#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৩৩ (কপি করা নিষেধ)
______________________________________
দরজা দিয়ে ব্যালকনিতে পা রেখেই ৪৪০ ভোল্টের ঝটকা খাওয়ার মতো ঝটকা খায় অনিল আবরারের খোলসে আবৃত হৃদয়। তার সামনে সে যা দেখছে এর বর্ণনা তার দ্বারা সম্ভব নয়। এ জীবনে এর থেকে আকর্ষণীয়, এর থেকে সুন্দর কিছু দেখেছে বলে অনিল মনে করতে পারলো না।
ব্যালকনির কোমর সমান রেলিঙের উপর দু’হাত রেখে অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে আছে মীম। তার পরনে একটা পিচ কালারের শাড়ী। যার পাড় গোলাপি রঙের। পাড়ের সাথে মিল রেখে গোলাপি ব্লাউজ যার হাতা কনুই পর্যন্ত। যে হাত দুটো রেলিঙের উপর রাখা সেই হাত ভর্তি চুড়ি পরেছে মেয়েটা। উল্টো দিকে ফিরে থাকায় অনিল তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর মুখ না দেখলেও তার হাটু ছুইছুই লম্বা ঘন খোলা চুল ঠিকই দেখে। আর সেখানেই আটকে যায় কাঠখোট্টা মেজরের দুনিয়া। হালকা বাতাসে মীমের লম্বা চুল দিশাহীন উড়ছে। রমণীর সেদিকে কোন খেয়াল নেই। সবসময় আধুনিক পোশাকে দেখে অভ্যস্ত মীমকে এভাবে শাড়ীতে দেখে কি পরিমাণ যে হোঁচট খেয়েছে মেজর তার পরিমাপ সে নিজেও করতে সক্ষম হচ্ছে না।
অনিল মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় এগিয়ে মীমের পিঠ ছুয়ে দাঁড়ায়। মীম বোঝে কেউ আছে তার পিছু। সে বুঝতেও পারে মানুষটা তার একান্ত পুরুষ। তাই সে নিজের ভর ছেড়ে তার পিঠ নিজের একান্ত পুরুষের বুকে ঠেকিয়ে ভর ছেড়ে দেয়। অনিলও বিনাবাক্যে পিছন থেকে জড়িয়ে নেয় স্বীয় স্ত্রীকে।
“এতো দেরি করলেন কেন? আপনি অসুস্থ মেজর।”
হাসি খেলে যায় মেজরের ঠোঁটে। মীমকে জড়িয়ে রাখা তার দুই হাত আরও দৃঢ় হয়। নিজের মনে মনে প্রস্তুত থেকেও কেঁপে ওঠে মীম। এদিকে নিজের বাহুতে স্ত্রীর কম্পন পুরোপুরিই বোঝে মেজর। তবুও হাত আলগা করে না। ওভাবেই বলে,
“তেমন সিক নেই আপনার মেজর। খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। না হলে আজ আপনাকে ছেড়ে এক পা নড়তো না আপনার মেজর।”
মীমের মনে অদ্ভুত অনুভূতি হয় বারবার আপনার মেজর আপনার মেজর শুনে। সেও অস্ফুটস্বরে বলে,
“আমার মেজর!”
“হ্যা মাই হাইনেস। আপনারই তো। পুরোটাই আপনার।”
অনিলের পকেটে থাকা ফোনে ভাইব্রেট করে। এদিকে ব্যালকনির ছোট টি-টেবিলের ওপর রাখা মীমের ফোনেও হালকা আওয়াজ হয়। মীম দ্রুত অনিলের বাহু থেকে নিজেকে সরিয়ে অনিলের বরাবর ফিরে দু’জনেই একদমে একসাথে বলে,
“হ্যাপি বার্থডে হাসবেন্ড।”
“শুভ জন্মদিন মাই হাইনেস।”
দু’জনেই ভীষণ অবাক হয়। তাদের দুজনের জন্মদিনই একই দিন। এটা একটা কাকতালীয় ঘটনা মাত্র। আর সেই কাকতালীয় দিন আজই অক্টোবর চার। হ্যা চার অক্টোবর অনিল আবরার খান আর মাশফিয়া রহমান মীম দু’জনেরই জন্মদিন। অনিল যখন হাসপাতালে ছিলো তাদের বিয়ের পরে অনিলের প্রায় সকল অফিসিয়াল কাজই মীম নিজ হাতে করেছে। তখনই অনিলের ন্যাশনাল আইডি কার্ড থেকে মীম জানতে পারে এই ব্যাপারে। এদিকে অনিল তো বহুদিন হবে তার স্ত্রীর সমস্ত খুটিনাটি নখদর্পনে রাখে। সেখানে জন্মদিন তো খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
“শাড়ীতে আপনাকে অনিল আবরার খানের নতুন বউ বউ লাগছে ম্যাডাম।”
“for Your kind information আমি অনিল আবরার খানের নতুন বউই। এখানে তার নতুন বউ বউ লাগার কিছু নেই।”
নিঃশব্দে ঠোঁট চওড়া করে হাসে অনিল। মীমের বক্ষস্থল কেঁপে ওঠে লোকটার হাসিতে। লোকটা একেই মারাত্মক সুদর্শন। তারপর থাকে সবসময় গম্ভীরমুখে। কিন্তু বিয়ে হওয়ার পর থেকেই তার সামনে লোকটা কেমন যেন অন্য এক অনিল হয়ে গিয়েছে। ওর কাছে থাকলে লোকটা হাসিখুশি থাকে। প্রফেশনাল গম্ভীরতা একদমই কাজ করে না তার মাঝে। বুদ্ধমতি মীম ভালোই বোঝে তার বর অনিল আর মেজর অনিলের মধ্যে কতটা তফাৎ। কিন্তু সে তো পারে না নিজেকে বদলাতে। সে তো পারেনা অনিলের মতো হাসতে। সে তো তিনটা বছর হয়ে গিয়েছে হাসতে পারে না। জোর করে চেষ্টা করেও তার মুখে হাসি ফোটে না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের মনের অস্থিরতা মনেই লুকিয়ে অনিলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই মীম বলে,
“আপনার মুখে মাই হাইনেস ডাক টা অসাধারণ শোনায় মেজর।”
“আমি ধন্য এটা জেনে।”
মাথা ঝুঁকিয়ে কার্নিশ করে বলে অনিল। মীম এতোটা ও আশা করেনি যে নাকউঁচু লোকটা এভাবে তার সামনে মাথা ঝোঁকাবে। সে যে বেশ অবাক হয়েছে তা তার চোখমুখই ভলে দিচ্ছে অনিলকে। অনিল তার ইউনিফর্ম এর পকেট থেকে একটা লাল ভেলভেট কাপড় মোড়ানো লম্বা বক্স বের করে সামনে আনে। মীম ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। তারপর সেই বক্স খুললে তার মধ্যে চমৎকার ডিজাইনের একটা লকেট সহ চেন দেখতে পায় মীম। অনিল বক্স টা রেখে মীমের গলায় চেনটা পরিয়ে দেয়। লকেট টা একটা ইনফিনিটি চিহ্ন আকারে বানানো প্লাটিনামের। আর তার উপর অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডায়মন্ড। এরপর আবার বুক পকেট থেকে খুবই সংগোপনে কিছু বের করতে দেখা যায় মেজরকে। মীম চুপচাপ দেখেই যায়। মেজরের পকেট থেকে যখন একটা শিউলি ফুলের গাজড়া বের হতে দেখে মীম আশ্চর্য না হয়ে পারে না। গাজড়া টা হাতে নিয়ে অনিল মীমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“মে আই?”
মীম নিঃশব্দে পিছন ফিরে গেলে অনিল প্রথমে মীমের চুলে লাগানো দুই তিনটা ববি পিন খুলে হাতে নেয়। তারপর লম্বা চুলগুলো ঘাড়ের ওপর ঢিলা হাতখোপা করে তাতে শিউলির গাজড়া পরিয়ে দিয়ে ববি পিন দিয়ে সেট করে দেয়। মীম অবাক হয় বেশ।
“এই রাতে আপনি শিউলি ফুল কোথায় পেলেন?”
“জোগাড় করে ফ্রিজে রেখেছিলাম।”
“সকাল থেকে ছিলেন তো আমার সাথেই হাসপাতালে। তবে জোগাড় করলেন কিভাবে?”
“আমাদের বাসার পিছনে একটা শিউলি গাছ আছে। সকালে আরুকে বলে কালেক্ট করিয়ে ফ্রিজে রেখেছিলাম।”
“ওহ। ধন্যবাদ আপনাকে। অক্টোবরের স্পেশালিটিই হচ্ছে এই শিউলি। জানেন এই কয় বছর লন্ডনে প্রচুর মিস করেছি এসব। আমাদের বাড়িতেও একটা আছে শিউলি গাছ। দাদুভাই লাগিয়েছিলেন আমার জন্য।”
অনিল মীমকে নিজের দিক ফিরিয়ে অনেকক্ষণ নিষ্পলক চেয়েই থাকে। অনেকটা সময় চেয়ে চেয়ে মেয়েটার হালকা প্রসাধনীর ছোয়া লাগানো মায়াবী মুখটা দেখে। হালকা মেকাপের সাথে ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। থুতনির এক কোনায় থাকা কালো তিলটা আজ বড্ড বিরক্ত করছে মেজরকে। সে ওই তিলের উপর হালকা করে ঠোঁট ছুইয়ে দিয়ে ওভাবেই বলে,
“আমার বাড়ি, আমার ঘর, আমার জীবন এবং আমি আজ থেকে চিরকালের জন্য আপনার হলাম মাই হাইনেস।
আপনি কি গ্রহণ করবেন?”
মীম নির্দ্বিধায় বলে,
“গ্রহণ করেছি মেজর। তবে কখনো কোনো মেয়ে ঘটিত কিছু ঘটলে আমি মাশফিয়া মীম আপনার বাড়ি, আপনার ঘর, আপনার জীবন এমনকি আপনাকে ত্যাগ করতেও দুবার ভাববো না। আমার অনুরোধ আপনার কাছে এমন কিছুই যেন না হয়।”
অনিলের হাসিহাসি মুখটায় হটাৎ করে অমাবস্যা নামে। কিন্তু মীম ওসবে পাত্তা না দিয়ে নিজেও টেবিলের উপর থেকে একটা বক্স নিয়ে সেখান থেকে একটা প্লাটিনাম রিং নিয়ে অনিলের অনামিকায় পরিয়ে দেয়। আর বলে,
“ছেলেদের তো স্বর্ণ পরতে নেই তাই প্লাটিনাম কিনেছি। আর ভাববেন না এই রিং কেনা টাকা আমার নিজের জমানো টাকা থেকে দিয়েছি। রহমান বাড়ির একটা পয়সা নেই এখানে। লন্ডনে পার্ট টাইম জব করে করে অনেকগুলো টাকা জমিয়েছিলাম সেখান থেকেই নিয়েছি।”
অনিল তাকায় মেয়েটার দিকে। এই মেয়ের মনে যে নিজের বাবাকে নিয়ে আকাশ সম অভিমান জমা তা জানে সে। তবে তার কারণ তার জানা নেই। তাই আর এই ব্যাপারে কথা বলে না। নিজের ফোন বের করে তাদের দু’জনের বেশকিছু সেল্ফি তুলে নেয় অনিল। সেনাবাহিনীর পোশাকে সে আর তার বাহুবন্ধনীতে শাড়ী পরিহিত তার একান্ত রমণী। মীম নিজেও দেখে। ছবি গুলো আসলেই মারাত্মক সুন্দর হয়েছে। এই যে এতো সুদর্শন একটা লোক আর্মি ইউনিফর্ম পরে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তবুও শ্যামা মীমকে লোকটার বক্ষে বেমানান মনে হচ্ছে না কিছুতেই। নিজেই অবাক হচ্ছে মীম।
“আপনাকে এভাবেই আর্মি পোশাকেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে মেজর।”
অবচেতনে বলে মীম। ঠোঁট বাঁকায় অনিল।
এবার অনিল মীমকে বলে,
“আমি ফ্রেশ হয়ে ওজু করে আসছি। তারপর আপনিও ওজু কর৩ আসুন। নতুন জীবন আল্লাহর নামে শুরু করি। মীম মাথা নাড়াতেই অনিল রুমে যেয়ে তার আলমারি খুলে একটা ট্রাউজার আর টি-শার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে যায়। মীম আবারও অন্ধকারে চেয়ে ভাবে আজ দুপুরের কথা।
হামিদুর রহমান সাহেব কিছুতেই মেয়েকে এভাবে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবেন না। ওদের ধুমধামে বিয়ে করিয়ে তবেই মীমকে পাঠাবে বলে জানান তিনি। এদিকে অনিলও জেদ ধরে বসে বউ ছাড়া সে কিছুতেই বাড়ি ফিরবে না। যেখানে সে সবার সামনে বিয়ে করেছে সেখানে আবার বিয়ের কি দরকার সেটাই তার কথা। একপর্যায়ে অনিলের জেদের কাছে হার মেনেই মীম পা রাখে এই বাড়ি।
কিন্তু মীমকে নিয়ে আসার পরপরই অনিল আর তাহমিদ বেরিয়ে যায় কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে। আর মৌকে নিয়ে আরিবা তাকে সাজাতে লেগে পড়ে। সে অবশ্য কোনো কিছুতেই মানা করেনি। কেনই বা মানা করবে যেখানে সে বিয়েটাই মেনে নিয়েছে!
সবকিছু শেষে তাকে এই ঘরে নিয়ে আসলে সে ঘরে ঢুকেই দেখে গরের চেহারা এরা ফুল দিয়ে ভরে ফেলেছে।
অনিল বেরিয়ে মীমকে পাঠায় ওজু করার জন্য। তারপর নিজে দুইটা জায়নামাজ বিছিয়ে রাখে। মীম আসলে দু’জনে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর শুকরিয়ায়। তারপর উঠে অনিল তার আলমারি খুলে আরও একটা বক্স বের করে এনে মীমের সামনে ধরে। মীম কিছু বলার আগেই অনিল সেই বক্স থেকে একটা ডায়মন্ডের ছোট্ট হালকা রিং বের করে মীমের অনামিকায় পরিয়ে দেয়। মীম তার হাত দেখে বলে,
” একবার তো গিফট দিলেনই। এটা আবার কেন?”
“তখনকার টা আপনার জন্মদিনের গিফট ছিলো।”
“আর এটা?”
“এটা আপনার ফার্স্ট নাইটের গিফট।”
কি অদ্ভুত মীম লজ্জা পাচ্ছে কেন? হাসফাস করে ওই ডার্ক ব্রাউন চোখের থেকে নিজের চোখ নামিয়ে আস্তে করে বলে,
“কিন্তু আমি তো আর কোন গিফট আনিনি আপনার জন্য।”
বউয়ের লজ্জা বুঝে বেশ সন্তুষ্ট হয় অনিল। তারপর বউয়ের কাছে এগিয়ে একদম কানের কাছে গিয়ে খুবই নেশালো কণ্ঠে বলে,
“আপনি নিজেই তো পুরো একটা পাঁচ ফুটের গিফট আমার জন্য মাই হাইনেস।”
শিউরে উঠে দুই পা পিছিয়ে যায় মীম। তারপর আমতা আমতা করে বলে,
“আ..আমার ঘুম পা..পাচ্ছে মেজর।”
অনিল এবার আবারও নিঃশব্দে হেসে ফেলে। এগিয়ে গিয়ে মীমের হাত ধরে ওই ফুলের বিছানায় শুইয়ে দেয়। তারপর নিজেও পাশে শুয়ে পড়ে।
অনিল শুতেই মীম নিজেকে কেমন গুটিয়ে নেয়। অনিল দেখে তা। সে তার ডান হাতে মেয়েটাকে টেনে এনে জড়িয়ে ধরে। মীম ছটফট করে উঠতেই অনিল অত্যন্ত ঠান্ডা অথচ শক্ত কণ্ঠে বলে,
“মন ছোয়ার আগে শরীর ছোয়ার মতো কাপুরষ নয় আপনার হাসবেন্ড ম্যাডাম। তাই উল্টো পাল্টা চিন্তা বন্ধ করুন। তবে বিয়ে করেও বউকে জড়িয়ে ধরে না ঘুমানোর মতোও সাধুও নয় আপনার হাসবেন্ড। তাই এটুকু প্রয়োজনে আপনাকে জোর করেই মানতে হবে।”
অনিলের বাহুতে মীমের ছটফটানি বন্ধ হয়ে যায়। সে বিড়বিড় করে বলে,
“কাকে সভ্য ভেবেছিলাম আমি! ভুলে গেলাম কিভাবে এই লোক আসলে একটা ঘাড়ত্যাড়ার বাপ।”
“হুম। আর সেই ঘাড়ত্যাড়ার মা আপনি।”
এই কথা বলেই মীমের মাথায় শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে চোখ বন্ধ করে অনিল। মীম ভাবেনি তার এতো আস্তে কাথাও লোকটা শুনে নেবে। তারপর সেও চোখ বোজে।
..
..
..
চলবে____
.

