সর্বোচ্চ। রুম সার্চ করা শেষে তার পাশে এসে দাঁড়ায় ক্যাপ্টেন তাহমিদ। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

“চক্র খু*নে তবে আরও একটা সংখ্যা বাড়তে চলেছে। অথচ আমরা এখনো কিছুই করতে পারছি না।”

“একটা নয় ক্যাপ্টেন। কয়েকদিনের মধ্যেই বেশ কয়েকটা খু*ন হতে যাচ্ছে এই কে*সের সাথে জড়িত।”

তাহমিদের কথার বিপরীতে বলে মেজর। তাহমিদ ভাবে এর শেষ কোথায়? আর কেইবা এইসবের পিছনে? কবে তারা এই র*ক্তের খেলা শেষ করবে? কেন এই খু*নী আইন নিজের হাতে তুলে নেয়? অরুপ দাসের মতো অপরাধীদের অপরাধের শাস্তি দেওয়ার জন্য আইন রয়েছে। কেন নিজেকে খু*নী বানালো এই ব্যক্তি? যখন তারা এই রহস্য উদঘাটন করবে, যখন এই ভয়ংকর সা*ই*কো খু*নী ধরা পড়বে তখন তাকে ক্যাপ্টেন তাহমিদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে। ক্যাপ্টেন তাহমিদ নিয়েই ছাড়বে।

এদিকে মেজর এএকের মস্তিষ্কে চলছে অন্যকিছু। তবে কি তার চৌকস মস্তিষ্কে কিছু ধরা পড়েছে?

হোটেল থেকে বের হয়ে টিম নিয়ে লাস্ট লোকেশন অনুযায়ী যেতে অর্ডার করে অনিল। তারপর নিজের পার্সোনাল ফোন বের করে কাউকে একটা কল করে। এবং কিছুক্ষণ যেতেই ক্রুর হাসে। ক্যাপ্টেন বোঝে এই হাসির মানে। নিজের সিনিয়র হওয়ায় না হলেও ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার দরুন এই হাসির মানে তার জানা। অনিলের এমন হাসির মানে অনেক কিছু অনেক। তাইতো নিজেও খিঁচে থাকা মেজাজ কিছুটা শিথিল করে মেজরের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেও মুচকি হাসে। তবে দেখা যাক চালাক মস্তিষ্কের খু*নী কত দিন আর মেজর এএকের নাগালের বাইরে থাকে? এই মেয়াদ যে খুব একটা দীর্ঘ হবে না সে ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত ক্যাপ্টেন তাহমিদ। এবার সময় এসেছে লুকোচুরি শেষ হওয়ার।
.

.
.
.
চলবে___

.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here