#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৩৭ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________________
জালাল সাহেব রাজউকের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। সেই সাথেই পিতৃসূত্রে পাওয়া অনেক সম্পত্তির মালিক সে। ঢাকা শহরে অনেক পুরনো আমলের মানুষ তারা। সেভাবেই তার বাবা ছিলেন ঢাকায় বিশাল সম্পত্তির মালিক।
একমাত্র মেয়ের কোন শখ কখনো অপূর্ণ রাখেননি তিনি। তনুর শখ জাগলো নিজের বাড়িতে সুইমিং পুল থাকবে তার। তাইতো জালাল সাহেব তার মিরপুরের দুইটা দশতলা বাড়ি বিক্রি করে উত্তরাতে একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি করেন। সেই বাড়ির ছাদে তনুর জন্য একটা সুইমিং পুল বানানো হয়। ছাদ এমন ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে এই পুলে কেউ নামলে তা বাইরে থেকে দেখা যাবে না। সেই বাড়িতেই স্ত্রী কন্যা নিয়ে বসবাস এখন জালাল সাহেবের।
রাত পার হয়েছে এগারোটা। তনু পুলের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিজের গায়ের সাদা আলখাল্লার মতো পোশাকের ফিতার সাহায্যে তা খুলে পাশেই পুলের কিনারায় রাখে। তারপর নিজের পরা সুইমিং স্যুটে পুলে ঝাপ দেয়। কিন্তু এখন আর ভার্সিটির মতো ডুবে যাচ্ছে না সে। বরং পুরো পুল জুড়ে সাতার কেঁটে বেড়াচ্ছে নির্বিঘ্নে।
মূলত প্রচুর রেগে আছে তনু। রেগে থাকলেই সে সুইমিং করে বেশিরভাগ সময়। এই সুইমিং তার বেশ শখেরও। ছোটবেলাতেই বাবার কাছে সাতার শিখেছিল। একবার নানাবাড়ি ফেনীতে বেড়াতে যেয়ে নানাদের পুকুরেই সাতার শেখা তার।
আজ শান্তশিষ্ট তনুর রাগের কারণ ভার্সিটির জুনিয়র একটা ছেলে। সে প্ল্যান করে তখন একটা ছেলের সাথে ধাক্কা খাওয়ার নাটক করে পুলে পড়েছিল। অনিল ভাই তাকে বাঁচাবে সেই ইচ্ছা ছিলো তার। অথচ তার সমস্ত ইচ্ছেতে পানি ঢেলে সেই জুনিয়র ছেলেই তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে দীঘিতে। অনিল আসতো সেই সময় পর্যন্ত দেয়নি ওই ছেলে। এতো রাগ হয়েছিল তনুর! কিন্তু সকলের সামনে তাই ওই ছেলের সাহায্যেই তাকে উঠতে হয়েছিলো। পানি থেকে তুলে সরি বলতে বলতে পারে না জুনিয়র পা ধরে ফেলে। বাধ্য হয়েই নিজের রাগে পানি ঢেলে তখন সেই ছেলেকে ইটস ওকে বলে দিতে হয়েছিল। না হলে রাগের মাথায় তনু তাকে থা*প্প*ড় মেরে দিতেও দ্বিধাবোধ করতো না।
আবার তাকে জুনিয়র ছেলেটা দীঘির পানি থেকে উঠাতেই আরেক জনদরদি মীম এসে তাকে নিজের ওড়না জড়িয়ে দেয়। এখানেও তনুর ইচ্ছা ছিলো অনিল ভাইয়ের টি-শার্ট এর উপর পরা কালো শার্টটা তার গায়ে জড়ানোর। এই দুই ষ্টুপিড তার সব কষ্ট মাটি করে দিয়েছে। মীমকে তনু এমনিতেই দেখতে পারেনা। এই মেয়েকে তার কাছে চলতি ফিরতি অ্যাটিটিউড এর দোকান মনে হয়। এমন ভাবে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে চলে মনে হয় অন্য কাউকে সে পাত্তাই দেয় না। ওই মেয়ের চলাফেরায় এই অল্পদিনেই পুরো ভার্সিটি কেমন আকর্ষণ করে ফেলে। আজকাল ভার্সিটির সকল কোনায় কানায় আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে মাশফিয়া রহমান মীম। আর এসব প্রচুর বিরক্ত লাগে তনুর। কিন্তু তার গ্রুপের সাথে অনিলের বন্ধুরাও আবার এই মেয়েকে মাথায় তুলে রাখে। নিজের ক্লিন আর চুপচাপ লক্ষী ইমেজ রক্ষায় তনু কিছু বলতেও পারে না। না হলে এই মীম আর ওর বান্ধবী মৌনতাকে কবেই তাদের আশেপাশের থেকে দূরে সরিয়ে দিতো সে!
মাঝে মাঝে যে অনিল ভাইয়ের সাথে কথা কাটাকাটি হয় মীমের তাও সহ্য না তনুর। কখনো অনিল ভাই ভুল করেও মীমের দিকে তাকালে নিজেকে সামলাতে কষ্ট হয় তার। শুধু মীম নয় অন্য যেকোনো মেয়েকেই অনিল ভাইয়ের সাথে সহ্য করতে পারে না সে। এমনকি ওইদিন তার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী চিত্রাকে দেখেছিল অনিল ভাইয়ের সাথে কথা বলতে। কি যে রাগ হয়েছিল সেদিন তার চিত্রার উপর!
এই অনিল আবরার তার আসক্তি হয়ে গিয়েছে। ভয়ংকর আসক্তি। ভালোবাসার গণ্ডি পেরিয়েছে অনিলের প্রতি তনিমার এই আসক্তি। অনিল ভাইকে তনুর চাই। চাই মানে চাই।
.
.
.
.
তনু পুল থেকে উঠে কাপড় বদলে আবারও সাদামাটা সেই থ্রিপিস পরে নিজের ঘরে যায়। পড়াশোনা করতে হবে তাকে। ফাইনাল টার্মের আর বেশিদিন বাকি নেই। এখন লেখাপড়ায় অবহেলা করলে টপার হওয়ার অহং ভাঙতে সময় লাগবে না। বই নিয়ে নিজের টেবিলে বসলেও কিছুতেই সে বইয়ে মনযোগ দিতে পারছে না। বারে বারে অনিলের কথা মাথায় আসছে। বিরক্ত তনু। চরম বিরক্ত।
না পেরে নিজেই নিজেকে শাসিয়ে বলে,
“উফফো তনুউউউউউউ! নিজেকে একটু সামলা। যে ব্যক্তি মনে আছে তাকে মনে রাখ। এখন দয়া করে তার বিচরণ তোর ব্রেইনে হতে দিস না। তোর পরীক্ষা সামনে পড়তে বস। না হলে তোর এতো তিলে তিলে গড়া রেপুটেশনে ফাটল ধরলো বলে।”
অথচ তার মুখে বলা কথা তার মন, ব্রেইন কেউই মানলো না। তারা সেই অনিল আবরারকে নিয়েই পড়ে আছে। বিরক্ত হয়ে তনু বই রেখে বিছানায় যেয়ে শুয়ে পড়ে নিজের ফোন হাতে নেয়। গ্যালারির গোপন ফোল্ডার লক খুলে ওপেন করতেই বেরিয়ে পড়ে তার লুকিয়ে লুকিয়ে তোলা অনিলের হাজারো ছবি। সেই ছবি দেখেই তো আজকাল দিন কাটিয়ে দেয় সে।
তনু যখন অনিলের ছবি দেখে নিজের মনের অস্থিরতা দূর করতে ব্যস্ত ঠিক তখনই তার ফোনে তার বন্ধু অয়নের কল আসে। কথা বলে চোখ বন্ধ করে বালিশে মাথা এলিয়ে দেয় তনু।
অয়ন যা বললো তা কোনো ভালো ইঙ্গিত নয়। তনু ভেবে পায়না সে আর কতো দিক সামলাবে। কিভাবে কি করবে! আবার সামনের মাসেই তার ফাইনাল টার্ম। আবার অনিল! উফফ পাগল হয়ে যাওয়াই এখন বাকি আছে তার। এছাড়া বাকি সব কমপ্লিট।
এদিকে জালাল সাহেবের শরীর তেমন ভালো না। তার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। প্রথম স্টেজে আছে তাই চিকিৎসা করে ঠিক হওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই চিকিৎসা করার জন্য পাড়ি জমাতে হবে দেশের বাইরে। সবকিছু ঠিক থাকলে তনুর পরীক্ষার পরেই বাবা মাকে নিয়ে সে পাড়ি জমাবে বাবার চিকিৎসার জন্য।
তনুর মনে পড়ে সেদিনের ঘটনা যেদিন জানতে পারে তার বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত।
-প্রায় প্রায় অসুস্থ হয়ে যেতো জালাল সাহেব। তাকে নিয়ে চেকাপের জন্য গিয়েছিল তনু। তারপর বিভিন্ন পরীক্ষা করে জানতে পারে জালাল সাহেব ক্যান্সারে আক্রান্ত। বাবা মায়ের সামনে শক্ত থাকলেও কি ভিষণ ভেঙে পড়েছিল তনু তা শুধু সেই জানে।
সেদিন সে অনিলকে একটা ম্যাসেজ করেছিল,
‘আমার সাথে একটু দেখা করতে পারবেন অনিল ভাই?’
সাথে সাথেই কোনো ফিরতি ম্যাসেজ আসেনি। তনু জানতো আসবেও না। সে যে ব্যস্ত ভীষণ। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে ম্যাসেজের পরিবর্তে এসেছিল অনিল আবরারের কল। তনুর মন খারাপের মাঝেও শত ডানার প্রজাপতি হওয়ার অনুভূতি অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিল শুধুমাত্র ওই একটা কলেই।
~হ্যালো তনু কি হয়েছে?
~কি..কিছু না অনিল ভাই।
~দেখা করার কথা বললে যে?
~সময় না থাকলে ঠিক আছে লাগবে না।
অনিলকি তবে বুঝলো প্রচন্ড মন খারাপ তার। কিছু সময় নিরবতা। হয়তো সেই মানব ভাবছে কিছু। তারপর সে বললো,
~উমমম তুমি আমাকে ঠিকানা টেক্সট করে দাও তনু। একটু অপেক্ষা করো। আমি হাতের কাজ শেষ করে আসছি।
অপেক্ষা…..
মহামূল্যবান একটা শব্দ। অপেক্ষাই তো করছে তনু। এই অপেক্ষার শেষ কোথায় তাও জানা নেই তার। কবে হবে তার এই অপেক্ষার সমাপ্তি? কবে সে পাবে অনিল আবরারকে? কবে পাবে তার ভালোবাসার পূর্ণতা? তার আসক্তির পূর্ণতা? তার এই ছোট জীবনের পূর্ণতা? এই সব প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় তো করছে তনিমা।
কবে মিলবে এসবের উত্তর?
..
..
..
চলবে_____

