প্রভামঞ্জরী #নওরোজ_মীম পর্বঃ ৫৬

0
20

#প্রভামঞ্জরী
#নওরোজ_মীম
পর্বঃ ৫৬ (কপি করা নিষেধ)
_____________________________________

রাতের শেষভাগে এসে ঠেকেছে প্রকৃতি। শীতের এই রাতে এখনো বৃষ্টি পড়ছে গুড়িগুড়ি। আর এই গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতেই শীতের পরিমাণ আরও বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু এই শীতের রাতে লেপ, কম্বলের নিচে আরামদায়ক ঘুম উপেক্ষা করে জাগ্রত গুটিকয়েক মানুষ। কেউ জীবিকার তাগিদে। কেউ নেশার তাগিদে। কেউ আবার ইচ্ছে-পূরণ তাগিদে। কেউবা কোনো পাশ*বিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।
নারায়ণগঞ্জ এর কাঁচপুরের ব্রিজ পার হয়ে অনেক ভেতরের একটা গ্রামের প্রবেশ মুখেই অপেক্ষারত রয়েছে দেশি-বিদেশি মিশেলে অর্ধশতাধিক বডিগার্ড মতন লোক। হাট্টাগোট্টা শরীরের লোকগুলো শিকারী দৃষ্টিতে যেনো পাহারা দিচ্ছে গ্রামের প্রবেশ পথ। যেনো তাদের ফাঁকি দিয়ে একটা মশাও আজ সেই গ্রামে প্রবেশের অনুমতি পাবে না। এই গ্রামেরই প্রায় শেষপ্রান্তে শীতলক্ষ্যা তীর ঘেষে জালাল সাহেবের সেই পুরনো পরিত্যক্ত গোডাউন অবস্থিত। যা তার মেয়ে সুরাইয়া তনিমা জালাল নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। এবং তার প্রয়োজন মোটেই ভালো কোনো কাজ নয়। পাশবিক, অমানবিক কাজেই সে ব্যবহার করে বাপ-দাদার এই সম্পদ। যেমন আজ এই শীত বর্ষার রাতেও আরও একবার জ্বলে উঠেছে এই গোডাউনের লাইট। আজকেও এক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজে লাগবে বাবার সম্পত্তি।

সেনাবাহিনীর একটা টীম শীতলক্ষ্যা নদীতে ট্রলারের সাহায্যে ওই গ্রামের কিনারে ভিড়িয়ে গোডাউনের উদ্দেশ্যে যায়। আর ওই টীমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং মেজর এএকে। তার সাথে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান।সহ নয়জন সদস্য। সবাই তারা নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরিহিত। মেজর এএকে সেই চট্টগ্রাম মিশনের মতো এবারেও ঘাড়, গলা, মুখ, কপাল ঢেকে রাখা মাস্ক পরে উপরে তার ইউনিফর্ম এর টুপি পরা। তীক্ষ্ণ গাঢ় বাদামী চোখদুটো আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। গাঢ় বাদামী মণির চারপাশের সাদা অংশের রঙ পালটে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। চোয়াল হয়েছে সর্বদার থেকে কয়েকগুণ বেশি শক্ত। যা মাস্কের বাইরে দিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারছে অন্য সেনাসদস্যরা। এদিকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমানের অবস্থাও একই। জুনিয়র তুখোড় বাছাইকরা কিছু সদস্য রয়েছে মেজর এএকের টীমে। সেই নির্ভীক অফিসারেরা পর্যন্ত দুই সেনাকর্তাকে দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছে রীতিমতো।

রাস্তা ধরে গ্রাম প্রবেশের পথে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন তাহমিদ ও তার নেতৃত্বে বিশাল এক টীম। ক্যাপ্টেনের সাথে কয়েকজন অফিসার সহ রয়েছে অন্যান্য সদস্য সমেত বড়সড় দল। চারটি আর্মি জীপে করে স*শ*স্ত্র তারা এগিয়ে যাচ্ছে বিপদের দিকে। তবুও তারা নির্ভীক। দৃঢ় মনোবল তাদের। তাদের মূলমন্ত্রই যে….

❝সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা,
সর্বত্র আমরা দেশের তরে।❞
.
.
.
.
পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায় মীম। চোখ মেলতে যেয়েও প্রচন্ড আলোতে একদম বিরক্ত হয়ে আবারও চোখ বুজে ফেলে। তারপর আবারও চেষ্টা করে। চোখ মেলে বোঝে যে সে কোথাও একটা বন্দী আছে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছে। একসাথে অনেকগুলো মানুষের উচ্চ হাসির শব্দে এবার পুরোপুরি চোখ মেলে দেখে তার সামনে কিছু পরিচিত মুখ। হতবিহ্বল হয়ে তনু, অয়ন, লিপি, নির্জনকে দেখলো সে। তাদের সাথে থাকা আরও কয়েকজন অপরিচিত মুখ। আর.. আর বহু পুরনো, বহু পরিচিত এক ব্যক্তি জ্যাক। যে তার বিড়াল চোখের সাহায্যে মীমের দিকেই তাকিয়ে আছে। মীমকে চোখ খুলতে দেখে উচ্চ শব্দে হেসেই তার পাশে এসে মেঝেতেই বসে পড়ে। তারপর মেয়েটার মুখে নিজের বা হাতের অনামিকা স্লাইড করতে করতে বলে,

“হ্যালো সুইটহার্ট। লং টাইম হা! ডিডন্ট ইউ মিস মি বেইব? দ্যা ওয়ে আই মিসড ইউ!”

মীম তাজ্জব বনে গিয়েছে। এই জ্যাক তার লন্ডনের প্রতিবেশী ছিলো। এবং তাকে কয়েকবছর ধরেই বিরক্ত করছিলো প্রতিনিয়ত। সে আর মৌনতা নানাভাবে ঝামেলায় না পড়েই সামলাতে চেয়েছে ব্যাপারটা। কিন্তু এই লোক ছিলো ভদ্রতার আড়ালে এক বদ্ধ উন্মাদ। একে আটকানো যাচ্ছিলো না। তার একটাই কথা যে, সে মীমকে ভালোবাসে। আর তার সাথেই মীমকে থাকতে হবে। একদিন তো সুযোগ বুঝে আজকের মতোই মীমকে অজ্ঞান করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো লন্ডনের বাইরর এক জঙ্গলের মধ্যের বাগানবাড়িতে। আর সেখানে যেয়ে একা মীমকে রেপ করার জন্য চেষ্টা করে। তার ধারণা একবার ফিজিক্যালি কাছাকাছি আসলেই মীম আর কখনো তাকে ছেড়ে যাবে না। তাই সেদিন সে চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। কিন্তু সেদিন মীমের ভাগ্য আরও একবার তাকে ওমন পরিস্থিতিতে সাথ দেয়। আল্লাহ তাকে সেদিনও বাঁচিয়ে দেন। নিজের ভাগ্যের জোর, উপস্থিত বুদ্ধির প্রভাব তাকে ওইদিন সাহায্য করে। জ্যাক যখন খালি ঘরে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন সে দৌড়ে উল্টোদিক চলে যায়। আর কিছু না ভেবেই রুমের মধ্যে থাকা একটা ফুলদানি হাতে নিয়ে তা ছুড়ে মারে জ্যাকের দিকে। এদিকে জ্যাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার মাথায় যেয়ে লাগে ফুলদানিটা। সে অর্ধ অচেতন হয়ে মেঝেতে পড়ে যায়। তাও আবার উঠতে চেষ্টা করলেই মীম যেয়ে তাকে আচ্ছামত ধোলাই করে। তারপর হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে বের হয়। ঠিক যেভাবে এখন তার হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছে এরা।

কিন্তু সেদিন জ্যাককে আহত করে তার ওই বাড়ি থেকে বের হয়েও তেমন সুবিধা করতে পারেনি মীম। কারণ তাকে নিয়ে গিয়েছিল অজ্ঞান অবস্থায়। আর সে বেরিয়ে দেখলো যে চারপাশে জঙ্গল আর জঙ্গল। জঙ্গলের ভিতর এই ছোট একটা বাড়ি। সে চারপাশে গাড়ি বা যানবাহন জাতীয় কিছু খুঁজে পায়নি। তাকে নিয়ে জ্যাক এসেছে কিভাবে তাও বুঝতে পারলো না। তবুও হাল না ছেড়ে সে ওই জঙ্গলের মধ্যেই পা চালায়। সে জানতো এই জঙ্গলে হিংস্র জন্তু জানোয়ার বা বিষাক্ত পোকামাকড় অথবা সাপ আছে। লন্ডনের সীমানার এই জঙ্গল বেশ প্রসিদ্ধ এসব দিক থেকে। তবে কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করেই সে চলা আরম্ভ করে। তার ভাগ্য সেদিন এখানেও ভালো ছিলো বিধায় তখনও ধরণীতে দিনের আলো ছিলো। আর কিছুদূর যাওয়ার পরেই সে একটা রিসার্চ টীমের দেখা পেয়ে যায়। যারা ওয়াইল্ড লাইফ নিয়ে রিসার্চ করতেই এই জঙ্গলে এসেছিলো। তাদের সাথেই সহিসালামত লন্ডন পৌঁছে যায়। ততক্ষণে মৌনতা লন্ডন পুলিশের কাছে রিপোর্ট করে তাকে খুঁজতে বের হয়েছে। মীমকে পেয়ে তার থেকে সবকিছু জেনে তা পুলিশের কাছে বলে মৌনতা। পুলিশ জ্যাককে সেই জঙ্গলের বাড়ি থেকেই অচেতন, হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা অবস্থাতেই ধরে। এবং তারপর যেই দুইটা বছর মীম আর মৌনতা লন্ডন ছিলো তারা শান্তিতেই ছিল। কিন্তু আজ এই জ্যাককে আবার দেখে সবকিছুই মনে পড়ে যায় মীমের।

মীমকে ধ্যানে থাকতে দেখেই বাঁকা হাসে জ্যাক। তার আঙুল স্লাইড করতে করতে মীমের ঠোঁটে নামে। সেখানে ছুয়ে দিতেই যেনো ধ্যান ভঙ্গ হয় মীমের। সে তৎক্ষনাৎ জ্যাকের যেই আঙুল তার ঠোঁট ছুইয়ে রেখেছে তা সজোরে কামড়ে ধরে। চিৎকার করে ঝাঁকুনি দিয়ে আঙুল ছাড়িয়ে নেয় সে। মীমের ঠোঁটে এবার তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে যায় সামান্য। সে বলে,

“যেমন কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। তেমন তুমিও যে কোনোদিন ভালো হবে না তা আমি জানতাম। তবে এতো মার খেয়ে, এতো অপমানিত হয়ে, জেল খেঁটেও যে তুমি আমার পিছু ছাড়বে না তা বুঝিনি। আসলে কোন জাতের কুকুর তুমি জ্যাক?”

মুখটা প্রচন্ড প্রশ্নসূচক করে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে আছে মীম। এদিকে জ্যাকের মুখে আঁধার নামে তাকে কুকুর বলাতেই। সে মীমকে উঠিয়ে বসায় একটা পিলারের সাথে হেলান দিয়ে। তারপর কিছু না বলেই ঠাস করে মীমের ডান গালে সর্বশক্তি দিয়ে থা*প্প*ড় মারে। বা দিকে হেলে পড়তে যায় মীম। কিন্তু তার বা দিকের বাহু ধরে রেখেছে জ্যাক। মীম জলন্ত চোখে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই একই জায়গায় আরও একটা থা*প্প*ড় মারে জ্যাক। এবারেও পড়তে পারে না মীম। কিন্তু ঠোঁটের কোনে কেঁটে র*ক্ত ঝরছে। একেই কয়েকঘন্টা একটানা এই কনকনে শীতের রাতে বৃষ্টিতে ভিজে সেই কাপড় আবার গায়েই শুকিয়েছে। জ্বরে অবস্থা ভীষণ শোচনীয় তার। মেজর বধূর নাজুক হালের মধ্যে এমন পাশবিক থা*প্প*ড় তাকে আরও দূর্বল করে দিচ্ছে। তবুও অটল সে। মনোবল অটুট। সে যে যেনে গিয়েছে পুরুষ জাতি ভরসা যোগ্য নয়। উহু একেবারেই নয়।
.
.
.
.
ক্যাপ্টেন তাহমিদের টীম এসে পৌঁছেছে গ্রামের প্রবেশদ্বারে। কিন্তু সরাসরি তারা অমন হাতি সাইজের বডিগার্ড গুলোর আশেপাশে যায়নি। তারা আসলে এখনই মুখোমুখি সংঘর্ষ চাইছে না। কোনভাবে যদি আসল কাল*প্রিটের কাছে খবর চলে যায় তবে সব সামলানোর আগেই তারা সতর্ক হয়ে যাবে। আর হতে পারে তারা হাতের বাইরেই চলে যায়। তাই যতটা সম্ভব বুদ্ধি দিয়েই এগোতে হবে সেনাবাহিনীর। বডিগার্ড গুলোর চোখের আড়ালে থেকেই তাদের উপর নজর রাখছে সেনাবাহিনী। এমন সময় ক্যাপ্টেন একটা ছোট নুড়ি পাথর কুড়িয়ে নেয় রাস্তা থেকে। তারপর তা ছুড়ে ফেলে দূরে। নিরবতার মাঝেই হালকা আওয়াজেই যেনো বিকট শব্দ হয়।
সারি সারি হয়ে ভাগ হয়ে অপেক্ষারত গার্ডদের মধ্যে একটা ভাগ মানে দশজন এগিয়ে যায় শব্দের উৎস খোঁজে। কারণ তারা বিন্দুমাত্র ভুল করতে ইচ্ছুক নয়। কোনভাবেই তাদের ফাঁকি দিয়ে আজ এই গ্রামে কেউ ঢুকতেই পারবে না। তারা সবাই জ্যাকের লোক।
দশজনের দলকে খুব সহজেই সেনাবাহিনীর একাধিক সদস্য ধরাশায়ী করে ফেললো। ওদের মুখ বন্ধ করে সাইলেন্সর লাগানো পি*স্ত*ল দিয়ে আহত করে সবাইকে একে একে তাদের সাথে আনা বড় একটা ভ্যানে উঠিয়ে দেয়।
সেই দল যখন দেরি করছে দেখে অন্যদল এগোয় তখন তাদের অবস্থাও একই হয়। এরপর সেনাবাহিনীর দলটা ক্যাপ্টেন তাহমিদের নির্দেশে এগিয়ে আসে মুখোমুখি হতে। কিন্তু সেনাবাহিনীর সাথে সুবিধা করতে পারেনি তারা। তার আগেই সবাইকেই বাগে এনে ফেলে সেনাবাহিনী।
.
.
.
.
এদিকে ট্রলার থেকে নেমে চুপিসারে এগোতে থাকে মেজর এএকে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুর রহমান ও তাদের টীম। গোডাউনের কাছাকাছি এসে মেজরের নির্দেশে নয়জনের দলটা দুইটা ভাগ হয়ে দুই দিক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে সেই প্ল্যান হয়। এক দলে মেজর সহ মোট চারজন। অন্যদলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সহ পাঁচজন।
মেজর গোডাউনের দক্ষিনের একটা ভাঙা ছোট্ট চারকোনা খোলা জায়গা দিয়ে একে একে প্রবেশ করে। হয়তো যখন গোডাউন চালু ছিলো তখন এই ফাঁকাতে এসি ছিলো।

গোডাউনটা এতো বড় যে ভিতরে ঢুকেও কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা। আর না তো কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তারা এবার ধীরে ধীরে এগোতে থাকে।
.
.
.
.
জ্যাক মীমের উপর অত্যাচার করছে দেখে অয়ন রেগে যায় প্রচুর। সে জ্যাকের পিছনে তাকে আ*ক্র*মণ করতে যেতেই লিপি, নির্জন তাকে আটকায়। আর তনু সাথে সাথে জ্যাকের পাশে গিয়েই মীমের ভেজা চুল ধরে তাকে প্রথমে কথাবার্তা ছাড়াই কয়েকটা থা*প্প*ড় মারে। তারপর তাকে আরও মারতে গেলে তা বডির এদিক ওদিক লাগতে থাকে। একবার পেটে হালকা লাগতেই মীম অনুনয় করে বলে,

“প্লিজ তনু আমার পেটে মেরো না। আমি জানিনা আমার সাথে কিসের জন্য এসব করছো তোমরা জ্যাকের কথায়। কিন্তু প্লিজ আমাকে ছেড়ে দেও। আমি প্রেগন্যান্ট। আমার বাচ্চাটা মরে যাবে।

..
..
..
..
চলবে____

(আগামী পর্বে #প্রভামঞ্জরী প্রথম পরিচ্ছেদের সমাপ্তি হবে। তারপর একটা বিরতি নিয়ে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শুরু করবো।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here