#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_১৮
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
চৌধুরী ভিলার সকালটা আজ অন্যরকম। ড্রয়িংরুমে বসে ফাহিম তার ল্যাপটপে নয়নার সাথে ভিডিও কলে মগ্ন। তাদের কথা বলার ধরণ দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সব চিনি আর মধু আজ তাদের গলার নালিতে এসে জমা হয়েছে।
“নয়না, জানো কাল রাতে আমি নীল রঙের স্বপ্ন দেখেছি। মনে হচ্ছিল তুমি একটা নীল প্রজাপতি হয়ে আমার জানলার গ্রিলে বসে আছো।” ফাহিমের এই ডায়ালগ শুনে পাশের সোফায় বসে থাকা আরাভ চৌধুরীর হাতের কফির মগটা নিয়ে আড়চোখে ফাহিমের দিকে তাকাল।
আরাভ চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে ফাহিমের দিকে তাকাল। তার লজিক্যাল মস্তিষ্কে প্রজাপতি আর জানলার গ্রিলের এই সমন্বয়টা কিছুতেই মিলছে না। সে মনে মনে ভাবল, “প্রজাপতি কি গ্রিলে বসে? ওটা তো ফুলের ওপর বসার কথা। ফাহিমের বায়োলজি জ্ঞান তো দেখি ফিজিক্সের চেয়েও খারাপ!”
ঠিক তখনই রিন্নি রান্নাঘর থেকে নাস্তা নিয়ে এল। রিন্নি দেখল আরাভ খুব নিবিড়ভাবে ফাহিম আর নয়নার প্রেমালাপ শুনছে। রিন্নি মুচকি হেসে আরাভের পাশে গিয়ে বসল।
“কী ব্যাপার স্যার? ছোট ভাইয়ের প্রেম দেখে কি আপনার মনেও বসন্তের হাওয়া লাগছে? প্রজাপতি নিয়ে ফাহিমের থিওরিটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং, তাই না?” রিন্নি চোখ টিপে বলল।
আরাভ গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল, “ফালতু সব কথাবার্তা। প্রজাপতি গ্রিলে বসে না, ওটা বসার জন্য সারফেস টেনশন আর ফ্রিকশনের ব্যাপার আছে। ফাহিম শুধু কাব্যিক হওয়ার চেষ্টা করছে তাও ভুল করছে।”
রিন্নি মুখ বাঁকিয়ে বলল, “সবকিছুতে ফিজিক্স খুঁজলে প্রেম হবে না স্যার। প্রেম হলো আবেগ। এই যে দেখুন ফাহিম কত সুন্দর করে বলছে। আপনি কি কোনোদিন আমাকে বলেছেন যে আমি আপনার জানলার প্রজাপতি?”
“এটা কেমন প্রেমের ভাষা যে মানুষ ছেড়ে প্রজাপ্রতি হওয়ার ইচ্ছে জাগে?” আরাভ রিন্নির চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার সেই চশমার আড়ালের গভীর দৃষ্টিটা হঠাৎ কেমন জানি নরম হয়ে এল। সে খুব নিচু স্বরে বলল, “তুমি প্রজাপতি নও রিন্নি। তুমি হলে সেই মহাকর্ষ বল, যা আমাকে প্রতি মুহূর্তে তোমার কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখে। আমি চাইলেও পালাতে পারি না। চাইলেও ছাড়তে পারি না। আর কোনোদিন দূরে যেতেও দিতে পারব না।”
রিন্নি থতমত খেয়ে গেল। বাপরে! রোবট মানুষটা কি এখন রোমান্টিক ডায়ালগ দিচ্ছে? রিন্নির গাল দুটো চট করে লাল হয়ে গেল। সে কথা ঘোরানোর জন্য বলল, “হয়েছে হয়েছে! অনেক ফিজিক্স ঝেড়েছেন। এখন নাস্তা করুন।”
কিন্তু রিন্নি খেয়াল করল, আরাভ আজ একটু বেশিই অন্যমনস্ক। বারবার ফোনে কার সাথে যেন চ্যাট করছে আর ঘড়ি দেখছে।
বিকেলবেলা আরাভ হুট করে তৈরি হয়ে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় রিন্নিকে বলে গেল, “আজ রাতে আমার একটা খুব জরুরি কাজ আছে। ল্যাবে কাজ বেশি, তাই ফিরতে দেরি হবে। হয়তো আজ রাতে ফিরবই না। তুমি দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ো।”
রিন্নি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আরাভ ধুলো উড়িয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
রাত দশটা বাজল, এগারোটা বাজল, বারোটা… আরাভের কোনো দেখা নেই। রিন্নির মনের ভেতর এবার ‘কু’ডাক দিতে শুরু করল। সে জানে আরাভ ইদানীং খুব অদ্ভুত আচরণ করছে। কিন্তু রাতভর বাসায় না আসা? রিন্নির মাথায় এবার উল্টো পাল্টা চিন্তা আসা শুরু হলো।
“ল্যাব? নাকি অন্য কোনো ‘ল্যাবরেটরি’?” রিন্নি বিছানায় শুয়ে বিড়বিড় করল। “ইউনিভার্সিটির ওই যে লম্বা মেয়েটা, সানিয়া, ও তো সবসময় স্যারের পিছে পিছে ঘোরে। আর ওই যে জুনিয়র লেকচারার তানজিনা, ও তো আবার স্যারের চশমা পরিষ্কার করে দেওয়ার বাহানা খোঁজে। আরাভ চৌধুরী কি তবে তাদের কারো সাথে ওই গোপন কাজে লিপ্ত?”
রিন্নি রাগে বালিশে একটা ঘুষি মা-রল। “আসুক কাল সকালে! এই হিটলারকে যদি আমি আজ চিবিয়ে না খেয়েছি তবে আমার নামও রিন্নি না!”
পুরো রাত রিন্নির চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। সারা রাত শুধু মাথায় ঘুরছে” স্যার কি কোনো মেয়ে সাথে অবাধ্য সম্পর্কে… না না! কি ভাবছি? সে আমার স্বামী আমার তাকে বিশ্বাস করা উচিত!”
কিছুক্ষণ বিড়বিড় করার পর আবার হঠাৎ বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বলে,” না! করলাম না বিশ্বাস। পুরুষ মানুষ বিশ্বাস করতে নেই। ওটা সন্দেহের জিনিস। বিশ্বাস করলে পাপ লাগবে। উফ্ হিটলারের বাচ্চা কোথায় তুই? আমার ঘুম হারাম করে কোথায় আছিস? ”
পরদিন সকাল আটটা। কলিংবেলের আওয়াজে রিন্নি ঝড়ের বেগে গিয়ে দরজা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে আরাভ চৌধুরী। পরনের শার্টটা কুঁচকানো, চুলগুলো অবিন্যস্ত, আর চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু তার হাতে একটা ছোট প্যাকেট।
আরাভ ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “উফ! সারা রাত যে কী ধকল গেছে!”
রিন্নি হাত গুটিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখমুখ তখন অগ্নিপিণ্ড। “ধকল তো যাবেই! সারারাত কার সাথে মিশন কমপ্লিট করলেন শুনি? সানিয়া নাকি তানজিনা? কার সাথে ফিজিক্সের ইকুয়েশন মেলাচ্ছিলেন রাতভর?”
আরাভ জুতো খুলতে খুলতে অবাক হয়ে তাকাল। “সানিয়া? তানজিনা? এরা আবার কোত্থেকে এল? আমি তো ল্যাবে ছিলাম…”
“মিথ্যে বলবেন না!” রিন্নি চেঁচিয়ে উঠল। “ল্যাবে থাকলে ফোন অফ ছিল কেন? আর আপনার শার্টের এই অবস্থা কেন? নির্ঘাত আপনি ওই মেয়েদের কারো সাথে রাত কাটিয়েছেন। আপনি আমাকে শুধু বাড়িতে বসিয়ে রাখার একটা আসবাবপত্র মনে করেন, তাই না?”
রিন্নির চিৎকার শুনে আফজাল সাহেব আর রোকেয়া বেগমও ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ফাহিম ব্রাশ করতে করতে ড্রয়িংরুমে এল।
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিন্নির দিকে এগিয়ে এল। “রিন্নি, তুমি যা ভাবছো তা একদমই ভুল। আমি সত্যিই একটা কাজে ছিলাম।”
“কীসের কাজ? ল্যাপটপ নিয়ে বসা থাকা ছাড়া আর কি কাজ করেন আপনি? নাকি কারো মন নিয়ে বসে ছিলেন ?” রিন্নি এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে দিল। “আপনার ওই চশমার আড়ালে যে এতবড় এক লম্পট লুকিয়ে আছে, সেটা আমি আগে বুঝিনি!”
আরাভ এবার একটু হাসল। সে রিন্নির হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল। সবার সামনেই সে রিন্নির কপালে একটা আলতো চুমু খেল। রিন্নি থমকে গেল। পুরো ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতা।
আরাভ হাতের প্যাকেটটা রিন্নির হাতে ধরিয়ে দিল। “কাল ফাহিম আর নয়নার ওই প্রজাপতি থিওরি শোনার পর আমার মনে হলো, আমি তোমাকে কোনোদিন সেভাবে সময় দিইনি। তাই কাল রাতে আমি ল্যাবের একাউস্টিক রুমে বসে নিজের হাতে তোমার জন্য একটা জিনিস বানিয়েছি। আর ফোন অফ ছিল কারণ ওই ল্যাবে কোনো সিগন্যাল কাজ করে না।”
রিন্নি কাঁপাকাঁপা হাতে প্যাকেটটা খুলল। ভেতরে একটা সুন্দর কাঁচের জার, আর তার ভেতরে ছোট ছোট কয়েকটা ধাতব প্রজাপতি। আরাভ জারটা হাতে নিয়ে একটা সুইচ টিপল। সাথে সাথে প্রজাপতিগুলো নীল আলোয় ডানা ঝাপটাতে শুরু করল আর রুমের স্পিকারে মৃদু একটা সুর বেজে উঠল।
আরাভ খুব নিচু স্বরে রিন্নির কানে কানে বলল, “ওগুলো মেকানিক্যাল প্রজাপতি রিন্নি। ফাহিমের প্রজাপতি তো শুধু কল্পনায়, কিন্তু আমার প্রজাপতি তোমার জানলার গ্রিলেও বসবে, আবার নীল আলোয় তোমার ঘরও ভরিয়ে দেবে। এবার কি হিংসেটা একটু কমাবে তুমি?”
রিন্নি এবার লজ্জায় আর অনুশোচনায় একদম শেষ হয়ে গেল। সে ভাবচ্ছে, “ইস! আমি লোকটাকে কত আজেবাজে কথা বললাম, আর উনি সারারাত জেগে আমার জন্য এই সারপ্রাইজ বানিয়েছেন!”
ফাহিম পাশ থেকে তালি দিয়ে উঠল। “বাপ রে ভাইয়া! তুমি তো দেখি আলবার্ট আইনস্টাইনকেও রোমান্টিকতায় হারিয়ে দিলে! ভাবীর রাগ এখন মনে হয় বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে।”
আফজাল চৌধুরী হেসে বললেন, “আরাভ বাবা, তুই তো দেখি আমার চেয়েও এক কাঠি উপরে। যা এবার দুজনে রুমে যাও।”
রোকেয়া বেগম মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, “সারারাত বাড়ি না থেকে এই সব লোহালক্কড় বানানো! যত সব পা*গলামি আর ন্যাকামি।” তবে তার মুখেও একটা হালকা হাসির রেখা দেখা গেল।
নাস্তার পর আরাভ আর রিন্নি নিজেদের ঘরে এল। রিন্নি জারের প্রজাপতিগুলো দেখছিল মুগ্ধ হয়ে।
আরাভ বিছানায় এলিয়ে পড়ে বলল, “রিন্নি, সারারাত ঘুমাইনি। এখন কি আমাকে একটু ঘুমানোর অনুমতি দেবে, নাকি আবার রিমান্ডে নেবে?”
রিন্নি আরাভের পাশে বসে ওর কপালে হাত রাখল। “সরি স্যার। আমি আসলে ভয় পেয়েছিলাম…”
আরাভ রিন্নির হাতটা নিজের বুকের ওপর রাখল। “ভয় পাওয়ার কিছু নেই রিন্নি। আমার হার্টরেট এখন তোমার স্পন্দনের সাথে মিলে গেছে। অন্য কেউ সেখানে ঢোকার মতো স্পেস নেই। আর হ্যাঁ, ওই সানিয়া আর তানজিনার কথা যে বললে… ওদের তো আমি ক্লাসে চিনতেই পারি না চশমা ছাড়া!”
রিন্নি খিলখিল করে হেসে উঠল। আরাভ চৌধুরীর প্রেমটা হয়তো সবার মতো সস্তা নয়, কিন্তু এর গভীরতা অনেক বেশি।
আরাভ চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করল, “রিন্নি, কাল সকালে যখন আমি ঘুম থেকে উঠব, তখন কিন্তু এই প্রজাপতি উপহারের বিনিময়ে আমার পাওনাটা দ্বিগুণ হবে। মনে থাকবে তো?”
রিন্নি গাল লাল করে বারান্দায় পালিয়ে গেল। রিন্নি জানালার গ্রিলের দিকে তাকাল প্রজাপতি বসুক আর না বসুক, তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজাপতিটা এখন তার বিছানায় শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।
চলবে,,,,

