#বিপরীত_মেরুর_টানে
#সপ্তম_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
বিয়ের কেনাকাটা শেষ করে ফেরার পথে রিন্নি আর আরাভের মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হলো, তা রীতিমতো বিশ্বযুদ্ধের শামিল। আরাভ বাইক চালাচ্ছে আর রিন্নি পেছনে বসে সারাক্ষণ ন্যাকামি মেশানো গলায় অভিযোগ করে যাচ্ছে। ধৈয্যের চরম পরিক্ষা দিল আজ আরাভ।যদিও একবার ইচ্ছে করেছিল মাঝ রাস্তায় ফেলে আসবে আবার ভাবল নিজের জিনিস কেউ নিয়ে গেলে নিজেরই লস।
বাইকটা রিন্নিদের বাড়ির সামনে থামতেই রিন্নি হেলমেটটা খুলে আরাভের হাতে একরকম আছাড় দিয়ে দিয়ে বলল, “এই ধরুন আপনার লোহার টুপি! আর জীবনেও আপনার বাইকে আমি উঠব না। আপনি তো বাইক চালান না, মনে হয় রকেট লঞ্চ করছেন।”
আরাভ শান্তভাবে চশমাটা মুছে পকেটে রাখল। তারপর বাইক থেকে নেমে রিন্নির দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল। “রিন্নি, আপনি যে হারে আমার জ্যাকেট খামচে ধরেছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল আপনি কোনো মহাকাশযান থেকে ছিটকে পড়ছেন। আপনার ওই গ্রিপ দেখে তো মনে হলো আপনি ফিজিক্সের ফ্রিকশন বলটা প্র্যাকটিক্যালি ভালোই বোঝেন।”
রিন্নি রাগে পা ঠুকে বলল, “ন্যাকামি করবেন না স্যার! আমি ভয় পেয়েছিলাম তাই ধরেছি। আপনি তো ইচ্ছা করে জোরে ব্রেক কষছিলেন যাতে আমি আপনার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি। আপনার সব চাল আমি বুঝি!”
আরাভ এক পা এগিয়ে এল। রিন্নিকে দেয়ালের সাথে একরকম কোণঠাসা করে ফেলে নিচু গলায় বলল, “চাল যদি বুঝতেনই হবু গিন্নি, তবে তানিনকে সাথে নিতেন না। আপনি চেয়েছেন তানিনকে দিয়ে আমাকে জেলাস ফিল করাতে, তাই না? কিন্তু দুঃখিত, জিরো ভ্যালুর কোনো অবজেক্টের ওপর আমার আকর্ষণ কাজ করে না।”
রিন্নি মুখ ভেংচিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আপনার আকর্ষণ তো শুধু ওই ল্যাবের পচা ব্যাঙ আর জং ধরা ক্যালকুলেটরের ওপর কাজ করে। যান এখন, বাড়ি যান! আম্মু বলেছে বিয়ের আগে আর আপনার সাথে দেখা করা যাবে না। মানুষ ভালো বলে না”
আরাভ একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করল। “মানুষ ভালো বলে না? আপনার এই ন্যাকামির চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। চললাম, কাল কিন্তু ল্যাবে অ্যাসাইনমেন্টটা নিয়ে আসবেন। বিয়ে বলে মাফ নেই।”
আরাভ বাইক নিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেল। রিন্নি বিড়বিড় করতে করতে ঘরে ঢুকল, “রাক্ষস একটা! বাসর রাতে আমি যদি ওর চায়ে লবণ মিশিয়ে না খাইয়েছি তবে আমার নামও রিন্নি না!”
বিয়ের আগের রাত। রিন্নিদের বাড়িতে হলুদের অনুষ্ঠান চলছে। রিন্নি হলুদ শাড়ি পরে হাতে মেহেদি দিয়ে বসে আছে। এমন সময় তানিয়া এসে ফিসফিস করে বলল, “রিন্নি, দেখ তো তানিন ভাই কী পাঠিয়েছে!”
রিন্নি প্যাকেটটা খুলতেই দেখল ভেতরে একটা বড় সাইজের প্লাস্টিকের টিকটিকি আর একটা চিরকুট— “রিন্নি, আমি জানি ওই রোবটটা তোমাকে টিকটিকির মতো ভয় দেখাবে। এটা সাথে রেখো, ও ভয় পেলে তুমি জিতে যাবে।”
রিন্নি হাসতে হাসতে শেষ। “তানিন ভাই আসলেই একটা মেন্টাল!”
ঠিক তখনই রিন্নির ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল। আরাভের মেসেজ।
“মেহেদি দিয়ে নিশ্চয়ই তানিনের দেওয়া ওই সস্তা প্লাস্টিকের টিকটিকি নিয়ে খেলছেন? ওটা ডাস্টবিনে ফেলুন। আর শুনুন, আপনার মেহেদির রঙ যদি গাঢ় না হয়, তবে কাল বিয়ের আসরে আপনাকে দিয়ে আমি পুরো ল্যাব পরিষ্কার করাব।”
রিন্নি থতমত খেয়ে গেল। “এই লোক কি সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে নাকি? সব জানল কীভাবে?”
সে রিপ্লাই দিল “আপনি নিজের চিন্তা করুন স্যার! কাল নীল শাড়িতে আমাকে দেখে যদি আপনার হার্টরেট ১০০ ছাড়িয়ে যায়, তবে কিন্তু আমার কোনো দোষ নেই।”
আরাভের পালটা মেসেজ এল “আমার হার্টরেট কন্ট্রোল করার উপায় আমার জানা আছে। আপনি বরং নিজের ব্লাড প্রেশার সামলান।”
পরদিন বিয়ের আসর। নীল রঙের সেই বেনারসি শাড়িতে রিন্নিকে সত্যিই নীলপরীর মতো লাগছে। আরাভ শেরওয়ানি পরে সোফায় বসে আছে। তার মুখ এখনো গম্ভীর, যেন বিয়ের পিঁড়িতে নয় বরং পিএইচডির থিসিস ডিফেন্ড করতে বসেছে।
কাজী সাহেব যখন বললেন, “মা, কবুল বলো,”
রিন্নি হঠাৎ থেমে গেল। সে আরাভের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার, একটা শর্ত আছে। কবুল বলার আগে আপনাকে বলতে হবে যে আপনি আর কোনোদিন আমাকে নেকা বলবেন না।”
পুরো আসরে হাসির রোল পড়ল। আফজাল চৌধুরী তো হেসেই অস্থির। “বলো মা, বলো! এই গাধাটাকে আজকে লাইনে আনো।”
আরাভ চিবুক শক্ত করে রিন্নির দিকে তাকাল। তারপর সবার সামনেই শান্ত গলায় বলল, “শর্তটা লজিক্যালি ভুল রিন্নি। আপনি ন্যাকামি না করলে তো আপনার অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, আজকের জন্য আমি এই টার্মটা সাসপেন্ড রাখলাম। এবার কবুল বলুন, কাজী সাহেবের সময় নষ্ট হচ্ছে।”
রিন্নি মুখ বাঁকিয়ে তিনবার “কবুল” বলল। মনে মনে ভাবল, “দাঁড়ান বাছাধন, রুমের ভেতর যাই, তারপর দেখাচ্ছি ন্যাকামি কারে কয়!”
বাসর ঘর। রিন্নি খাটের মাঝখানে বসে আছে। চারদিকে ফুলের গন্ধ, কিন্তু রিন্নির মাথায় তখনো যুদ্ধের পরিকল্পনা। আরাভ ঘরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করল। রিন্নি সাথে সাথে ঘোমটা টেনে আরও একটু গুটিসুটি হয়ে বসল।
আরাভ ধীরপায়ে খাটের কাছে এসে দাঁড়াল। রিন্নির কোনো সাড়াশব্দ নেই। আরাভ পাঞ্জাবির বোতাম আলগা করতে করতে বলল, “কী ব্যাপার মিসেস চৌধুরী? ড্রয়িংরুমে তো খুব তেজ দেখাচ্ছিলেন। এখন কি ভয়ে পেশার লো হয়ে গেছেন নাকি?”
রিন্নি ঘোমটার ভেতর থেকে টেনে টেনে বলল, “আমি ভয় পাইনি। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।”
“অপেক্ষা? কিসের জন্য? আমাকে দিয়ে ঘর মোছাবেন বলেছিলেন না?” আরাভ রিন্নির খুব কাছে বসল।
রিন্নি হঠাৎ ঘোমটা সরিয়ে একটা চওড়া হাসি দিল। তারপর পাশ থেকে একটা বড় মোটা বই বের করে আরাভের সামনে ধরল। আরাভ অবাক হয়ে দেখল, ওটা রিন্নির ফিজিক্সের টেক্সট বুক!
রিন্নি বলল, “এই যে স্যার, বাসর রাতের উপহার। এই বইয়ের লাস্ট চ্যাপ্টারের ১০টা ম্যাথ আমি আজ পর্যন্ত বুঝিনি। আপনি যেহেতু আমার টিচার, তাই আজ সারা রাত আপনি আমাকে এগুলো বুঝিয়ে দেবেন। আর যতক্ষণ আমি বুঝব না, ততক্ষণ আপনি ঘুমাতে পারবেন না!”
আরাভ হা করে তাকিয়ে রইল। “আপনি কি পাগ*ল? বাসর রাতে কেউ ফিজিক্সের অংক করে?”
রিন্নি জেদ ধরে বলল, “আপনিই তো বলেছিলেন পারসোনাল আর প্রফেশনাল লাইফ মেশাবেন না। তো এখন আমি আপনার ছাত্রী, আর আপনি আমার টিচার। শুরু করুন!”
আরাভ মাথা চুলকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বইটা হাতে নিয়ে বলল, “ঠিক আছে। আপনি যখন নিজেই নিজের কবর খুঁড়ছেন, তবে তাই হোক। ১ নম্বর ম্যাথটা দেখুন এখানে ভরবেগ আর বেগের যে সম্পর্ক…”
ঘণ্টাখানেক পর রিন্নি হাই তুলতে শুরু করল। আরাভ তখন পুরো দমে বুঝিয়ে যাচ্ছে। রিন্নি কোনোমতে বলল, “স্যার, আজ থাক… আমার ঘুম পাচ্ছে।”
আরাভ চশমাটা ঠিক করে গম্ভীর মুখে বলল, “নো মিসেস রিন্নি! আপনি নিজেই শুরু করেছেন। যতক্ষণ না এই ১০টা ম্যাথ শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ ঘুমানো নিষেধ। ন্যাকামি করবেন না, মনোযোগ দিন!”
রিন্নি কপাল চাপড়ে মনে মনে বলল, “হায় আল্লাহ! এ তো নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মা*রলাম! রোবটটাকে ইমোশনাল করতে গিয়ে উল্টো আমি নিজেই এখন খাঁচায় বন্দি!”
রাতের তিনটে বাজে। রিন্নি খাতার ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। আরাভ কলমটা নামিয়ে রাখল। রিন্নির ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে তার মুখে একটা অত্যন্ত মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। সে খুব সাবধানে রিন্নির মাথার নিচে বালিশ দিয়ে চাদরটা টেনে দিল।
রিন্নির কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আপনার এই ন্যাকামিগুলোই তো আমার ফিজিক্সের সবচেয়ে প্রিয় চ্যাপ্টার, রিন্নি। কিন্তু সেটা এখন বললে আপনি তো আবার মাথায় চড়ে বসবেন!”
আরাভ লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে রিন্নির পাশে শুয়ে পড়ল।
চলবে,,,
(আমার কোনো দোষ নেই। আমি গতকাল রাতেই দিতে চাইছিলাম। দোষ সব আমার পাঠিকা আয়শার। এই বেডির সাথে কথা বলতে বলতে কাল আর দেওয়া হলো না😩)

