#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_১৬
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
ফাহিম আর নয়নার গোপন কাবিন অনুষ্ঠানটা কোনোমতে শেষ হলো। হেড স্যারের ড্রয়িংরুমে মাত্র কয়েকজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে কাজটা সারা হয়েছে। নয়না তার বাবার বাড়িতেই রয়ে গেল, আর ফাহিমকে একরকম টেনে হিঁচড়ে বাসায় নিয়ে এল আরাভ।
বাসায় ফিরে ফাহিম নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে হয়তো বিরহ যাপন করছে। আর রিন্নি? রিন্নি এখন ঘোরতর এক ঘোরের মধ্যে আছে।
আরাভ চৌধুরীর সেই ‘তুমি’ সম্বোধন আর কানের কাছে বলা সেই রহস্যময় হুমকিটা রিন্নির মাথার ভেতর বিরামহীনভাবে ঘুরছে। লোকটা কি সত্যিই বদলে যাচ্ছে? নাকি এটা নতুন কোনো ফাঁদ?
রাত তখন প্রায় দুইটা। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। রিন্নি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে, কিন্তু ঘুম আসছে না। সে লক্ষ্য করল পাশের বালিশটা খালি। আরাভ ঘরে নেই। সাধারণত এই সময়ে আরাভ ল্যাবে থাকে অথবা বারান্দায় বসে কফি খায়। কিন্তু আজ কোনো সাড়াশব্দ নেই।
রিন্নি আলতো করে বিছানা থেকে নামল। ঘর থেকে বেরিয়ে সে দেখল আরাভের স্টাডি রুমের দরজার তলা দিয়ে নীলচে একটা আলো চুইয়ে আসছে। রিন্নি কৌতূহলী হয়ে পা টিপে টিপে দরজার কাছে গেল। দরজাটা পুরোপুরি লাগানো ছিল না, সামান্য ফাঁক হয়ে আছে।
ভেতরে উঁকি দিতেই রিন্নির চোখ চড়কগাছ!
আরাভ তার সেই পরিচিত চশমাটা খুলে রেখেছে। তার চোখে এখন একটা নীল আলো প্রতিরোধী বিশেষ লেন্স। টেবিলের ওপর সাজানো তিন-তিনটে বিশাল মনিটর। সেখানে ফিজিক্সের কোনো ইকুয়েশন নেই, বরং কালো স্ক্রিনে সবুজ আর সাদা রঙের হাজার হাজার কোড বিদ্যুতের গতিতে ছুটছে। আরাভের আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর এমন দ্রুত গতিতে চলছে যেন সে কোনো পিয়ানো বাজাচ্ছে।
হঠাৎ আরাভ চোখের পলকে সবকিছু এমনভাবে পরিবর্তন করল যেন খুব স্বাভাবিকভাবে কিছু ইমেইল চেক করছে। রিন্নি ভাবল, “ধুর! আমিই হয়তো বেশি ভাবছি। লোকটা নির্ঘাত ল্যাবের কোনো কাজ করছে।”
রিন্নি যেই না ঘরে ফিরে আসার জন্য পা বাড়াল, অমনি পেছন থেকে একটা হাত এসে ওর মুখ চেপে ধরল!
রিন্নি চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু শক্তিশালী হাতের বাঁধনে তার আওয়াজ গলায় আটকে গেল। আরাভ রিন্নিকে একরকম টেনে নিজের স্টাডি রুমের ভেতর নিয়ে এল এবং দরজাটা পিঠ দিয়ে ঠেলে বন্ধ করে দিল।
ঘরের আলো একদম নেভানো, শুধু ল্যাপটপের নীলচে আলোটা আরাভের চেহারায় একটা ভৌতিক কিন্তু ভীষণ আকর্ষণীয় ছায়া ফেলছে। আরাভ রিন্নিকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে নিজের হাতটা সরাল।
“উঁকিঝুঁকি দেওয়া কি তোমার পুরনো অভ্যাস মিসেস চৌধুরী?” আরাভের কণ্ঠস্বর একদম নিচু, কিন্তু তাতে এক ধরণের শাসন মেশানো।
রিন্নি হাফাতে হাফাতে বলল, “আমি… আমি তো জাস্ট দেখছিলাম আপনি ঘুমাননি কেন। এত রাতে নীল আলো জ্বেলে কী করছেন?”
আরাভ একটু ঝুঁকে রিন্নির চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চশমাটা আজ নেই। “আমি কী করছি সেটা তোমার না জানলেও চলবে। কিন্তু তুমি যে এখানে এসেছ, সেটা আমার জন্য বেশ সুবিধাই হলো। মনে আছে আমাদের ডিলের কথা?”
রিন্নির বুকটা ধক করে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলল, “ডিল? কোন ডিল? আমি তো কিছু মনে করতে পারছি না…”
আরাভ এবার রিন্নির খুব কাছে চলে এল। রিন্নির নাকে আরাভের পারফিউমের সেই চড়া আর নেশাক্ত গন্ধটা বার বার ধাক্কা দিচ্ছে। আরাভ খুব ধীরে ধীরে রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুমি খুব ভালো অভিনয় করতে পারো জেরি। কিন্তু আমি জ্যান্ত ক্যালকুলেটর। আমার হিসেব কখনো ভুল হয় না। তুমি চেয়েছিলে ফাহিমের বিয়েটা হোক, তার বিনিময়ে আমি আমার পাওনা চেয়েছিলাম। তখন তো খুব বীরত্বের সাথে রাজি হয়েছিলে, এখন পালাচ্ছ কেন?”
রিন্নি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বাঁচার পথ খুঁজছে। “স্যার… এখন অনেক রাত। এই বিষয়ে কাল কথা বলব…”
“না, কাল নয়। এখনই।” আরাভ এবার রিন্নির দুপাশে হাত দিয়ে ওকে পুরোপুরি আটকে ফেলল। “তুমি আমাকে লোভী ভেবেছিলে না? তবে আজ দেখো, দরকার ছাড়াও আমি আমার পাওনা কীভাবে আদায় করি।”
আরাভ আর কোনো সময় দিল না। রিন্নি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরাভ তার সেই দাবিকৃত পাওনাটা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিল। তবে এবারের ছোঁয়াটা আগের মতো ছিল না। এতে ছিল এক অদ্ভুত অধিকার আর শীতল এক রোমান্স। রিন্নির মনে হলো সে কোনো এক গভীর সাগরে তলিয়ে যাচ্ছে যেখানে কোনো লজিক নেই, কোনো ফিজিক্স নেই।
কয়েক সেকেন্ড পর আরাভ সরে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি। সে রিন্নির অবিন্যস্ত চুলগুলো আঙুল দিয়ে কানের পেছনে সরিয়ে দিয়ে বলল, “পাওনা শোধ হলো। এবার ঘরে গিয়ে ঘুমাও। আর শোনো, কাল থেকে আমার ঘরে ঢোকার আগে তিনবার অনুমতি নেবে। তোমার কৌতূহল কিন্তু তোমার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।”
রিন্নি কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সে কোনোমতে টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নিজের ঘরে এসে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার গাল দুটো আপেলের মতো লাল হয়ে আছে। সে বিড়বিড় করল, “এই লোকটা কি সত্যিই মানুষ? নাকি অন্য গ্রহের কোনো এলিয়েন? একবার ওভাবে অপমান করল, আবার ওভাবেই সব আদায় করে নিল!”
পরদিন সকাল। নাস্তার টেবিলে রিন্নি একদম চুপচাপ। আরাভ খুব আয়েশ করে চা খাচ্ছে, যেন কাল রাতে কিছুই হয়নি।
আফজাল চৌধুরী হঠাৎ বললেন, “আরাভ, আজ ল্যাব থেকে ফেরার সময় রিন্নিকে নিয়ে একটু মার্কেটে যাস। ওর বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য কিছু কেনাকাটা বাকি আছে।”
আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই আব্বু। আজ দুপুরে রিন্নিকে নিয়ে আমি এমন এক জায়গায় যাব যেখানে ও অনেকদিন ধরে যেতে চাইছে।”
রিন্নি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবল, “এই রে! লোকটা কি আবার কোনো ডিল করবে নাকি?”
দুপুরে আরাভ রিন্নিকে নিয়ে একটা ক্যাফেতে এল। কিন্তু ক্যাফেটা খুব অদ্ভুত। কোনো মানুষের আনাগোনা নেই। আরাভ এক কোণায় বসে তার ল্যাপটপটা বের করল।
রিন্নি কৌতূহল সামলাতে না পেরে বলল, “এখানে কেন এনেছেন? আর আপনি সারাক্ষণ এই ল্যাপটপ নিয়ে কী করেন?”
আরাভ ল্যাপটপের স্ক্রিনটা রিন্নির দিকে ঘোরাল। রিন্নি দেখল সেখানে অনেকগুলো অনলাইন শপিং সাইট খোলা। আরাভ শান্তভাবে বলল, “ফাহিমের বিয়ের জন্য ডেকোরেশন আর গিফটের অর্ডার দিচ্ছিলাম। আপনি কী ভেবেছিলে?”
রিন্নি মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, “ধুর! আমি সত্যিই পা-গল হয়ে গেছি। ফালতু সন্দেহ করছি।”
আরাভ যখন রিন্নিকে ল্যাপটপের শপিং সাইট দেখাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার ল্যাপটপের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা গোপন উইন্ডো খোলা ছিল। সেখানে ডার্ক ওয়েবের একটা মেসেজ ভেসে এল “টার্গেট লোকেটেড। আজ রাত বারোটায় অপারেশন শুরু হবে।”
আরাভ তাড়াতাড়ি ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিয়ে রিন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি কফি খাবে রিন্নি? নাকি কাল রাতের মতো আবার কোনো স্পেশাল এনার্জি ড্রিংক লাগবে?”
রিন্নি লজ্জায় মাথা নিচু করল।
চলবে,,,,,
(রোজায় ভাই জীবন যায়। বড় করতে পারলাম না😩)

