#বিপরীত_মেরুর_টানে
#সপ্তদশ_পর্ব
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
গতকালের সেই রহস্যময় রাত আর ক্যাফেটেরিয়ার ‘তুমি’ সম্বোধনের রেশ রিন্নির মাথা থেকে এখনো নামেনি। আরাভ চৌধুরীর মতো রোবট মার্কা মানুষটা হুট করে এত রোমান্টিক আর রহস্যময় হয়ে উঠচ্ছে, এই হিসাবটা রিন্নি কিছুতেই মিলাতে পারছে না। তবে রিন্নির মনে খটকা একটাই লোকটা ল্যাপটপে কী এমন করে যে লুকোতে হয়?
পরদিন সকালে চৌধুরী ভিলার ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত গম্ভীর পরিবেশ। আফজাল চৌধুরী বসে বসে তসবিহ পড়ছেন। রোকেয়া বেগম বিরক্ত মুখে সোফায় বসে আছেন কারণ আজ সকালের চা-টা মোটেও মনের মতো হয়নি। রিন্নি রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে এল। আরাভ তৈরি হয়ে নিচে নেমেছে। আজ তার পরনে কুচকুচে কালো শার্ট, হাতা দুটো কবজি পর্যন্ত গোটানো, হাতে দামী ঘড়ি। তাকে দেখে যে কেউ ভাববে সে কোনো কর্পোরেট বস, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নয়।
আরাভ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “আব্বু, আমি বের হচ্ছি। আজ ফিরতে দেরি হতে পারে।”
আফজাল চৌধুরী চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, “রিন্নিকেও সাথে নিয়ে যা। মেয়েটা সারাদিন ঘরে বসে বোর হয়। একটু ঘুরে আসুক।”
আরাভ রিন্নির দিকে তাকাল। রিন্নি ইশারায় বলল সে যাবে না। তার মাথায় তখন অন্য প্ল্যান আরাভ বের হলেই সে ওর স্টাডি রুমে হানা দেবে। রিন্নি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আব্বু, আজ আমার শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছে। আমি বরং বাড়িতেই থাকি।”
আরাভ এক মুহূর্তের জন্য রিন্নির চোখের দিকে স্থির হয়ে তাকাল। রিন্নি চোখ সরিয়ে নিল। আরাভ যেন রিন্নির মনের ভেতরটা এক্স-রে করে ফেলচ্ছে। সে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “শরীর ম্যাজম্যাজ করছে? নাকি ড্রয়ারে উঁকি দেওয়ার নতুন কোনো ইকুয়েশন মাথায় কাজ করছে তোমার?”
রিন্নি চায়ের কাপটা প্রায় ফেলে দিচ্ছিল। এই লোকটা কি অন্তর্যামী? নাকি রিন্নির মগজে কোনো চিপ বসিয়ে রেখেছে?
রোকেয়া বেগম বিরক্তি নিয়ে বললেন, “আরাভ! সবসময় এই অংকের ভাষায় কথা বলবি না তো! রিন্নি মা, তুই যা বিশ্রাম নে। আর ফাহিম, তুই কি আজ কলেজে যাবি না?”
ফাহিম এক কোণায় মুখ গুঁজে বসে ছিল। সে করুণ সুরে বলল, “ভাইয়া তো আমার কলেজে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছে আম্মা। আমি এখন ঘরের আসবাবপত্রের সাথে কথা বলা শুরু করব। ড্রয়িংরুমের সোফাটা আজ বেশ ভালোই রেসপন্স করছে!”
আরাভ ফাহিমের মাথায় একটা টোকা দিয়ে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় রিন্নির কানের ঠিক পাশে এসে ফিসফিস করে বলে গেল, “ড্রয়ারে তালা দেওয়া আছে রিন্নি। আর যদি খোলার চেষ্টা করো, তবে আজ রাতে কিন্তু তোমার পাওনা আরও বেড়ে যাবে। মনে আছে তো?”
রিন্নি রাগে গজগজ করতে করতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। দেখল আরাভের গাড়িটা বেরিয়ে যাচ্ছে। সে মনে মনে বলল, “তালা দেওয়া থাকলে কী হবে? জেরির কাছে ডুপ্লিকেট চাবি সব সময় থাকে!”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। আরাভ ফেরার আগেই রিন্নি অনেক চেষ্টা করল স্টাডি রুমের ড্রয়ার খুলতে, কিন্তু কাজ হলো না। আরাভ সত্যিই খুব কড়া তালা মেরেছে। রিন্নি যখন হাল ছেড়ে নিজের ঘরে বসে ফিজিক্সের বই উল্টাচ্ছিল, তখনই রাজকীয় ভঙ্গিতে আরাভের প্রবেশ।
আরাভ এসেই ব্যাগটা রেখে রিন্নির খাতার দিকে তাকাল। “কী খবর জেরি? ড্রয়ারের তালা কি তোমার জেদ ভাঙতে পারল?”
রিন্নি মুখ ঘুরিয়ে বলল, “আমি ওসব ধারের কাছেও যাইনি। পড়াশোনা করছি।”
“তাই নাকি? দেখি কী পড়াশোনা করেছো!” আরাভ একটা কঠিন ম্যাথ দিয়ে বলল, “এটা সমাধান করো। দেখি তোমার আইকিউ কতটুকু বেড়েছে।”
রিন্নি দশ মিনিট ধরে কলম কামড়াল, কপাল কুঁচকাল, কিন্তু অংক আর মেলে না। ক্যালকুলেশন করতে গিয়ে সে এক জায়গায় বিশাল এক ভুল করে বসল। আরাভ খাতাটা টানে দিয়ে দেখল। তার মেজাজ চট করে সপ্তমে চড়ে গেল।
“রিন্নি! এই সিম্পল ক্যালকুলেশনটা তুমি ভুল করলে? প্রফেসর আরাভ চৌধুরীর বউ হয়ে এই লেভেলের ম্যাথ ভুল? তোমাকে আজ রিমান্ডে নিতে হবে!”
বলেই আরাভ রিন্নিকে ভয় দেখানোর জন্য সজোরে হাত উঠাল। রিন্নি ভাবল আজ বোধহয় কপালে শনি আছে। সে সাথে সাথে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে এক বিশাল চিৎকার দিয়ে উঠল “ওরে বাবা রে! মে-রে ফেলল রে! বাঁচাও!”
আরাভ থতমত খেয়ে গেল। সে দ্রুত রিন্নির মুখ নিজের এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। “চুপ কর! একদম চুপ! এখনো তো মা-রিই নি। এভাবে চিৎকার করলে তোমার শ্বশুর এখনই ওপরে চলে আসবে আর আমায় একটা জানোয়ার মনে করবে।”
রিন্নি আরাভের হাতের নিচ দিয়ে কোনোমতে নিজের মুখটা বের করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আপনি মা-রতে হাত তুলেছেন কেন? এমনিও আপনি আমাকে মা-রতে পারেন না। আইন আছে দেশে!”
আরাভ ভুরু নাচিয়ে বাঁকা হাসল। “তোমার এটা মনে হওয়ার কারণ? আইনের কোন ধারায় লেখা আছে যে বউ ভুল করলে শিক্ষক বর তাকে শাসন করতে পারবে না?”
রিন্নি বুক ফুলিয়ে বলল, “কারণ আমি আপনার থেকে অনেক ছোট! ছোটদের গায়ে হাত তোলা বড় ধরণের অন্যায়।”
আরাভ হাসল। তার হাসিতে আজ এক ধরণের কৌতুক। “এজন্যই বলি মেয়েদের বুদ্ধি হাঁটুর নিচে থাকে। মা-রলে ছোটদেরই মারতে হয়। কখনও শুনেছ বড়দের কেউ মা-রে? বড়রা তো পাল্টা মা-র দেবে, তাই ছোটদের ম-ারা সেফ।”
রিন্নি এবার মোক্ষম চাল চালল। “তাও আপনি আমাকে মা-রতে পারেন না কারণ আমি আপনার একমাত্র বউ! একমাত্র জিনিসের যত্ন করতে হয় স্যার, ম-ারতে হয় না। নষ্ট হয়ে গেলে কিন্তু আর খুঁজে পাবেন না!”
আরাভ এবার রিন্নির চোখের দিকে তাকিয়ে একদম স্থির হয়ে গেল। তার চোখের সেই চশমার আড়ালের দৃষ্টিটা হঠাৎ বদলে গেল। সে খুব নিচু স্বরে বলল, “যাক! শেষ পর্যন্ত স্বীকার করলা তাহলে যে তুমি আমার বউ!”
রিন্নি জিভ কামড়ে ধরল। সে তো এটা তর্কে জেতার জন্য বলল। “না… আমি সেটা বলি নি… মানে ওই অর্থে বলি নি… আপনি সবসময় উল্টো বোঝেন!”
“থাক! যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে আমার। অনেক ন্যাকামি হয়েছে, এবার পড়ো।” আরাভ ওকে টেনে আবার চেয়ারে বসিয়ে দিল।
রিন্নি খাতা টেনে নিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “আপনি তো উল্টো বোঝেন সবসময়। প্রফেসর কীভাবে হলেন কে জানে? নির্ঘাত কারচুপির মাধ্যমে সার্টিফিকেট হাতিয়েছেন। রোবট একটা!”
আরাভ ল্যাপটপ খুলতে খুলতে বলল, “কিছু বললে?”
রিন্নি চেঁচিয়ে বলল, “বলছি আপনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রফেসর! আপনার মতো মহাজ্ঞানী আর কেউ নেই!”
রাত এগারোটা। চৌধুরী ভিলার সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু রিন্নি আর আরাভের ঘরে আলো জ্বলছে। রিন্নি দেখল আরাভ আবার সেই ল্যাপটপটা নিয়ে বসেছে। সেই পরিচিত নীল আলোটা আরাভের চেহারায় ভেসে উঠছে।
আরাভ হঠাৎ বলল, “রিন্নি, কাল দুপুরে তৈরি থেকো। তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”
রিন্নি কৌতূহলী হয়ে বলল, “কোথায়? আবার কোনো ক্যাফেতে বসিয়ে রাখবেন নাকি?”
আরাভ ল্যাপটপটা বন্ধ করে রিন্নির খুব কাছে এসে দাঁড়াল। রিন্নির হৃদপিণ্ড তখন মনে হয় লাফালাফি শুরু করেছে। আরাভ রিন্নির চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল, “সবকিছু তোমার ওই ছোট্ট মাথায় ঢুকবে না জেরি। তবে কাল তুমি এমন কিছু দেখবে, যা তুমি কল্পনাও করোনি। আর হ্যাঁ, ডিলটা কিন্তু এখনো কন্টিনিউ হচ্ছে। পাওনাটা আজ বাড়ল না কালকের জন্য জমা থাকল, সেটা কালই ঠিক করব আমি।”
আরাভ লাইট নিভিয়ে দিল। রিন্নি অন্ধকারের মধ্যে বড় বড় চোখ করে চেয়ে রইল।
ফাহিম পাশের ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, “ভাইয়া! ভাবিকে আর ধমক দিও না। বেচারি বাচ্চা মানুষ!”
আরাভ ধমক দিয়ে বলল, “তুই ঘুমা ফাহিম! নয়তো কাল সকালে তোকে ল্যাবের কঙ্কালের সাথে বেঁধে রাখব!”
রিন্নি কম্বল মুড়ি দিয়ে মনে মনে হাসল।
চলবে,,,
(শরীরের অবস্থা ভালো না। জ্বর, মাথা ব্যথা, বুকে ব্যথা তারপর রোজা। ভাবতে পারচ্ছি না তেমন। তাই বাকিটা দেরি হচ্ছে দিতে। দোয়া করবেন আমার জন্য)

