#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৩৫ (কপি করা নিষেধ)
__________________________________
মীম অনিলদের বাড়িতে থাকা শুরু করেছে দুই দিন হচ্ছে। অনিল মোটামুটি সুস্থ। মীম রাজি না থাকলেও আজ অনিল জোর করেই ভার্সিটি যাচ্ছে। অগত্যা মীমকেও যেতে হচ্ছে। তবে তারা আলাদা যার যার মতো যাবে। কারণ যেহেতু তাদের বিয়ের ব্যাপারে কাউকে জানানোর ইচ্ছা নেই এখনই অনিলের। মীম যদিও একটু দোনোমনা করছে এই ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু অনিল খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছে তাকে ব্যাপারটা।
এদিকে এই কয়দিন শুধু মীম, অনিল, তাহমিদ আর মৌনতা বাদে বাকি সবাইকে ভার্সিটি পাঠিয়েছে অনিল। যাতে করে কেউ সন্দেহ না করে।
আর আজ সবাই মিলেই যাচ্ছে।
অনিলের গোপন ফোন বের করে সে রাতেই তনুকে ম্যাসেজ দিয়েছিল যে কাল ভার্সিটিতে দেখা হচ্ছে। তাই সে শতভাগ নিশ্চিত তনিমা ঠিকই উপস্থিত হবে আজ। অনিল অবশ্য চিন্তিত একদিকে মীম অন্যদিকে তনু। কাউকেই এখন সত্য বলা যাবে না। আর না তাও কাউকেই ছাড়তে পারবে সে। আর মরার উপর খাড়ার ঘা হচ্ছে মীমের সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব তনুর।
ক্যাম্পাসে এসেছে অনিল, সাদাফ, রনি, তাহমিদ, মীম, তনিমা, চিত্রা, লিপি, নির্জন, অয়ন। শুধু অনুপস্থিত মৌনতা আর ইবনাত। মীমের ও যাওয়ার কোন প্ল্যান ছিল না কিন্তু অনিলের লজিকে বাধ্য হয়েই মৌ ছাড়া সে একা এসেছে। এবং এই ব্যাপারে সে বেজায় বিরক্ত। প্রথমে ক্যাম্পাসে এসে যে যার যার ক্লাসে যায় ক্লাস করার জন্য। অনিলরা চারজন গেল তাদের নির্ধারিত এমবিএ র ক্লাস করতে। যেয়েই শোনে আজ নাকি কোন নিউ প্রফেসর আসবে বিদেশ থেকে পিএইচডি শেষ করে। তারা চারজন আশেপাশে চেয়ে দেখে ব্যাপারটা নিয়ে বেশ ভালোই কৌতূহল স্টুডেন্টদের মাঝে।
জনাব জহুরুল ইসলাম মাস্টার্স অভ বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনের ফ্যাকাল্টি হেড। এই মূহুর্তে ক্লাসরুমে প্রবেশ করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে সকলের দৃষ্টি জহুরুল ইসলাম ব্যতীত ও অন্যকেউ কেড়ে নেয়। সোনালী পাড়ের কালো শাড়ী পরিহিত অত্যন্ত পরিপাটি ও সুদর্শণা এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে জহুরুল ইসলামের ডান পাশে। অনিল সহ তার বন্ধুদের চক্ষু কপালে। তাহমিদ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে যে অন্যান্য ছেলেদের নজর আটকেছে সেই তরুণীতে। এরমধ্যেই জহুরুল ইসলাম সকলের উদ্দেশ্যে বলেন,
“প্রিয় শিক্ষার্থীগণ। ইনি আরিবা আবরার খান। কানাডা থেকে পিএইচডি শেষ করে আমাদের ইউভার্সিটিতে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেছেন। আজই তার প্রথম দিন একজন শিক্ষিকা হিসেবে। এখানে আপনারা অনেকেই আছেন তার থেকে বয়সে বড় আমি জানি। তবুও আমি আশা রাখছি আপনারা তার এবং আমার সম্মানহানি হয় এমন কিছু করবেন না।”
সবাই সহমত প্রকাশ করে। আরিবা এক নজর নিজ ভাইয়ের পানে চেয়ে দেখে তার ভাই অনিল আবরার খান কি প্রচন্ড গর্বিত হয়ে দেখছে তাকে! হাসি ফোটে তার মুখেও। জহুরুল ইসলাম আরিবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“Ariba now all yours. All the best my child.”
“Thank you sir.”
চলে গেলেন জহুরুল ইসলাম। আরিবা সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমার পরিচয় আপনারা জেনেছেন। আপনারা তো অনেকে তাই আপনাদের সাথে পুরো একটা ক্লাস সময় ব্যয় করে পরিচিত হলেও এতজনকে মনে রাখা অসম্ভব ব্যাপার। তাই আমি কোন পরিচয় পর্বে যাচ্ছি না। ক্লাসের উপর মনোনিবেশ করলে ধীরে ধীরে আপনাদের পরিচয় আমার কাছে আপনা আপনিই আসবে।”
অনিল তাকিয়ে আছে তার আর তার বাবার বুকের মধ্যে বড় হওয়া বাচ্চাটার দিকে। কি আত্মবিশ্বাস তার ছোট্ট বোনের মধ্যে! কি দৃঢ়তা! কি অদ্ভুত কঠোরতা, পেশাদারিত্ব! তার আরু যে একজন পাক্কা খান বংশীয় তা তার চেহারার পেশাদারিত্বেই যেন প্রকাশ পাচ্ছে। কারণ অনিলদের খান বংশীয় প্রত্যেকে ব্যক্তি জীবনে যেমনই হোক প্রফেশনাল জীবনে নিজ নিজ অবস্থানে সেরা।
তাহমিদ ও তাকিয়ে আছে তার না পাওয়া সুখের দিকে। তার আরু বড় হয়েছে তবে তাকে পাওয়ার মতো ভাগ্য যে নেই তাহমিদের। অনিল আড়চোখে একবার প্রিয় বন্ধুর দিকে দেখে একটু বাঁকা হাসে। এই বলদ ভাবে অনিল তার মনের খবর জানে না। অথচ এদের প্রত্যেকের নাড়ি-নক্ষত্র অনিলের নখদর্পনে। তারউপর এখানে তার কলিজার টুকরা জড়িত।
.
.
.
.
তনু আজ একটা বাদামী রঙের লং কামিজের সাথে সাদা প্যান্ট আর সাদা ওড়না দিয়ে পরেছে। কাঁধের নিচে পড়া চুলগুলো উঁচু করে পৌনিটেল করা। তাকে দারুণ কিউট লাগছে দেখতে। ক্যানটিনে বসে আছে তার বন্ধুদের সাথে। এখানে শুধু তারাই।
নির্জন ~ তনুরে তুই অনিল ভাইকে মনের কথা বলে দে। পড়ে দেরি হয়ে গেলে দেখা গেল অন্যকেউ তোর অনিল ভাইকে নিয়ে যায়।
লিপি ~ ও ঠিকি বলেছে তনু। ভালোবাসিস অথচ বলছিস না কেন?
চিত্রা ~ তোরা ঠিক বলছিস মানলাম। কিন্তু আগে তো অনিল ভাইয়ের মনের দিকটাও জানতে হবে তাইনা। সে তনুকে নিয়ে কি ফিল করে তা না জেনেই কি বলে দেওয়া ঠিক হবে? যদি তার মনে তনুর জন্য তেমন কিছু না থাকে তবে তো তনুকে রিজেক্ট করবে। তা কি সইতে পারবে আমাদের বইপোঁকা সুরাইয়া তনিমা জালাল?
ঠিক এই ভয়টাই তনুকে বারবার বাঁধা দিচ্ছে। চিত্রা মুখে নিজের মনের কথা শুনতে পেয়েই করুণ চোখে তাকিয়ে আছে তনু তার দিকে। এবার কিছু একটা মনে আসতেই হাসি ফোটে তার মুখে।
তনু ~ তবে চল একটু পরীক্ষা করে দেখি তাকে।
অয়ন ~ কি করবি?
তনু ~ দেখলেই বুঝবি। চল আমার সাথে।
তারা এগিয়ে যায় তাদের ক্যাম্পাসের দীঘির পাড়ে। সেখানে বিভিন্ন ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে। তনুরাও সেখানেই যায়। তাদের দেখে অনিল ও তার বন্ধুরাও সেখানে আসে। এবং তারাও বিভিন্ন কথা বলতে থাকে নিজেদের মধ্যে। মীম ও তার ক্লাস শেষ করে ব্রেক টাইমে এখানে আসে।
সবকিছু ঠিক ছিল কিন্তু তনু কথা বলতে বলতে দীঘির দিকে পিছন ঘুরে উল্টো দিকে ওদিকেই এগোতে থাকে। ক্রু কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা জুনিয়র ছেলের সাথে ধাক্কা লেগে সে ঠাস করে দীঘির পানিতে পড়ে যায়। এদিকে কি হয়ে এখনো কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। হা করে তাঁকিয়েই আছে। তনু হাবুডুবু খাচ্ছে অবিরাম এমন সময় কেউ একজন দীঘিতে ঝাপ দেওয়ার শব্দে হুস ফেরে সবার। এবং উতলা হয় তনুর জন্য।
.
.
.
.
নিজের রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে মৌনতা। ভাবছে তা জীবনে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনার কথা। নিজের চব্বিশ বছরের জীবনের হিসাব মিলাতে যেয়ে দেখলো তার জীবনে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাই বেশি। প্রাপ্তি বলতে সে শুধু মীম আর বড় বাবাকেই পেলো বাকীটা পুরোটাই অপ্রাপ্তি, আঘাতে ভরপুর। জন্মের সময় মা মারা যায়। ছোট থেকে চাচীর লাথি-ঝাটা খেয়ে বড় হয়েছে সেখানে কাজেরলোকের মতো। তার বয়স যখন এগারো তখন বাবার সাথে এই বাড়ি আসে সে। তারপর থেকেই হামিদুর রহমানের আরেক মেয়ে হয়ে উঠেছিল মৌনতা। একটা ঘটনায় বাবাও মারা যায় তার। তারপরও সে ভালো করেই বেঁচে ছিল। কিন্তু তার অপূর্ণতার সংখ্যা, আহাজারি, কষ্টের পরিমাণ বৃদ্ধি করতেই হয়তো সেদিন সে ইবনাত শাহরিয়ারের গাড়িতে উঠেছিল জেদ করে। তারপর ঘটে অবর্ণনীয় সেই ঘটনা। এমন একটা অবস্থা যে সে কিছুতেই এখানে ইবনাতের দোষ দিতে পারে না। সেও যে সমান অপরাধী।
এদিকে হাসপাতালে নিজের কেবিনে টেবিলের উপর দুইহাতের কনুই ভর দিয়ে মাথার চুল দু’হাতে টেনে ধরে চোখ বুজে রয়েছে ইবনাত। মনে পড়ছে সেদিনের ঘটনা,
❝সকালে ঘুম জড়ানো চোখ খুলে ইবনাত নিজেকে বিনা কাপড়ে আবিষ্কার করে চমকে ওঠে। তারপর একটু ভাবতেই আগের রাতের কথা মাথায় আসে তার। রাগে, দুঃখে তার অবস্থা যে কি হয় তা প্রকাশ করার মতো না। পাশে তাঁকিয়ে বিছানা ফাঁকা দেখে শুকনো ঢোক গিলে সে। মৌনতা শেখ কি তাকে ভুল বুঝলো?
নিজের ফোন হাতে নিয়ে মৌনতাকে কল করার জন্য লক খুলতেই দেখে ‘Enayet’ নামে সেভ করা নাম্বার থেকে অগণিত মিসড কল উঠে আছে। কপালে ভাঁজ পড়ে ইবনাতের। ইনায়েত তার সৎ বোন। ইবনাতের মা মারা যাওয়ার পর ইবনাতের বাবা আবারও বিয়ে করেন। সেই ঘরের মেয়ে ইনায়েত। ইনায়েত ও তার মাকে সাথে নিয়ে তার বাবা আমেরিকা সেটেল্ড। খুব মাখো মাখো সম্পর্ক না হলেও ইনায়েত আর ইবনাতের মধ্যে মাঝেমধ্যে কথা হয়। সৎ মায়ের আচরণে বাবার সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে সে বহুবছর।
ইবনাত ইনায়েতকে কল ব্যাক করলেই রিসিভ করে সে কিছু বলার আগেই ইনায়েত বলে,
“ভাইয়া তোমার সামনে ভীষণ বিপদ। আমি মায়ের কথা শুনে ফেলিছি সে কারো সাথে মিলে তোমাকে বদনাম করে শাহরিয়ারদের সমস্ত কিছু থেকে বঞ্চিত করার পরিকল্পনা করেছে। কাল রাতে তুমি যেখানে ছিলে সেখানকার কাউকে দিয়ে তোমাকে নেশা জাতীয় কিছু খাইয়ে কোন মেয়েকে তোমার কাছে পাঠানো এবং তোমাদের ঘনিষ্ঠ মূহুর্তের ছবি, ভিডিও করে তা ভাইরাল করে দেওয়ার প্ল্যান ছিলো। কিন্তু কোন কারণে সেই মেয়ে তোমার কাছে যেতে পারেনি। কিন্তু তোমারই সাথের কেউ মনে হয় তোমার কাছে ছিলো। আর.. আর তার সুযোগ নিয়ে ওদের কাছে নানা ধরনের ভিডিও, ছবি আছে। মেয়েটার নাম হয়তো মৌনতা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমানের কেউ হয়। হামিদুর রহমানের সাথে হয়তো মায়ের পূর্ব কোনো শত্রুতা আক্সহে যার জের ধরে মৌনতা মেয়েটাকে চরম বিপাকে ফেলার সব ব্যবস্থা রেডি। আর আগামীকাল আমরা ঢাকা আসছি। দুইদিন পর শাহরিয়ারদের যে পার্টি আছে সেখানেই এসব করার জন্য ভেবে রেখেছে এরা। তুমি কোন ভাবেই এবার পার পাবে না। আমি এটুকুই জানতে পেরেছি। এখন তুমি দেখো কি করবে।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইবনাত ভাবে যে সে তো বুঝতেই পেরেছিল এই কাজ কার। তবে এর পেছনে এতো নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্র হবে তা ভাবেনি সে। কিন্তু এখন নিজেকে সামলে ইনায়েতকে বলে,
“ধন্যবাদ ইনায়েত। এগুলো আমার ধারণার বাইরে ছিলো। হয়তো তুমি আমি সহ একটা নিষ্পাপ মেয়েকে অপদস্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিলে।”
“ভাইয়া একটা অনুরোধ। তুরিন আপু হারিয়ে গিয়েছে। এর পেছনের কারণ অজানা হলেও আমার মাকে সন্দেহ হয়। তুমি প্লিজ মৌনতা নামের মেয়েটাকেও হারিয়ে যেতে দিও না।”
কি উত্তর দেবে ইবনাত ভেবে পায় না। সে বলে,
“পার্টিতে দেখা হচ্ছে ইনায়েত।”
বলেই কল কাটে। তারপর এতো সময় তার আর ইনায়েতের কল রেকর্ড ‘ফেম স্টার’ কনভারসেশন গ্রুপে সেন্ড করে। এবং মৌনতাকে কল করে। কিন্তু মেয়েটার ফোন বন্ধ পায়।
তারপর এই দুইদিনে অনেক অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে। আর আজ রাতেই সেই পার্টি। সেখানেই আজ একটা কাহিনি ঘটতে চলেছে।❞
পুরনো কথা ভাবা বাদ দিয়ে ইবনাত বাসার জন্য বের হয়। তাকে তো সুন্দর করে রেডি হয়ে যেতে হবে পার্টিতে। আজকের মেইন লীড সে কিনা!
..
..
..
..
চলবে____
(পার্টিতে চমক আছে চমক।)

