বিপরীত_মেরুর_টানে #পঞ্চম_পর্ব #আরিবা_নাওশীন

0
14

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পঞ্চম_পর্ব
#আরিবা_নাওশীন

ক্লাস শেষে ইউনিভার্সিটির করিডোর দিয়ে রিন্নি আর আরাভ পাশাপাশি হাঁটছিল। আরাভের হাতে একগাদা ফাইল, আর রিন্নি ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। হঠাৎ করিডোরের মোড় ঘুরতেই দেখা গেল তানিনকে। ওকে দেখে আরাভ আবার সেই গুমোট মুখ করল, কিন্তু রিন্নি কিছু বলার আগেই তানিন গিটারের তারে একটা ঝংকার তুলল।

মায়াবী একটা সুর বেজে উঠল পুরো করিডোরে। তানিন চোখ বন্ধ করে খুব দরদ দিয়ে গাইতে শুরু করল–

“তুমি কাঁদিও কাঁদিও, আমারে পরলে মনে
নিরবে কাঁদিও
তুমি গাহিও গাহিও, আমারে পরলে
মনে বিরহের গান গাইও
তাতে যদি মন না ভরে আমারে ডাকিও পাখি,
কোনো এক জোছনা রাতে ব্যথা নিয়া তোমার বুকে আমারে ডাইকা তোমার মনে কথা কইও…”

তানিনের গলার স্বরটা হঠাৎ করেই পাল্টে গেছে। সেই খ্যাপাটে ভাবটা নেই, বরং এক ধরনের গভীর হাহাকার আছে গানে। রিন্নি দাঁড়িয়ে পড়ল। গানের সুরটা কেন জানি সরাসরি ওর মনে গিয়ে ধাক্কা দিল। তানিন গেয়ে চলেছে–

“ওরেওওওও সাধের পাখি, শোনো তোমারে ডাকি
ওরেওওওও সাধের পাখি, শোনো তোমারেই ডাকি
আমারে দুরে রাইখ না, ও পাখি রে
আমারে মনের ঘরে রাইখ, ও পাখি রে
আমারে আছল তুলে পুইষো, ও পাখি রে…”

পুরো করিডোরে পিনপতন নীরবতা। রিন্নি খেয়াল করল, ওর অজান্তেই ওর চোখ দুটো একটু চিকচিক করছে। কেন জানি গানটা শুনে ওর মনে হলো, মানুষটা সত্যি হয়তো ওকে অনেক বেশি ভালোবাসে।

রিন্নি একটু ইমোশনাল হয়ে পড়ল। সে মনে মনে ভাবল, “সবাই তো আমাকে শাসন করে, প্রফেসর তো শুধু বকেই যায়, কিন্তু তানিন ভাই তো আমাকে নিয়ে এভাবে ভাবে!”

রিন্নি মুগ্ধ হয়ে তানিনের দিকে তাকিয়ে রইল। আরাভ এতক্ষণ চুপ করে সবটা দেখছিল। রিন্নির চোখে মুগ্ধতা দেখে আরাভের চিবুকের হাড় শক্ত হয়ে এল। সে দেখল রিন্নি যেন তানিনের সুরের মায়াজালে আটকে গেছে।

গান শেষ হতেই তানিন গিটারটা নামিয়ে রিন্নির দিকে তাকাল। তার চোখে তখন জল টলমল। সে ধীর স্বরে বলল, “রিন্নি, তোমাকে হারানোর ব্যথাটা হয়তো আমার এই গানেই থেকে যাবে। তুমি সুখে থেকো।”

রিন্নি গলা পরিষ্কার করে আমতা আমতা করে বলল, “তানিন ভাই… আপনি এত সুন্দর গাইতে পারেন? আমি তো জানতাম না। সত্যি বলছি, আমার খুব ভালো লেগেছে।”

তানিনের মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে আরাভের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে চলে গেল। রিন্নি দীর্ঘক্ষণ সেই চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরাভ এবার আর থাকতে পারল না। সে কড়া গলায় বলল, “কী হলো? এখানেই কি দাঁড়িয়ে মূর্তির মতো রাত পার করবেন নাকি ল্যাবে যাবেন?”

রিন্নি একটু ঝাড়ি দিয়ে বলল, “আপনি সব সময় এত কর্কশ কেন স্যার? মানুষটা এত সুন্দর গান গাইল, তার কোনো প্রশংসা নেই? আপনি তো জীবনে একটা কলিও গান গাইতে পারবেন না। সারাদিন শুধু অ্যাসাইনমেন্ট দাও আর টাইম মেনটেইন করো!”

আরাভ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। “প্রশংসা? যে কাজটা অহেতুক ইমোশন তৈরি করে, তার প্রশংসা আমি করি না। আর গান গেয়ে কি জীবন চলে? রিন্নি, আপনি এখনো অনেক ছোট, তাই সস্তা আবেগ দেখে গলে যাচ্ছেন।”

রিন্নি এবার রেগে গেল। টেনে টেনে বলল, “আমি সস্তা আবেগ বুঝি না স্যার। আমি বুঝি যে মানুষের মন বলে একটা জিনিস আছে। আপনার ওই বুকের ভেতর তো পাথর। আপনি কোনোদিন কারো মনের কথা বুঝতে পারবেন না। আপনি শুধু ইকুয়েশন বুঝবেন!”

রিন্নি হনহন করে হেঁটে আগে চলে গেল। আরাভ পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত মুঠো হয়ে এল। সে মনে মনে বলল, “পাথর? আমার বুকের ভেতরটা কি সত্যিই পাথর? নাকি কেউ কোনোদিন সেই পাথরটা সরানোর চেষ্টাই করেনি?”

বিকালে বাসায় ফেরার পর রিন্নি খুব চুপচাপ হয়ে গেল। তানিনের গানটা ওর মাথায় বার বার বাজছে। রাতে আরাভ একটা টেক্সট করল “কালকের ভাইভার সিলেবাস দেখেছ?”

রিন্নি উত্তর দিল “সিলেবাস দেখিনি, আর দেখার ইচ্ছেও নেই। আপনি তো রোবট, আমাকে মানুষ ভাবতে পারেন না।”

আরাভ আর কোনো রিপ্লাই দিল না। কিন্তু এক ঘণ্টা পর রিন্নির ফোনের ওপাশে একটা অডিও ক্লিপ এল। রিন্নি অবাক হয়ে ক্লিপটা প্লে করল।

অডিওটা চালু হতেই রিন্নি থমকে গেল। কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই, শুধু একটা গম্ভীর আর ভীষণ সুপুরুষ কণ্ঠস্বর। আরাভ গাইছে সেই একই গান!

“…বড় ইচ্ছে করছে ডাকতে, তার গন্ধ মেখে থাকতে
কেন সন্ধ্যে সন্ধ্যে নামলে সে পালায় !
তাকে আটকে রাখার চেষ্টা আরো বাড়িয়ে দিছে তেষ্টা
আমি দাঁড়িয়ে দেখছি শেষটা জানলায় !
বোঝেনা সে বোঝেনা বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা সে বোঝেনা , বোঝেনা সে বোঝেনা
বোঝেনা বোঝেনা বোঝেনা
বোঝেনা বোঝেনা বোঝেনা …”

আরাভের গলার স্বরটা তানিনের মতো অতটা কাব্যিক নয়, কিন্তু এতে এক ধরনের তীব্র অধিকারবোধ আর অদ্ভুত এক মাদকতা আছে। গানের সুরের চেয়ে গানের প্রতিটি শব্দে যেন সে রিন্নিকে নিজের করে পাওয়ার এক অঘোষিত দাবি জানাচ্ছে। রিন্নি বিছানায় উঠে বসল। ওর হৃদপিণ্ড তখন অনিয়মিত স্পন্দনে ধুকপুক করছে।

গানটা শেষ করে আরাভ অডিওর শেষে খুব নিচু গলায় বলল, “রিন্নি, গান গাইতে পারি না বলে আমার মন নেই—এটা আপনার সবচেয়ে বড় ভুল ইকুয়েশন ছিল। আশা করি কাল ল্যাবে আসার আগে এটা মনে রাখবেন।”

রিন্নি বালিশটা জাপটে ধরল। তার রাগ আর মুগ্ধতা সব একাকার হয়ে গেছে। সে মনে মনে ভাবল, “এই লোকটা কি আস্ত একটা রহস্য? একদিকে হিটলার, আরেকদিকে এমন একটা কণ্ঠ!”

পরদিন সকালে আরাভ যখন তার বাইক নিয়ে রিন্নিদের গেটের সামনে এসে দাঁড়াল, রিন্নি বাসা থেকে বেরিয়ে এল। আজ তার সাজটা একটু আলাদা। চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক।

আরাভ বাইকের স্ট্যান্ড নামিয়ে বলল, “উঠুন। আজকে আপনার ভাইভা।”

রিন্নি বাইকে উঠতে উঠতে ফিসফিস করে বলল, “কালকের অডিওটার জন্য ধন্যবাদ।”

আরাভ হেলমেটটা মাথায় দিতে দিতে বলল, “ওটা ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য ছিল না। ওটা ছিল একটা কারেকশন। আমি চাই না আমার ছাত্রীর মাথায় কোনো ভুল তথ্য থাকুক যে তার হবু বর গান গাইতে পারে না।”

রিন্নি হাসল। “বাবার সামনে তো খুব লজিক দেখান, কিন্তু গানের সময় তো বেশ আবেগ ছিল স্যার!”

আরাভ বাইক স্টার্ট দিতে দিতে বলল, “ওটা আবেগ ছিল না, ওটা ছিল গানের টোন, যে কেউ গাইলে অটোমেটিক চলে আসে। এখন চুপ করে বসুন, বাইক স্টার্ট দিচ্ছি।”

রিন্নি এবার আর দ্বিধা করল না। সে খুব স্বাভাবিকভাবেই আরাভের কাঁধে হাত রাখল। আরাভও এবার আর কোনো আপত্তি করল না। বাইকটা যখন হাইওয়ে দিয়ে তীরের মতো ছুটছে, রিন্নি হঠাৎ বলে উঠল, “তানিন ভাইয়ের গানটা সুন্দর ছিল, কিন্তু আপনারটা কেন জানি মনে দাগ কেটে গেছে।”

আরাভ আয়নায় রিন্নির দিকে তাকাল। চোখে সানগ্লাস থাকায় রিন্নি তার চাহনি বুঝতে পারল না, কিন্তু দেখল আরাভের ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি।

আরাভ বলল, “রিন্নি, তানিনের গানে ছিল বিরহ, আর আমার গানে ছিল জেদ। আমি যা একবার পছন্দ করি, তা কোনো ইকুয়েশনেই অন্যের হাতে ছাড়ি না।”

রিন্নি মনে মনে বলল, “আপনি তো শুধু জেদই দেখছেন স্যার, কিন্তু এই জেদের আড়ালে যে ভালোবাসাটা আপনি লুকাতে চাইছেন, ওটা কিন্তু আমি ধরে ফেলেছি!”

বাসায় ফিরতেই আফজাল চৌধুরী ড্রয়িংরুম থেকে হাঁক ছাড়লেন, “কিরে আরাভ! রিন্নিকে দিয়ে আসলি?”

আরাভ ব্যাগটা রেখে বলল, “হ্যাঁ আব্বু। তোমার হবু পুত্রবধূ তো গান শুনেই কুপোকাত।”

আফজাল সাহেব ভ্রু নাচিয়ে বললেন, “তুই গান গেয়েছিস? তোর তো কাকের মতো গলা! মেয়েটা নিশ্চয়ই ভয়ে ইমপ্রেস হয়েছে।”

আরাভ হাসতে হাসতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আফজাল সাহেব বিড়বিড় করলেন, “এই ছেলেটা দেখি দিন দিন রিন্নির পাল্লায় পড়ে বদলে যাচ্ছে। আল্লাহই জানে বাসর রাতে এরপর এই ছেলে কেমন হয়ে যাবে!”

চলবে,,,,
(৪৫০ রিয়াক্টের পর নেক্সট পর্ব আসবে।আসলে আমার একটু টাইম লাগবে। প্রতিদিন দেওয়া কঠিন। শর্ত পূরণ হতে ২দিন তো লাগবেই)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here