বিপরীত_মেরুর_টানে #পর্ব_২০

0
12

#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_২০
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন

সকাল বেলা জানলার পর্দা সরিয়ে রিন্নি দেখল বাইরে রোদের ঝিলিক। গত কয়েকদিনের সেই রহস্যময় গুমোট ভাবটা আজ যেন কিছুটা কম। রিন্নি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়িটা ঠিক করছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত হাত ওকে জড়িয়ে ধরল।

আরাভ চৌধুরীর পারফিউমের সেই চেনা নেশাক্ত গন্ধটা রিন্নির নাকে ধাক্কা দিল। আরাভ ওর ঘাড়ে মুখ গুঁজে খুব নিচু স্বরে বলল, “আজ তৈরি হয়ে নাও রিন্নি। তোমাকে নিয়ে আজ শহরের বাইরে এক জায়গায় যাব।”

রিন্নি অবাক হয়ে ঘুরল। রিন্নি দুষ্টুমি করে বলল, “কেন স্যার? বউয়ের সাথে হঠাৎ ঘুরার শখ হলো কেন?”

আরাভ রিন্নির কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে বলল, “না, আজ শুধু তুমি আর আমি। আর হ্যাঁ, একটা ছোট কাজ আছে। আমার এক পরিচিতর বাসায় যেতে হবে। তৈরি হয়ে নাও।”

শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে গাড়িটা যখন একটা সবুজে ঘেরা ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে থামল, তখন রিন্নির চোখ জুড়িয়ে গেল। বাড়ির সামনে বাগান, দোলনা আর চারদিকে এক অদ্ভুত শান্তি। বাড়ির মালিক জামিল সাহেব আর তার স্ত্রী নীলা ভাবি হাসিমুখে তাদের স্বাগত জানালেন। তাদের দুটো ছোট সন্তান আদি আর রাইসা ছুটে এসে আরাভকে জড়িয়ে ধরল।

ভেতরে ঢুকতেই রিন্নি দেখল এক আদর্শ সুখী পরিবারের চিত্র। ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করার সময় জামিল সাহেব নীলা ভাবির দিকে যেভাবে তাকাচ্ছেন, রিন্নির বারবার মনে হচ্ছিল কেউ যেন রূপকথার পাতা থেকে এদের তুলে এনেছে। জামিল সাহেব কিছুক্ষণ পর পর নীলা ভাবির চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, কখনো বা হাত ধরে বলছেন, “নীলা, আজ তোমাকে অন্যদিনের থেকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। ব্যপার কি?”

নীলা ভাবিও হেসে দিলেন। তিনি আরাভের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরাভ ভাই, আপনি তো রিন্নিকে একদম সময় দেন না মনে হয়। জামিল তো আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না।”

রিন্নি এটা শুনেই পাশে বসা আরাভকে একটা চিমটি কাটল। ফিসফিস করে বলল, “শুনলেন তো? ভালোবাসা কাকে বলে? জামিল ভাইয়ের কাছে একটু টিউশনি নিন তো!”

আরাভ কিছু বলল না। সে খুব মনোযোগ দিয়ে পুরো ঘরটা দেখছিল। তার চোখ দুটো স্ক্যানারের মতো একবার জামিল সাহেবের হাতের ঘড়ির দিকে যাচ্ছে, আবার রাইসার খেলনাগুলোর দিকে।

খাওয়া-দাওয়ার টেবিলে তো ভালোবাসার বন্যা বয়ে গেল। জামিল সাহেব নীলা ভাবিকে খাইয়ে দিচ্ছেন, রাইসা আর আদি হাসাহাসি করছে। রিন্নি আবার আরাভকে খোটা দিল, “দেখুন স্যার, স্বামীরা বউকে খাইয়েও দেয়। আর আপনি? আপনি তো খাওয়ার সময়ও ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনে হয় ল্যাপটপটাই আপনার প্রথম বউ!”

আরাভ এবারও চুপ। সে জাস্ট মৃদু হেসে রিন্নির পাতে একটা মাং-সের টুকরো তুলে দিল। আরাভের দৃষ্টি এখন দেয়ালে ঝোলানো একটা ফ্যামিলি পোট্রেটের দিকে, যেখানে একটা কোণ একটু উঁচানো।

ঠিক তখনই জামিল সাহেবের বড় মেয়ে, যে ভার্সিটিতে পড়ে, সোনিয়া ঘরে ঢুকল। আরাভকে দেখেই সোনিয়ার চোখেমুখে এক উজ্জ্বল আভা ফুটে উঠল। সে সোজা আরাভের পাশে এসে বসল।

“আরাভ স্যার! আপনি এখানে? বিশ্বাসই করতে পারছি না। আপনি জানেন আমাদের ডিপার্টমেন্টে আপনাকে নিয়ে কত ক্রেজ? আপনার ওই ইন্টেলিজেন্ট লুক আর গম্ভীর ভয়েস। ওহ মাই গড, আই এম আ বিগ ফ্যান!” সোনিয়া একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিল।

রিন্নির প্লেটে রাখা পরোটাটা গলায় আটকে যাওয়ার উপক্রম। সে চোখ বড় বড় করে সোনিয়াকে দেখল। সোনিয়া এবার আরাভের চশমাটা ছুঁয়ে বলল, “স্যার, এই ফ্রেমটা আপনার ওপর জাস্ট আগুন লাগে! আমি কি একটু ট্রাই করে দেখতে পারি?”

রিন্নি এবার জ্বলে উঠল। মনে মনে বলল, “এই মেয়ে কি এখন এখানেই আমার বরের ইন্টারভিউ শুরু করবে নাকি? চশমা ছুঁয়ে দেখছে কেন? আমাকে কি ওর চোখে পড়ছে না?”

রিন্নি চট করে আরাভের হাতটা শক্ত করে ধরল। সবার সামনেই একটু বেশিই আহ্লাদ করে বলল, “সোনিয়া সোনা, স্যারের চশমাটা পাওয়ার লেন্সের। ওটা পরলে তোমার চোখের বারোটা বেজে যাবে। তার চেয়ে বরং আমার এই লিপস্টিকটা দেখো, এটা তোমার ওপর বেশ মানাবে।”

সোনিয়া থমকে গেল। রিন্নি আবার আরাভকে খোটা দিল, “বাইরে আপনার এত ডিমান্ড, আর আপনি ঘরের বউকে একটু রোমান্টিক হয়ে দেখান না!”

আরাভ রিন্নির কাণ্ড দেখে মনে মনে হাসল। তার জেরি এবার হিংসে ফেটে পড়ছে। সে রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “হিংসা হচ্ছে? তুমি তো আমাকে পছন্দ করো না, এখন সোনিয়া যদি একটু প্রশংসা করে তবে ক্ষতি কী?”

রিন্নি দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আপনি বাড়ি চলুন একবার, আপনার প্রশংসা আমি হাড়ছাড়া বের করছি!”

দুই ঘণ্টা কেটে গেল। রিন্নি খুব খুশি এদের এত সুখী সংসার দেখে। কিন্তু আরাভের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। সে লক্ষ্য করল নীলা ভাবির গলার হারটা দামী হলেও তার হাতের কবজিতে একটা হালকা কালশিটে দাগ, যেটা সে মেকআপ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করেছে।

আর জামিল সাহেব রোমান্টিক অভিনয় করলেও তার পকেটে থাকা ফোনটা প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর ভাইব্রেট করছে, যেটা তিনি আড়াল করছেন। কিন্তু আরাভের চোখে কিছুই আড়ালো না।

আরাভ হুট করে রাইসাকে বলল, “মা, তোমার ওই নতুন রোবটটা একটু দেখাবে আমাকে? ওটা নাকি কথা বলতে পারে?”

রাইসা যখন রোবটটা নিয়ে এল, আরাভ ওটার নিচে একটা স্টিকার লক্ষ্য করল। ওটা কোনো খেলনা কোম্পানির স্টিকার নয়, ওটা একটা গোপন ট্র্যাকার কোম্পানির লোগো।

আরাভ উঠে দাঁড়িয়ে জামিল সাহেবকে বলল, “জামিল ভাই, আপনার স্টাডি রুমটা কি একটু দেখতে পারি? আমার একটা ইমেইল পাঠানোর ছিল।”

জামিল সাহেব এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। তার চোখের কোণে একটা পলকের জন্য আতঙ্ক ফুটে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি সামলে নিয়ে বললেন, “অবশ্যই আরাভ! চলো।”

স্টাডি রুমে ঢুকে আরাভ যখন ল্যাপটপ ওপেন করল, সে দেখল পর্দার আড়ালে একটা সার্ভার রান করছে। জামিল সাহেব বাইরে দাঁড়িয়ে নীলা ভাবির সাথে হাসাহাসি করছেন, কিন্তু আরাভ ল্যাপটপের এনক্রিপশন ভেঙে যা দেখল তাতে তার র*ক্ত হিম হয়ে গেল।

এই হাসিখুশি দম্পতি আসলে কোনো সুখী পরিবার নয়। এরা আন্ডারকাভার এজেন্ট, যারা গত দুই মাস ধরে আরাভের ওপর নজর রাখার জন্য এই এলাকাতে ঘর ভাড়া নিয়ে হ্যাপি ফ্যামিলি নাটক করছে। এমনকি বাচ্চাদুটোও কোনো অনাথ আশ্রম থেকে আনা হয়েছে। তাদের এই বাড়াবাড়ি পর্যায়ের রোমান্টিকতা ছিল আরাভকে বিভ্রান্ত করার একটা ফাঁদ।

আরাভ দ্রুত ল্যাপটপ থেকে একটা ডাটা কপি করে নিল। জামিল সাহেব এখন তার ফোনের সিগন্যাল দিয়ে বাইরে থাকা টিমকে অ্যালার্ট করছেন।

আরাভ ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। রিন্নি তখন সোনিয়ার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে চা খাচ্ছিল।

আরাভ শান্ত গলায় বলল, “রিন্নি, চলো। আমার একটা জরুরি মিটিং আছে, এখনই বের হতে হবে।”

রিন্নি অবাক হয়ে বলল, “এখনই? কেন? নীলা ভাবি তো কেবল পায়েস রান্না শুরু করলেন। দেখুন জামিল ভাই কত যত্ন করে বউকে পায়েস বানাতে হেল্প করছেন, আর আপনি…”

আরাভ এবার রিন্নির হাতটা খুব শক্ত করে ধরল। তার চোখের দৃষ্টিতে এক চরম সতর্কতা। রিন্নি বুঝতে পারচ্ছে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে।

জামিল সাহেব এগিয়ে এসে বললেন, “আরাভ ভাই, এখনই চলে যাবেন? পায়েসটা খেয়ে যান।”

আরাভ জামিল সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল। এক অদ্ভুত শীতল হাসি। সে বলল, “জামিল ভাই, আপনার পায়েসটা নিশ্চয়ই খুব মিষ্টি হবে, ঠিক আপনার অভিনয়ের মতো। তবে আমার বউয়ের আবার বেশি মিষ্টি সহ্য হয় না। ওর ফিগার নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা আসছি।”

আরাভ রিন্নিকে একরকম টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে নিয়ে এল। গাড়ি স্টার্ট দিয়েই সে ঝড়ের গতিতে হাইওয়েতে উঠে পড়ল।

রিন্নি সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে চেঁচিয়ে উঠল, “আপনি কি পা*গল হয়ে গেছেন? এত স্পিডে কেন চালাচ্ছেন? আর ওভাবে অভদ্রের মতো চলে এলেন কেন? নীলা ভাবি কত কষ্ট পাবে!”

রিন্নি আবার ঝঝিয়ে উঠল, “ওই যে জামিল ভাই আর নীলা ভাবি দেখলেন কত সুখী? জামিল ভাই বউকে দুই মিনিট পর পর কপালে চু-মু দিচ্ছিলেন, আর আপনি সেখানে মূর্তির মতো বসে কফি গিলছিলেন। আপনার ভেতরে কি এক ফোঁটা রোমান্স নেই? ওই সোনিয়া মেয়েটা আপনাকে ওভাবে টাচ করছিল, আর আপনি মূর্তির মতো বসে ছিলেন। আপনার লজ্জা করে না?”

আরাভ হঠাৎ হার্ড ব্রেক কষে গাড়িটা একদম হাইওয়ের এক নির্জন পাশে থামাল। রিন্নি ভয় পেয়ে গেল। “কী হলো? গাড়ি থামালেন কেন?”

আরাভ এবার সিটবেল্ট খুলে রিন্নির একদম ওপরে ঝুঁকে এল। রিন্নি সিটের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দিল।

আরাভের চোখে এখন আছে এক অদ্ভুত দহন।
আরাভ রিন্নির কানের লতিটা আলতো করে দাঁত দিয়ে টেনে ধরে খুব নিচু আর নেশাক্ত স্বরে বলল, “অনেক হয়েছে হিপি-হ্যাপি ফ্যামিলি নিয়ে তোমার আদিখ্যেতা রিন্নি। তুমি কি চাও আমি সবার সামনে জামিল সাহেবের মতো ওই ড্রামাগুলো করি? ওই পরিবারটা যে ফেক, ওই দম্পতি যে আসলে একে অপরকে সহ্য করতে পারে না আর শুধু অভিনয়ের জন্য ওই সব করছিল তা বোঝার মতো বুদ্ধি কি তোমার কোনোদিন হবে?”

রিন্নি থতমত খেয়ে বলল, “ফেক মানে? ওরা তো কত রোমান্টিক…”

আরাভ রিন্নির ঘাড়ের কাছে নিজের তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “ওটা রোমান্স না রিন্নি, ওটা হলো লোকদেখানো প্রহসন। আসল রোমান্স ড্রয়িংরুমে হয় না, ওটা চার দেয়ালের ভেতরে হয়। তুমি আমাকে অনরোমান্টিক বলছো না? তাহলে দেখো আসল রোমান্স কাকে বলে।”

আরাভ আর কোনো সময় দিল না। সে রিন্নির ঠোঁটে নিজের অধিকারটা এমনভাবে আদায় করে নিল যে রিন্নির পৃথিবীর সব লজিক, সব হিংসে আর সব অভিযোগ নিমিষেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। রিন্নির মনে হচ্ছে সে কোনো এক তীব্র ঝড়ের কবলে পড়েছে।

কয়েক মিনিট পর আরাভ সরে এল। রিন্নির মুখ তখন একদম টকটকে লাল। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

আরাভ আবার ড্রাইভ করা শুরু করল। সে বাঁকা হেসে বলল, “এখন বলো, কে বেশি রোমান্টিক?”

রিন্নি কোনো কথা বলতে পারছে না। সে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিজের ওড়নাটা শক্ত করে খামচে ধরে বসে রইল। আরাভ চৌধুরী লোকটা আসলেও একটা অসভ্য! সে যেমন শান্ত থাকতে জানে, তেমনই অশান্ত করতেও জানে।

আরাভ হঠাৎ বলল, “আর শোনো, ওই সোনিয়া মেয়েটা যখন প্রশংসা করছিল, তখন তুমি যেভাবে আমার হাত খামচে ধরেছিলে, ওটাই ছিল আমার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক দৃশ্য। তোমার হিংসুটেপনাটা আমি অনেক বেশি এনজয় করি গিন্নি!”

রিন্নি এবারও কথা বলল না, শুধু মনে মনে হাসল। তার বরটা অরোমান্টিক না, সে আসলে একটা ডেস্পারেট রোমান্টিক মানুষ, যে কেবল সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে।

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here