#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৩৪ (কপি করা নিষেধ)
___________________________________
অনিলকে জ্বালিয়ে তার থেকে টাকা নিয়ে বাকিরা বাইরে বেরিয়েছে সেই টাকায় খেতে। ঢাকা শহরে রাত ১২টা কোনো ব্যাপারই না। যদিও আরিবা আর মৌনতা সাথে রয়েছে তবুও কেউই এটা নিয়ে ভাবছে না। কারণ এই মৌনতা যে মীমের সাথে রাতবেরাত বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তা বাকিরা ভালো করেই জানে। আর আরিবা এতো বছর কানাডায় ছিল। তারপর আবার চারজন জোয়ান ছেলে সাথে থাকতে ভয় কিসের?
সবাই সামনে সামনে হাটছে। আরিবা আর তাহমিদ পিছনে। মূলত বন্ধুরাই এদের সুযোগ করে দিয়েছে। এদিকে তাহমিদ আর আরিবা পিছন থেকেই ইবনাত আর মৌনতার ঝগড়ার শব্দ শুনছে। বাকিরাও অবাক হয় বারবার ইবনাত যে কেন এই বাচ্চা মেয়েটার উপর এভাবে চোটপাট করে বোঝে না কেউ।
হটাৎ আরিবা বলে,
“আমিও যদি কখনো তোমার বোন তুরিনের মতো হারিয়ে যাই তখনও কি তুমি আমাকে মনে করবে না তাহমিদ? নাকি ইবনাত ভাইয়ের মতো সব ভুলে আমাকে নিয়েই থাকবে?”
চলন্ত পা জোড়া থামে তাহমিদের। শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“তুমি আমার বন্ধুর ছোট বোন আরু। এভাবে পাগলামি করছো কেন? কোনকিছুর বিনিময়েই আমি আমার চারটা বন্ধুর কাউকেই হারাতে পারবো না আরু। তুমি প্লিজ আমার জন্য সবকিছু কঠিন করে দিও না। জীবনে মুভ অন করো। আমি আহনাফ তাহমিদ তোমার যোগ্য নই আরু।”
“তুরিন তো তোমার ছোট বোন তাহমিদ। তুমি কি ইবনাত ভাইয়ের সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিলে তুরিনকে সে ভালোবাসে জেনে?”
“আরু আমি….”
“তুমি ঠিকই বলেছো। তুমি আমার যোগ্য নও। ছোটবেলা থেকেই আমি আরিবা অপাত্রে ভালোভাসা ঢেলে এসেছি। অথচ তুমি কখনো আমাকে বুঝতেই চাও নি। তবে ঠিক আছে। তুমি যা চাও তাই হবে। আজ এখন থেকে ইবনাত ভাই, রনি ভাই আর সাদাফ ভাইয়ের মতোই তুমিও আমার কাছে। আরিবা আবরার খান আর কখনো তোমার কাছে ভালোবাসা নিয়ে আসবে না। তুমি যার মূল্য দাও না সে তোমাকে তার এক পাক্ষিক ভালোবাসা থেকে মুক্ত করলো।”
চোখের পানি মুছতে মুছতে দৌড়ে বাকিদের কাছে চলে যায় আরিবা। এদিকে পিচঢালা রাস্তার দিকে চেয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে তাহমিদ বলে,
“একপাক্ষিক নয় আরু। জীবনে কখনো একপাক্ষিক ছিল না তোমার ভালোবাসা। তুমি আমায় ভালোবাসার অনেক আগে থেকেই এই মন দখল করে বসে আছ তুমি। তবে তোমার তাহমিদ নিরুপায় আরু। নিরুপায়।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাহমিদও এগিয়ে যায় সামনে।
.
.
.
ধানমন্ডির একটা লেট নাইট রেস্তোরাঁয় বসে আছে সবাই। খাবার অর্ডার করে খাচ্ছে টুকিটাকি আর নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। কথা বলছে বলতে ইবনাত আর মৌনতার ঝগড়া দেখছে মন দিয়ে বাকিরা। কিন্তু আরিবা বসে আছে নির্জীব হয়ে। যেন তার শরীরে প্রাণ নেই।
এদিকে বিরামহীন ঝগড়া করে যাচ্ছে মৌ আর ইবনাত।
“চুপ করে খেতে পারো না তুমি মৌ?”
“চুপ করে খাব কেন? আমি কি বোবা নাকি যে কথা বলবো না?”
“তুমি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কথা বল জানো তা?”
“আর আপনি প্রয়োজনের চেয়ে কম।”
“তোমার মুখ টা আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধ করে খাও। দেখো তো আরু ও তো আছে এখানে ও তো মেয়ে। কই আরু তো তোমার মতো বকবক করে কারো মাথা খাচ্ছে না।”
অভিমানী চোখে সবার দিকে তাকিয়ে মৌ প্রশ্ন করে,
“তোমরা কি আমার কথায় বিরক্ত হয়ে যাচ্ছো?”
সাদাফ সাথে সাথে বলে,
“আরে মৌ ওর কথা বাদ দাও তো। মোটেই আমরা কেউ বিরক্ত হচ্ছি না। তাহমিদ আর আরু তো রোবট হয়ে বসে আছে। আর এই লা*শের ডাক্তার তো জন্ম থেকেই রোবট। বরং এভাবে চুপচাপ বসে আমরা বিরক্ত হচ্ছি।”
গরম চোখে সাদাফের দিকে তাকায় ইবনাত। কিন্তু মৌ খুশি হয়ে যায়। এদিকে একটা মেয়ে ওয়েটার এসে কোল্ড ড্রিংকস দিয়ে যায়। সাথে এক বোতল পানি। মৌয়ের উপর বিরক্ত হয়ে ইবানাত পানির বোতল খুলে এক দমে প্রায় অর্ধেক পানি খেয়ে নেয়। মৌ ইবনাত পাশাপাশি বসায় কথা বলতে বলতে ওই একই বোতল থেকে বাকি পানি মৌ খেয়ে নেয়।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই বেরিয়ে পার্কিং এরিয়ায় দাঁড়িয়ে আছে। রনি বলে,
“তাহমিদ তুই আরুকে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি যা। আর ইবনাত তোর বাসায় যাওয়ার আগেই তো মৌয়ের বাড়ি ওকে তুই নিয়ে যা। আর চল সাদাফ তুই আর আমি যাই।”
“আমি এই ভাঙা রেডিওকে আমার সাথে নিতে পারবো না।”
ইবনাতের কথায় রেগে যায় মৌ। সেও বলে,
“এখন তো আমি আপনার সাথে আপনার গাড়িতেই যাবো। দেখি কিভাবে না নিয়ে জান।”
এই কথা বলেই সে ইবনাতের গাড়িতে উঠে বসে পড়ে। ইবনাত ও বিরক্ত হয়ে যেয়ে তার গাড়িতে বসে।
“সাদাফ ভাই তোমার বাড়ির আগেই তো আমাদের বাড়ি। আমি তোমার সাথে যাই। শুধু শুধু তাহমিদ ভাইয়ের উল্টো যাওয়ার কি দরকার।”
আরিবার এমন কথাতে বেশ অবাক হয় সকলে। কারণ আরিবা সবসময়ই তাহমিদের সান্নিধ্য পছন্দ করে। সেই মেয়ে নিজ থেকেই এমন বলবে কেউ ভাবতে পারেনি। সাদাফ তাহমিদের দিকে ফিরলে সে ইশারায় বলে আরিবাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
সাদাফ বলে,
“তাহলে তুই আমার সাথেই চল আরু।”
তাহমিদ শুকনো ঢোক গিলে নিজের বাড়ির রাস্তা ধরে। আরিবা নামক সুখ যা সে কখনো গ্রহণ করতে পারেনি তা এবার সত্যি সত্যিই তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
.
.
.
.
ইবনাত ড্রাইভ করছে কিন্তু তার হটাৎ করে প্রচুর গরম লাগছে। এদিকে মৌয়েরও গরমে অবস্থা শোচনীয়। এসির মধ্যেও ঘেমে বিশ্রী অবস্থা। সাথে দুইজনেই একে অপরের প্রতি অবর্ণনীয় শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করছে। ইবনাত কোন ভাবেই নিজেকে সামলাতে পারছে না। মৌয়ের অবস্থা আরও খারাপ। বুদ্ধিমান ইবনাতের বুঝতে অসুবিধা হয়নি তাকে কৌশলে খারাপ কিছু খাওয়ানো হয়েছে। এদিকে মৌকে দেখেও বোঝে যে তাকেও একই জিনিস খাওয়ানো হয়েছে। একটু মাথা খাটালেই মনে পড়ে যে তারা দুজনেই একই বোতলের পানি খেয়েছে। এবং বোতল যে আগে থেকেই খোলা ছিলো তখন তা দেখলেও সে গায়ে লাগায়নি খুব একটা। আর সেটাই কাল হয়েছে। কিন্তু সব জেনে-বুঝেও নিজেকে আটকাতে অক্ষম সে। পরিস্থিতি তার হাতের বাইরে।
কোনরূপ বিল্ডিংয়ের গেট দিয়ে গাড়ি ঢুকিয়ে পার্কিং-এ যেয়ে গাড়ি থামায় ইবনাত। সাথে সাথে মৌ তার সিট বেল্ট খুলে এগিয়ে আসে ইবনাতের দিকে। ইবনাত ও ততক্ষণে নিজের সিট বেল্ট খুলে ফেলেছে। সে মৌয়ের কোমড়ে নিজের ডান হাত রেখে এক টানে মেয়েটাকে তার কোলে বসায়। তারপর তার গালে হাত দিয়ে বলে,
“I’m sorry Mou. I can’t control. You shouldn’t be with me now. But you are with me it’s your bad luck. Sorry Again.”
এদিকে ইবনাতের কোন কথা কান পর্যন্তই যায়নি মৌয়ের সে নিজেই অধৈর্য্য হয়ে ইবনাতের ঠোঁটে ঠোঁট রাখে তার। এদিকে এবার যেন ইবনাতের সকল সংযমের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। উন্মাদ হয়েছে সে। ওভাবেই কতক্ষণ যে কাটালো দুজনে!
পরে গাড়ি থেকে বের হয়ে মৌকে কোলে তুলে নিয়ে লিফট দ্বারা নিজ বাসায় যায় ইবনাত। এদিকে রেস্টুরেন্ট থেকেই তার গাড়ির পিছু করা একটা গাড়ি অনবরত তার আর মৌয়ের ঘ*নি*ষ্ঠ মূহুর্তের ছবি তুলে কু*টিল হাসলো। যে প্ল্যান ছিলো ইবনাত শাহরিয়ারকে নিয়ে তা সাকসেসফুল না হলেও এখন যেসব প্রমাণ যোগাড় করেছে তাতেই শাহরিয়ারদের বর*বাদ করা যাবে।
একই রাত। চার অক্টোবরের প্রথম প্রহরে ‘ফেম স্টার’ এর তিনজনের জীবনে নতুন মোড় ঘুরে গেলো। অনিল তার বউকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করলো, তাহমিদ পেয়েও তার সুখ হারিয়ে ফেললো আর ইবনাত এক ভ*য়া*বহ সর্ব*না*শের খেলায় মা*তা*ল হলো। কি হবে এদের পরিনতি! শেষমেশ জীবন কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে ‘ফেম স্টার’ দের!
..
..
..
..
চলবে____
(এই পর্ব ইবনাত মৌনতা আর তাহমিদ আরিবা স্পেশাল পর্ব।)

