#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৯
বিকেলের হালকা রোদটা চৌধুরী ভিলার বারান্দায় এসে পড়েছে। আরাভ ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। ল্যাপটপ নিয়ে খুব সিরিয়াস মুডে বসে আছে, তার কপালে চিন্তার ভাঁজ, আঙুলগুলো কিবোর্ডে কি যেন একটা জটিল ছক মেলাচ্ছে। রিন্নি দূর থেকে লক্ষ্য করছিল লোকটাকে।
গত কয়েকটা রাত আরাভ ঠিকমতো ঘুমায়নি, চোখের নিচে হালকা কালচে ছায়া। রিন্নির বুকের ভেতরটা কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠল। লোকটা কি নিজেকে শেষ করে দেবে এই ছাইপাশ কাজের নেশায়?
রিন্নি পা টিপে টিপে এগিয়ে এল। আরাভ এতটাই মগ্ন যে রিন্নির উপস্থিতি টেরও পেল না। রিন্নির মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি চাপল। সে ঝট করে আরাভের ল্যাপটপের কিবোর্ডের ওপর নিজের দুই হাত দিয়ে এলোপাতাড়ি টাইপ করা শুরু করল।
আরাভ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, তার এতক্ষণের সাজানো প্রোগ্রামটা রিন্নির আঙুলের ছোঁয়ায় এখন এক জগাখিচুড়ি পাকিয়ে গেছে।
আরাভ রিন্নির হাতটা চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “থামবা?”
রিন্নি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা না করেই থুতনি উঁচিয়ে বলল, “থামার জন্য টাকা নিব। এমনি এমনি থামব না।”
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা অর্ধেক নামিয়ে দিল। সে রিন্নির চোখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বলল, “এমনি বিছানায় কখনও থামতে বলব না বাট এটা থামানো দরকার।এটা শুধু আমার নেশা না, এটা আমার অস্তিত্বের লড়াই। বলো, কত টাকা লাগবে?”
রিন্নি দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে ভাবল এমন একটা অঙ্ক বলবে যা শুনে এই হিটলার প্রফেসরের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে। সে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে ভাবার ভান করে বলল, “১০০-২০০ কোটি ডলার!”
আরাভের ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, “সাহেবা কি আমাকে সরাসরি রাস্তায় নামানোর ধান্দা করছো?”
রিন্নি খিলখিল করে হেসে উঠল। সে ভাবল আরাভ মজা করছে। সে ঠাট্টা করে বলল, “কেন? ভয় পাচ্ছেন? আপনার পকেটে কি এত টাকা আছে নাকি যে রাস্তায় নামার চিন্তা করছেন? বড়জোর কয়েক হাজার টাকা হবে মানিব্যাগে!”
আরাভ এবার রিন্নির খুব কাছে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ গম্ভীর আর ভারী হয়ে গেল। সে রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ভিখারি মনে হয় আমাকে? তুমি যা চাইলে রিন্নি, তার চেয়েও অনেক বেশি এই ল্যাপটপের একটা এনক্রিপ্টেড ফোল্ডারে লুকানো আছে। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে আমি তোমাকে সুখী করতে পারব না। আমি তো তোমাকে এই পৃথিবী থেকেই হারিয়ে ফেলার ভয়ে প্রতি রাতে জেগে থাকি। ভিখারি তো আমি তখনই হব, যেদিন তোমাকে রক্ষা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলব।”
রিন্নি এবার একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। লোকটা কি সত্যি বলছে? নাকি ফিজিক্স পড়াতে পড়াতে এখন মাথা খারাপ হয়ে গেছে? সে এত টাকা কোথায় পাবে?
ঠিক তখনই ফাহিম ড্রয়িংরুমে ঢুকল। সে দেখল আরাভ আর রিন্নি খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে ফিসফিস করছে। ফাহিম গলা পরিষ্কার করে বলল, “ভাইয়া, রোমান্স কি একটু পরে করা যায়? হেড স্যার মানে নয়নার আব্বু গেটে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। সাথে একজন মহিলাও আছে।”
আরাভ ঝট করে উঠে দাঁড়াল। তার চেহারায় এক মুহূর্তের জন্য উদ্বেগের ছায়া পড়ল। সে রিন্নিকে ইশারা করে বলল, “রিন্নি, ভেতরে যাও। আর খবরদার, আমার ল্যাপটপে হাত দিবা না।”
আনোয়ার সাহেব ভেতরে ঢুকলেন। তার সাথে একজন মধ্যবয়সী সুদর্শনা মহিলা। রিন্নি পর্দার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখল। আনোয়ার সাহেবের চেহারা আজ খুব শুকনো। তিনি সোফায় বসে সরাসরি আরাভের দিকে তাকালেন।
“আরাভ, তোমাকে বলেছিলাম না যে সময় খুব কম? এই নাও মিসেস সুরাইয়া, ইনি আমাদের নতুন টিম মেম্বার” আনোয়ার সাহেব মহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
মিসেস সুরাইয়া আরাভকে দেখে একটা তীক্ষ্ণ হাসি দিলেন। “প্রফেসর আরাভ, আপনার তৈরি করা সেই ‘ব্লু চিপ’টা কি এখন রেডি? ডার্ক ওয়েবে আমাদের টার্গেট কিন্তু মুভ করছে।”
আরাভ শান্তভাবে জবাব দিল, “আমি কাজ করছি। তবে আমার পরিবারের ওপর যেন কোনো আঁচ না আসে। বিশেষ করে রিন্নি… ও খুব চঞ্চল, ও যেন এসবের কিছুই টের না পায়।”
আনোয়ার সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “আমরা চেষ্টা করছি আরাভ। কিন্তু ওরা খুব শক্তিশালী।”
রিন্নি পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু কিছুই শোনা যাচ্ছে না। তাই রিন্নি আর দাড়াল না।” যদি ওই ডাইনি সুরাইয়া আমাকে দেখে ফেলে তবে তো স্যার আমার হাড়গোড় দিয়ে ফিজিক্সের কঙ্কাল বানিয়ে ফেলবে!”
রিন্নি কোনোমতে পা টিপে টিপে নিজের ঘরের দিকে দৌড় দিল। কিন্তু তার মাথায় তখন ঘুরছে আরাভের সেই কথা “বিছানায় থামতে বলব না…”। লোকটা কি সত্যিই কোনো লম্পট হয়ে যাচ্ছে নাকি?
আনোয়ার সাহেব আর মিসেস সুরাইয়া চলে যাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছিল। আরাভ এক হাতে কপাল টিপে সোফায় বসে আছে। ল্যাপটপটা তখনো তার কোলের ওপর রাখা, স্ক্রিনটা অন্ধকার।
ফাহিম দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ভাইয়া, পরিস্থিতি কি এখন কন্ট্রোলে? নাকি আমি নয়নাকে ফোন করে বলব যে আমাদের পালানোর সময় হয়ে গেছে?”
আরাভ একটা বিরক্তিকর দৃষ্টি দিয়ে বলল, “তুই গিয়ে তোর ডায়েরিতে কবিতা লেখ ফাহিম। আমার মাথা খাস না।”
আরাভ ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। ঘরে ঢুকেই সে দেখল রিন্নি বিছানায় উল্টো হয়ে শুয়ে আছে, পা দুটো বাতাসে দুলছে। আরাভ ঢুকতেই রিন্নি ঝট করে উঠে বসল। তার চোখেমুখে হাজারটা প্রশ্ন কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত জেদ।
আরাভ আলমারি থেকে নিজের টি-শার্ট বের করতে করতে বলল, “উঁকিঝুঁকি মা*রা শেষ হলো মিসেস জেরি? সব কি বুঝতে পেরেছো?”
রিন্নি ভেঙচি কেটে বলল, “বুঝব না কেন? আপনি তো বড় কোনো চোর-ডাকাত দলের লিডার হয়ে গেছেন। ওই যে সুরাইয়া নাম না কড়াই ওই মহিলার সাথে আপনার কী ডিল? কি কথা হয়েছে আপনাদের?আপনাকে বলছি না মেয়েদের থেকে দূরে থাকবেন?”
আরাভ শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে রিন্নির দিকে কয়েক পা এগিয়ে এল। রিন্নি অবচেতনভাবেই একটু পিছিয়ে গেল। আরাভের খালি গলার হাড় আর চওড়া বুক দেখে রিন্নির হৃদস্পন্দন যেন কয়েক গুন বেড়ে গেছে।
আরাভ রিন্নির খুব কাছে এসে থামল। রিন্নি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বলল, “কি… কি করছেন? বেশি কাছে আসবেন না বলছি!”
আরাভ রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুমিই না বললে ১০০ কোটি ডলার লাগবে? ওই মহিলার সাথে ডিলটা সাকসেসফুল হলে অত টাকা আমার বাঁ হাতের খেল। কিন্তু তার আগে তোমাকে তো আমার ট্যাক্স শোধ করতে হবে।”
রিন্নি থতমত খেয়ে বলল, “কীসের ট্যাক্স? আমি কোনো ভ্যাট-ট্যাক্স জানি না!”
আরাভ বাঁকা হাসল। সে হুট করে রিন্নিকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। রিন্নি চমকে উঠে আরাভের গলা জড়িয়ে ধরল। “আরে! নামান আমাকে! অসভ্য একটা!”
আরাভ রিন্নিকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে ওর ওপর ঝুঁকে এল। রিন্নির চোখে তখন এক আকাশ ভয় আর এক চিমটি কৌতূহল। আরাভ রিন্নির নাকের ডগায় নিজের নাক ঘষে বলল, “কাল রাতের ডিলটা তো এখনো পেন্ডিং। তুমি চাইলে ওই ১০০ কোটি ডলার আমি তোমাকে এখনই দিতে পারি, কিন্তু তার বদলে আমার বিছানায় তোমাকে একটা নিয়ম মানতে হবে।”
রিন্নি ঢোক গিলে বলল, “কী… কী নিয়ম?”
আরাভ রিন্নির ওড়নার খুঁটটা আঙুলে জড়িয়ে টেনে একটু কাছে এনে বলল, “নিয়মটা হলো তুমি যতবার ল্যাপটপে হাত দিবে, ততবার তোমাকে আমার কাছে হার মানতে হবে। আর হারের শাস্তি হিসেবে আমাকে…”
আরাভ একটু থামল। রিন্নি চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করছিল কোনো এক ঝড়ের। কিন্তু আরাভ হঠাৎ রিন্নির কপালে একটা জোরে টোকা দিল!
“আউচ!” রিন্নি চোখ খুলে দেখল আরাভ হাসছে।
আরাভ বলল, “শাস্তি হিসেবে আমাকে এক কাপ কড়া কফি বানিয়ে খাওয়াতে হবে। আর হ্যাঁ, চিনি একদম দেবে না। তোমার বুদ্ধির মতোই কফিটাও যেন তেতো হয়।”
রিন্নি রাগ করে বালিশ ছুড়ে মারল। “আপনি একটা আস্ত শয়তান! আমি ভাবলাম আপনি বুঝি…”
“তুমি কী ভাবলে?” আরাভ আবার রিন্নির ওপর একটু বেশিই ঝুঁকে এল। তার দৃষ্টি এখন রিন্নির ঠোঁটের ওপর স্থির। সে খুব নিচু স্বরে বলল, “তুমি যা ভাবছো, সেটা করার জন্য আমার কারো পারমিশন লাগে না রিন্নি। তুমি কি চাও আমি আমার পাওনাটা এখনই বুঝে নি?”
আরাভ রিন্নির ঘাড়ের কাছে নিজের তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। রিন্নির পুরো শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। সে কোনোমতে বলল, “আপনি তো বললেন টাকা নেই আপনার কাছে…”
আরাভ রিন্নির গালটা আলতো করে কামড়ে দিয়ে বলল, “টাকা নেই, কিন্তু ভালোবাসা তো উপচে পড়ছে। এই যে এইমাত্র ১ কোটি ডলারের একটা ‘ট্যাক্স’ আদায় করলাম। বাকি ৯৯ কোটি ডলার কি আজ রাতেই শোধ করবে?”
রিন্নি লজ্জায় লাল হয়ে বালিশ দিয়ে মুখ ঢাকল। আরাভ হাসতে হাসতে ল্যাপটপটা নিয়ে বিছানায় বসল। রিন্নি বালিশের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখল আরাভ আবার কাজে ডুবে গেছে। কিন্তু এবার আরাভের ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি।
রিন্নি মনে মনে বলল, “এই হিটলার প্রফেসরকে নিয়ে আমি কী যে করি! একবার মনে হয় সে স্পাই, আরেকবার মনে হয় রোবট আবার মনে হয় রোমান্টিক! তবে যাই হোক, ওই সুরাইয়া ডাইনিকে আমি এই বাড়িতে ঢুকতে দেব না।”
ঠিক রাত ১২টা। চৌধুরী ভিলা যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন আরাভের ল্যাপটপে একটা লাল রঙের সিগন্যাল জ্বলে উঠল। আরাভ রিন্নির দিকে এক পলক তাকাল। রিন্নি তখন গভীর ঘুমে, তার হাতটা আরাভের পায়ের ওপর রাখা।
আরাভ বিড়বিড় করে বলল, “তোমাকে এই বিপদে জড়াতে চাই না রিন্নি। কিন্তু তোমাকে ছাড়া এই রহস্যের ইকুয়েশন আমি মেলাতেও পারছি না।”
আরাভ ল্যাপটপে টাইপ করল “Target moving towards the safe house. Initiate Phase 2.”
চলবে,,,,

