বিপরীত_মেরুর_টানে #ষষ্ঠ_পর্ব #লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

0
13

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#ষষ্ঠ_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

বিয়ের আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। রিন্নি আর আরাভের পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিয়ের মেইন লেহেঙ্গা আর শেরওয়ানিটা ওরা দুজনে মিলে পছন্দ করবে। কিন্তু রিন্নি সকাল থেকেই তার চিরাচরিত ডং শুরু করেছে। সে কিছুতেই আরাভ নামের ওই রোবট এর সাথে শপিংয়ে যাবে না।

রিন্নি বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে আছে। পরনে একটা ঢোলা পায়জামা আর টি-শার্ট। চুলে এলোমেলো একটা ঝুটি। সে তার আম্মাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, “আমি যাব না মানে যাব না! ওই লোক কি শপিং করবে? উনি তো শাড়ির ভাঁজেও ফিজিক্সের রিফ্লেকশন খুঁজবেন। আমার শখের লেহেঙ্গাটাকে উনি নির্ঘাত ল্যাবরেটরির অ্যাপ্রন বানিয়ে ছাড়বেন!”

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। রিন্নির আম্মা দরজা খুলতেই দেখা গেল আরাভ চৌধুরীকে। আজ তার মেজাজ মনে হয় একটু বেশিই চড়া। হাতে বাইকের হেলমেট। রিন্নিকে এই অবস্থায় দেখে আরাভ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর কড়া গলায় বলল, “মিস রিন্নি, আপনাকে কি ইনভিটেশন কার্ড পাঠাতে হবে? ১০টার সময় বের হওয়ার কথা ছিল, এখন ১০টা ৩০। আপনি কি এখনো ঘুম থেকে ওঠার প্রসেসিংয়ে আছেন?”

রিন্নি মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আমি যাব না স্যার। আমার শরীর ভালো না। আমার মনে হচ্ছে আমার মেইন মেরুদণ্ডের স্ট্রাকচারটা ভেঙে পড়ছে।”

আরাভ এক পা এগিয়ে এল। রিন্নির খুব কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, “শুনুন, হয় আপনি নিজে উঠে ফ্রেশ হয়ে ৫ মিনিটের মধ্যে বাইকে বসবেন, আর না হয় আমি আপনাকে এই অবস্থাতেই কাঁধে তুলে শপিং মলে নিয়ে যাব। চয়েস ইজ ইয়োরস। আমি কিন্তু ল্যাবে প্র্যাকটিক্যাল করানো মানুষ, কথা কম কাজ বেশি করি।”

আরাভের চোখের দিকে তাকিয়ে রিন্নি বুঝল, এই লোক সিরিয়াস। সে বড়বড় করতে করতে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিল।যেতে যেতে হাজারটা গালি দিতে ভুলল না যদিও মনে মনে দিচ্ছে। কারণ জীবন বাচানো ফরজ।

৫ মিনিট পর রিন্নি তৈরি হয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখল সেখানে তানিন হাজির। তানিনকে দেখে আরাভের কপালে তিনটা ভাঁজ পড়ল। তানিন এক গাল হেসে বলল, “আঙ্কেল বললেন আপনারা শপিংয়ে যাচ্ছেন। আমি ভাবলাম, রিন্নি তো অনেক জেদি, আপনি একা হয়তো সামলাতে পারবেন না। তাই আমিও আসলাম।”

আরাভ দাঁত চিবিয়ে বলল, “আমাদের কোনো অতিরিক্ত লোড এর প্রয়োজন নেই মিস্টার তানিন।”

রিন্নি মনে মনে এক শয়তানি বুদ্ধি আঁটল। আরাভ স্যারের ওই গম্ভীর লেকচার থেকে বাঁচতে তানিন ভাই একটা ভালো শিল্ড হতে পারে। সে আহ্লাদী স্বরে বলল, “আরে তানিন ভাই! আপনি এসেছেন? কী ভালো হলো! চলুন না আমাদের সাথে। স্যার তো শুধু কালো আর সাদা বোঝেন, আপনি থাকলে একটু কালারফুল কিছু কিনতে পারব।”

আরাভ রিন্নির দিকে একটা খ-ুনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কিন্তু রিন্নি ততক্ষণে তানিনকে নিয়ে বাইকের দিকে হাঁটা দিয়েছে। আরাভও দাতে দাত চেপে গেল আর হেলমেট টা তানিনের হাতে ধরিয়ে দিও

তানিন আর রিন্নি দুজনই বোকার মতো তাকিয়ে আছে। আরাভ দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ” কি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? তানিন বাইক চালাতে পারেন তো? পুরুষ হিসেবে বাইক চালাতে না পারাটা বড্ড বেমানান ”

“হ্যা পারি কিন্তু আমি কেন?”

আরাভ একটু তানিনের দিকে ঝুকে ফিসফিস করে বলল,” তাহলে কি ভাবছেন, রিন্নিকে আপনার পাশে আমি বসে দিব?”

তানিন রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,” কেন আমার পাশে বসলে কি ওর শরীর পুড়ে যাব?”

আটাভ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ” পুড়ে গেলে সেটা চিকিৎসা করা যায়। কিন্তু সমস্যা হলো পচে গেলে কিছুই করার থাকে না”

রিন্নি দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে, ” কি যাবেন নাহলে বলুন এমনিও আমার যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই!”

আরাভ তানিনের দিকে তাকিয়ে বলে, ” কি বলছে শুনছেন না? ”

শেষমেশ তিনজনেই শপিং মলে পৌঁছাল। আরাভের মুখ তখন অমাবস্যার চাঁদের মতো কালো।

শপিং মলে ঢুকে রিন্নি একটা লাল টুকটুকে জমকালো লেহেঙ্গা পছন্দ করল। তানিন সাথে সাথে তালি দিয়ে উঠল, “ওয়াও রিন্নি! এটাতে তোমাকে ঠিক যেন রক্তজবা ফুলের মতো লাগবে। একদম আগুন!”

আরাভ ওটার দিকে তাকিয়ে এমন একটা শব্দ করল যেন বমি আসছে। “রক্তজবা? রিন্নি, এটা পরলে আপনাকে জ্যান্ত একটা ফায়ার এক্সটিংগুইশার লাগবে। এই কালারের গাড় এত বেশি যে মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে অন্ধ হয়ে যাবে। একদম বাজে পছন্দ।”

রিন্নি মুখ ফুলিয়ে বলল, “তাহলে কোনটা নেব?”

আরাভ একটা হালকা পিচ কালারের সিল্কের লেহেঙ্গা দেখিয়ে বলল, “এটা। এটা ডিসেন্ট, এলগ্যান্ট। রিফ্রেকশন কম হবে, আপনাকে শান্ত দেখাবে।”

তানিন নাক সিঁটকে বলল, “শান্ত? আরে স্যার, বিয়ে কি কোনো লাইব্রেরি নাকি যে শান্ত থাকবে? বিয়ে মানে ধামাকা! রিন্নি, তুমি এই ময়ূরী রঙের ড্রেসটা দেখো। এটা পরলে মনে হবে তুমি বন থেকে সরাসরি রাজপ্রাসাদে এসেছ।”

আরাভ এবার তানিনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। “মিস্টার তানিন, বন থেকে রাজপ্রাসাদে আসা মানে ওটা আদিবাসী কোনো চরিত্র হতে পারে, কনে নয়। আর এই ড্রেসটার ওজন কত জানেন? রিন্নি এটা পরলে অভিকর্ষজ বলের (Gravity) চোটে সোজা মাটির সাথে মিশে যাবে। হাঁটতে পারবে না।”

তানিন জেদ ধরে বলল, “আপনি সব কিছুতে বিজ্ঞান টানেন কেন? রিন্নি, তুমি এটা পরে একবার ট্রায়াল দাও। আমি বলছি, তোমাকে দেখে সবাই হার্ট অ্যাটাক করবে।”

আরাভ বিড়বিড় করে বলল, “হ্যাঁ, হার্ট অ্যাটাক তো করবেই, তবে ভয়ে! আর ম*রে গেলে বাসর ঘরের জায়গায় জেলে রাত কাটাতে হবে। যা সর্বনাশ তা তো আমার হবে আপনার কি? শুনুন রিন্নি আমি রিস্ক নিতে পারব না।”

রিন্নি এবার একটার পর একটা ড্রেস ট্রায়াল দিচ্ছে আর বাইরে দুই বিশেষজ্ঞর মহাযুদ্ধ চলছে।

রিন্নি একটা কালো সিকোয়েন্সের শাড়ি পরে বের হতেই তানিন চিৎকার করে উঠল, “উফ! রিন্নি, তুমি তো পুরো ব্ল্যাক হোল! সব আলো শুষে নিচ্ছো।”

আরাভ সাথে সাথে প্রতিবাদ করল, “ব্ল্যাক হোল মানে তো ওর ভেতরে কিছুই নেই, সব শূন্য! আপনি কি ওকে শূন্য বলতে চান? আর বিয়ের দিন কালো কে পরে? এটা কি শোকসভা? রিন্নি, এটা একদম ইমপ্র্যাকটিক্যাল। আপনি ওই অফ-হোয়াইটটা পরুন।”

তানিন বলল, “অফ-হোয়াইট? স্যার কি রিন্নিকে স্কুলের পিটি টিচার বানাতে চান নাকি? রিন্নি, তুমি এই গোলাপিটা দেখো। একদম বার্বি ডল!”

আরাভ ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলল। “বার্বি ডল হলো প্লাস্টিকের তৈরি একটা খেলনা যার কোনো মস্তিষ্ক নেই। আপনি কি রিন্নিকে ব্রেইনলেস প্রমাণ করতে চান? রিন্নি, এই গোলাপি কালারটা আপনার গায়ের রঙের সাথে মানাছে না। ওটা পরলে আপনাকে জ্যান্ত একটা তুলা মিছরি লাগবে।”

রিন্নি নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বির করল।” কোথায় ফাসলাম আমি? তানিন ভাইকে এনে তো আরও বিপদে পড়লাম” রিন্নি মাঝখানে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো বলল, “আপনারা কি ড্রেস পছন্দ করবেন নাকি ঝগড়া করবেন?”

তানিন বলল, “আমি বলছি রিন্নিকে লাল লেহেঙ্গাতেই সেরা লাগবে।”

আরাভ বলল, “আর আমি বলছি ওকে পেস্ট কালারের জামদানিতে বুদ্ধিমতী লাগবে।”

তানিন: “বিয়েতে বুদ্ধিমতী দিয়ে কী হবে? রূপ লাগবে রূপ!”

আরাভ: “রূপ তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ভুল ড্রেস চয়েসের আফসোস চিরস্থায়ী। আপনি কি চান ও বিয়ের অ্যালবামে নিজেকে একটা রঙিন সং মনে করুক?”

তর্ক যখন চরমে, তখন আরাভ হঠাৎ একটা গাঢ় নীল রঙের বেনারসি শাড়ি আর তার সাথে ম্যাচিং করা একটা কাজ করা বেলাউস টেনে বের করল। সেটার দিকে তাকিয়ে তানিনও কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেল।

আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে একটু নরম স্বরে বলল, “রিন্নি, নীল আপনার পছন্দের রঙ। আর এই শেডটা আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে পারফেক্টলি ম্যাচ্ছ। এবার ন্যাকামি ছেড়ে এটা ট্রায়াল দিয়ে আসুন তো।”

রিন্নি ওটা নিয়ে ভেতরে গেল। যখন বের হলো, শপিং মলের অন্য কাস্টমাররাও হাঁ করে তাকিয়ে রইল। রিন্নিকে সত্যিই অপার্থিব সুন্দর লাগছে।

তানিন কোনোমতে বলল, “ইয়ে… স্যার, এবার লজিক কাজ করেছে। রিন্নিকে তো আসলেই সুন্দর লাগছে।”

আরাভ নিজের অজান্তেই একটু হাসল। তারপর গলার স্বর শক্ত করে বলল, “হবে না কেন? গোল্ডেন রেশিও মেইনটেইন করে এই শাড়িটা সিলেক্ট করেছি। তানিন সাহেব, আপনি এবার বাড়ি যান। শপিং শেষ।”

তানিন কাঁচুমাচু করে বলল, “রিন্নি, আমি তাহলে আসি? ওই নীলটাতে তোমাকে কিন্তু দারুণ লাগছে।”

রিন্নি হাসিমুখে বিদায় দিল তানিনকে। তানিন যেতেই আরাভ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তানিনের সামনে তো খুব ডং করছিলেন। এখন এই শাড়িটার দাম দেখে আপনার হার্টরেট কত বাড়ছে সেটা কি মেপে দেখব?”

রিন্নি জিভ কেটে বলল, “দাম যাই হোক স্যার, পছন্দ তো আপনারই। এখন শপিং তো হলো, এবার আইসক্রিম খাওয়াবেন না?”

আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আইসক্রিমের ক্যালরি আর ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা নিয়ে একটা লেকচার দেওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আপনার ওই ন্যাকামি মার্কা চেহারাটা দেখে আজ লজিকটা একটু স্থগিত রাখলাম। চলুন!”

রিন্নি মনে মনে বলল, “হিটলার সাহেব তো দেখি নীল শাড়িতে কুপোকাত!”

চলবে,,,
(কি অন্যায় হচ্ছে ভাই। ১দিনও সময় পেলাম না।আমার কি কান্না করা উচিত?)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here