প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ৫৪

0
18

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৫৪ (কপি করা নিষেধ)
________________________________________

অনিল দেখলো তার বউ লজ্জা পাচ্ছে। তাই লজ্জা বাড়িয়ে দিতে আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওয়াসরুমের দরজায় কেউ নক করে।

“ধুর বউয়ের সাথে একটু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবো তার ও উপায় নেই। সবাই আমার শত্রু দেখছি।”

প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে বলে অনিল। এদিকে মেজরের লাগামহীন কথায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছে মীম।

“একজন মেজর হয়ে এমন হোটেলের লেডিস ওয়াসরুমে ঢুকে লোকচক্ষুর আড়ালে বউকে জড়িয়ে রাখা কি আপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ জনাব?”

এক ভ্রু উঁচু করে মেজরের কুঁচকে রাখা চোখের দিকে তাকিয়ে বললো মেজরের হাইনেস। কুঁচকে রাখা চোখ স্বাভাবিক করে স্বীয় স্ত্রীকে একপলক দেখে নিয়েই মেজর আরও একধাপ এগিয়ে যায় লাগামহীনতার।

“আপনার ঠোঁটে এতো গাড় লিপস্টিক কেন দিয়েছেন ম্যাডাম? এতো গাড় লিপস্টিক ভালো লাগছে না দেখতে। আসুন আমি হালকা করে দিচ্ছি।”

“আরে না। অনিল……….”

অনিলের হাইনেসের সেই বাক্য আর পূর্ণতা পেলো না। তার আগেই তার ঠোঁটের ম্যাট লিপস্টিক হালকা হয়ে গেলো তার ব্যক্তিগত রিমুভার দ্বারা।
.
.
.
.
সবাই পার্টিতে আনন্দ করছে। এক কোণে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে মীম। সে যে এমন নির্লিপ্ত থাকে এসব পার্টিতে তা নয়। কিন্তু এখন তার মধ্যে একটা প্রাণ রয়েছে। তার আর তার মেজরের অংশ। জানার পর থেকেই অতিরিক্ত সাবধান থাকছে অনিল বধূ। তখন অনিলের সাথে যখন দেখা হয় তখন জানাতে চেয়েও পরে পিছিয়ে গিয়েছিল। কারণ মেজরকে আয়োজন করে জানাবে সে এই খুশীর খবর। তারউপর লোকটা পাগলামি করছিলো তখন প্রচুর তাই আরও বলা হয়নি। মৌনতাও সাথে রয়েছে তার। তারা দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরে অনিল বাদে বাকি চারজন এসে ওদের দুজনের সাথে দাঁড়িয়েছে। সাদাফ, রনি, তাহমিদ আর ইবনাত। এসেই ইবনাত বলে,

“কংগ্রাচুলেশনস মীম। আর ধন্যবাদ।”

মীম একবার তার দিকে তাকিয়ে পরে আবার মৌনতার দুকে দেখে। সে বোঝে ইতোমধ্যে তার প্রেগন্যান্সির খবর ইবনাত জেনেছে মৌনতার থেকে। সে মুচকি হাসে। এদিকে অন্যরা কিছু বুঝতে না পেরে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আছে মীম আর ইবনাতের দিকে। ইবনাত সে দৃষ্টি খেয়াল করে বলে,

“আরে ব্যাটা চাচা হতে যাচ্ছিস। মেজর ছক্কা মেরে দিয়েছে।”

মীম লজ্জায় হাসফাস করে ওঠে। আর বাকিরা খুশীতে ডগমগিয়ে উঠল। সবাই কতরকম ভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছে। মীম শুধু বলে,

“মেজরকে বলবেন না ভাইয়া প্লিজ। সারপ্রাইজ দিবো ভাবছি।”

সবাই হেসে ওঠে প্রাণবন্ত। একপাশে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে কথা বলায় কেউ বুঝলো না তাদের ভিতরের কথপোকথন। এদিকে অনিল বন্দিপ্রায় তনু আর তার বন্ধুদের কাছে। সে দেখেছে এদের হাসাহাসি। তার প্রেয়সীর লজ্জারুণ রুপ। এমন রুপ দেখে এখন তার থেকে দূরে থাকার নিদারুণ কষ্ট পাচ্ছে সে। ছুটে যে মেয়েটাকে বুকে টেনে নিয়ে অশান্ত মনটা একটু শান্ত করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগছে। কিন্তু কিছুতেই আলাদা হতে পারছে না ওই গ্যাং এর হাত হতে।
এদিকে মীমের কেন জানি আজ সহ্যই হচ্ছে না তনু আর অনিলের কাছাকাছি থাকা। সে কিছু বলতেও পারছে না আর না পারছে সহ্য করতে। মীমের চোখের ক্রোধ দেখে অনিলের বন্ধুরা একে অপরকে দেখে গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এখন যে পরিস্থিতি আরও গোলমেলে হয়ে গেলো। একটা নতুন প্রাণ না এসবের স্বীকার হয়।
.
.
.
.
অয়ন মাইক হাতে নিয়ে বলে,

“ডিয়ার ফ্রেন্ডস, সিনিয়রস এন্ড জুনিয়রস লেটস এনজয় দ্যা পার্টি। লেটস হ্যাভ আ ডান্স।”

বেশিরভাগ মানুষ হাততালি দিয়ে ডান্স করার জন্য যারযার পার্টনার সিলেক্ট করে ডান্স করে। তনু জোর করে অনিলের হাত ধরে নিয়ে যায় ডান্স ফ্লোরে। মীম কটমট করে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। অনিল বউয়ের চোখে তাকিয়ে ঢোক গিলে না চাইতেও গেলো। ওদিকে অয়ন এসে মীমকে অফার করে তার সাথে ডান্স করার জন্য। মীম রিজেক্ট করতে যেয়েও করে না অনিল তনুকে দেখে। কিন্তু আবারও নিজের অনাগত সন্তানের কথা ভেবে ভদ্রভাবে মানা করে দেয়। অয়নের ইগোতে লাগে ব্যাপারটা। তাও কিছু না বলে হেসেই এগিয়ে যেয়ে চিত্রার সাথে ডান্স করে।

ডান্স শেষে আবারও অয়ন মাইক নেয় হাতে। সবাই ডান্স থামিয়ে গোল হয়ে অয়নকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। অয়ন বলে,

“আপনারা আমার দাওয়াত রক্ষা করে এখানে এসেছেন আমি ভীষণ খুশী হয়েছি। আসলে আজ আমার জন্মদিনেই আমি আমার জীবনের অন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপে আমি যেতে চাই। আমি চাই আমার এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে আপনারাও সাক্ষী থাকেন।”

এবার সে এগিয়ে যায় এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মীমের দিকে। কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করে সে মীমের হাত ধরে আগের জায়গায় নিয়ে আসে। পার্পল গাউনে মীমকে এমনিতেই চোখ ধাঁধানো সুন্দর লাগছে তারউপর এখান আবার সকলের মধ্যেমনি হয়ে অসংখ্য লাইটের আলোতে একদম একটা জীবন্ত ডিজনি প্রিন্সেস লাগছে। গলায় পরা মুক্তোর মালায় আলোর প্রতিফলন হয়ে ফিরে যাচ্ছে অন্যদের চোখে। হতভম্ব হয়ে কিছু বলতেও ভুলে গেলো মীম। চোয়াল শক্ত করে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কিন্তু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে অনিল। তার বুঝতে বাকি নেই এখন কি হতে চলেছে। এবং তার ধারণা সঠিক করে অয়ন সর্ব সম্মুখে মীমের এক হাত ধরে হাটু গেড়ে তার সামনে বসে।

“সেদিন ভার্সিটির গেট দিয়ে ঢুকেই দেখি এক জায়গায় ছাত্র-ছাত্রী আর টিচারদের জটলা হয়ে গিয়েছে। কৌতূহল বশত এগিয়ে যেয়ে দেখি এক ছোটখাটো মেয়ে ভার্সিটির ত্রাশ, পাতি নেতাকে বেধড়ক মারধর করছে। তার চোখে আগুন জ্বলছে যেনো। তৎক্ষণাৎ আমার হৃদয়ে আলোড়ন তৈরি হয়। আমি কিছু অনুভব করি যা আগে কখনো করিনি। কারো জন্য এর আগে এতো ছটফট করিনি কখনো। আমি সেই অনুভূতির নাম দিলাম ভালোলাগা। ধীরে ধীরে তার সাথে আলাপ বাড়লো আর আমার হৃদয়ের ছটফটানি ততই বাড়লো। একসময় বুঝলাম সে ছাড়া আমি কিছুই না। তাকে আমার লাগবেই। তখন মনের ভুল দূর হয়ে যায়। আমি বুঝে ফেললাম সে আমার ভালোলাগা নয় সে আমার ভালোবাসা। আর.. আর সেই মেয়েটা তুমি মাশফিয়া রহমান মীম। হ্যা আমি তোমাকেই ভালোবাসি। ক্যান ইউ প্লিজ বি মাইন?”

অনিল নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারছে না। শুধু তার পেশাদারিত্ব তাকে কঠোর ধৈর্য্য শিখিয়েছে বলে সে এখনো প্রতিক্রিয়াহীন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার দিকে অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছে তার চার বন্ধু। আর অনুনয় নিয়ে তাকিয়ে আছে তার বিবাহিতা স্ত্রী যার হাত ধরে সর্ব সম্মুখে অন্যকেউ ভালোবাসার প্রকাশ করছে।

মৌনতা অবাক হয়ে গিয়েছে অনিলের নির্লিপ্ততায়। কাউকে তাদের বিয়ের কথা এতোদিন বলেনি বলে আজকে এমন একটা মূহুর্তে ও যে কেউ নির্লিপ্ত থাকতে পারে এটা দেখেই সে বিশ্বাস করতে পারছে না। অনিল ভাই তো এমন নয়। তবে?

মীম স্বামীর পানে আশা আকাঙ্ক্ষা ভরা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হতাশ হয়। সেই হতাশ দৃষ্টি সহ্য হয়না মেজরের। সে নিজের চোখ সরিয়ে নেয় ওই কাতর দৃষ্টি হতে। তার বিশ্বাস আছে তার অগ্নিকন্যা ঠিক সামলে নিবে পরিস্থিতি। হলোও তাই। অনিলের দৃষ্টি নামানো দেখে হাজার প্রশ্ন মনে জাগলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে মনোযোগ দিলো মীম। আলতো করে অয়নের হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে দুই পা পিছিয়ে খুব সন্তপর্ণে আরও একবার অনিলের দিকে তারপর অয়নের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বলে,

“আমি কখনো তোমাকে সেই নজরে দেখিনি অয়ন। শুরু থেকেই শুধু বন্ধুর নজরে দেখেছি।”

“দেখোনি তো কি হয়েছে এখন থেকে দেখবা।”

“সম্ভব নয় অয়ন।”

“কেন?”

“কারণ আমি বিবাহিতা।”

গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া সবার মাঝেই বাজ পড়লো হয়তো। তনুর ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফোটে। অয়নের চোয়াল শক্ত হয়।

“বিশ্বাস করছি না আমি। তুমি মিথ্যা বলছো।”

“তোমার বিশ্বাস করা বা না করাতে আসলে আমার কিছুই যায় আসে না। তাই তোমার যা খুশী ভাবতে পারো।”

অয়ন উঠে দাঁড়িয়েছে আরও আগেই। সে কিছুই বলছে না। এবার নিজেদের জানা কথার সত্যতা নিশ্চিত হতে লিপি বলে,

“তবে তোমার হাসবেন্ড কে মীম?

মীম কিছুক্ষণ চোখ বুজে নিজেকে কিছু বললো হয়তো। তবে এবার ভুলেও অনিলের দিকে তাকায় না।

” আমার হাসবেন্ড একজন মেজর। মেজর এএকে।”

এবার সবার মাঝে গুঞ্জন শুরু হয়। সেসব গুঞ্জনের মাঝেই কেউ জিজ্ঞেস করে,

“যে মেজর চক্র খু*নের কে*সের তদন্তে আছে, যে আহত হয়ে অস্ট্রেলিয়া চিকিৎসার জন্য আছে সে?”

“হ্যা।”

“বিয়ে কবে হয়েছে তোমাদের?”

এক সিনিয়র জিজ্ঞেস করে। তার জবাবে মীম বলে,

“তার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার খবর বের হওয়ার আগেই।”

“ওহ।”

পরিস্থিতি চুপচাপ হয়। মীম পিছিয়ে যায়। অয়ন ইশারায় তার বন্ধুদের দিকে। এবার নির্জন মাইক নিয়ে বলে,

“পরিস্থিতি যদিও কিছুটা ঘোলাটে তবুও আমরা প্রি প্ল্যান অনুযায়ী আরও একটা কাজ করবো। আশাকরি এবার আর হতাশ হতে হবে না।

তনু…”

তনু আসে মাঝে। তার চেহারায় অন্যরকম আলো যেনো ঝলমল করছে। সে মাইক নিয়ে বলে,

“অনিল ভাই প্লিজ সামনে আসবেন?”

ধক করে ওঠে মীমের আত্মা।
অনিলের মনে হলো তার কফি*নে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে সুরাইয়া তনিমা জালাল। তবুও সে যায় সামনে। তনু একটা লাল গোলাপ নিয়ে অনিলেরর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

“আমি আপনাকে ভালোবাসি অনিল ভাই। আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?”

দুরুদুরু বুক নিয়ে তাকিয়ে আছে সবাই। কিন্তু মীমকে বেশ ভারমুক্ত দেখালো। সে হয়তো ভাবছে তার মতোই তার স্বামীও করবে।

কিন্তু তার সকল বিশ্বাসকে গোড়া থেকে উপরে ফেলে মেজর এএকে ওরফে অনিল আবরার খান তনুর হাত থেকে ফুল টা গ্রহণ করে হাসি মুখে।

মীম শরীরের ভর ছেড়ে দু’কদম পিছনে সরে যায়। এক কোণায় থাকায় কেউ না দেখলেও দেখলো ফেম স্টারস আর মৌনতা। চোখ দুটো ঝাপসা হলো বুঝি।
এদিকে খুশীতে তনু সবার সামনেই অনিলকে জড়িয়ে ধরে। ঠিক সেই সময়ে নিজের পেটে হাত দেয় মীম। হয়তো তার বাচ্চাকে বাবার করা এমন নিষ্ঠুরতম কাজের সাক্ষী রাখলো।

..
..
..
চলবে___

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here