#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_২১
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
বাসায় ঢুকেই রিন্নি দেখল ড্রয়িংরুমের অবস্থা জঘন্য। সোফার কুশন মেঝেতে, ডাইনিং টেবিলে আধখাওয়া নাস্তার থালাবাসন। রিন্নি অবাক হয়ে চেঁচিয়ে বলল, “আম্মু! ও আম্মু! বাড়িতে কি তুফান এসেছিল নাকি? আর আমাদের বুয়া আম্মা কোথায়?” ওনার কপালে জলপট্টি, চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল।
রিন্নি আঁতকে উঠে বলল, “আম্মু! আপনার এই অবস্থা কেন? আর বুয়া কোথায়? ঘরদোরের এই শ্রী কেন?”
রোকেয়া বেগম ধপাস করে সোফায় বসে পড়লেন। “বলিস না রিন্নি মা, আজ সকাল থেকে ওই বুড়ো বুয়া আসেনি। ওর নাতি নাকি কাঁঠাল গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙেছে। আর আমারও দেখ, আজই প্রেসারটা বেড়ে মাথাটা এমন ঘুরছে যে রান্নাঘরে পা দিতে পারছি না। আফজাল সাহেবও গেছেন এক দাওয়াতে, ফিরতে রাত হবে।”
রিন্নি দ্রুত শাশুড়ির হাত ধরল। “আম্মা, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি আছি তো! আপনি এখনই ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”
রিন্নি কোমর বেঁধে রান্নাঘরে ঢুকল। কিন্তু ড্রয়িংরুম আর রান্নাঘরের অবস্থা দেখে তার আত্মা শুকিয়ে গেছে। থালাবাসনের স্তূপ হিমালয় সমান হয়ে আছে। রোকেয়া বেগম কাঁপতে কাঁপতে রান্নাঘরে এলেন, “রিন্নি মা, এক কাজ কর, আমি তরকারিটা অন্তত একটু কেটে দিই। তুই তো একা সব সামলাতে পারবি না।”
রিন্নি শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল, “একদম না! আপনি অসুস্থ শরীরে এখানে এক সেকেন্ডও দাঁড়াবেন না। আমি চৌধুরী বাড়ির বড় বউ, এইটুকু কাজ পারব না? যান তো আম্মা, আপনি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। এক ঘণ্টার মধ্যে সব ঝকঝকে হয়ে যাবে।”
রিন্নি জোর করে শাশুড়িকে ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে থালাবাসন ধোয়া শুরু করল। তখনই আরাভ চৌধুরী ঘরে ঢুকল। ল্যাপটপ ব্যাগটা একপাশে রেখে সে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। রিন্নিকে ওড়না কোমরে জড়িয়ে ঘামতে দেখে আরাভ একটু হাসল।
“কী ব্যাপার গিন্নি? আজ কি থালাবাসনের সাথে কুস্তি লড়ছো?”
রিন্নি রাগী চোখে তাকিয়ে বলল, “হাসবেন না স্যার! বুয়া আসেনি, মা অসুস্থ। আজ আমাকে সব একা করতে হচ্ছে। আপনি দাঁড়িয়ে না থেকে যদি একটু হেল্প করতেন…”
আরাভ ঘড়ি দেখল। সে শার্টের হাতা গুটিয়ে রিন্নির পাশে এসে দাড়াল। “ঠিক আছে, আজ নাহয় একটু প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস নেওয়া যাক।”
আরাভ একটা থালা নিয়ে মাজতে শুরু করল। রিন্নি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল প্রফেসর আরাভ চৌধুরী থালা মাজছে! দৃশ্যটা ফ্রেমে বাঁধানোর মতো। ঠিক তখনই আরাভের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘মিশন হেড আনোয়ার স্যার’।
আরাভ ফোন রিসিভ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তার চেহারা পলকে গম্ভীর হয়ে গেল। ফোন রেখে সে রিন্নির দিকে তাকাল। “রিন্নি, আমাকে এখনই বের হতে হবে। ওই ব্লু-চিপের লজিক গেটে কেউ বাইরের সার্ভার থেকে হামলা করেছে। আমি না গেলে সব ডাটা লস্ট হয়ে যাবে।”
রিন্নি বিমর্ষ হয়ে বলল, “এখনই যাবেন? আমি একা সব কীভাবে করব?”
আরাভ রিন্নির কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে বলল, “চিন্তা করো না। ফাহিমকে বলে যাচ্ছি।” আরাভ নিচ থেকে চেঁচিয়ে ডাকল, “ফাহিম! এদিকে আয় তাড়াতাড়ি!”
ফাহিম তাড়াতাড়ি নিচে এল। আরাভ ওর কানে একটা হালকা টোকা দিয়ে বলল, “শোন, মা অসুস্থ, রিন্নি একা কাজ করছে। তুই সব কাজে রিন্নিকে হেল্প করবি। একটা থালাও যেন না ভাঙে, আর ঘর যেন ঝকঝকে থাকে। আমি ফিরতে ফিরতে সব ঠিকঠাক চাই।”
আরাভ ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় রিন্নির দিকে তাকিয়ে একবার চোখ টিপল, যার মানে ছিল ‘বাকি পাওনা কাল বুঝব’।
আরাভ যাওয়ার পর ফাহিম বিশাল এক সেলফি তুলল। “ভাবী, চলো আজ আমরা চৌধুরী ভিলাকে তাজমহল বানিয়ে ফেলি! নয়না যখন ভিডিও কলে দেখবে যে আমি কত বড় গৃহিণী… মানে গৃহকর্তা, তখন ও নির্ঘাত আমার প্রেমে আবার পড়বে।”
রিন্নি শুকনো মুখে বলল, “তাজমহল পরে বানাস, আগে এই ড্রয়িংরুমটা একটু মুছে ফেল।”
ফাহিম খুব উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করল। সে আধা কেজি ডিটারজেন্ট আর তিন বালতি পানি পুরো ড্রয়িংরুমের মেঝেতে ঢেলে দিল। তারপর শুরু করল স্কেটিং।
রিন্নি ঘর ঝাড়ু দিয়ে এসে দেখল পুরো ড্রয়িংরুম এখন একটা ছোটখাটো পুকুর। ফাহিম মেঝের ওপর পিছলে গিয়ে সোফার তলায় ঢুকে আছে। ফাহিমকে পিছলাতে দেখে রিন্নির বেশ হাসি পেলেও পরিস্থিতির কথা ভেবে আরও কান্না পাচ্ছে। রিন্নি চিৎকার করে উঠল, “ফাহিম! তুই এটা কী করেছিস? আমি তোকে মোছামুছি করতে বলেছি, মাছ চাষ করতে বলিনি!”
ফাহিম সোফার তলা থেকে মাথা বের করে বলল, “ভাবী, জীবাণু মা*রার জন্য বেশি ফেনা দরকার। আমি তো হাইজিন মেইনটেইন করছিলাম!”
রিন্নি কপাল চাপড়াল। এরপর শুরু হলো রান্নাঘরের পর্ব। রিন্নি ভাবল রাতে বিরিয়ানি করবে। ফাহিমকে বলল, “ফাহিম, তুই মাংসটা একটু ধুয়ে দে তো।”
ফাহিম মাংস ধুতে গিয়ে ভাবল সাবান দিয়ে ধুলে বোধহয় আরও পরিষ্কার হবে! সে মাংসের হাড়ের ওপর ডিশওয়াশার বার ঘষতে লাগল। রিন্নি যখন সেটা দেখল, তার তখন পা*গল পা*গল দশা।
“ফাহিম! তুই কি আমাকে পা*গল করে ছাড়বি? তোর ধুতে হবে না, তুই আলুগুলো একটু ছিলে দে তো।”
ফাহিম আলু ছিলতে গিয়ে ভাবল ব্লেড দিয়ে ছিললে বোধহয় ডিজাইন ভালো হবে। সে আলু ছোলার পর দেখা গেল আলুগুলো এখন লিচুর সমান হয়ে গেছে!
রিন্নি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তুই যা এখান থেকে! তোর সাহায্য মানে আমার কাজ বাড়ানো। যা!”
ফাহিম মুখ কালো করে চলে গেল। রিন্নি এবার একা সব কাজে নামল। ড্রয়িংরুমের পানি সেচতে সেচতে রিন্নি ভিজে একাকার। তার ওপর রান্নাঘরের আগুনের আঁচ। রাত আটটা নাগাদ রিন্নি যখন শেষ ঘরটা মুছতে গেল, তার শরীরটা থরথর করে কাঁপতে শুরু করল।মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সে কোনোমতে সোফায় গিয়ে বসল।
শরীরটা হঠাৎ বড্ড ভারী লাগছে। রিন্নি বুঝতে পারচ্ছে তার জ্বর আসছে। প্রবল জ্বরে তার চোখমুখ লাল হয়ে গেছে।
রাত ১০টা। আরাভ চৌধুরী বাসায় ফিরল। বাসায় ঢুকেই দেখল ঘর একদম ঝকঝকে তকতবে। কিন্তু ড্রয়িংরুমের কোণে রিন্নি সোফার ওপর গুটিসুটি মে*রে শুয়ে আছে। তার গায়ে একটা পাতলা চাদর, মুখটা একদম ফ্যাকাসে।
আরাভ ব্যাগটা রেখে রিন্নির কাছে গেল।”কী ব্যাপার জেরি? হার মানলে নাকি? নাকি কাজ শেষ করে মেডেলের অপেক্ষা করছো?”
রিন্নি কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ দুটো বন্ধ, ঠোঁটগুলো শুকিয়ে গেছে। রিন্নির কপালে হাত রাখতেই সে আঁতকে উঠল। কপাল আগুনের মতো গরম!
আরাভ রিন্নিকে ডাকল, “রিন্নি? এই রিন্নি?”
রিন্নি আধোবোজা চোখে তাকিয়ে কোনোমতে হাসার চেষ্টা করল। “স্যার… কাজ সব শেষ… আমি আর পারছি না… আমি আম্মুর কাছে যাবো… আমি আর বিয়ে করব না…”
“সেটা হবারও নয়” আরাভ রিন্নিকে পাজাকোলা করে নিজের ঘরে নিয়ে এল। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সে থার্মোমিটার দিয়ে দেখল জ্বর ১০৩.৫! আরাভ এবার সত্যিই চিন্তায় পড়ে গেল।
“উফ! আমার কপালে যে এই ছিল তা কে জানত! এক দিনের কাজেই কুপোকাত! ভাবলাম একটা আয়রন লেডি বিয়ে করলাম যে অন্তত ল্যাবের ভারী ভারী জিনিসপত্র সরাতে পারবে, কিন্তু এ তো দেখি চিনেমাটির পুতুল। এক বেলা বুয়া আসেনি তাতেই জ্বরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে! কি মেয়ে বিয়ে করলাম রে বাবা!”
রিন্নি জ্বরের ঘোরেও আরাভের কথা শুনতে পেল। সে চোখ না খুলেই খুব ধীরে ধীরে বলল, “আপনি… আপনি একটা শয়তান… পাষাণ… আমি কাজ করেছি তাই জ্বর এসেছে… আপনি তো ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকেন…”
আরাভ নিজের রুমাল ভিজিয়ে রিন্নির জলপট্টি দিতে শুরু করল। রিন্নি জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে বলছে, “জামিল ভাইয়া কত ভালো… নীলা ভাবিকে কত আদর করে… আর আপনি…”
আরাভ রিন্নির কপালে জলপট্টিটা একটু জোরেই চেপে ধরল। “চুপ করো জেরি! স্বামীর সামনে পরপুরুষের প্রশংসা করো? জামিল ভাইয়া রাজা। আর আমি হলাম পাষাণ, তাই না? এখন একদম চুপচাপ ঘুমাও। কারে বুঝালাম সারা রাস্তা এতকিছু?”
আরাভ সারা রাত রিন্নির মাথার কাছে বসে রইল। মাঝে মাঝে সে রিন্নির হাতের তালু মালিশ করে দিচ্ছে, মাঝে মাঝে কপালে নিজের হাত রেখে তাপমাত্রা চেক করছে। রিন্নি জ্বরের ঘোরে আরাভের একটা হাত শক্ত করে ধরে আছে।
মাঝরাতে জ্বরটা একটু কমলে রিন্নি চোখ মেলল। দেখল আরাভ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আরাভের চোখে আজ লাল হয়ে আছে।
আরাভ রিন্নির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো রিন্নি। তুমি সুস্থ না হলে এই বাসায় কার সাথে ঝগড়া করব? আর শোন, কাল যদি তুমি সুস্থ না হও, তবে ওই ফাহিমকে আমি ঘর মোছার জন্য পার্মানেন্ট ডিউটি দিয়ে দেব কিন্তু!”
রিন্নি ঘোরের মাঝেই মুচকি হাসচ্ছে। যে মানুষটা ল্যাপটপ ছাড়া কিছু বোঝে না, সে আজ তার জন্য রাত জেগে জলপট্টি দিচ্ছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?
চলবে,,,

