#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৫১ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________________
স্যামুয়েল রোজারিওকে স্পেশাল সেলে রাখা হয়েছে। যদিও তাকে আটক করা সহ যাবতীয় কাজ ক্যাপ্টেন তাহমিদের তত্ত্বাবধানে হয়েছে, তবুও তাকে ইন্টারোগেশন করবে স্বয়ং মেজর। তাইতো আটক করার পর থেকে তার দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছে ক্যাপ্টেন। চট্টগ্রাম থেকে ফিরেই স্যামুয়েল রোজারিওর সাথে দেখা করেছে মেজর এএকে। কয়েক দফা কয়েক ভাবে। কিন্তু লোকটা সেই মাপের ত্যাদড়। তাইতো এতো কিছু হওয়ার পরেও মুখ খোলে নাই। নিজেকেই বস দাবী করছে। কিন্তু মেজর জানে অন্যদের মতো এই স্যামুয়েল রোজারিও নিজেও দাবার একটা সাধারণ গুটি মাত্র। তাইতো নিজে এর পিছনে পড়েছে। একে একে কম পদ্ধতি ব্যবহার করেনি সে এই স্যামুয়েল রোজারিওর সাথে। কিছুতেই যখন কিছু হচ্ছে নক তখন মেজর ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে। স্পেশাল অনুমতি নিয়ে স্যামুয়েল রোজারিওর সামনে একটা ল্যাপটপ নিয়ে বসে টেবিলে। দক্ষ হাতে কিছুক্ষণ কিবোর্ড চালনা করার পরে তা ঘুরিয়ে দেয় রোজারিওর দিকে। ভেঙে পড়া দূর্বল শরীর নিয়ে পিটপিট করে ল্যাপটপ স্ত্রিনে চোখ রাখে স্যামুয়েল। আর তাতেই এই কয়দিনের মনের জোর, শারীরিক দূর্বলতা সব ভুলে চিল্লিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বিক্ষুব্ধ চোখে চেয়ে দেখে তার সামনে নির্বিকারে বসে থাকা সেনা মেজরের দিকে। এই মেজর ঠিক কতখানি ধূর্ত তা আবারও প্রমাণ পাচ্ছে সে। যে তথ্য সে আজীবন ভীষণ যত্নে গোপন করে রেখেছিল তা এই মেজর ঠিকি মাটি খুড়ে বেরিয়ে এনেছে।
মেজর এএকে যে ভিডিও মাত্র দেখালেন তাতে দেখা যাচ্ছে একটা পঁয়ত্রিশ বা ছত্রিশ বছরের একটা মানবী হাসপাতালের পোশাক পরে শুয়ে আছে বেডে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক হাতে ক্যানোলা যাতে চলছে স্যালাইন। কোনো এক হাসপাতালের কেবিনে অবস্থান করছে মেয়েটা অবচেতন হয়ে। আর এটা দেখেই উক্ত আচরণ করে স্যামুয়েল রোজারিও। ঠোঁটের কোনে সামান্য বিদ্রুপের হাসি ফোটে মেজরের। তবুও তা সামনে আ*সামী রুপি স্যামুয়েল রোজারিওর চোখে পড়ে না।। কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা ছাড়াই তাকিয়ে থাকে একে অপরের দিকে।
নিরবতা ভেঙে মেজর বলা শুরু করে,
“অনুসুয়া আকন্দ। বয়স চৌত্রিশ বছর। দশ বছর যাবত কোমায় রয়েছে এভাবেই। শারীরিক এই অবস্থার কারণ দশ বছর পূর্বে নিজের থেকে ঊনিশ বছরের বড় একজন বিবাহিত লোকের প্রেমে পড়ে যাচ্ছেতাই পাগলামি করে। লোকটার একটা মেয়ে আর একটা ছেলে থাকার পরেও সেই সংসার ভেঙে সেই লোকের বউ হতে চাওয়া। আর শুধু চাওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না থেকে সেই লোকের পরিবারের বিভিন্ন ক্ষতি করার চেষ্টা করা। তার মেয়েকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা অথবা তার স্ত্রীকে মা*রার চেষ্টা কিছুতেই পিছপা হয়নি। কিন্তু তার ধারণা ছিলো না যে লোকের জন্য এতো পাগলামি তার সেই লোক একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হতে পারেন। হ্যা তিনি দশ বছর আগে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমানের জন্য পাগলামো করেছেন। আর এই অনুসুয়াকে যখন বিগ্রেডিয়ার জেনারেল প্রত্যাখ্যান করেন তা সহ্য করতে না পেরে আ*ত্ম*হ*ত্যা*র চেষ্টা করে সে। কিন্তু সফল হয়নি তার আগেই আপনি বাঁচিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু তার অপরাধের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে ততদিনে। তাকে গ্রেফতারের পরোয়ানা জারি হয়। কিন্তু আপনি বুদ্ধিতে তাকে মৃ*ত বানিয়ে দেন। সেই অসফল আ*ত্ম*হ*ত্যাকে আপনি সফল প্রমাণ করে আইনের চোখে ধুলো দিয়ে তাকে গোপনে এই দশবছর ধরে চিকিৎসা করাচ্ছেন নিজের পয়সায়।”
“এসব আপনার বানানো ঘটনা মেজর। এই মহিলাকে আমি চিনিও না। আগে কখনো দেখিনি।”
মেজর রোজারিওর দিকে এমন ভাবে দেখছে যেন সে আগেই জানতো এমনই হবে। আর সে সবরকম প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। নিরবতার পরে আবারও মেজর শুরু করে,
“আলতাফ আকন্দের বড় মেয়ে। যার ম্যানেজারের চাকরি করতে করতে তারই বড় মেয়েকে মন দিয়েছিলেন আপনি। আর কিছুতেই নিজের ভালোবাসার মানুষকে এভাবে অন্যের জন্য পাগল হতে দেখে সহ্য করতে পারেননি। তবুও তখন সামান্য ম্যানেজার হয়ে মালিকের মেয়ের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস হয়নি আপনার। এদিকে অনুসুয়ার পাগলামি বাড়তে থাকে। সহ্য করতে না পেরে আপনি প্রস্তাব রাখেন আলতাফ আকন্দের কাছে। আলতাফ আকন্দ হেসে আপনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সবার সামনে যথেষ্ট অপমান করতেও ভোলেন না। সেদিন থেকে জেদ ধরে দূ*র্নী*তির পথ বেছে নেন। যেই টাকার জন্য এতো অপমান সহ্য করেছেন সেই টাকার পাহাড় গড়ে ওঠে আপনার। আর তা হয় আলতাফ আকন্দের খু*ন করে তার সম্পত্তি দখলের মাধ্যমে। অনুসুয়া ছাড়া পরিবারের সবাইকেই আপনি খু*ন করেছেন। অনুসুয়াকে একদিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেশ অপমান করে তার পরিবারের পিছে লাগায়। যখন সে বোঝে এই লোককে কখনোই পাবেনা সে গাড়ি ইচ্ছাকৃত এক্সি*ডেন্ট করায়। কিন্তু ততক্ষণে আপনি জেনে গিয়েছেন সব। তাকে বাঁচিয়ে নিয়ে চোরাই পথে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে গোপনে চিকিৎসা করাতে থাকেন। এদিকে হাসপাতাল থেকে বেওয়ারিশ লা*শ যোগাড় করে তাকে বানিয়ে দেন অনুসুয়া আকন্দ। দুনিয়ার চোখে অনুসুয়া আকন্দ মারা গেলেও তাকে আপনি আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন। কারণ তাকে আপনি এতকিছুর পরেও ভালোবাসেন। আর তাই সেই জন্য প্রতিশোধ নিতেই চারবছর আগে আপনার লোকের মাধ্যমে ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের পরিবারের উপর আ*ক্র*মণ করিয়েছেন। তার স্ত্রী, মা, বাবাকে মে*রে ফেলেন। তার কন্যাকে অন্য পুরুষ দ্বারা ধ*র্ষি*তা করতে চেয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ সহায় থাকায় তা পারেন নি। তাইতো কিছুদিন আগে যখন খবর পেলেন সে চট্টগ্রাম যাচ্ছে তখন আবারও তাকে তুলে আনতে এক পাতি মা*স্তান কে সুপারিশ দেন।”
বিস্ফোরিত হতেও যেনো ভুলে যায় রোজারিও। এউ সামনের মেজর তার সমস্ত ঠিকুজি বের করে ফেলেছে। এখন আর তার বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই তবুও সে হাল না ছেড়ে কিছু বলতে গেলেই মেজর সেই সুযোগ দেন না। সে আবারও বলে,
“ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের কন্যাকে আপনি কেন আর কখনো আল্লাহ ব্যতীত কেউ কিছুই করতে পারবে না। কারণ তার ছায়া হয়ে অনিল আবরার খান থাকে। অনিল আবরার খানের বুকের মণিকোঠায় তার বসবাস। এসব আমি আগেই জেনেছি। এবার চটজলদি চক্র খু*নের মেইন মাথা কে বলে ফেলেন তো।”
এবার বেশ মজা পেলো যেনো রোজারিও। হু হা করে কিছুক্ষণ হেসে সে বলে,
“আর যদি না বলি মেজর! কি করবে হে বাচ্চা ছেলে?”
মেজর এএকে কে এভাবে সম্মোধন করাতেও নির্বিকার মেজর। সেও মজা পাচ্ছে রোজারিও নামের বোকার স্বর্গে বাস করা লোকের সাথে কথা বলে।
“তুই কি ভাবিস মেজর এএকে ঘাসে মুখ দিয়ে চলে? তার দায়িত্বে থাকা কে*সের ব্যাপারে আসে উদাসীন? কোনো কিছুই জানেনা মেজর?
তোর সাঙ্গপাঙ্গরা সব আমার নজরেই থাকে সবসময়। তোর আরেক সাগরেদ সুরাইয়া তনিমা জালাল আমার হাতে ঠিক কিভাবে লাটাই হয়ে থাকে আর মেজর কিভাবে সে লাটাই ঘোরাই তা খবর নিয়ে দেখিস। তোর লেঙ্গুর পেঙ্গুর সব আমার হাতে। বাকি থেকে গিয়েছিলি তুই। এখন তুইও আমার হাতে। আর কি বললি মুখ খুলবিনা! আচ্ছা তাহলে এখন একটা কল করবো আর তোর প্রেয়সীর লা*শ বের হবে হাসপাতাল থেকে।”
যে মেজর এতোদিন এমনকি কয়েক মিনিট আগেই আপনি আপনি করে কথা বলছিলো সে হুট করেই তুইতোকারি করছে দেখেই প্রথমে একটু থতমত খেয়ে যায় রোজারিও। কিন্তু অনুসুয়াকে মে*রে ফেলার ধমিকে ভয় না পেয়ে উল্টো যেনো মজা পেলো।
“তুমি অনুসুয়াকে মা*রতে পারবে না মেজর। তার সাথে তোমার কোন ব্যক্তিগত ঝামেলা নেই যে তাকে তুমি মা*রবে। আর না তো সে এই সকল কে*সের সাথে জড়িত। তোমার ব্যাপারে এতোটা জেনেছি আমি যে তুমি নির্দোষ কাউকে শাস্তি দাও না।”
“সঠিক জেনেছিস। কিন্তু তোর অনুসুয়ার সাথে ঝামেলা না থাকলেও তোর সাথে আছে আমার। তুই যেমন নিজের ভালোবাসার জন্য যে কোনো সীমা লঙ্ঘন করেছিস তেমন আমিও করতে পারি। ইভেন কতবার যে করেছি তার হিসেব নেই। তুই আমার কলিজায় হাত দিয়েছিস। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কন্যা মেজর এএকে বধূকে মা*রার চেষ্টা করেছিস। তার সম্মান হাবির চেষ্টা করেছিস। তার পরিবারকে মে*রে তাকে কষ্ট দিয়েছিস। প্রেয়সীর মলিন মুখ ভুলি কি করে বলতো!”
ভাবুক দেখালো মেজরকে। অবাকতার সীমা ছাড়িয়েও অবাক হয় রোজারিও। মাশফিয়া রহমান মীম সম্পর্কে তার তো সবই জানা। তবে সে কি করে মেজরের বউ হলো? কই এই ব্যাপারে তো তার কিছুই জানা নেই। তনুও তো তাকে বলেনি এই কথা। উল্টো ওই তনুই তো এই ছদ্মবেশী মেজরের প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে আছে। সে নিজেও তো একে একজন বিজনেসম্যান আর স্টুডেন্ট হিসেবেই জানতো। ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে আসার পরেই না এর আসল পরিচয় পেয়েছে সে। বাধ্য হয়ে রোজারিও মুখ খোলে। অধর কোণ অদেখা বেঁকে যায় মেজর এএকের।
.
.
.
.
বাবার দেওয়া লাল রঙের গাড়িতে করে উত্তরা উত্তরের একটা রেস্টুরেন্টে আসলো তনু। ভিতরে এসে দেখে সেই সবচেয়ে বেশি দেরি করে এসেছে। সে ছাড়া দলের অন্য সদস্যরা আগেই উপস্থিত। সে এসে বসলেই শুরু হয় আলোচনা। আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে স্যামুয়েল রোজারিও। দুপ সপ্তাহ ধরে রোজারিও সাথে কোনরূপ যোগাযোগ হয়নি দলের কারো। রোজারিও একটা ইমেইল করেছিলো দুই সপ্তাহ আগে যে সে জরুরি কাজে ইন্ডিয়া যাচ্ছে তাই যোগাযোগ করতে পারবে না। আর তার অনুমতি ব্যতীত যেন দলের পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়। মূলত রোজারিও তাদের বস। তাদের সকল প্রকার প্রেটেকশন সেই দিয়ে থাকে। ফাইন্যান্সিয়াল দিকটাও সেই সামলায়। তাইতো তার কথা মানতে বাধ্য তারা। কিন্তু এভারে তনুর কেমন যেনো খটকা লাগছে। তার বার বার মনে হচ্ছে কোথাও কোনো কিছু মিস যাচ্ছে তাদের। কিছু তো আছে যা তার চোখে পড়েও পড়ছে না।
একদিকে ব্যক্তিগত জীবনে সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছে এখন যদি শখের জীবনেও এলোমেলো অবস্থা আসে তবে সামলাবে কিভাবে ভেবেই কূলকিনারা হারাচ্ছে তনু। তার বাবা জেনে গিয়েছে সব। তারপর থেকেই আগের স্বাভাবিক সম্পর্ক আর নেই তাদের বাবা মেয়ের। আবার বাবা আর অসুস্থ। কি করবে বুঝতেই পারে না আজকাল। অনিলকে এখনো মনে কথা জানাতেই পারলো না। সেদিকেও প্রচন্ড ইনসিকিউরড ফিল করে তনু। আজকাল কাউকে অনিল ভাইয়ের ত্রিসীমানায় দেখলেও খু*ন করে দিতে ইচ্ছে করে। না সে অন্য কাউকে তার মনের অবস্থা বোঝাতে পারে আর না পারে অনিল ভাইকে বোঝাতে।
..
..
..
..
চলবে_____

