প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ৫৫

0
19

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৫৫ (কপি করা নিষেধ)
_______________________________________

এবছর প্রচুর শীত পড়েছে বাংলাদেশে। যে ঢাকায় শীত অনুভব করা আর সাইবেরিয়ায় গরম অনুভব করা সমান কথা সেই ঢাকাতেই কয়েকদিন ধরে হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে। যানযট, অপরিকল্পিত বড় বড় বিল্ডিং যা এখানে সেখানে গড়ে উঠেছে, যে শহরে সবুজের মাত্রা কম আর ধুলাবালির মাত্রা অতিরিক্ত বেশি সেই ঢাকার শীত সহ্য করা এখানের বাসিন্দাদের জন্য কষ্টকর হয়েছে বটে। সকাল, রাতে কুয়াশায় ছেয়ে থাকা পরিবেশ যেন তার সাক্ষী। কয়েকদিন ধরে আবার চলছে শৈত্য প্রবাহে। সূর্য মামার দেখা পাওয়া হয়েছে মুশকিল। তাই শীতের পরিমাণ আরও বেড়েছে। আর আজকের এই রাতে তো সমস্ত সীমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রকৃতিতে নেমেছে বৃষ্টি। তাও যে সে বৃষ্টি নয় পুরো মুশলধারায়।

আর এই শীত, এই শীতের রাতের বৃষ্টি সবকিছুকে উপেক্ষা করে আনমনে হেঁটে যাচ্ছে এক ছন্নছাড়া রমণী। যার অগোছালো জীবন সবে একটু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ছিলো ছন্নমতি সেই জীবন এবার এমন করে ছন্নছাড়া হয়েছে যে গোছানোর সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
রাত এগারোটার কাছাকাছি হবে হয়তো। সঠিক জানা নেই। হোটেল থেকে বেরিয়ে একঘন্টার ও বেশি নিরুদ্দেশ হয়ে উন্মাদের মতো হাঁটছে মীম। গন্তব্য জানা নেই আজ তার। বিয়ের পর থেকেই সারাদিন নীড় হারা পাখির মতো উড়ে বেড়ালেও একটা সময় যে নীড়ে তার ফেরা ছিলো বাধ্যতামূলক সেই নীড়ে আজ ফেরার কোনো তাড়া নেই। নিজ ইচ্ছায় যে খাঁচায় ছন্নমতি নিজেকে বন্দী করতে অনুমতি দিয়েছিলো আজ সেই খাঁচার মালিক খাঁচার দুয়ার খুলে দাঁড়িয়ে আছে। এই দুয়ার খুলে দেওয়া কি তাকে আবারও নীড় ছেড়ে উড়ে যাওয়ার অদেখা আদেশ নয়?

অবাধ্য চোখদুটো ও যেনো এক অন্য লোকের সাথে সন্ধি করেছে। বিরামহীন অশ্রুকণায় সিক্ত করছে বর্ষার পানিতে সিক্ত গালকে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা পানির উপর চোখ থেকে নির্গত গরম পানির প্রলেপ পড়ে চলেছে অনবরত। অথচ রহমতের পানিতে সেই উষ্ণ তরল কি নিদারুণ নিজেকে আড়াল করে ফেলেছে।

এতো রাতেও দুই একটা রিকশা দ্বখা যাচ্ছে যার চালকেরা কমদামী রেইনকোট দিয়ে নিজেদের ঢেকে নিয়ে রিকশা চালাচ্ছে। হয়তো পেটের তাগিদটা বেশিই তাইতো শীত, বর্ষা উপেক্ষা করে কর্ম করে যাচ্ছে। এক এক রিকশাওয়ালা মীমের পাশাপাশি যেতে যেতে বলে,

“আফা কই যাবেন?”

“….”

“আফা যাবেন নি?”

“….”

“ধুর।”

মীমের উত্তর না পেয়ে রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়ে তা প্রকাশ করেই রিকশা টান দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এদিকে রিকশাওয়ালার পকেটে রাখা ফোন থেকে এখনো মীমের কানে পুরনো এক বাংলা ছায়াছবির গান ভেসে আসছে,

“কিছু কিছু মানুষের জীবনে……
ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল……..
……..সারাটি জীবন ভরে দিতে হয়
……..শুধু সেই ভুলের মাশুল ”

আর শোনা যাচ্ছে না। আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে আসছে। হয়তো রিকশাওয়ালা দূরে চলে গিয়েছে এতোক্ষণে। মীমের মনে পড়ে ভিকারুননিসায় পড়াকালীন সে মৌনতা আর তার বন্ধুরা মিলে কি পরিমাণে হাসি মজা করতো বাংলা ছায়াছবির কিছু কিছু গান নিয়ে। কোথায় বাংলা ব্যান্ড মিউজিক যা কিনা বাঙালির আবেগে জুড়ে আছে আর কোথায় বাংলা ছায়াছবির কিছু গান যা কিনা কিছু বলার মতো রাখে না। অথচ আজ এই গান শুনে তার নিজের জীবনের সাথে কি ওতোপ্রোতো ভাবে মিলই না মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেনো গীতিকার এই গান মাশফিয়া রহমান মীম নামের এক সর্বহারা নারীর উদ্দেশ্যেই লিখেছেন। গানের সুর মিলিয়ে যেতে যেতেই ছন্নমতি রমণীর ঠোঁটে তাছিল্যের হাসি ফোটে। তার মনে পড়ে মাত্র একঘন্টা আগে তার জীবন ঠিক কিভাবে বদলে গিয়েছে।

তনু একটা লাল গোলাপ নিয়ে অনিকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

“আমি আপনাকে ভালোবাসি অনিল ভাই। আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?”

দুরুদুরু বুক নিয়ে তাকিয়ে আছে সবাই। কিন্তু মীমকে বেশ ভারমুক্ত দেখালো। সে হয়তো ভাবছে তার মতোই তার স্বামীও করবে।

কিন্তু তার সকল বিশ্বাসের গোড়া থেকে উপরে ফেলে মেজর এএকে ওরফে অনিল আবরার খান তনুর হাত থেকে ফুল টা গ্রহণ করে হাসি মুখে।

মীম শরীরের ভর ছেড়ে দু’কদম পিছনে সরে যায়। এক কোণায় থাকায় কেউ না দেখলেও দেখলো ফেম স্টারস আর মৌনতা। চোখ দুটো ঝাপসা হলো বুঝি।
এদিকে খুশীতে তনু সবার সামনেই অনিলকে জড়িয়ে ধরে। ঠিক সেই সময়ে নিজের পেটে হাত দেয় মীম। হয়তো তার বাচ্চাকে বাবার করা এমন নিষ্ঠুরতম কাজের সাক্ষী রাখলো।

শুধু সেখানেই থেমে গিয়েছিল এমন নয়। তনু তার সাইড ব্যাগ থেকে একটা আংটি বের করে অনিলের উদ্দেশ্যে নিজের বাম হাত বাড়িয়ে ধরে। অনিল আবরার খান কি অবলীলায় মীমের চোখে চোখ রেখে নিজের হাত এগিয়ে দেয়। সেই হাত সানন্দে আঁকড়ে ধরে তনু। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে যখন অনিলের বাম হাতের অনামিকায় আগে থেকেই একটা প্লাটিনামের আংটি পরা থাকায়। তনু একবার ভ্রুকুঞ্চন করে অনিলের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভেবে সেই আংটি টেনে খুলে তার ডান হাত দিয়ে মাথার উপর দিক হতে পিছনে ছুড়ে মারে। তারপর নিজের আনা আংটি অনিলের বাম হাতের অনামিকায় পরিয়ে দেয়। অনিল হাস্যজ্বল চেহারা নিয়েই তনুর দিকে তাকিয়ে আছে। একবার তার সামনে অথচ তনুর পিছনের একটা কোণে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীর পানে চেয়ে দেখে। অথচ মেয়েটার চোখে সে কোনো অনুভূতিই দেখতে পেলো না। মেয়েটা কি তার মতোই চেহারায় নির্লিপ্ত ভাব রাখার কৌশল আয়ত্ত করেছে নাকি!
এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড মীম সেই গাঢ় বাদামী চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো মীম। ততক্ষণে তার পায়ের কাছে তনুর ছুড়ে ফেলা তাদের ফার্স্ট নাইটে মীমের পরিয়ে দেওয়া অনিলের আংটিটা গড়িয়ে গিয়ে তার জুতার সাথে বেঁধে থেমে গেছে। গাঢ় বাদামী চোখের থেকে নিজের আদ্র অবিশ্বাস্য চোখ দুটো সরিয়ে নিচু হয়ে সেই আংটি তুলে হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকে। তারপর তা মুঠোবন্দি করে তার আশেপাশে থাকা অনিলের বন্ধুরা ও মৌনতাকে উদ্দেশ্য করে কাঠকাঠ গলায় বলে উঠলো,

“যদি কখনো এক সেকেন্ডের জন্যেও আমাকে নিজেদের কেউ মেনে থাকেন তবে আমার বাচ্চার কথা যেনো অনিল আবরার খান আপনাদের দ্বারা জানতে না পারে।”

সকলের মুখেই হতাশার ছায়া। কারোই যে কিছুই করার নেই। এই ভয়টাই তো পেয়েছে তাদের অনিল অনেকটা আগে থেকে। মীমের মতো কঠিন সত্ত্বার মেয়ের এভাবে ভেঙে পড়া যে কিছুতেই মানার মতো নয়। মীম এক পা দুপা করে পিছিয়ে যেতে থাকলে মৌনতা তার সাথেই যেতে পা বাড়ায় এমনকি ইবনাত, রনি, তাহমিদ আর সাদাফ ও। সাথে সাথেই মীম আবার বলে,

“আমার সাথে বা পিছু আসলে আজকের পরে আমাকে আর কেউ কখনো খুঁজে পাবেন না। আমাকে একা ছাড়ুন। কেউ আসবেন না আমার সঙ্গে এমনকি মৌ ও নয়।”

সকলের পা চলন্ত পা থামে। মেয়েটাকে একটু নিজের মতো ছাড়া উচিত ভেবে আর এগোই না কেউ। এদিকে অনিল দেখে পুরো দৃশ্যটা। কাঁপতে থাকা হৃদয় নিয়ে সে দেখে তার প্রাণভোমরা তারই দেওয়া একবুক কষ্ট নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। অথচ সে চাইলেও এই মূহুর্তে সবকিছু ফেলে ছুটে যেতে পারছে না।
.
.
.
.
মৌনতা নিজে যেতে না পারলেও মেজর জেনারেলের কাছে ম্যাসেজ করে ঘটনার সারসংক্ষেপ বলে মীমের খোঁজ নিতে বলেছে। তিনি বাড়িতে থাকায় ইতোমধ্যে তার ধানমন্ডির বাড়ি থেকে উত্তরার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে গাড়ি নিয়ে। কারণ মীমের ফোনের শেষ লোকেশন অনুযায়ী সে উত্তরা থেকে গাজীপুর যাওয়ার রাস্তায় দেখাচ্ছে। যা অনবরত সেই রাস্তা দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।

এখন আর বৃষ্টি হচ্ছে না। কিন্তু বৃষ্টির পরে কুয়াশার মিশ্রনে অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধুলোবালি ভরে যাওয়া রাস্তাঘাট পরিষ্কার হয়ে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। রাস্তার পাশের গাছ গুলোর পাতার উপরের ধুলো ধুয়ে প্রকৃতি হয়েছে সবুজ। কিন্তু এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আকর্ষণ করতে অপারগ বাবা ও স্বামী রুপি দুইজন দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পুরুষকে। তার অস্থির হয়ে পাগলের মতো খুঁজে চলেছে একটা মেয়েকে। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না সেই রমণীর কোনো হদিস। দুইজনের দুইটা গাড়ি থেকে এখন ছয়জনের ছয়টা গাড়ি খোঁজে নেমেছে মেজর বধূর। ফেম স্টারস আর মেজর জেনারেল হামিদুর রহমান হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে মীমকে। রাস্তার একপাশে লোকেশন অনুযায়ী যেয়ে থামে একসাথে ছয়টা গাড়ি। ছয়জন পুরুষ সাথে মৌনতা নামে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে রাস্তাটা উত্তরা ছেড়ে গাজীপুরের রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। জায়গাটা পুরোপুরি ফাঁকা। জনমানবহীন জায়গায় একটা মার্কেট মতো দেখা যাচ্ছে। অনিল অনাবরত কল দিয়ে চলেছে মীমের ফোনে। এখানে নামার পর আবার যখন কল করে তখন রিং শোনা যায়। একটু খুজেই পাওয়া যায় তা। রাস্তার পাশে পড়ে বেজে বেজে কেঁটে যাচ্ছে। ফোনটা হাতে তুলে নেয় অনিল। কিন্তু মীমের খোঁজ নেই। পাগলের মতো করছে অনিল। কি করবে ভেবেই পাচ্ছে না কিছুতেই। আশেপাশে তাকিয়ে হয়তো কিছু খুঁজছে। পেয়েও গেলো জলদি। মার্কেটের একটা দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা দেখা যাচ্ছে। অনিল দ্রুত দোকানের উপরে দেওয়া নাম্বার নিয়ে তাতে কল করে নিজের পরিচয় দিয়ে সেই রাত দুইটার সময় দোকানীকে এনে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে।

ফুটেজে রাস্তার উপর পরিষ্কার কিছু দেখা না গেলেও মীমের শরীরের পোশাক দেখে নিশ্চিত হয়। তারপর একটা গাড়ি এসে থামে। কথাবার্তা ছাড়াই মীমের নাকে রুমাল চেপে তাকে গাড়িতে উঠিয়ে গাড়ি রাস্তার মোড় ঘুরে আবার ঢাকার দিকে চলে যায়। মীমের ফোনটা হয়তো তখনই পড়েছে রাস্তায়। অ*প*হর*ণকা*রী কারো চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। গাড়িতে যে নাম্বার প্লেট আছে তা কোনো শিশুও বলতে পারবে এটা নকল। অন্যসবাই অস্থির হয়ে উঠলেও হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যায় মেজর। কঠিন ঝড় ওঠার আগে যেমন প্রকৃতি নিরব হয়ে যায় বর্তমানে মেজরের অবস্থা তেমনই।

..
..
..
চলবে____

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here