#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৩৬ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________
চোখ ধাঁধানো আলো ঝলমলে পুরো হলরুম জুড়ে। থাকবেনাই বা কেন, শাহরিয়ার গ্রুপের উত্তরাধিকার ঘোষণা পার্টি যে আজ। বাংলাদেশের অন্যতম বনেদী ব্যবসায়ীদের মধ্যে শাহরিয়ার গ্রুপ একটা। এবং তাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই উত্তরাধিকার ঘোষণা পার্টি আয়োজন করা হয়ে থাকে। তাইতো এই পার্টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে তেমনই সমসাময়িক ব্যবসায়ী মহলেও। এই পার্টিতে আমন্ত্রিত রয়েছে দেশ বিদেশের অনেক ব্যবসায়ী পরিবার। শাহরিয়ারদের উত্তরাধিকার নির্বাচনের মধ্যে অনেক গুণাবলি থাকা আবশ্যক। তার মধ্যে চরিত্রবান হওয়া প্রধান। কারণ যুগের পর যুগ তারা মেনে এসেছে যে একজন ব্যক্তি যদি নিজের চরিত্রই ঠিক রাখতে না পারে তবে এতো বড় দায়িত্বের যোগ্য সে নয়।
আর ঠিক এখানেই গেম টা খেলেছে ইকবাল শাহরিয়ারের দ্বিতীয় স্ত্রী নুসরাত শাহরিয়ার। উসমান শাহরিয়ার বর্তমানে শাহরিয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান আর তার ছেলে ইকবাল শাহরিয়ার এমডি। পরম্পরা অনুযায়ী এখন উসমান শাহরিয়ারের নাতি আর ইকবাল শাহরিয়ারের একমাত্র ছেলে ইবনাত শাহরিয়ার পুরো শাহরিয়ার গ্রুপের উত্তরাধিকার। আর এটাই মানতে নারাজ নুসরাত শাহরিয়ার। ইবনাতের মা মারা যাওয়ার পর নুসরাতকে বিয়ে করে ইকবাল শাহরিয়ার। তার কিছু খারাপ দিক থাকায় সে কখনো শাহরিয়ার গ্রুপের উত্তরাধিকার হয়নি। বাবার জন্য এমডি পদবী পেয়েছে শুধু। এখন ইবনাত সর্বদিক দিয়ে পারফেক্ট হওয়ায় উসমান শাহরিয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাকে উত্তরাধিকার ঘোষণা করবেন। ইকবাল শাহরিয়ার যৌবনে নিজের ছেলের সাথে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করলেও সে এই বয়সে এসে বুঝেছেন ছেলের মর্ম। সে চায় ছেলের সাথে সম্পর্ক ঠিক করতে। ছেলের সাথে একটা স্বাভাবিক জীবন কাঁটাতে। কিন্তু তার আত্ম উপলদ্ধি হতে যথেষ্ট দেরি হয়ে গিয়েছে। ততদিনে ইবনাত নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে নিজ খোলসে। তার দুনিয়ায় তার চারটা বন্ধু, তার দাদু আর তুরিন নামের একটা মেয়ে ব্যতীত কেউ ছিল না। এমনকি সে কখনোই শাহরিয়ার গ্রুপের উত্তরাধিকার হতে আগ্রহ দেখাইনি। যখনই তাকে এই ব্যাপারে বলা হয়েছে সে এড়িয়ে গিয়েছে। এবার অবশ্য উসমান শাহরিয়ার ইবনাতকে না জানিয়েই সব আয়োজন করেছেন। এবং ইকবাল শাহরিয়ার অত্যন্ত খুশি মনে রাজি হয়েছেন। কিন্তু তিনি জানেন নুসরাত শাহরিয়ার এতো সহজে এসব মেনে নেবেন না। তার যে শাহরিয়ার গ্রুপের উপর ভীষণ লোভ। যুবক বয়সে বুঝতে না পারলেও এখন সবকিছু পানির মতো পরিষ্কার ইকবাল শাহরিয়ারের কাছে। তার ছেলের ক্ষতি করতে এই মহিলা কখনো ভাবেনি আর ভাববেও না।
পার্টিতে আমন্ত্রিত প্রায় সবাই এসে গিয়েছে। ইবনাতের চার বন্ধুই আছে এখানে আমন্ত্রিত। আবার তারাও ব্যবসায়ী পরিবার হওয়ায় তাদের পরিবার ও এসেছে সাথে। সাদাফ তার বাবা মায়ের সাথে এসেছে। রনি এসেছে বাবা মা আর ছোট ভাইয়ের সাথে। তাহমিদের বাবা মা দেশের বাইরে তাই সে একাই এসেছে। অনিল এসেছে বাবা বোনের সাথে। ওদিকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান এসেছে। যেহেতু তার বাবার বিজনেস সে দেখাশোনা করে তাই তাকেই আসতে হয়েছে। সাথে অবশ্য মীম আর মৌনতা ও রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ধনী ব্যক্তিবর্গ এখানে উপস্থিত। ইকবাল শাহরিয়ারের সাথে আছে তার স্ত্রী আর মেয়ে। ইনায়েতের দুই চোখ খুঁজে চলেছে তার ভাইকে। না জানি তার মা কি কি করতে চলেছে?
উসমান শাহরিয়ার ওঠেন স্টেজে। তাকে সাহায্য করে ইনায়েত। যথেষ্ট বয়স হয়েছে তার। একা একা খুব একটা চলাফেরা করতে পারে না এখন আর। এতো বছর একা একা আমেরিকা থেকেছে। মাঝে মধ্যে অবশ্য ছেলে আর নাতনি যেয়ে দেখে আসতো তাকে। স্টেজে তখন স্পটলাইট উসমান শাহরিয়ারের উপর। এছাড়া পুরো হলরুম অন্ধকার। উসমান শাহরিয়ার মাইক নিয়ে বলেন,
“Ladies and gentleman welcome to Shahriar’s biggest occasion. It’s a big day for me and others Shahriars. Today we are going to know who is our next leading Shahriar.
So he is none other than Mr. Ibnat Shahriar. Son of Mr. Iqbal Shahriar and grandson of Mr. Usman Shahriar. Let’s discover something about him…..”
এরপর উসমান শাহরিয়ারের উপর থেকে স্পটলাইট সরে যায়। এবং হলরুমে প্রজেক্টের চলে ওঠে। আমন্ত্রিত অতিথিদের নজর পড়ে সেদিকে। প্রজেক্টরে দেখা যাচ্ছে একদম শিশু ইবনাতের বিভিন্ন ছবি। কখনো মায়ের কোলে, কখনো বাবার কোলে কখনো দাদা-দাদীর সাথে। হলরুমে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা ইকবাল শাহরিয়ারের চোখ ভিজে ওঠে। অথচ প্রজেক্টরের অল্প আলোতেই ইনায়েত দেখে তার মায়ের মুখের ক্রুর হাসি। ইবনাতের ছবি স্লাইড হতে হতে একটা ছবিতে গেলে থেমে যায়। পাঁচটা তাগড়া যুবক দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে ইবনাত শাহরিয়ার আর অনিল আবরার খান গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে আর বাকি তিনজন তাদের দুইপাশে দাঁড়িয়ে। কাঁধে হাত পাঁচটা ছেলের। চোখমুখে আলাদা উজ্জ্বলতাই জানান দিচ্ছে তাদের অটুট বন্ধুত্বের। পাঁচজনের গায়ে সাদা টি-শার্ট যাতে “FEM STARS” লেখা জ্বলজ্বল করছে। উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ছবিটি। নুসরাত শাহরিয়ার এর মুখে হাসি আরও চওড়া হয়। সে জানে কয়েক মিনিট পরে এরাই ছিঃ ছিঃ করবে যারা এখন মুগ্ধ হয়েছে।
ফেম স্টারস এর চারজন যুবককে তখনও আধো আলোতে ছবিটির মতোই কাঁধে হাত রেখে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। প্রজেক্টের বন্ধ হয়ে এবার স্পটলাইট যায় হলরুমের সিড়িতে। সেখান থেকে কালো স্যুট-কোট পরিহিত সুদর্শন ইবনাত শাহরিয়ারকে নামতে দেখা যাচ্ছে গম্ভীরমুখে। সে নেমেই স্টেজে দাদুর সাথে হাগ করে বোনের মাথায় হাত দিয়ে আদর করেই নেমে পড়ে স্টেজ থেকে। স্পটলাইট যেন ইবনাতের ছায়া আজ ওগুলোও তার উপরেই। নুসরাত শাহরিয়ার মনে মনে বলে,
“হেসে নাও ইবনাত। জীবনের শেষ হাসি হেসে নাও। কয়েক মিনিট পর থেকেই আর কখনো হাসতে পারবে না তুমি।”
এর সাথে সে চোখ ঘুরিয়ে মৌনতাকে দেখে উপহাস করে হাসে। অথচ সে যদি একটু খেয়াল করতো তবে তার নজরে পড়তো ইবনাত হাসেনি বিন্দুমাত্র। সবসময় যেমন গম্ভীর থাকে এখনো তেমনই আছে। আর মৌনতাকে নিয়ে তার উপহাসের হাসি নজর এড়াতে পারেননি সেই গম্ভীর মানবের।
ইবনাত স্টেজ থেকে নেমেই তার চার বন্ধুর নিকট হাজির হয়। ছবিতে যেমন ছিল ঠিক সেভাবেই সাদাফ আর অনিলের মাঝে নিজের জায়গা করে দুজনের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ায়। পাঁচজনের পরনে কালো স্যুট-কোট। পাঁচটা সুদর্শন পুরুষ। কি যে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে কেউ চোখই সরাতে পারছে না। শাহরিয়ারদের হায়ার করা ক্যামেরাম্যান ছাড়াও উপস্থিত কতজন যে নিজের ফোনে এমন সুন্দর মূহুর্ত ক্যামেরা বন্দী করছে তার ইয়াত্তা নেই। সেই দলে রয়েছে মাশফিয়া মীম ও। সেও তার ফোন বের করে ছবি তোলে। আর এটা খেয়াল করে অনিল। মনে মনে কিঞ্চিৎ হেসে ফেলে সে।
আবারও স্টেজে ওঠে ইবনাত। দাদুর একটা হাত ধরে মাইক ধরে অন্য হাতে। তারপর বলে,
“আমিই ইবনাত শাহরিয়ার। শাহরিয়ার গ্রুপের নতুন চেয়ারম্যান। আপনারা আমার জন্ম থেকেই সবকিছু দেখলেন। এখন আমি আমার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় সম্পর্কে আপনাদের বলতে চাই।”
দাদুর হাত ছেড়ে তার দিকে তাকালে সে ইশারায় হ্যা বলে। ইবনাত আরও একবার স্টেজ থেকে নেমে হামিদুর রহমানের সামনে যেয়ে ইশারায় তার অনুমতি চাইলে সেও হ্যা বলে। কালো জর্জেট শাড়ি পরিহিত খোলা কোমড় সমান চুল, ঠোঁটে চেরি রেড লিপস্টিক চোখে কাজল দেওয়া মৌনতার একহাত নিজ হাতের মধ্যে নিয়ে বিনাবাক্যে তাকে স্টেজে নিয়ে নিজের পাশে দাঁড় করায়।
“আমি ইবনাত শাহরিয়ার বিয়ে করেছি মৌনতা শেখকে। সে আমার অর্ধাঙ্গিনী।”
মৌনতা অবাক নয়নে তাঁকিয়ে আছে ইবনাতের পানে। বাকিরা সবাই হাত তালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে। ইনায়েত নিজের মায়ের দিকে তাকালে দেখে আকাশ থেকে পড়ার মতো রিএকশন তার। ফোন নিয়ে কিছু একটা করেই নুসরাত শাহরিয়ার অত্যন্ত খোভ নিয়ে দেখতে থাকে ইবনাত মৌনতাকে। সে ফোন রাখার পরেই আবারও প্রজেক্টর চালু হয়। এখানে দেখানো হচ্ছে। লাল বেনারসি শাড়ি পরে মৌনতা আর কালো শেরওয়ানিতে ইবনাত শাহরিয়ার সোফায় বসা। তাদের বিয়ে পড়ানো হচ্ছে। ইবনাতের পাশে তার চার বন্ধু আর তার দাদু। অন্যদিকে মৌনতার পাশে মীম আর তার বাবা আছে। এবং শরিয়তের সঙ্গে আইনি ভাবেও বিয়ে হয় তাদের।
নুসরাত শাহরিয়ার এর মাথায় হাত। এসব তো হওয়ার কথা নয় তবে? তার ভাবনার মাঝেই খুবই ক্ষীণ আওয়াজে তার পাশে এসে কেউ বলে,
“বেশি উড়বেন না ম্যাডাম। ইবনাতের ক্ষতি করার চিন্তা মাথা থেকে বের করে দেন। এতো বছর অনেক করেছেন। কিন্তু আর নয়। আমি অনিল আবরার ভয়ংকর মানুষ। আমার প্রিয়জনকে কেউ আঘাত করতে চাইলে তাকে দুনিয়া থেকে গায়েব করে দিতে খুব একটা সময় লাগে না আমার। এটাই আপনার জন্য প্রথম আর শেষ ওয়ার্নিং।”
সরে যায় সেই আওয়াজ। কিন্তু এই আওয়াজে কি ছিল তা জানা নেই নুসরাত শাহরিয়ার এর। অটোমেটিক তার ঘাম ছুটে যায়।
—
পার্টি শেষে বাড়ি ফিরে আবারও নিজের রুমে শুয়ে মৌনতা দুইদিন আগে ফিরে যায়।
সেদিন ইবনাতের বাসা থেকে বের হয়ে কোনমতে নিজের বাড়িতে মানে সুখ নিড়ে ফিরে রুমে দরজা বন্ধ করে ওয়াসরুমে যেয়ে শাওয়ারের নিচে বসে ডুকরে কেঁদে ওঠে। অনেকটা সময় কাঁটিয়ে রুমে এসে একটা কলম নিয়ে লিখতে শুরু করে,
❝প্রিয় বড় পাপা,
জানিনা তোমাকে প্রিয় বলার অধিকার আর থাকবে কি না! এই যে আমি মৌনতা নামের এক অসহায় মা হারা মেয়েকে তুমি বুকে আগলে রেখে বড় করেছো, সেই আমিই তোমার সম্মান রক্ষা করতে অক্ষম হয়েছি। মীম আমার আমার মধ্যে যেমন তুমি কোন পার্থক্য করো নি কখনো, বিশ্বাস করো আমিও কখনো আমার নিজের বাবা আর তোমার মধ্যে পার্থক্য করিনি। তুমি বা রহমান বাড়ির কেউ আমাকে কখনো বুঝতেই দেয়নি আমি তাদের ড্রাইভারের মেয়ে।
অথচ এতো ভালোবাসা পেয়েও আমি কি করেছি? আমি একটা পুরুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে এসেছি। আমাকে কি ক্ষমা করা যায়? জানি তো যায় না। যেখানে আমি নিজেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না সেখানে তুমি কিভাবে পারবে?
তাইতো নিজেকে শাস্তি দিচ্ছি। এখানে ওই পুরুষের কোন দোষ নেই বড় পাপা। সে পরিস্থিতির স্বীকার ছিল। তাকে কিছু বলবে না এটা তোমার মেয়ের অনুরোধ।
মীমকে বলে দিও মৌ তাকে ভীষণ ভালোবাসে। আমি তোমাকেও ভীষণ ভালোবাসি বড় পাপা। জীমকেও ভীষণ ভালোবাসে তার মৌ আপি জানিও তাকে।
তোমার অযোগ্য মেয়ে,
মৌনতা।❞
এই চিঠি লিখে নিজের মোবাইল দিয়ে টেবিলে চাপা দিয়ে চা*কু দিয়ে নিজের হাত কেঁটে ফেলে। র*ক্ত ঝরতে ঝরতে একটা সময় জ্ঞান হারায় সে।
এদিকে ইবনাতের পাঠানো কল রেকর্ড অনিলের সাথে মীম ও শোনে। কেঁপে ওঠে ওরা মৌনতার কথা ভেবে। অনিল মীমকে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে সুখ নীড়ে যায়। দুই বাড়ির দূরত্ব কন হওয়ায় দশ মিনিটের মধ্যে মৌনতার রুমের দরজায় ঠকঠক করে মীম। কিন্তু খোলে না তা। ততক্ষণে সুখ নীড়ে হাজির হয় ফেম স্টারস এর বাকিরাও। এমনকি ইবনাত নিজেও। হামিদুর রহমান ছিলেন ডিউটিতে। তাকেও কল রেকর্ড পাঠিয়ে দেয় অনিল।
মৌনতা দরজা না খুললে চিন্তায় পাগল হয়ে যায় মীম। অনিল আর তাহমিদ মিলে দরজা ভেঙে রুমের ভিতর যেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় সবাই। মৌ বলে এক চিৎকার দিয়ে মেঝেতে বসে মৌনতার মাথা নিজ উরুতে নিয়ে কেঁদে ওঠে মীম। এই শক্তপোক্ত মেয়েকে আবারও কাঁদতে দেখে অনিল। তবে তাকে শান্ত করার চেয়েও এখন মৌনতাকে বাঁচানো অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অনিল মৌকে কোলে নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। সাথে যায় অন্যরাও। ইবনাতের শরীর মৌনতাকে এভাবে দেখার পরেই অসার হয়ে গিয়েছে। সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রনি তাকে ধরে নিয়ে যায়।
মৌনতা বেঁচে গেলেও অনেক র*ক্ত বের হওয়ার জন্য তিন ঘন্টা অজ্ঞান ছিল। হামিদুর রহমান সেনানিবাস থেকে সরাসরি হাসপাতালে চলে এসেছেন। তাই পরনে এখনো তার ইউনিফর্ম। সকলের পরিচিত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নয় এক সন্তান হারাতে বসা বাবার রুপে স্তব্ধ ফেম স্টারস। অনিল, তাহমিদ, ইবনাতের কাছে তাদের সেনানায়ক তাদের জীবনের অন্যতম মডেল। তার এই ভেঙে পড়া অবস্থা তারা কিছুতেই দেখতে পারছে না।
তখন মৌনতার রুমে টেবিলের উপর একটা কাগজ চোখে পড়ায় তা হাতে নিয়েই হাসপাতালে এসেছে সাদাফ। ওই কাগজটা হাতে নির্জীব হয়ে বসে আছেন হামিদুর রহমান। ইবনাত সহ্য করতে না পেরে তার সামনে যেয়ে বলে,
~আমিই সে যার কথা আপনার মেয়ে এই চিঠিতে উল্লেখ করেছে। আমাকে শাস্তি দিন স্যার।
কিছুই বলে না হামিদুর রহমান। শুধু কান্না আটকে রাখা লাল চোখে একবার তাঁকায় ইবনাতের পানে।
মৌনতা সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফেরে। সুখ নীড়ের ড্রয়িং রুমে বসে আছে উসমান শাহরিয়ার, ফেম স্টারস, হামিদুর রহমান আর মীম।
উসমান শাহরিয়ার,
~দেখো হামিদ, তোমাদের সাথে বহু পুরনো বন্ধুত্ব আমাদের। সেই সুবাদে বলো আর এই দূর্ঘটনার জন্যই বলো আমি তোমার মেয়ে মৌনতাকে আমার নাতির জন্য চাইতে এসেছি।
হামিদুর রহমান,
~আমার মেয়ের বায়োলজিকাল বাবা যে এই বাড়ির ড্রাইভার ছিলো জানেন কি? শাহরিয়ার গ্রুপের উত্তরাধিকারের ওয়াইফ হওয়ার জন্য এই সামান্য একটা পরিচয় নিয়ে যে আপনারা কোনো ঝামেলা করবেন না তা কিভাবে জানবো? আমি আমার মেয়েদের সুখী দেখতে চাই। যেকোনো কিছুর মুল্যে আমার সন্তানরা ভালো থাকুক এটাই আমার চাওয়া।
উসমান শাহরিয়ার,
~তুমি আমাকে বহু বছর ধরে চেনো হামিদ।
হামিদুর রহমান,
~সমস্যা এখানেই চাচা। আমি আপনার ছেলেকেও বহু বছর ধরে চিনি।
উসমান শাহরিয়ার,
~ইবনাত তার বাবার মতো নয়।
হামিদুর রহমান,
~আপনার নাতি যদি বাবার মতো হয় আমি হামিদুর রহমান নিজ হাতে আমার মৌনতাকে কেঁটে নদীতে ভাসিয়ে দেবো তবুও আপনার নাতির হাতে তুলে দেবো না চাচা।
অনিল,
~ইবনাত মৌয়ের সাথে কখনো কোন অন্যায় করবে না স্যার। আমি অনিল কথা দিচ্ছি।
হামিদুর রহমান,
~আমি তোমাকে চিনি ডক্টর শাহরিয়ার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমি তোমার বাবাকেও চিনি। তুমি যে তার মতো হবে না সেই কথা দিতে পারবে তুমি? আমার মৌ আমার কাছে বোঝা নয় শাহরিয়ার। নুসরাত শাহরিয়ার এর চাল ভেস্তে দিতে আমার সময় লাগবে না।
ইবনাত,
~আমি মৌকে ভালোবাসি এই মিথ্যা বলবো না স্যার। আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তবে সে নেই। এই দূর্ঘটনা না ঘটলে আমার এই জীবনে অন্যকারো অস্তিত্ব আমি চিন্তাও করতে পারতাম না। তবে যা হয়েছে তারপর মৌয়ের এই বোকামি, সবমিলিয়ে আমি ইবনাত শাহরিয়ার আপনার মেয়ে মৌকে বিয়ে করতে চাইছি। কথা দিচ্ছি পপ্রাণ থাকতে দায়িত্বে অবহেলা করবো না। আর যদি কখনো আপনার মনে হয় আমি আপনার মেয়েকে ভালো রাখতে পারছি না তবে আপনি যে শাস্তি দেবেন তা মাথা পেতে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবো।
মীম,
~বিবাহিত সম্পর্কে কি শুধুই দায়িত্ব থাকে ইবনাত ভাই? ভালোবাসার কি হবে? আপনি তো মৌকে ভালোবাসেন না। আর নাতো মৌ আপনাকে। তবে?
ইবনাত,
~তুমি অনিলকে ভালোবাসো মীম?
মীম চুপ হয়ে গিয়েছে। অনিল তাকায় নিজ স্ত্রী পানে।
ইবনাত,
~তোমরা কি বিয়ে করো নি? সবকিছুর জন্য সময় প্রয়োজন।
হামিদুর রহমান,
~মৌকে নিয়ে এসো মীম।
মীম মৌকে এনে হামিদুর রহমানের পাশে বসাতেই,
হামিদুর রহমান,
~নিজের রগ কেঁটে আমাকে প্রচন্ড কষ্ট দিয়েছো তুমি। এখন আমার চাওয়া তোমার আর ডক্টর শাহরিয়ারের বিয়ে হোক। আজ এবং এখন।
মৌনতা,
~যার উপর কোনো অনুভূতি কখনো কাজ করেনি তাকে কি বিয়ে করা যায় বড় পাপা?
হামিদুর রহমান,
~যায়। মনে করো তোমাদের এরেঞ্জ ম্যারেজ।
ওই রাতেই আকঁদ হয় তাদের। আকঁদের পরে অবশ্য যে যার বাড়িতেই থাকছে কারণ এখনো ইবনাতের কাছে তুলে নেয়নি মৌনতাকে। এরজন্য সময় দেওয়া হয়েছে দুজনের মধ্যে এই অসস্তি দূর করার।❞
মৌয়ের এসব ভাবনার মাঝেই ইবনাতের কল আসে।
~পৌঁছেছো?
~জ্বি।
~কাল দেখা করতে পারবে।
~হ্যা পারবো।
~আচ্ছা ঘুমাও
~আচ্ছা।
..
..
..
চলবে_____
(এই পর্বে ইবনাত আর মৌনতার ব্যাপারটা ক্লিয়ার করতে করতেই ২১০০+ এতো শব্দ হয়েছে। তাই আর কিছু লিখলাম না। তনুকে পরের পর্বে পাবেন। ওই পর্ব হতে চলেছে তনু ময়।

