#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ২৩ (কপি নিষিদ্ধ)
__________________________________
অরুপ দাসের শেষ লোকেশন অনুযায়ী গুলিস্তানের দিকে ছুটে যাচ্ছে সেনাবাহিনীর একটা গাড়ি। গুলিস্তান সায়েদাবাদ তারপর যাত্রাবাড়ী এদিকেই এগোচ্ছে গাড়িটা কিছু একটা সন্দেহ করে। যাত্রাবাড়ীও পার হয়ে পরে যাচ্ছ্র নারায়ণগঞ্জ বরাবর।
সেনাবাহিনীর গাড়িটা যখন শনির আখড়া পার করে রায়েরবাগ থেকে বের হবে তার আগেই গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের ছিটে বসে থাকা কারো মাথার দিক নিশানা করে রায়েরবাগ ওভার ব্রিজ থেকে গু*লি ছোড়ে কেউ। কিন্তু চলন্ত গাড়ি হওয়ায় গুলি মিস হয়ে মাথা না লেগে লাগে কাঁধের একটু নিচে হৃৎপিণ্ড বরাবর পিঠের দিকে। খোলা জীপ হওয়ায় গু*লি লাগা সেনা কর্মী সাথে সাথেই ঢলে পড়ে রাস্তায়। ড্রাইভার ও পেছনে থাকা অন্য সদস্যরা কিছু বুঝে গাড়ি থামানোর আগেই একটা বিকট শব্দে থেমে যায় চারপাশ। শব্দটা ছিল বু….ম।
আড়াল থেকে একটা পুরনো টয়োটা গাড়ি বের হয়। তার ড্রাইভিং সিটের পাশের ব্যক্তি ক্রুর হেসে বলে,
“তুমি নাকি আমাকে ধরবে মেজর! আমাদের সামনাসামনি দেখা হওয়ার আগেই তোমার চেহারা আমি আর আমার চেহারা তুমি দেখার আগেই তোমার উপরে যাওয়ার টিকিট কেটে দিলাম।”
গু*লি ছোড়া ব্যক্তিও এসে পিছনের সিটে বসে এমন ভাবে হেসে উঠলো যেনো সে অটোম্যান সামাজ্রকে হারিয়ে রাজ্য জয় করে ফিরেছে। সে এবং তার সাথে সামনে বসা দুইজন রহস্যময় মানুষ। আর তার পাশে কিছুক্ষণ আগে ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে গিয়েছে বলে ওই রাতেই হোটেল থেকে বের করে এনে অপ*হ*রণ করা অরুপ দাস অর্ধ অচেতন অবস্থায়। এই তিনজনের হাসির আওয়াজ বিস্ফো*রিত পরিবেশকে করছে আরও ভারি। আরও অসহনীয়। তারা হাসতে হাসতে চলে যায় নিজেদের পেন্ডিং কাজ শেষ করতে।
.
.
.
.
রাতে বাবার সাথে অসহনীয় কথা-কাটাকাটি হয়েছে মীমের। জেদের বসে বাবার সাথে এমন করলেও প্রতিবারের মতো এবারেও অনুশোচনায় প্রাণ যায়যায় তার। কিন্তু বাবাকে যেয়ে সরিও বলতে পারছে না। কারণ ওই যে জেদ, ইগো আর পুরনো কিছু মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ঘটনা। সারারাত এক ফোটাও ঘুম হয়নি তার। এক সেকেন্ডের জন্যেও দুচোখের পাতা এক করতে পারে নাই। তাইতো আর থাকতে না পেরেই ফজরের আজান দেওয়ার আগেই হালকা শীত আর কুয়াশাকে মাথায় করে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। গেটে যদিও বাঁধা দেওয়া হয়েছিল কিন্তু চোটপাট দেখিয়ে সেই অন্ধকারেই বেরিয়েছে সে।
ধানমণ্ডি থেকে বেরিয়ে সর্বোচ্চ গতিতে ফাঁকা রাস্তায় বাইক ছুটিয়ে চলেছে সে। কোথায় যাবে? কেন যাবে? কিছুই জানে না। শুধু মনের অশান্তি দূর করতেই ছুটে চলেছে। এক পর্যায়ে এসে তার খেয়াল হয় সে কোনো একটা ফ্লাইওভার দিয়ে বাইক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে হালকা হালকা আলো হয়েছে চারপাশে। একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝতে পারে সে গুলিস্তান পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার রাস্তা আছে। খেয়াল হলেও বাইক থামানোর কোনো প্রবণতা দেখা গেলো না তার মাঝে। ছুটছে তো ছুটছেই।
ফ্লাইওভার থেকে নেমে কিছুদূর যেতেই চারপাশে ফজরের আজান শুনতে পায় মীম। ঠিক এমন সময়ে দূর থেকে কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া নজরে পড়ে তার। শীতের ভোর কুয়াশা ভেবে অতটা গুরুত্ব দেয় না সে। কিন্তু যত সামনে এগোতে থাকে তত বেশি ধোঁয়া নজরে পড়ে তার। একসময় সেই জায়গায় যেয়ে বাইক থামিয়ে নেমে দেখে আসলেই একটা সেনাবাহিনীর গাড়ি ছিন্ন*ভিন্ন হয়ে পুড়ছে। আর কয়েকজন সেনাবাহিনীর সদস্য ও রয়েছে তাতে। আর সেখানে স্থানীয় মানুষেরা ঘিরে রয়েছে জায়গাটা। এতো মানুষের ভীড়ে মানুষ পোড়া গন্ধ সবমিলিয়ে কেমন অস্থির লাগতে শুরু করে মীমের। ততক্ষণে অনেকটা আলো ফুটেছে ধরণীতে। কিছুটা দূরে একটা নেমপ্লেট পড়ে আছে দেখে মীম সেখানে যেয়ে ওটা হাতে তুলে নিলেই দেখে নেমপ্লেটে লেখা নামটা ‘ফারিহা আঞ্জুম’। মীমের পুরো শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। ফারিহা আঞ্জুম মানে কি ওয়ারেন্ট অফিসার ফারিহা আঞ্জুম! যে মেজর এএকের টিম মেম্বার বর্তমানে!
তাহলে অনিল! কোথায় সে? কিছু হয়নি তো?
মীমের যেনো পায়ের নিচের মাটি সরে যায় মুহূর্তেই। মুখ হয়ে ওঠে ফ্যাকাসে। মনে হচ্ছে তার দুনিয়া হয়তো থেমেই যাবে। সময় নষ্ট না করেই ফোন বের করতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখে যে সে তো থ্রিপিস পরে আছে। প্যান্ট নয় যে পকেট থাকবে। তার মানে ফোন সে বাসায় ফেলে এসেছে। নিজের প্রতিই বিরক্ত হয় সে। আশেপাশে পাগলের মতো খুঁজতে থাকে কিছু। ভোরের আলোতে বি*স্ফো*রণের জায়গা থেকে একটু দূরে রাস্তা থেকে নিচু জায়গায় কিছু একটা দেখে দৌড়ে যায় সেখানে। হ্যা সে ঠিকই ভেবেছে এখানে সাদা শার্ট পরিহিত কেউ উল্টে পড়ে আছে। ধুলো ময়লা আর রক্ত মিলেমিশে বিশ্রী এক রং ধারণ করেছে লোকটার সাদা শার্টের বেশিরভাগ জায়গা। মীম দুরুদুরু বুকে কাঁপতে থাকা হাতে লোকটাকে সোজা করে মুখ দেখেই গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে ‘অনিইইইইইইল’।
মেয়েটার মনে হলো তার জীবনের বুঝি এখানেই সমাপ্তি হলো। অস্থিরতায় নিশ্বাস নিতে পারছে না এমন। তিনবছর ধরে যে মেয়ের চোখে কখনো পানি আসেনি পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক। সেই মেয়ে অর্ধ অচেতন অনিলের মাথা কোলে নিয়ে ওই মাটিতে বসেই অঝোরে কেঁদে চলেছে। তার চোখের পানি টপটপ করে পড়ছে অনিলের মুখের উপর। অনিল চোখ মেলে ঝাপসা চোখে তাকায়। এক টানে অনিলের মুখের মাস্ক খুলে দেয় মীম। যেখানে এই কয়দিনে এই অসহ্য লোকটার ছায়া দেখেও চিনে নেয় মীম সেখানে মুখের সামান্য মাস্ক নাকি তাকে আড়াল করবে। এও হয় নাকি?
অনিলের নিশ্বাস পড়ছে না ঠিকমতো। অস্থির মীম দিন দুনিয়া, অবস্থা, সম্পর্ক সব ভুলে এনেস্থিসিয়ার মতো ভয়ানক কাজটা একদম অবলীলায় করে ফেললো। মুখে মুখ লাগিয়ে অক্সিজেন সাপ্লাই করছে অনিলকে মীম। একবার, দুইবার। কাজ হচ্ছে না দেখে পরপর বেশ কয়েকবার। অনেকটা সময় পরে একটু স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে পারে অনিল।
অনিলের আবারও চোখ বন্ধ হয়ে আসছে দেখে মীম আবারও জোরে জোরে কেঁদে ওঠে একদম বাচ্চাদের মতো। সে জেদ করে অনিলের কানের কাছে মুখ নিয়ে কেঁদে কেঁদে আর্তনাদ করে জানায়,
“এই বেয়াদব মেজর চোখ বন্ধ করলে কিন্তু একদম একটা ঘুষি মারবো। চোখ খুলে রাখুন। তাকান বলছি আমার দিকে। আমায় দেখুন না অনিল প্লিজ। এভাবে চলে যেতে পারেন না আপনি। সেই অনুমতি আপনাকে আপনার হাইনেস দিচ্ছে না। আপনাকে আপনার হাইনেসের সাথেই থাকতে হবে। এই শুনছেন! আপনার জন্য আমার চোখে পানি এসেছে দেখুন। আমি কাঁদছি দেখুন। কেন এতো কষ্ট হচ্ছে আমার তা জানিনা। কিন্তু আমার অসহনীয় কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে আপনি চলে গেলে আমি শেষ হয়ে যাবো। আপনি প্লিজ আমাকে একটু বাঁচতে দিন না অনিল প্লিজ! আমি বাঁচতে চাই অনিল। শুনছেন?”
কোনরূপ চোখ মেলে রয়েছে অনিল অনেক কষ্টে। তার জন্য এমন একটা পাথুরে মেয়ের আহাজারি কি আদৌও তার নিকট পৌঁছাতে পারছে? সে কি দেখতে পাচ্ছে বেপরোয়া এক মেয়ে কিভাবে আর্তনাদ করে চলেছে তার জীবনের জন্য?
এতোক্ষণে মীমের চেঁচামেচিতে পাশের কয়েকজন এগিয়ে আসে তাদের দিক। এসেই বলে এই লোক এখনো জীবিত তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। মীমের এবার হুশ আসে। কিন্তু না তার সাথে গাড়ি আছে আর না এই সময় কোনো গাড়ি পাবে আশেপাশে। আর এম্বুল্যান্স আসতে যে দেরি হবে তা সহ্য করতে পারবে না অনিলের শরীর আর না সহ্য করতে পারবে তার হাইনেসের মন। তাইতো কয়েকজন লোকের সাহায্য নিয়ে অনিলকে তার বাইকের পিছনে কোনমতে বসিয়ে দিয়ে তার ওড়না দিয়ে অনিলের কোমরের দিকে আর গু*লি লাগা স্থানের নিচ দিয়ে পেচিয়ে মীমের শরীরের সাথে পেচিয়ে বেঁধে নেয়। বাঁধার পরে নিজ থেকেই মীম অনিলের মাথা তার কাঁধে এলিয়ে অনিলকে শোয়ার মতো করে দেয় আর তার হাত জোড়া এনে নিজের পেটের উপর রেখে তার বা হাত দিয়ে ধরে রাখে।
বাইক নিয়ে চোখ কান বুজে ড্রাইভ করে হাসপাতালে পৌঁছে যায় মীম। অনিলকে ইমারজেন্সিতে নেওয়া হবে। স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছে। ওটি তে ঢোকানোর আগে নিজের দুর্বল হাতে মীমের হাত আঁকড়ে ধরে তাকে কাছে ডাকে অনিল। মীম ঝুঁকতেই ভাঙা ভাঙা কন্ঠে অনেক কষ্ট করে বলে অনিল,
“আমা..র পক..পকেট থেকে ফোন বের করে তা..তা..তাহমিদ কে কল করে ও..ওখনের ঘটনা জানাবেন। আর আমার বা..বাকে কল করবেন।”
কিছুটা দম নিয়ে।
“যদি আ..আমি বেঁচে থ..থাকি তবে আপ..আপনি কি আমা..র হব..হবেন মাই হাই..নেস? আমাকে বি..বিয়ে করবে..ন?”
মীমের মাথা তখনও হ্যাং হয়ে আছে কোনো কিছু বা ভেবেই বলে,
“আপনি যা বলবেন, যখন বলবেন আর যেভাবে বলবেন সবকিছু করবো আপনি শুধু থেকে যান আমি রেখে দেবো।”
র*ক্তা*ক্ত অবস্থাতেই কখনো হাসতে না দেখা ঊনত্রিশ বয়সী মেজরের প্রাণ খুলে হাসি দেখলো মীম। সেভাবেই হাসতে হাসতে অনিল আবারও বললো,
“কথা দি..দিচ্ছেন তো? পরে ভু..ভুলে গেলে ক..কিন্তু আমি অ..অনিল আবরার খান আপ..আপনাকে ত..তুলে নিয়ে য..যাবো ম..মাই হাইনেস।”
মীম বোকা বনে যাওয়া চোখে তাকিয়ে বলে,
“কথা দিচ্ছি।”
তারপর অনিলকে ওটিতে নিয়ে গেলে। তার ফোন থেকে তাহমিদ ও অনিলের বাবাকে কল করে সে অপেক্ষা করতে থাকে এক অজানা ভবিষ্যতের। তার জানা নেই আদৌও মেজর বাঁচবে কি না? শুধু সে আল্লাহর কাছে আকুল আবেদন নিয়ে তার ভাষ্যমতে এক বেয়াদব মেজরের প্রাণের ভিক্ষা চেয়ে আর্জি নিয়ে বসে থাকলো নিষ্প্রাণ অবস্থায়।
.
.
.
.
চলবে___
(বলেছিলাম ধামাকা হবে)

