#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৪৪ (কপি করা নিষেধ)
____________________________________
“তুমি আমার অনেক আদরের। আমার সাত রাজার ধন। যখন মুখে কিছু উচ্চারণ করেছো আমি যেভাবেই হোক তোমার সামনে হাজির করেছি। যেখানে যেতে চেয়েছো নিয়ে গিয়েছি। যা বলেছো তাই করেছি। তোমার কি কখনো আমাদের প্যারেন্টিং এর উপর মনে হয়েছে আমি বা তোমার মা ভুল?”
“কখনোই না বাবা। তুমি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বাবা।”
“কিন্তু আমার যে নিজেকে ব্যর্থ মনে হয় মা। মনে হয় আমি বাবা হিসেবে গো হারা হেরে গিয়েছি।”
“এসব বলো না বাবা।”
“তা না হলে কি আর আমার মেয়ে অন্য বাবা মায়ের বুক খালি করতে পারতো।”
তনু এক নাগাড়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়েই থাকে। জালাল সাহেবের দুচোখের কোণ ঘেঁষে পানি গড়িয়ে পড়ে।
“কিসের কমতি রেখেছিলাম আমি তোমার জীবনে তনু? কেন তুমি এই স*র্ব*না*শের খেলায় মেতেছ? কেন অন্যের জীবন কেড়ে নিচ্ছো?”
তনু চুপ হয়ে বাবার দিকে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই আছে। তার মুখে কোন কথা নেই। ঠিক তেমনি তার চোখেও অনুতাপের ছায়াও নেই। যেন এসব কোন ব্যাপারই না। অন্তত জালাল সাহেব তো মেয়ের চোখে অনুতপ্ততা দেখছেন না।
জালাল সাহেব মেয়ের এমন আচরণে চোখ বুজে শুয়ে পড়েন। মানে সে এখন তনুর সাথে কথা বলতে আগ্রহী নয়। তনু বোঝে তাই সে বাবার ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। এদিকে মেয়ে ঘর ছেড়ে বের হতেই জালাল সাহেব চোখ মেলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। যেন এই কান্না আটকে রাখতে না পেরেই মেয়েকে নিরবে প্রস্থানের জন্য বলেছেন।
জালাল সাহেবের মনে পড়ে সেই রাতের কথা যেই রাতে তিনি জেনেছেন যে পুরো দেশ তোলপাড় করা সে চক্র খু*নে*র মাস্টারমাইন্ড তারই মেয়ে। যেই খু*নিকে মনে প্রাণে কয়েক মাস ধরে তিনি অভি*শা*প দিয়েছেন সে তার নিজের মেয়ে। যেই খু*নে*র রহস্য ফাঁস হোক তিনি সবসময় চেয়ে এসেছেন, যেই কে*সের পিছনের মাথা গুলো বের হোক তিনি আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত ও করেছেন, এখন সেই তিনিই সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে এই খু*নের রহস্য কখনো ফাঁস না হয়। সেই একই হাত জোড়া আল্লাহর দরবারে আবারও ভিক্ষা চাচ্ছে যাতে খু*নি ধরা না পড়ে। কি করবেন নিজের মেয়ে তো! যতই বিবেকের কাছে হেরে যান অথবা যতই মনে মনে সন্তান হারা বাবা মায়ের কথা মনে পড়ুক, নিজের মেয়ের মুখটা চোখে ভাসলেই সব ফিকে মনে হচ্ছে।
হাজার অ*প*রা*ধ তনিমা করলেও জালাল সাহেব নিজের ভিতরের পিতা সত্ত্বার কাছে হেরে যাচ্ছেন।
সেই রাতে জালাল সাহেবের অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়। আসলে অফিসের একটা ডিনার ছিল তাই তাদের বাড্ডা যেতে হয়েছিল। মেরুল বাড্ডা থেকে গাড়ি ঘোরানোর সময় সে একটা গাড়িতে তনু এবং তার বন্ধুদের দেখে উল্টো দিক যেতে। অত রাতে তার মেয়ে নিজের বাড়িতে না থেকে উত্তরা থেকে সম্পূর্ণ উল্টো দিকে কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে অবাক হন প্রথমে তিনি। যে তনু তাকে না বলে কখনো বাড়ির বাইরে পা রাখে না সে এতো রাতে কোথায় যেতে পারে?
তিনি ভাবেন হয়তো তনু তাকে ফোন করেছিলো কিন্তু তাকে পায়নি। তাই তিনি নিজের ফোন চেক করেন। কিন্তু তনু তাকে না তো কোন কল করেছে আর না কোন ম্যাসেজ। তিনি আরও চিন্তিত হন। তার মেয়ে তো এমন নয়। তাহলে কি মেয়ে তার কোন বিপদে পড়েছে?
জালাল সাহেব ভয় পেয়ে যান। এখনো শহরে সেই সিরিয়াল কি*লিং বন্ধ হয় নি। আর না তো সেই সিরিয়াল কি*লার বা তাদের চক্র ধরা পড়েছে। তাদের টার্গেটই তো তনুর মতো কন বয়সী ছেলে মেয়েরা। জালাল সাহেবের রীতিমতো ঘাম ছুটে যায়। এসি গাড়ির মধ্যে তরতর করে ঘামতে থাকেন ভদ্রলোক।
ততক্ষণে তনুদের গাড়ি সিগনালে দাঁড়িয়েছে। জালাল সাহেব ড্রাইভারকে নামিয়ে দিয়ে নিজেই ড্রাইভ করে গাড়ি ঘুরিয়ে ফেলেন। তার উদ্দেশ্য মেয়েকে ফলো করার ছিল না। সে তো উল্টো তনুকে কল করেন কিন্তু তনুর ফোন বন্ধ ছিল। তাই মেয়ের বিপদাপদ এর কথা ভেবেই সিকিউরিটি পারপাস যাচ্ছিলেন। সে যদি একবার জানতো যে এই যাওয়াই তার কাল হবে, এও যাওয়ার কারণেই অপ্রিয় লুকায়িত সত্য তার সম্মুখে উন্মোচন হবে তাহলে তিনি কিছুতেই যেতেন না। উহু কিছুতেই না।
কাকরাইলের একটা থ্রিস্টার হোটেল। সেই হোটেলের পাশে মেইন রাস্তা। রাস্তার অপরপ্রান্তে একটা চিকন রাস্তা রয়েছে। সেই রাস্তা দিয়ে হয়তো রাজারবাগ দিয়ে বের হওয়া যায়। ঠিক মনে পড়ছে না জালাল সাহেবের
এইদিকে খুব একটা যাওয়া আসা নেই কিনা। কিন্তু কথা হচ্ছে। তনু যেই গাড়িতে রয়েছে সেই গাড়িটা ঘুরিয়ে সেই চিকন রাস্তায় থামালো ড্রাইভার। ব্যাপারটা এমন যে এখানে গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ আছে। যা শেষ করে এই গাড়ি রাজারবাগের দিকে যাবে।
জালাল সাহেব তার গাড়ি একটু আড়াল করে রাখলেন যাতে তার উপস্থিতি কেউ বুঝতে না পারে। এদিকে তিনি খেয়াল করলেন যে তনুর যে বন্ধু আছে নির্জন নামের সে একটা ল্যাপটপ নিয়ে গাড়িতে বসেই কি যেন করছে। তিনি বুঝলেন না কি করছে। তবে নির্জনের হাতের ল্যাপটপ দেখতে পেলেন ভালো করেই কাঁচ নামানো থাকায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরে দেখলেন এবার লিপি নামের মেয়েটা কাউকে একটা কল করছে। কল কেটে চুপচাপ বসে সামনের সিটে বসা তার মেয়ে তনুকে কিছু একটা ইশারা করতেই তনু অদ্ভুত ভাবে হাসি মুখে হোটেলের দিকে তাকায়। জালাল সাহেব মনে মনে ভড়কে গেলেন মেয়ের এমন অজানা রুপে। তবুও তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন এর পরে কি হয় জানার জন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হোটেলের মেইন গেট থেকে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে বেরিয়ে আসে তাদের গাড়ির কাছে। ছেলেমেয়ে দুজনকে না চিনলেও এদের বয়স যে তনুর মতোই হবে তা বেশ বুঝলেন জালাল সাহেব।
ছেলেমেয়ে দুজন গাড়ির আসতেই ড্রাইভার ছাড়া সকলেই নেমে পড়ে। তাদের সকলের একইরকম পোশাক পরা। আর সেই পোশাকের স্লোগান এর মতো লেখা পড়ে ঘেমে ওঠেন ভদ্রলোক।
হুট করেই নিজের মুখে মাস্ক পরে হোটেল থেকে বের হওয়া দুইজনের মুখের সামনে কিছু একটা স্প্রে করে দিতেই তারা নেতিয়ে পড়তে নেয়। কিন্তু তা হতে না দিয়ে তাদের ধরে নিজেদের গাড়িতে উঠিয়ে বসায় তনু, লিপি, অয়ন, নির্জন এবং আরও দুইজন অপরিচিত মানুষ। কি স্প্রে করেছে তা দূর থেকে দেখা না গেলেও ভি*ক্টিমদের অজ্ঞান হয়ে যাওয়া দেখে অনুমান করা কঠিন কাজ নয়।
তাদের নিয়েই গাড়ি সত্যি সত্যিই রাজারবাগের দিকে যাচ্ছে। জালাল সাহেবও পিছু নিয়েছে। রাজারবাগ দিয়ে মতিঝিলের মধ্যে দিয়ে যেয়ে গাড়ি গেল যাত্রাবাড়ী। সেখান থেকেই নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার রাস্তা ধরে তনুদের গাড়ি। দূরত্ব রেখেই পিছে জালাল সাহেব।
তনুদের গাড়ি যখন নারায়ণগঞ্জ এর কাঁচপুর ব্রিজ অতিক্রম করে তখন যেন অবাক হতেও ভুলে যান জালাল সাহেব। তার ধারণা যদি সত্যি হয় তবে তার মেয়ে তাদেরই পরিত্যক্ত গোডাউনে যাচ্ছে। এবং তার ধারণা সত্যি করে আসলেই তনুরা তাদের গোপন আস্তানা সেই কাঁচপুরের ভিতর একটা পরিত্যক্ত গোডাউনে গেল। তনুদের গাড়ি গোডাউনে ঢোকার পরে জালাল সাহেব তার গাড়ি দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে পায়ে হেটেই ভেতরে গেলেন অন্য একটা ছোট পকেট গেট দিয়ে। এই গেটের কথা অবশ্য অন্যকেউ জানেনা।
গাড়ি রেখে পায়ে হেটে যেতে যেতে তার মিনিট দশেক দেরি হয় তনুদের থেকে। কিন্তু ভেতরে যেয়ে তিনি যা দেখলেন তাতে তার দম যেন ওখানেই আঁটকে গেল।
অজ্ঞান হওয়া ছেলেমেয়ে দুজন এখন সুস্থ। অথচ চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। গলা ফাটিয়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করছে ছেলেটা। আর মেয়েটা ভয়ে কেঁদেকেটে অস্থির। আর তার নিজের মেয়ে সেই দৃশ্য কি সানন্দেই না দেখছে আর হাসছে।
ছেলেটার পায়ে রড গরম করে চেপে ধরে রেখেছে অয়ন। ছেড়ে দেয় কিছুক্ষণ পরে। এরপর তনু এগিয়ে যায় একটা বেত হাতে। ওই যে আগেরকার দিনে স্কুলে যেই বেত দিয়ে মারা হতো ছাত্রছাত্রীদের সেই বেত। তনু নিজ হাতে ছেলেটার গায়ে অগণিত বেত্রাঘাত করেই যাচ্ছে তো করেই যাচ্ছে। একপর্যায়ে হাঁপিয়ে ওঠে সে। তারপর থামে। কিছুটা সময় বসে থাকে। যেন জিরিয়ে নিচ্ছে এমন। তারপর মেয়েটাকেও বেত্রাঘাত করতে থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত আবারও হাঁপিয়ে না ওঠে চলমান রয় তার তান্ডব লীলা। যখন পুনরায় হাঁপিয়ে ওঠে তখ দুজনের সামনে একটা চেয়ার পেতে বসে। তারপর বলে,
“তোরা দুজনেই আলাদা ভাবে অন্যকারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে আছিস। দুজনেই তা জানিস। তাও তোদের শরীরে এতো জ্বালা যে হোটেলে যাইস নষ্টামি করতে? কেন রে বিয়ে করে নে। তা না করে ঠকাবি তো তোরা অন্যদের। বুঝিস হা*রামিরা কারো থেকে ঠকে গেলে কেমন লাগে? বুঝবি ক্যামনে তোরা জা*নো*য়া*র।
এই এই তোরা হলি দুনিয়ার বোঝা। তোদের এই দুনিয়াতে কোন দরকার নেই। আবর্জনা একেকটা। আর এই আবর্জনা সাফ করার দায়িত্ব নিয়েছি আমি। তাইতো তোদের মতো পিস অফ শীট আমি নিজ হাতে মেরে কেঁটে সাফ করে ফেলি শহর থেকে।
এটা আমার আদালত। এখানে আমিই বিচার করি।তাই তোদের ও এখন বিচার হবে। অন্যদের বেলায় যেমন রায় তোরাও সমান অ*প*রা*ধী তাই তোদের রায় ও সমান। আর সেই শাস্তি হচ্ছে মৃ*ত্যু*দ*ন্ড। তোরা ছটফটিয়ে ম*র*বি আর তোদের য*ন্ত্র*ণা দেখে চিৎকার শুনে শান্তি পাবো আমরা।”
বিশ্রী ভাবে হেসে ওঠে উপস্থিত সকলে। এদিকে যেন মাটির সাথে আঁটকে গিয়েছেন জালাল সাহেব। এ কি দেখছেন তিনি তার সামনে? এ কাকে দেখছেন তিনি? এই মেয়েই কি তার মেয়ে? এই কি তার তনিমা?
তিনি আবারও তনুর আওয়াজ পান। সে চেঁচিয়ে ডেকে উঠলো,
“ভিক্টর..”
অপরিচিত যে দুইজন ছিল তনুদের গাড়িতে তাদের মধ্যে একটা ছেলে এগিয়ে আসে ডাকের সাথে সাথেই। তনু তাকে ইশারা করতেই সে তার প্যান্টের দুপারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দুটো ছোট পকেট না*ইফ বের করে। তারপর কাউকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই বাঁধা থাকা ছেলে মেয়ে দুটোর গলায় চালিয়ে দেয়। কাঁটা মুরগী যেমন ছটফট করে তেমনি সামনের মানুষ দুটো, না না কাঁটা মানুষ দুটো ছটফট করতে থাকে। সেই অসহনীয় দৃশ্য হজম করার আগেই ভিক্টর নামের লোকটার হাতে এবার একটা বড় তর*বারি তুলে দেয় অয়ন। এবং একই রকম আরেকটা তর*বারি নির্জন হাতে তুলে দেয় তনুর। তনু চেয়ার ছেড়ে উঠে। তারপর ছটফট করতে থাকা মানুষ দুটোকে জীবন্ত অবস্থাতেই তর*বারি দিয়ে ফালাফালা করতে থাকে। এই নির্মমতা দেখে জালাল সাহেব ওখানেই অজ্ঞান হয়ে যান। তার ওখানকার আর কিছুই মনে নেই।
তবে তার যখন জ্ঞান ফেরে তখন সে নিজেকে হাসপাতালে শোয়া অবস্থায় আবিষ্কার করেন। তার একপাশে স্ত্রী খাদিজা আর অন্যপাশে তার মেয়ে তনু। হ্যা তার মেয়ে তনু তার হাত ধরে বসে আছে। বাবার জ্ঞান ফিরেছে দেখেও তার কোন হেলদোল নেই। না তো চোখে কোন অনুতপ্ততা। সেই হাসপাতালে শুয়ে সেই চোখ দেখেই জালাল সাহেবের পুরো দুনিয়া শেষ হয়ে যায়। এই চোখের মালিক কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হতে পারে না। কোন সা*ই*কো*প্যা*থ ছাড়া এমন হওয়া অসম্ভব। তার ফুলের মতো মেয়ে কিভাবে এমন সা*ইকো হয়ে গেলো তা বুঝতে সক্ষম হলেন না তিনি।”
..
..
..
চলবে___
(নেন দিলাম অনেক কিছু পরিষ্কার করে। তনুকে নিয়ে কেউ সেন্টি খেলে আমার দোষ নেই। আমি এই গল্প সেই ২০১৯ এ লিখে রেখেছিলাম। এখন শুধু একটু সামান্য সংযোজন – বিয়োজন করে পোস্ট করছি। আর তনুকেও সেই ২০১৯ শেই ক্রি*মি*নাল বানিয়ে রেখেছিলাম। এখন আপনারা অনেকেই তনুর সাথে সামন্য খারাপ ঘটনাই মানতে পারেন না, তাই তাকেই মূল হোতা মানতে কষ্ট হবে জানি। কিন্তু তবুও আমি গল্পের মোড় পরিবর্তন করতে চাইনি। তাই যেমন ভেবে লিখে রেখেছিলাম তেমনই দিলাম।)

