#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_৮
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
“উফ! কী ভয়ানক স্বপ্ন!” রিন্নি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। স্বপ্নে দেখছিল বাসর রাতে আরাভ ওকে দিয়ে অংক করাচ্ছে। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল সকাল আটটা। আজ আরাভ আসার কথা ওদের বাসায়, দুই পরিবার মিলে বিয়ের মেনু ঠিক করবে।
নিচে নামতেই রিন্নি দেখল ড্রয়িংরুমে রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। তবে আরাভ আর রিন্নির না, যুদ্ধটা হচ্ছে আরাভ আর তার বাবা আফজাল চৌধুরীর মধ্যে।
আফজাল চৌধুরী সোফায় বসে হাত নেড়ে বলছেন, “আরে তুই ফিজিক্সের টিচার হতে পারিস, কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারে তুই একটা আস্ত মূর্খ! বিয়ের মেনুতে কাচ্চি থাকবেই। খাসির মাংস ছাড়া আবার বিয়ে হয় নাকি?”
আরাভ তার ল্যাপটপ থেকে মুখ না তুলেই বলল, “আব্বু, তুমি কি চাও গেস্টরা সবাই বিয়ের পর হার্ট অ্যাটাক করুক? অতিরিক্ত ফ্যাট আর কোলেস্টেরল মানেই হলো স্বাস্থ্যের জন্য বিপর্যয়। আমি লিস্টে চিকেন রোস্ট আর ভেজিটেবল রেখেছি।”
আফজাল সাহেব এবার গর্জে উঠলেন, “ভেজিটেবল? তুই কি আমার আত্মীয়-স্বজনদের ঘাস খাওয়াতে চাস? হাসান সাহেব, দেখেন আপনার হবু জামাইয়ের কাণ্ড! ও তো দেখি বিয়ের খরচ বাঁচাতে গিয়ে মানুষকে না খাইয়ে ম-ারবে।”
আরাভের মা রোকেয়া চৌধুরী কপালে হাত দিয়ে একপাশে বসে আছেন। তিনি বিরক্তি নিয়ে বললেন, “এই তোমরা থামবে? এই বাবা-ছেলের ঝগড়া শুনতে শুনতে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেল। তোমাদের ঝগড়া দেখলে মনে হয় বিয়েটা বোধহয় আর হবেই না।”
আরাভ শান্ত স্বরে বলল, “আম্মু, আমি শুধু লজিক্যালি কথা বলছি।”
“তোর লজিক তুই পকেটে রাখ!” আফজাল সাহেব রিন্নিকে দেখে বললেন, “মা রিন্নি, তুই বল তো বিয়েতে কি কাচ্চি থাকবে না ঘাস-পাতা থাকবে?”
রিন্নি এবার সুযোগ পেয়ে গেল। সে আরাভকে জ্বালানোর জন্য খুব আহ্লাদী সুরে বলল, “আঙ্কেল, কাচ্চি তো থাকবেই! সাথে বোরহানি আর জর্দা। আর স্যার যা বলছেন সেটা তো ডায়েট চার্ট, বিয়ের মেনু না। স্যার কি ল্যাবের গিনিপিগদের দাওয়াত দিয়েছেন নাকি? তারপর স্যার আপনি যদি চায় তাহলে আপনার জন্য না হয় এই ঘাস পাতা আমরা ব্যবস্থা করে দিব”
রিন্নির মা পাশ দিয়ে ঝাড়ি দিয়ে উঠল, “হবু জামাই সাথে কেমন ভাবে কথা বলছিস তুই!”
রিন্নি তো মহাবিরক্ত। “হ্যা হবু জামাই এখনও জামাই হয়ই নি তাতে আমাকে সহ্য হচ্ছে না আর এমন করো যেন উনিই তোমার ছেলে আর আমি সতিনের মেয়ে! ”
আরাভ চশমার ওপর দিয়ে রিন্নির দিকে তাকাল। সেই তীক্ষ্ণ চাউনি। “মিস রিন্নি, আপনি যে হারে কাচ্চি খাওয়ার প্ল্যান করছেন, বিয়ের শাড়িতে আপনাকে জ্যান্ত একটা ফুটবল মনে হবে। তখন কিন্তু অভিকর্ষজ বলের কারণে স্টেজ থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যাবেন।”
রিন্নি মুখ ভেংচিয়ে বলল, “পড়ি তো পড়ব! আপনাকে ধরে টান দিয়ে সাথে নিয়ে পড়ব।”
এরই মধ্যে ড্রয়িংরুমে তানিনের এন্ট্রি হলো। তানিন একটা ডায়েরি নিয়ে হাজির। সে এসেই বলল, “আমি বিয়ের জন্য একটা কবিতা লিখেছি। রিন্নি, শুনবে?”
আরাভ ল্যাপটপ বন্ধ করে দিয়ে বলল, “মিস্টার তানিন, কবিতার চেয়ে খাবারের মেনুটা বেশি ইম্পর্টেন্ট। আপনি কি জানেন কাচ্চির মশলায় কত ধরনের টক্সিন থাকতে পারে?”
তানিন ওসব পাত্তা না দিয়ে সুর ধরল, “রিন্নি তুমি নীল শাড়িতে এক ফোঁটা অশ্রু…”
আরাভ সাথে সাথে বলল, “অশ্রু মানে হলো সোডিয়াম ক্লোরাইড আর পানি। নীল শাড়িতে লবণ-পানি ঢাললে ওটা নষ্ট হয়ে যাবে। আপনার কবিতাটা কি কোনো সায়েন্টিফিক ডিকশনারি থেকে কপি করা?”
আফজাল সাহেব এবার তার ছেলেকে ধমক দিলেন, “আরাভ! তুই ছেলেটাকে অপমান করছিস কেন? ও কত কষ্ট করে কবিতা লিখেছে।”
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আব্বু, ভুল ইনফরমেশন সহ্য করা আমার স্বভাবের বাইরে। ও রিন্নিকে অশ্রু বলছে কেন? ও কি রিন্নিকে কাঁদাতে চায়?”
রিন্নি এবার আরাভের মেজাজ আরও বিগড়ে দেওয়ার জন্য তানিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। “তানিন ভাই, আপনার কবিতাটা খুব সুন্দর। বিশেষ করে ওই নীল শাড়ির অংশটা। আপনি কি বিয়ের দিন আমাকে একটা নীল ডায়েরি গিফট করবেন?”
তানিন গদগদ হয়ে বলল, “অবশ্যই রিন্নি! আমি তাতে তোমার জন্য প্রতিদিন কবিতা লিখব।”
আরাভ এবার আর থাকতে পারল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে রিন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, “মিস রিন্নি, আমার সাথে একটু ছাদে আসুন। আপনার কালকের প্র্যাকটিক্যাল রিপোর্ট নিয়ে কিছু কথা আছে।”
রিন্নি টেনে টেনে বলল, “স্যার, এখন তো ছুটি! এখন কিসের রিপোর্ট?”
আরাভ কোনো কথা না বলে রিন্নির হাত ধরে একরকম টেনে হিঁচড়ে ছাদের দিকে নিয়ে গেল। নিচে আফজাল সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, “দেখলেন হাসান সাহেব? আমার ছেলেটা মুখে বাঘ হলেও মনে মনে কিন্তু বেড়াল। রিন্নিকে একা পাওয়ার জন্য কেমন ছুতো বের করল!”
রোকেয়া চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন, “বেড়াল না ছাই! ওটা একটা আস্ত খাটাস। মেয়েটাকে নিয়ে আবার ছাদে গিয়ে ঝাড়ি না দেয়!”
ছাদে যেতেই রিন্নি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “আপনি এত অসভ্য কেন স্যার? সবার সামনে হাত ধরলেন কেন? আর তানিন ভাইয়ের সাথে আমি কথা বলছিলাম, আপনার সমস্যা কী?”
আরাভ রিন্নির খুব কাছে এগিয়ে এল। রিন্নি ছাদে দেয়ালের সাথে মিশে গেল। আরাভ তার দুই হাত দেয়ালের ওপর রেখে রিন্নিকে মাঝখানে আটকে ফেলল।
“সমস্যা অনেক রিন্নি। এক, আপনি ওই কবিতা নামের আবর্জনা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। দুই, আপনি কাচ্চি খাওয়ার নামে আমার বাবার মাথায় কাঁঠাল ভাঙছেন।”
রিন্নি নাক উঁচু করে বলল, “আপনার তাতে কী? আমি ন্যাকামি করি, আমি কাচ্চি খাই তাতে আপনার বাবার তো কোনো সমস্যা নেই। আপনি তো দেখি আস্ত একটা হিংসুটে!”
আরাভ হঠাৎ নিচু গলায় বলল, “হিংসা না রিন্নি, এটাকে বলে পজেসিভনেস। ফিজিক্সে যেমন একটা ইলেকট্রন তার প্রোটনকে ছেড়ে অন্য কোথাও যায় না, আমার প্রজেক্টও তেমন অন্য কারো কবিতা শুনে হাসবে — এটা আমি নিতে পারছি না।”
রিন্নি থতমত খেয়ে গেল। আরাভ কি পরোক্ষভাবে তাকে ভালো লাগার কথা বলল? সে আমতা আমতা করে বলল, “আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
আরাভ একটা বাঁকা হাসি দিল। “ভয় তো আপনি বাসর রাতেই পাবেন যখন দেখবেন আপনার সব ডং আমি এক নিমেষে হাওয়া করে দিয়েছি। আপাতত নিচে যান, আর ওই তানিনকে বলুন ওর ডায়েরি নিয়ে এখনই পগার পার হতে, নতুবা আমি ওর ডায়েরিটা রকেট বানিয়ে আকাশ পাঠিয়ে দেব।”
রিন্নি মুখ বাঁকিয়ে নিচে চলে এল। মনে মনে বলল, “হিটলার সাহেব তো দেখি পুরাই খেপে আছেন! তানিন ভাইকে এবার সরাতে হবে, নাহলে স্যার নির্ঘাত ল্যাবে আমার ইন্টারনাল মার্কস কেটে জিরো দিয়ে দেবেন।”
বিকালে আরাভ যখন বাইক নিয়ে বের হতে যাবে, আফজাল চৌধুরী গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “কিরে? রিন্নির জন্য কি নীল চুড়ি কিনতে যাচ্ছিস?”
আরাভ হেলমেট পরতে পরতে বলল, “না আব্বু। ওর জন্য এক কেজি লজেন্স কিনতে যাচ্ছি। ন্যাকামি করার সময় ওটা চুষলে হয়তো কিছুক্ষণ মুখটা বন্ধ থাকবে।”
আফজাল সাহেব হেসে উঠলেন, “তোর ওই লজেন্সই একদিন তোর গলার কাঁটা হবে রে বাপ! দেখে নিস।”
আরাভ বাইক স্টার্ট দিয়ে বিড়বিড় করল, “গলার কাঁটা তো ও অলরেডি হয়েই আছে, এখন শুধু গিলে ফেলার অপেক্ষা!”
চলবে,,,
(৪২০ রিয়াক্ট পর নেক্সট পর্ব আসবে। আর ভাবলাম ওদের বিয়ে তাও আবার এত সহজে হবে বিষয়টা বেমানান। কাল থেকে শুরু হবে বিয়ের খেলা। জাস্ট ওয়েট। ভ্যালেন্টাই গিফট আসতেছে আমার মতো যারা সিঙ্গেল তাদের জন্য)

