প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ৪৩

0
17

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৪৩
___________________________

‘সেন্ট্রাল হাসপাতাল’ চট্টগ্রাম। রাত ৩.৪৫ মিনিট।
অনিলের মাথায় আর ডান বাহু সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো। আর্মি ছাটের চুলগুলো সামান্য একটু বড় হয়েছে। তাতেই যেন সৌম্যদর্শন পুরুষের সৌন্দর্য ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। ডার্ক ব্রাউন চোখ জোড়ার সাদা আংশ র*ক্তি*ম হউএ গিয়েছে ইতোমধ্যেই। আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে আছে অনিল। আর আইসিইউতে মীম। অনিলের পাশেই দাঁড়িয়ে শাহমীর দেওয়ান। শাহমীর অবাক হয়ে সমবয়সী ভাইয়ের উন্মাদনা দেখছে রাত থেকে। তখনকার জঙ্গলের সেই অনিলের কথা মনে পড়লেই শাহমীরের মতো শক্তপোক্ত পুরুষের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে।

তখন শাহমীর লোকেশন অনুযায়ী যেয়ে দেখে অনিলের দিকে পি*স্ত*ল তাক করে গু*লি ছুড়ছে। কোন কিছু না ভেবেই শাহমীর তার পায়ের কাছে থাকা মোটা গাছের ডাল ছুড়ে মারে সেদিকে। ডাল যেয়ে সেই লোকের হাতের পি*স্ত*ল ফেলে দিলেও সেই একই ডাল ছিটকে যেয়ে মীমের মাথায় লাগে। মীম সেখানেই পড়ে যায়। এটা খুবই দূর্ভাগ্যবশত ঘটে যায়।
ওই অন্ধকারে অনিল ভেবেছিল যে মীমের গু*লি লেগেছে। তাকে বাঁচাতে যেয়ে মেয়েটা…..
মীম সেন্সলেস হওয়ার পরেই অনিল উন্মাদের মতো করতে থাকে। শাহমীর অবাক হয়ে দেখে। চেতনাহীন মীমকে বুকে জড়িয়ে সে কি আহাজারি!
তখনই শাহমীরের টীম ও এসে যায়। তারা ধরে দুইজনকেই হাসপাতালে নিয়ে আসে। মীমকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলেও অনিলকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলো না শাহমীর। এদিকে বেশি রাত হওয়ায় শাহমীর তার বাড়ির কাউকে আর ডাকে না। মাঝে ডাক্তার বের হয়ে বলে যে মীমের জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু প্রচন্ড মাথা যন্ত্রণায় ছটফট করছে দেখে তাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে। চারঘন্টা পর উঠবে। তারপর অনিলকে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়েছে।

এদিকে শাহমীর নিজের লোক দিয়ে গু*ন্ডাগুলোকে নিজের গোপন গোডাউনে পাঠিয়েছে। এদের ব্যবস্থা এবার মেজর করবে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শাহমীর হাত রাখে অনিলের কাঁধে।

“ভাবি ঠিক আছে ভাই। এখন তুই একটু রেস্ট কর। অন্তত বসতে তো পারিস। তাওর নিজেরই কিন্তু অনেক আঘাত লেগেছে অনিল।”

“মেয়েটা একদম আমার কথা ভাবে না। আমার কথা শোনেও না। নিজের মর্জি মতোই চলা লাগবে তার। বারবার নিজে বিপদ ডেকে আনবে। কিভাবে পারলো বলতো ভাই?
আমার কথা মনে হলো না তার? যদি.. যদি ওর কিছু হয়ে যেতে কি করতাম আমি? কিভাবে বাঁচতাম?”

শাহমীর কেন জানি মুচকি হেসে ফেলে। অনিল তা দেখার আগেই আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে ফেলে। এরপর নিজের মধ্যে প্রচন্ড সিরিয়াস ভাব এনে সরাসরি অনিলের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

“ভালোবাসিস?”

অনিল ও শাহমীরের সাদা সাদা বিড়াল চোখে তাকিয়ে আছে। সেভাভেই চোখে চোখ রেখেই বলে,

“প্রচন্ড।”

“তোদের বিয়ের তো দুইমাস মতো হবে হয়তোবা। শুনেছি চেনাজানাও বেশি দিনের নয়। এতো অল্প সময়েই এভাবে ভালোবাসা যায় বুঝি?”

অনিল এবার চোখ সরিয়ে নিয়ে আইসিইউর কাঁচের দেয়ালে হাত রাখে। মীমের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে,

“ভালোবাসা দিনক্ষণ বা সময় দেখে হয়না। ভালোবাসা একটা অসামান্য অনুভূতি। এই অনুভূতি কাউকে একপল দেখেই হতে পারে। আবার কারো সাথে একজীবন পার করার পরেও নাও হতে পারে। এই অনুভূতি একটা হৃদয়ের তারতম্য। এখানে ব্রেইন কোনো কাজে আসে না। কখনো কেউ বুঝে শুনে প্ল্যান করে ভালোবাসতে পারে না। ব্রেইনের অজান্তেই মন কাউকে দেখে এই অনুভূতির সম্মুখীন হয়।”

“তো তুই তাকে প্রথম দেখেই ভালোবেসেছিস!”

“হয়তো। হয়তোবা না। তখন কিছু একটা অনুভব করেছিলাম। কিন্তু এই অনুভূতির নাম দেওয়ার মতো যোগ্য ছিলাম না।”

“তো কবে থেকে তুই ভাবির প্রেমের মাতোয়ারা মি. অনিল আবরার খান?”

ভুবন ভোলানো হাসি ফোটে অনিলের ঠোঁটে। যেন জীবনের সেরা কিছুর স্মরণ করছে সে। ওভাবেই হাসি মুখে শাহমীরের হাত উঁচু করে তার ঘরির দিকে তাকিয়ে বলে,

“দশ বছর এগারো মাস সাতাশ দিন ঊনিশ ঘন্টা একুশ মিনিট।”

শাহমীর যেন কিভাবে কি, কবে, কখন, কোথায় সবকিছু জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেলো। ড্যাবড্যাব করে শুধু অনিলের হাস্যরত মুখের দিকে তাকিয়েই থাকলো।
.
.
.
.
ইবনাতের কল পেয়ে অনিচ্ছা স্বত্তেও ধানমন্ডির একটা ক্যাফেতে এসেছে মৌনতা। সেই রাতের ঘটনা তারপর এই বিয়ে আর শাহরিয়ারদের পার্টির পর আর না দেখা হয়েছে দুজনের আর না কথা। দুজন আগের মতো যে যার বাড়িতে নিজের মতো থাকছে। তাদের যে একটা সম্পর্কে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তার কোনো নাম নিশানা নেই। যেন দুজনেই দুজনকে অদেখা উপেক্ষা করে চলেছে। কিন্তু আজ সকালেই ইবনাতের কল আসে মৌনতার ফোনে। ধরবে না ধরবে না করেও ভদ্রতা দেখাতে রিসিভ করে সে।

“হ্যালো।”

“জ..জ্বি বলুন।”

“বিকালে ফ্রি আছো?”

“হ্যা। কিন্তু আপনি কেন জিজ্ঞেস করছেন?”

“চারটায় দেখা করো। আমি ঠিকানা ম্যাসেজ করে দিচ্ছি।”

“কিন্তু বলা নেই কওয়া নেই আমি আপনার সাথে দেখা করতে যাবো কিসের জন্য?”

“তোমার বর ডেকেছে সেইজন্য।”

কল কেঁটে দেয় ইবনাত। অথচ তার কথায় মৌ একদম বরফের মতো জমে গিয়েছে। কি বললো লোকটা? বর?
এতো অধিকার কিভাবে কোথায় পাচ্ছে লোকটা?

আসবে না আসবে না করেও এসেছে মৌ। কারণ যত যা কিছুই হোক এই বিয়ে তো সে অস্বীকার করতে পারবে না। তাছাড়া বড় পাপা চাইছে ইবনাতের সাথে তার সম্পর্ক ঠিক হোক।

ক্যাফেতে দশ মিনিটের মতো বসে আছে মৌ। বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে রেখেছে। আজ এই লোক এলে বেশ কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দেবে বলে মনস্থির করে। এরমধ্যেই চোখ যায় ক্যাফের কাঁচের দেয়ালের বাইরে। সেকেন্ড ফ্লোরে আছে মৌ। সে দেখে ইবনাত নিচে গাড়ি পার্ক করে দৌড়ে দৌড়ে উপরে আসছে। ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা হালকা ল্যাভেন্ডার কালার শার্ট আর শুকিয়ে যাওয়া মুখ দেখেই সে ইচ্ছা মাটিচাপা দেয় মৌ। লোকটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাত্রই অফিস থেকে বেরিয়েছে।

“স্যরি মৌ। লেট করার জন্য আ’ম এক্সট্রেমলি স্যরি। আসলে বের হয়েই যাচ্ছিলাম তখনই একটা রিপোর্ট সাবমিট করার জন্য রিকোয়েস্ট করে। তাই না করতে পারিনি।”

“ইটস ওকে। আপনি বসুন।”

ইবনাতের চোখে পড়ে মৌ তার দিকে না তাকিয়েই কথা বলছে। চোখ তার নিচের দিকে। এই অস্বস্তির কারণ জানা আছে ইবনাতের। তাইতো আজ এই মিটিং। সে বড় মুখ করে সবার সামনে বলেছে সে মৌকে ভালো রাখবে। ভালো নাই বাসতে পারুক এই মেয়েটার প্রতি দায়িত্ব পালনে কোন হেলাফেলা করবে না সে। কখনো মেয়েটাকে কষ্ট দিবে না। এভাবেই না হয় এই জীবন পার হোক। এভাবে থাকতে থাকতে ভালোবাসা নাই হোক মায়া তো জন্মাবে একে অপরের জন্য। তারা না হয় সেই মায়া নিয়েই জীবন পার করে দিবে।
এসব ভাবতে ভাবতে বসে বলে,

“কি খাবে মৌ?”

“উম কোল্ড মকা।”

“ওখেই।”

ইবনাত যেয়ে মৌয়ের জন্য একটা কোল্ড মকা আর নিজের জন্য একটা আইসড ব্ল্যাক কফি অর্ডার করে আসে। তারপর আবারও মৌয়ের সামনে বসে। মৌয়ের মুখের দিকে তাকায়। এর আগে কখনোই সে খেয়াল করেনি। অথচ আজ দেখলো মেয়েটা চোখ ধাঁধানো সুন্দরী। ইবনাত তার জীবনে হয়তো এতো সুন্দরী কোনো মেয়েকে দেখেনি। তার তুরিন তো তার চোখে অনন্যা ছিলো। কিন্তু তার সামনে বসে থাকা মৌনতা বোধহয় সকলের চোখেই অনন্যা। হাজার লোকের ভীড়ে থাকলেও তাকে আলাদা করা সম্ভব। ঠিক ওই সময়টাতেই ক্যাফের মিউজিক সিস্টেমে আগের গান চেঞ্জ হয়ে বেজে ওঠে,

❝হাজার লোকের ভীড়ে অনন্যা
সেই মেয়েটি আমার।❞

তাচ্ছিল্য হাসে ইবনাত। হ্যা তারই তো। জোর করে জুড়ে দেওয়া নয় সে নিজ ইচ্ছেতে এই মেয়েকে নিজের জীবনে জড়িয়েছে। সেই রাতের ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে সে কিভাবে মেরুদণ্ডহীনের মতো ওই মেয়েকে ছেড়ে দিবে? যেখানে সে এক নিঃস্ব মানুষ, তার এই জীবন না হয় এই মৌনতা শেখের নামে কুরবান।

“আমাদের এই বিয়ে নিয়ে তোমার মতামত কি মৌ?”

তড়িৎ বেগে চোখ তুলে ইবনাতের দিকে তাকায় মৌ।

“ম..মানে?”

“আমাদের বিয়ে হয়েছে মৌ। সারাজীবন একসাথে থাকতে হবে। সো প্লিজ বি ইজি উইধ মি।”

“আপনি মানেন এই বিয়ে? থাকবেন আমার সাথে সারাজীবন?”

ইবনাত জানে এই সন্দেহের কারণ। তাই সে মাথা উপর নিচ করে হ্যা বলে।

মৌ আবারও বলে,

“ভেবে বলছেন তো ইবনাত? নাকি সেই রাতের জন্য দয়া দেখাচ্ছেন? দেখুন আমাকে দয়া দেখাতে হবে না। আমি এতোটাও অবলা নই। বড় পাপা আমাদের একা একা সার্ভাইব করা শিখিয়েছেন। তাছাড়া সেই রাতে একা আপনার দোষ ছিল না ইবনাত। আমিও সমান ভাবে দায়ী। তাই প্লিজ নিজের উপর জোর করা বন্ধ করুন। যা যেভাবে আছে সেভাবেই থাকতে দিন।”

“বিয়ে হয়েছে মৌ। তুমি মানো না এই বিয়ে?”

কোন ভণিতা ছাড়া মৌ স্বীকার করে,

“মানি। আমি এই বিয়ে মানি। আর আপনাকেও মানি। আর সেই জন্যই চাই আপনি আমার উপর করুণা না করেন।”

“আমি এতটা উদার মনের নয় মেয়ে। তোমাকে জোর করে এই বিয়ে দিয়েছে তোলা বড় পাপা। কিন্তু আমাকে না। আমি নিজে ইচ্ছাতে তোমাকে বিয়ে করেছি। অনেক তো হলো একা থাকা এবার না হয় কেউ আসুক আমার জীবনে। আমার শুন্য বাসায় তার কথার ফুলঝুরি ফুটুক। আমার একা জীবনে আমার চারটা ভাই ছাড়াও কেই দখলদারি করুক।কেউ অপেক্ষা করুক আমার জন্য খাবার নিয়ে। কেউ আমার উপর আবদার করুক তার এটা চাই ওটা চাই। কেউ মাঝে মাঝে ঝগড়া করুক।”

চকিত চেয়ে আছে মৌ।

“আপনি ভেবে বলছেন তো ইবনাত?”

“অনেক ভেবে বলছি। সম্পূর্ণ স্বজ্ঞানে বলছি।”

“…….”

“আমি আমার জীবন নিয়ে তোমাকে কিছু বলতে চাই মৌ। শুনবে?”

ঘাড় নাড়িয়ে হ্যা বলে মৌ।

“আমার যখন এগারো বছর বয়স তখন আমার আম্মু মা*রা যায়। আমার বাবার বর্তমান যে স্ত্রী তার সাথে বাবার এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার গড়ে ওঠে। তিনি বাবার অফিসের সাধারণ একজন কর্মচারী ছিলেন। কিভাবে বাবা আর তার এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা আমার জানা নেই। তবে সেই খবর জেনে আমার আম্মু ভেঙে পড়ে। বলা বাহুল্য আমার আম্মু তখন সাত মাসের প্রেগন্যান্ট ছিলো যখন জানতে পারে এই ঘটনা। বাবা হুট করে সেই মহিলাকে বিয়ে করে নিয়ে আসেন বাড়িতে। আম্মু সেদিন ওই ধাক্কা সহ্য করতে পারেনি। স্ট্রো*ক করে বসে। দাদু আর আমি মিলে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে আমার অনাগত ভাই বা বোন সহ আম্মু আমাকে একা করে চলে যায়।
তারপর থেকে আমার বাবাকে মনে প্রাণে ঘৃ*ণা করি আমি। তারপর দুইবছর আমি আর দাদু সেই বাড়িতেই থাকি। আমার উপর অমানবিক অত্যাচার করতো সেই মহিলা। কতবার যে মে*রে ফেলার চেষ্টা করেছে তা আর না বলি। কাউকেই কিছু বলতাম না। পরে দাদু বুঝে ফেলে বাবাকে উত্তরাধিকার হওয়া থেকে বঞ্চিত করে। বিশ্বাস কর মৌ আমার বাবার জন্য একটুও কষ্ট হয়নি। ইনায়েত জন্মায়। ওই মহিলা নিজের মেয়েকেও ছাড়েনি। সে ছেলে চেয়েছিলেন যাতে সম্পদের অধিক অধিকার পান। তবে হলো মেয়ে। দুধের বাচ্চাকে মারধর করতেন। একদিন তো ইনায়েত কাঁদছিল বলে তিনমাসের বাচ্চাকে বিছা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। আমি আর দাদু দেখে নিয়েছিলাম সেদিন। দাদু উইল করে ইনায়েত শাহরিয়ারদের একুশ পারসেন্ট পাবে ওর বয়স একুশ বছর হলে। কিন্তু এর আগে যদি ওর কোন ক্ষতি হয় তাহলে সে সম্পদ যাবে ট্রাস্টে আর ইনায়েত এর বাবা মা শাহরিয়ারদের এক বিন্দু সম্পদ পাবে না। সেভাবেই ওকে সেইভ করা হয়। আর আমি চলে যাই ক্যাডেটে। তারপর দাদুই প্ল্যান করে আমেরিকার একটা অফিসের দায়িত্ব দিয়ে আমার বাবা আর তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে সেখানে পাঠিয়ে দেন যাতে আমি বাঁচতে পারি। আর কয়েকবছর পর দাদু অসুস্থ হয়ে গেলে চিকিৎসার জন্য আমেরিকা থাকা শুরু করে।
এই সময়ে আমাকে আমার ভাই গুলো সামলে নিয়েছে। তবে আমার কিশোর মনে কেউ কব্জা করে বসে।

প্রথমবারের মতো তাহমিদের ছোট বোন তুরিনকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সে কি পাগলামি যে করেছি ওর জন্য!
আমার পাগলামির কাছে হার মেনে তুরিন সহ ওর ফ্যামিলি আর আমার দাদু মেনে নেয়। এভাবেই কাঁটে সময়। পারিবারিক ভাবে আমাদের আংটিবদল হয়েছিলো। সবকিছু ভালো ভাবেই চলছিল।

কিন্তু আল্লাহর হয়তো আমার সুখে থাকা পছন্দ হয়নি। তাইতো একদিন ঝড় ওঠে। একটা লা*শ আমার সামনে রেখে বলে এটা আমার তুরিন। সে নাকি আমাকে রেখে চলে গিয়েছে। বিশ্বাস করবে মৌ আমিও সেদিন ম*রে গিয়েছিলাম।”

থামে ইবনাত। চোখ বন্ধ করে রেখেছে। এদিকে মৌয়ের চোখের পানি কখন থেকে পড়া শুরু হয়েছে তা জানা নেই তার। একজন এসে তাদের অর্ডার করা কফি দিয়ে যায়। ইবনাত চোখ মেলে কফির স্ট্র তে চুমুক দিয়ে আবারও শুরু করে।

“ওর বডি আমাকে ময়নাতদন্ত করতে দেওয়া হয়নি। আমি নাকি নিজেকে শক্ত রেখে কাজ করতে পারবো না। মেনে নিলাম ডিপার্টমেন্ট এর কথা। কিন্তু মন তো মানলো না। কিছুতেই নিজেকে কনভিন্স করতে পারিনি আম যে তুরিন নেই। মনে মনে খুঁজতে থাকি ওকে। কাউকেই কিছু বলিনি। কিন্তু অনিল বুঝে যায়। আমার সাথে ওর ও নাকি ব্যাপারটায় খটকা লেগেছে। তাই আমার সাথে সেও খোঁজ লাগায়। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হয়নি।

তো সেদিন এর ওই রাতের পরে সকালে ইনায়েত আমাকে ফোন করে জানালো যে আমার সাথে তোমাকে জড়িয়ে কি জঘন্য ষ*ড়*য*ন্ত্র করেছে ওর মা। আমি সবকিছু সামলেই নিয়েছিলাম প্রায় কিন্তু তখনই ইনায়েত আমাকে আরও একটা ভিডিও সেন্ড করে। সেখানে একটা সিসিটিভি ফুটেজ ছিলো তুরিনের মা*রা যাওয়ার খবর পাওয়ার আগের দিন। ওখানে ওই মহিলা ওকে ব্ল্যাকমেইল করছে। আমাকে কোন ভাবে অজ্ঞান করে আমার গলায় চা*কু রেখে ভয় দেখায় ওকে। বোকা তুরিন ফাঁদে পা দেয়। তারপর সবকিছু ওই মহিলার প্ল্যান মোতাবেক এগোয়। তুরিনকে আমার থেকে দূরে করার জন্য ওর মা*রা যাওয়ার নাটক সাজানো হয়। বোকা তুরিন ফাঁদে পা দিয়ে সবাইকে ছেড়ে চলে যায়। আত্মগোপন করে এতোদিন থেকেছে চট্টগ্রামে।”

এই পর্যায়ে মৌ আর চুপ থাকতে পারে না। উত্তেজিত হয়ে বলে,

“কি সে বেঁচে আছে? আর আর আপনি তারপরও আমাকে বিয়ে করেছেন? আচ্ছা বুঝলাম যে বিয়ের পরে জেনেছেন সে বেঁচে আছে। তবে তাকে ফিরিয়ে না এনে আমাকে এসব গল্প শুনিয়ে কি লাভ? ইবনাত প্লিজ চলুন তাকে ফিরিয়ে আনি। আপনি কষ্ট পাচ্ছেন তারজন্য। তার পরিবার কষ্ট পাচ্ছে।”

“তার জন্য কষ্ট পাওয়ার বা তাকে নিয়ে ভাবার যে আর কোন অধিকার নেই আমার।”

“এসব কি বলছেন? দেখুন আমার জন্য এসব করবেন না দয়া করে।”

“তোমাকে বিয়ের আগে থেকেই আমি তার খবর জানি মৌ। তুমি তার আর আমার মাঝে আসোনি। নিজেকে ব্লেম করা বন্ধ করো। বরং তার আর আমার বলতে এখন কিছু নেই। আর না হবে। এখন তুমি আর আমক মিলে আমরা হয়েছি।”

“ইবনাত আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“তুরিন বিবাহিত মৌ।”

“কিহ!”

চিৎকার করে ওঠে মৌ।

“সে এখন মিসেস সাদাফ আদনান।”

“মানে সাদাফ ভাই জেনেশুনে বন্ধুর প্রেমিকাকে বিয়ে করেছে? আর তুরিন ও রাজি হয়েছে?”

“আরে না। গাধাটা এখনো জানেই না যে ও সেদিন যাকে সমাজের কলঙ্ক থেকে বাঁচাতে বিয়ে করেছে সে আর কেউ নয় তুরিন। বিয়ে করে গাধাটা বউয়ের মুখ পর্যন্ত দেখেনি। আর না কথা বলেছে। শুধু নাম দেখেছে বোধহয়। আর তুরিনের পুরো নাম ওর জানার কথাও না। আর তুরিনের দোষ নেই। পরিস্থিতি ওর বিপক্ষে ছিল। তাছাড়া ও যখন বিয়ে করেছে তখন জানতো না যে সাদাফকে বিয়ে করছে। জানলে করতো না আমি শিউর। আমার থেকে পালিয়ে আমারই বন্ধুকে বিয়ে করার মেয়ে সে নয়।”

“আপনি এসব কিভাবে জেনেছেন?”

“অনিল খুঁজে বের করেছে সব। গাধাটাকে এইজন্যই চট্টগ্রাম নিয়ে গিয়েছে। আর নিজেও গিয়েছে সাথে। কারণ যখন জানবে ও তুরিনকে বিয়ে করেছে তখন মানতে পারবে না।”

“আমি যদি খুব ভুল না হই তবে আমাকে বিয়ে করার পিছনে আপনার অনেক গুলো কারণের মাঝে এই কারণটাও আছে যাতে তুরিনের আপনার কাছে ফেরার পথ না থাকে। সাদাফ ভাই যাতে কোনো পাগলামি না করতে পারে। তাদের বিয়ে যাতে ভেঙে না যায়। তাইনা?”

“অস্বীকার করবো না। এই কারণটা ভেবেছি আমি।”

মৌয়ের চোখের পানি আবারও গড়ালো। উহু কষ্ট পেয়ে নয়। স্বামী নামক এই পুরুষের উচ্চ মন মানষিকতা দেখে মুগ্ধ হয়ে।
ইবনাত চেয়ে দেখে সেই চোখের পানি। সে এবার টেবিলের উপর রাখা মৌয়ের ডান হাত টেনে নিজের দু’হাতে আঁকড়ে ধরে বলে,

“তোমাকে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখবো এই কথা দিতে পারছি না। কিন্তু তোমাকে সুখে রাখবো আমি। কখনো কষ্ট পেতে দিবো না। আমার পূর্বের সম্পর্কের সাইড ইফেক্ট আমাদের বিয়েতে পড়তে দেব না। বেস্ট হাসবেন্ড হওয়ার চেষ্টা করবো।
তুরিনকে ভুলে তা বলবো না। তাকে আমি ভুলতে চাইও না। তবে তার চ্যাপ্টার আমি অলরেডি আমার জীবন থেকে ক্লোজ করে দিয়েছি। সেই বই খুব সংগোপনে বুকের একটা কোনায় লুকিয়ে রাখবো। তুমি কি এইটুকু ছাড় দিয়ে আমাকে মেনে নিতে পারবা না মৌ? তোমাকে ভালোবাসার রাস্তাটা নাহয় তুমিই আমাকে দেখিয়ে দিলে! বলো মৌ মানতে পারবে না আমাকে? ফিরিয়ে দেবে খালি হাতে? আমার যে একটা ছোট্ট সুখী পরিবারের ভীষণ লোভ। আর সে সুখী ছোট্ট পরিবারের রাণী হিসেবে তোমাকে কল্পনা করি আমি এখন। সেখানেই যে আর তুরিনের মুখটা ভাসে না চোখ বন্ধ করলে। দিবে আমাকে একটু সুখের খোঁজ মৌ?”

মৌ নিজের অন্যহাত রাখে ইবনাতের হাতের উপর। এই মানুষটাকে সে ফিরিয়ে দেবে এমন সাধ্যি কই তার? না হয় সে একটু কম্প্রোমাইজ করলো। লোকটাকে সুখী করতে পারলে ক্ষতি কি তাতে!
.
.
.
.
রাতে প্রচুর পেটে ব্যথা নিয়ে ছটফট করছে জালাল সাহেব। স্ত্রী মেয়ে কেমন পাগল পাগল হয়ে উঠেছে। ডাক্তার ডাকা হয় ওই রাতে। ডাক্তার এসে সাময়িক ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে যায়। এছাড়া কিইবা করবেন লাস্ট স্টেজের ক্যা*ন্সার পেশেন্টের সাথে।
ব্যথা কিছুটা কমে যেতেই স্ত্রীকে কিছু খাওয়ার কথা বলে রুম থেকে বাইরে বের করেন জালাল সাহেব। এখন রুমে শুধু সে আর তনু।
তনু কেঁদেকুটে অস্থির। বাবার পেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। জালাল সাহেব পরম আবেশে হাত বাড়িয়ে মেয়েকে বুকে ডাকেন। তনু বাবার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে। জালাল সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

কথা বলতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। তবুও এখন না বললেই নয়। তাই জালাল সাহেব বহু কষ্টে কথা বের করেন।

“তনুউউউউ..”

“বাবা এই এইতো আমি।”

“তুমি আমার অনেক আদরের। আমার সাত রাজার ধন। যখন মুখে কিছু উচ্চারণ করেছো আমি যেভাবেই হোক তোমার সামনে হাজির করেছি। যেখানে যেতে চেয়েছো নিয়ে গিয়েছি। যা বলেছো তাই করেছি। তোমার কি কখনো আমাদের প্যারেন্টিং এর উপর মনে হয়েছে আমি বা তোমার মা ভুল?”

“কখনোই না বাবা। তুমি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বাবা।”

“কিন্তু আমার যে নিজেকে ব্যর্থ মনে হয় মা। মনে হয় আমি বাবা হিসেবে গো হারা হেরে গিয়েছি।”

“এসব বলো না বাবা।”

“তা না হলে কি আর আমার মেয়ে অন্য বাবা মায়ের বুক খালি করতে পারতো।”

তনু এক নাগাড়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়েই থাকে। জালাল সাহেবের দুচোখের কোণ ঘেঁষে পানি গড়িয়ে পড়ে।

..
..
..
..
চলবে____

(খুব জলদি প্রথম পরিচ্ছেদ সমাপ্ত হবে। এই খু*নের কেস সলভ করে সমাপ্ত করবো। কিন্তু আমার মেজর এএকে কে আরও লিখতে চাই। সেগুলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে থাকবে। প্রথম পরিচ্ছেদ শেষ করে কয়েকদিন পরেই শুরু করবো।

আজকের পর্ব পড়ে হয়তো অনেকেই গল্পের তীর কোন দিক যাচ্ছে বুঝে যাবেন। আমার পাঠকমাত্রই বুদ্ধির ঢেকী কিনা!)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here