#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৫২ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________________
তনু ও তার সঙ্গীরা বেশ বিরক্ত হয়ে আছে। বিগত দেড় ঘন্টা যাবত তারা তাদের দলের এক সদস্যের জন্য অপেক্ষা করছে। সরাসরি তাদের সাথে খু*ন করায় অংশগ্রহণ না করলেও তাদের দলের অন্যতম ভিত্তি।
অনেক লোক মিলে অনেক বড় একটা দল রয়েছে তাদের। যাদের একমাত্র কাজ শুধু এই তরুণ-তরুণীদের খু*ন করা নয়, সাথে আরও অনেক কিছু রয়েছে। নানা ধরনের অন্যায় তারা করে থাকে এবং করিয়ে থাকে। অথচ চক্র খু*নের কে*স এমন ভাবে উপস্থাপন করেছে যেনো একটা মাত্র মানুষ, একজন সাই*কোপ্যা*থ নিজের চিন্তাভাবনা দিয়ে এই ইয়াং জেনারেশন এর একটা অংশ খু*ন করছে।
পুরোটাই ছিলো একটা গভীর পরিকল্পনার পরিনাম। এর পেছনে রয়েছে বড় বড় রাঘব বোয়াল। এই তনু আর তার গঠিত ছোট টীম একটা চুনোপুঁটি অংশ মাত্র। তাদের দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে,প্রচন্ডরকম ম্যানুপুলেট করেই নিজেদের কাজ হাসিল করছে সেসব রাঘববোয়ালেরা। আর এসবের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তনু অথবা তার দলের কারো।
এসব ভেবেই ঠোঁটের কোনে হাসি নিয়ে কালো রঙের টয়োটা থেকে বেরিয়ে আসে লম্বাটে এক লোক। এই কালো টয়োটা গাড়িটা প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে রেস্টুরেন্টের বিপরীত পাশে বসে ছিলো এই লোক। লম্বাটে লোকের পরনে ডার্ক নেভী শার্ট, নেভী ফর্মাল প্যান্ট। সাদা আর হালকা নীল চেক ব্লেজার। সাদা সুজ আর ঘড়ি। মুখে মাস্ক চোখে সানগ্লাস। হাঁটা চলার স্টাইল নজরকাড়া। সে যখন স্লাইডিং দরজা খুলে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে তখন উপস্থিত প্রায় প্রত্যেকেই তাকিয়ে থাকলো। এমনকি অনিলকে মনে প্রাণে ধারণ করা সুরাইয়া তনিমা জালাল নিজেও এই লোকের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্যই হলো।
লোকটা সবার নজর দেখে মাস্কের আড়ালেই হাসলো বোধহয়। সে এগিয়ে যেয়ে সোজা তনুর সামনে ওদের টেবিলেই বসলো। এবং চোখের সানগ্লাস খুলে টেবিলে রেখে নিজের ডান হাত থুতনিতে ঠেকিয়ে সরাসরি তনুর চোখে চোখ রেখেই বলে,
“হ্যালো মিস তনিমা। আই ওয়েটেড আ লং টাইম টু মিট ইউ। ইউ এন্ড ইওর টীম ইজ আনবিলিএভেইল ট্যালেন্টেড।”
তনু তাকিয়ে আছে সেই লোকের চোখের দিকেই। চোখ দুটো সাদা। একদম স্বচ্ছ। বিড়ালের চোখের মতো। তনুর কাছে মনে হলো যেনো বিড়ালের চোখের সাথে এই লোকের চোখের অদলবদল হয়েছে। কারণ বিড়াল চোখের মানুষ তনু তার জীবনে আরও অনেক দেখেছে। তবে এতটা মিল আর এতটা স্বচ্ছ বোধহয় এই প্রথম সে দেখছে। তার এই অবাকতার রেশ কাটে লোকটার গলায় নিজের নাম সহ নিজেদের ব্যাপারে এমন প্রসংশা বাক্যে।
সুন্দর মনমাতানো হাসি দিয়ে তনু উত্তর করে,
“থ্যাংকস মি……”
“জ্যাক। ইউ ক্যান কল মি জ্যাক।”
“থ্যাংক ইউ মিস্টার জ্যাক।”
“আজকে আপনাদের সাথে যার দেখা করার কথা সে আমি। আমার সাথে সরাসরি আপনাদের যোগাযোগ না হলেউ রোজারিওর সাথে হয়। রোজারিও আমার লোক। আমার কথাতেই তার সাথে আপনার যোগাযোগ হয় মিস তনিমা। আপনারা কেউ আমাকে না চিনলেও আমি আপনাদেরকে খুব ভালো করেই চিনি। আপনাদের জন্ম থেকে এখন পর্যন্ত সবকিছুই আমার জানা আছে। এর আগে কখনো আপনাদের সাথে দেখা না করার পিছনে অনেক কারণ ছিলো। এবং আজ আপনাদের সাথে দেখা করার ও অনেক কারণ আছে।”
সবাই জ্যাকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। তার বলা শেষ হতেই অয়ন বলে,
“বুঝলাম মি. জ্যাক। আমাদের সমস্ত টার্গেট আপনিই দিয়ে এসেছেন এতকাল। আপনিই বলেছেন সকল ধোঁকাবাজের নাম পরিচয়। আমরা তাদের শাস্তি দিয়েছি। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন রয়েছে আপনার কাছে।”
“হ্যা বলুন মি. অয়ন। কি জানতে ইচ্ছুক আপনি?”
“আমরা যত জনকে শাস্তি দিয়েছি তারা কোন না কোনভাবে আমাদের ভার্সিটির সাথে জড়িত। এর পিছনে কি কোন বিশেষ কারণ রয়েছে?”
জ্যাক নামের লোকটার ঠোঁটে আবারও অদৃশ্য হাসি খেলে গেলো। মাস্ক থাকায় এবারও তা কারো চোখে পড়েনি। হয়তো গভীর কোন রহস্য রয়েছে তার এই অদেখা হাসিতে। যা সে কিছুতেই তার তুরুপের তাস নামক এই দলের কাছে উন্মুক্ত করতে রাজি নয়।
“আসলে কয়েকবছর আগে আমি নিজেই এই ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম। তখনই আমার চোখে আসে এসব ধোঁকাবাজি। তাই আমি যখন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম তখন আমার দেখা, চেনা জায়গা থেকেই শুরু করেছি। তবে খুব শীঘ্রই আমরা বাইরের আবর্জনা পরিষ্কারের কাজেও লেগে যাবো। আশা করি বুঝতে পেরেছেন আপনারা।”
সকলেই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। এরপর জ্যাক তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা ছবি বের করে তা উল্টো করে টেবিলের উপর রাখে। তারপর নিজের হাত নামিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আপনাদের পরবর্তী টার্গেট। বলতে পারেন আপনাদের ভার্সিটির শেষ টার্গেট।”
ছবিটা সর্বপ্রথম নির্জন হাতে নিয়ে দেখে। এবং সাথে সাথেই তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। নির্জনের পাশেই লিপি বসে ছিলো। সেও নির্জনের হাত থেকে ছবিটা নিয়ে দেখে। এবং তার চেহারাও কিছুটা একই হয়। এবং দুজনেই অয়নের মুখের দিকে করুণ চোখে তাকায়। ওদের অবস্থা দেখে বেশ অবাক হয় বাকিরা। এবং অধৈর্য হয়ে এবার তনুও ছবিটা দেখে জ্যাকের চোখে চোখ রাখে। ছবিটা সোজা ভাবেই টেবিলের উপর রাখে। অয়ন দেখেই উঠে দাঁড়ায়। অবাক হয়। বিমূঢ় হয়। আহত হয়।
বন্ধুরা বোঝে তার এই অবস্থা।
লিপি বলে,
“মীম!”
“মাশফিয়া রহমান মীম।”
নির্জন ও বলে,
“ও আমাদের বন্ধু জ্যাক!”
“তো?”
“আমরা আমাদের বন্ধুকে মা*রবো!”
“সে একজন অ*প*রা*ধী নির্জন। তো তাকে শাস্তি দিবেন না? নাকি বন্ধুত্বের কোটায় তার শাস্তি মওকুফ করবেন?”
অয়ন যেনো মূর্তি বনে গিয়েছে। কিন্তু এতক্ষণ পরে তনু বলে,
“অ*প*রা*ধ করলে সে শাস্তি পাবেই। তাতে কে বন্ধু আর কে শত্রু তা আমরা দেখবো না। তবে তার অ*প*রা*ধ মানে সে যে ধোঁকাবাজির সাথে জড়িত তার কি প্রমাণ?”
“মাইন্ডব্লোয়িং তনু। এইজন্যই আপনার চর্চা হয় সবসময়। যে ধরনের কাজ আপনারা করেন তাতে যে মীম একটা প্রব্লেম হতে পারে কখনো মনে হয়নি আপনাদের? সে একজন মেজর জেনারেলের মেয়ে এটা কি অজানা আপনাদের?”
“না। অজানা নয়। জানি মীম মেজর জেনারেলের মেয়ে। তবে এর জন্য আমাদের কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয়নি কখনো। আর আপনি ভালো করেই জানেন আমরা শুধু শুধু কাউকে মা*রি না।”
“হা হা। জানি জানি। আমি সবই জানি। করেন খু*ন তবুও নীতি ঠিক আছে আপনাদের। আচ্ছা তবে এবার বলুন আপনারা যাকে বন্ধু বলছেন সেই মাশফিয়া রহমান মীম যে বিবাহিতা তা জানেন আপনারা?”
মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে অয়নের। সে সেই শুরু থেকেই মীমকে পছন্দ করে। কখনো বলা হয়নি। কিন্তু তার বন্ধুরা বোঝে সব। শুরুটা পছন্দ দিয়ে হলেও এখন তা সীমালঙ্ঘন করে ভালোবাসায় রুপ নিয়েছে। এই মেয়েকে হারানোর কথা সে ভাবতেও পারে না। অথচ এখন শুনছে তার সেই না বলা ভালোবাসার মানুষটা নাকি অন্যকারো। সে প্রায় চিৎকার করে ওঠে,
“মানে? কি বলতে চাইছেন আপনি?”
“বলতে চাইছি আপনাদের বন্ধু মীম বিবাহিতা। এবং এই খবর আপনারা কেউ জানেন না।”
অয়নকে সবাই মিলে ঠান্ডা করে বসিয়ে দেয়। এবার তনু বলে,
“মানলাম মীম বিবাহিতা। এবং আমাদের বলে নাই। সেজন্য আমারা বন্ধু হিসেবে তার উপর রাগ করতে পারি। অভিমান করতে পারি। কিন্তু এখানে ধোঁকার কি আছে? সে আমাদের জানা মতে কারো সাথে সম্পর্কে থাকাকালীন অন্যকাউকে বিয়ে করেছে এমন নয়। তাহলে?”
“ভেরি গুড তনিমা। তবে শুনুন আপনাদের বন্ধু মাশফিয়া রহমান মীমের বর একজন আর্মি মেজর। মেজর এএকে। যে মেজর আদাজল খেয়ে আপনাদের পিছনে পড়ে আছে সেই মেজর এএকের বউ ওই মেয়ে।”
সবার মাথায় এবার হাত উঠে যায়। সবাই অবাক হয়েই তাকিয়ে থাকে বিড়াল চোখের জ্যাকের দিকে। তারপর নির্জন বলে,
“কিন্তু মেজর এএকে তো অস্ট্রেলিয়া। চিকিৎসার জন্য গিয়েছে আমাদের করানো সেই আ*ক্র*মণ এর পর।”
“হ্যা। আমার জানামতে মেজর এখনো অস্ট্রেলিয়া আছে। কিন্তু বিয়ে হয়েছে তার আগেই। এবং সে মেজর এএকে। কৈ মাছের জান ওই মেজরের। একে মা*রা বা রোখা এতো সহজ ভাবে নিয়েন না। মেজর এখন অসুস্থ ঠিকি কিন্তু একবার ফিরে আসলে এবার আর আপনাদের রক্ষা নেই।”
তনুর মাথায় এবার একটা কথাই ঘুরছে, মীম মেজর জেনারেল হামিদুর রহমানের মেয়ে। এবং এখন সে মেজর এএকের বউ। যে মেজর তাদের ধরার কাজে নিযুক্ত। যদিও মেজর সাময়িক বিরতিতে আছে তবুও এই মেজরের ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত সে। না হলে এতকিছু করেও মেজরের চেহারা দেখতে পারেনি তারা। আর না তো মেজর সম্পর্কে একটা কথা জানতে পেরেছে। এই মেজর ঠিক কতখানি ধুরন্ধর তা বলার অপেক্ষা রাখে না নিশ্চয়।
প্রত্যেকের অবস্থা দেখে মনে মনে হাসে জ্যাক। যেনো আবারও সে মাছের সামনে টোপ ফেলতে সক্ষম। মনে মনেই জ্যাক বলে,
~সী ইউ সুন মাশফিয়া রহমান মীম। হ্যা বিলাভড ওয়াইফ অভ মেজর এএকে। সী ইউ সুন। আমাকে করা প্রত্যেকটা আঘাতের বদলে তোমায় আমি শেষ করে দেবো। পুরনো হিসাব এবার বরাবর হওয়ার পালা। এবার আমিও দেখি তোমার মেজর জেনারেল বাপ আর মেজর বর তোমায় কিভাবে রক্ষা করে। আমিও আমার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র নিক্ষেপ করেছি। বার বার তুমি পার পাবে না মীম। বারংবার আমি হেরে যাবো এমন আর হবে না। তোমার ধারণা নেই তুমি ঠিক কতটা বিষাক্ত সাপের লেজে পা দিয়ে ফেলেছো।
..
..
..
..
চলবে____

