প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্ব: ৫০

0
17

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্ব: ৫০ (কপি কতা নিষেধ)
_____________________________________

সময় প্রবহমান। না তাও সময় কারো জন্য থামে আর না এক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়। এই প্রবহমান সময়ের সাথে কতকিছুই যে ঘটে দুনিয়া জুড়ে। পরিবর্তন হয় প্রকৃতি সহ পরিস্থিতির। এক এক মিনিট করে এগোতে এগোতে দিন পার হয়, মাস পার হয়, পার হয় বছর। এভাবেই মানুষের ও জন্ম থেকে মৃত্যু পার হয় এই সময়ের প্রবহমানতার সাথে। কারো জীবনই পুরোপুরি সুখী ভাবে পার হতে পারে না। প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই কখনো না কখনো খারাপ সময় আসে। বিপদ আসে আসে কষ্ট। আবার সেই কালো আঁধার রাত পার করে দেখা দেয় প্রভামঞ্জরী। সেই প্রভামঞ্জরী কখনো কারো জীবনে হয়তো আক্ষরিক অর্থেই নিকষ কালো রাতের পরে ভোরের প্রথম আলোর কিরণ হয়। আবার কারো জন্য হয় অসহনীয় সময় পার হওয়ার পরে নতুন ভোরের নতুন সুখের দেখা।

তেমন ভাবেই ফরেনসিক এক্সপার্ট ইবনাত শাহরিয়ারের জীবনের অনেকটা সময় কষ্টের কাঁটার পরেই তার জীবনে প্রভামঞ্জরী হয়ে এসেছে মৌনতা শেখ। তার কষ্ট লাঘব করতে মরিয়া যে মেয়ে। এইতো দুই সপ্তাহ আগের শুক্রবারে ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে নিজের ঘরে তুলেছে ইবনাত। ভালোবাসা না থাকলেও দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। সহজ হয়েছে সম্পর্কের জটিলতা সমূহ। ইতস্ততভাব দূর হয়েছে দুজনেরই। প্রথম প্রথম এক বিছানায় ঘুমানো হোক না একসাথে খাওয়া সব কিছুতেই ছিলো আড়ষ্টতা। কিন্তু সেই আড়ষ্টতা নিজ দায়িত্বে দূর করেছে মৌনতা শেখ। সেদিন ক্যাফেতে বসে ইবনাতের সকল ঘটনা শুনে থেকেই ছেলেটার প্রতি তার এসেছিলো অদৃশ্য এক মায়া। সেই মায়া হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী। দিনদিন একসাথে থেকে সেই মায়ার পরিমাণ বেড়েছে অনেক। সেই মায়ায় জড়িয়েই ইবনাতের অগোছালো জীবন আর বাসা গোছানোর দায়িত্ব সে নিয়েছে নিজ কাঁধে। যেই ইবনাত বাসায় ঠিকমতো থাকতেই চাইতো না। যার বাসায় দমবন্ধ লাগতো, সেই ইবনাত আজকাল বাসায় থাকার বাহানা খুঁজে ফেরে। কাজ ছাড়া বাসার বাইরে থাকতেই যেন তার আপত্তি। আজকাল ইট পাথরে ঘেরা জায়গাটা তার নিজের ঘর মনে হয়। বাসায় গেলেই মিষ্টি হাসি দিয়ে দরজা খুলে মৌনতা। এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়া হোক বা নিজ হাতে রান্না করে খাওয়ানো হোক ইবনাতের সাথে জড়িয়ে পড়েছে মেয়েটা। যে ইবনাত দিনের দুই বেলা বাইরে খেয়ে আর সকালে না খেয়েই কাঁটিয়ে দিয়েছে বছরের পর বছর সেই ইবনাত এখন প্রায় তিনবেলাই বাসায় খাবার খায়। সকালে সে বের হওয়ার আগেই মৌনতা নাস্তা রেডি করে রাখে। অফিসে যাওয়ার আগে দুপুরের লাঞ্চ প্যাক করে দেয়। রাতে ফিরে রাতের খাবার ও রেডি পায় সে। এই যে মা মারা যাওয়ার পর থেকেই ছন্নছাড়া ইবনাত শাহরিয়ার এখন পুরোদস্তুর ফ্যামিলি ম্যান।
স্বামী-স্ত্রীর গতানুগতিক সম্পর্ক এখনো সেভাবে গড়ে না উঠলেও এখন আর তুরিনের কথা মনে পড়ে না ইবনাতের। প্রথম ভালোবাসাকে ভুলে যায়নি বরং মনের কোণে আলগোছে তালাবদ্ধ করে রেখেছে। আর বাকি পুরটা দখল করে নিয়েছে মৌনতা শেখ। ভালোবাসা না হলেও মৌনতার মায়ায় পড়েছে কঠিন ভাবে সে। সংসার যতটা কঠিন ভেবেছিলো ইবনাত তা মোটেই কঠিন না বাস্তবিক অর্থে তার কাছে। পুরোটাই সহজ করেছে মায়াবতী মেয়েটা।

এদিকে এই দুই সপ্তাহে একটুও পরিবর্তন হয়নি তুরিন আর সাদাফের সম্পর্কের। তখন অনিল মীমের সাথেই সাদাফ ফিরেছিলো ঢাকা। কিন্তু এবারে একা নয় বিয়ে করা স্ত্রী নিয়ে ফিরেছে সে। তুরিনকে ছোটবেলা থেকেই চেনে সাদাফের পরিবার। তাই তাকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে সেকেন্ড সময় লাগেনি তাদের। এদিকে তুরিনের পরিবারের একটা ইমোশনাল সময় পার হওয়ার পরে সবকিছু শুনে বুঝে তারাও মেনে নিয়েছে এই বিয়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে স্বয়ং সাদাফ। সে কোনভাবেই মানতে পারছে না। ঢাকায় ফিরে ইবনাতের সাথে সরাসরি কথা বলেছে এই ব্যাপার নিয়ে। এমনকি ইবনাতের সাথে তুরিনের ও দেখা হয়েছে। ইবনাত মৌনতার রিসেশনে সে তুরিনকে নিয়েই গিয়েছিলো। তাও তার মন কোনভাবেই মানতে পারছে না। আজকাল ইবনাতের হাসি মুখ তার চোখ এড়ায় না। ইবনাত যে মৌনতার সাথে ভালো আছে তাও সে বোঝে। তবুও কোথাও একটা তার কিন্তু থেকে গেছে।
ছয় মাস আগে যে একটা অচেনা অজানা মেয়েকে বিয়ে করেই দায়িত্ব নিয়েছিলো সে মনে মনে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলো সারাজীবন মেয়েটার পাশে থাকার তাকে আগলে রাখার তা যেনো এই অস্বস্তি, ইতস্ততভাবের নিচেই চাপা পড়ে গিয়েছে। পূর্ণ মর্যাদায় তুরিনকে বাড়িতে তুলেছে তার বাবা মা। সেখানে সে তাদের আদুরে বৌমা হিসেবেই থাকছে। কিন্তু সাদাফ আদনানের বউ হয়ে উঠতে পারেনি। এক ঘরে থেকেও তাদের মাঝে যোজন দূরত্ব। এক বিছানায় ঘুমানো হয়নি কখনো তাদের। ঘরে রাখা ডিভানেই থাকে সাদাফ। তুরিন চেষ্টা করলেও তাতে সাড়া জানায় না সাদাফ। মেয়েটার শুকিয়ে যাওয়া মুখ সে দেখে প্রতিনিয়ত। দেখে তার সকল চেষ্টা এই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার। কিন্তু সে যে মন থেকে এগোতে পারছে না। সময়ের উপর ছেড়ে দিয়েছে সব সে। এখন দেখা যাক উপরওয়ালা এখন সময়ের সাথে কোথায় নিয়ে দাড় করায় তাকে।

আগের মতো রোজ ভার্সিটি যাচ্ছে মীম, মৌনতা। আর সপ্তাহে দুই/তিন দিন যাচ্ছে অনিলরা। আজকাল তনু যেনো জোঁকের মতো অনিলের সাথে লেগে থাকে। অনিল ছাড়া নিঃশ্বাস ও নিতে পারে না এমন। এসব দেখে আগে কিছু না মনে হলেও ইদানীং সহ্য করতে পারে না মীম। তবুও তাদের বিয়ের কথা কেউ জানেনা দেখে চুপচাপ থাকে। অনিলের তনুর প্রতি কোন আগ্রহ নেয় দেখেই সহ্য করে। তার প্রতি অনিলের মুগ্ধতা সে বোঝে বোলেই একটা শব্দ করে না। অথচ আগের মতোই কেউ কারো কিছু না সেভাবেই ভার্সিটির সবার সামনে থাকে অনিল আর মীম।

চক্র খু*নের আ*সামী যে তনু আর তার বন্ধুরা সেই ব্যাপারে এই ভার্সিটি আসার কয়েকদিন পরেই সন্দেহ হয় অনিলের। তাইতো তার প্রতি তনুর দূর্বলতা আছে জেনেই তাকে বিভিন্নভাবে প্রশ্রয় দিয়েছে সে। তার প্রতি তনুর এই অবসেশনকে কাজে লাগিয়েই অনেক তথ্য সে যোগাড় করেছে। তনুকে ধরার জন্য প্রয়োজন শুধু প্রমাণ। আর কিছু প্রমাণ ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর হাতে রয়েছেও। যেমন ড্রাইভার রাসেল। কিন্তু এখনো পোক্ত কোন প্রমাণ তার হাতে নেই যার সাহায্যে সে তাকে শাস্তি দিতে পারবে। তাইতো এতো অপেক্ষা। তনুর পিছনে থাকা আসল মাথা যে এখনো দেশের বাইরে। সেই মাথা দেশে আনার সবরকম পক্রিয়া করে ফেলেছে মেজর। সমস্ত প্ল্যান রেডি। এখন শুধু কয়েকদিন সময়ের অপেক্ষা।

ভার্সিটিতে বর্তমানে মীমকে আরও বেশি ইগনোর করে অনিল। কারণ কোনভাবেই যদি তনু বুঝে যায় মীম আর অনিলের মধ্যে কিছু আছে তাহলে তার প্রিয়তমা যে প্রাণনাশের ঝুঁকিতে পড়বে। তনিমা যে একটা সা*ইকো। তাইতো সেদিন বিয়ের সময় এই বিয়ে গোপন রাখার কথা বলেছিলো সে। কিন্তু এখন তনুর পাগলামির যে পর্যায় চলছে তাতে তাকে জলদি না আঁটকালে তার হাইনেস তার গর্দান নেবে। তনু যখন আশেপাশে থাকে তখন যে লুক দেয় যে মেজর রীতিমতো ভয় পেয়ে যায় পাঁচ ফুটের মেয়েটাকে। ভয় না পেয়ে উপায় যে নেয়। হৃদয় ঘটিত ব্যাপারস্যাপার বলে কথা। হৃদয়ে যার ঠিকানা তার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা মেজর এএকে।

এদিকে আজকাল শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না মীমের। মাছ মাংসের গন্ধ সহ্যই কর‍তে পারে না। একটু থেকে একটু কিছু হলেই বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে সে। যখন তখন মাথা ঘুরে ওঠে তার। শরীর দূর্বল প্রচুর। কিন্তু এসব কিছু সে অনিলকে জানায়নি। লোকটা চট্টগ্রাম থেকে ফিরে সারাদিনের প্রায় বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকে। এতো ব্যস্ততা কিসের বোঝে না মীম। লোকটার সাথে সেভাবে সময়ই কাঁটাতে পারে না সে। ভোর বেলা সে ঘুম থেকে ওঠার আগেই যায় আর রাতে সে ঘুমানোর পরে আসে। মাঝে মাঝে তো দুই তিনদিন এক টানা বাড়ি ফেরে না। ভার্সিটিতেই দেখা হয়। তাও তনু আঠার মতো লেগে থাকে বলে একটু কথা ও বলতে পারে না। অথচ একটু কথা বলার জন্য একটু জড়িয়ে ধরার জন্য ছটফট করতে থাকে তার অন্তর। সে বোঝে তার স্বামী তার ব্যক্তিগত হলেও মেজর হিসেবে সে জনগণের জন্য নিবেদিত প্রাণ। আর এই ভার্সিটির সময়টা তার ডিউটির সময়ই। তাইতো গুমরে গুমরে ম*রতে থাকলেও কোনো অভিযোগ জানিয়ে লোকটাকে কষ্ট দেয় না। কিন্তু তবুও আজকাল মোটেই তনুর এই গায়ে পড়া স্বভাব সে সহ্য করতে পারে না।
মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে নিজেকে লোকটার বাহুডোরে আবদ্ধ পায় এই যা। এছাড়া আর পাচ্ছেই না লোকটাকে সে। দুই সপ্তাহে শুধু ইবনাত মৌনতার অনুষ্ঠানের দিন ওই কয়েক ঘন্টা পেয়েছিল। তাছাড়া মেজর পুরো অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গিয়েছে মাশফিয়া মীমের জন্য।

..
..
..
চলবে____

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here