#বিপরীত_মেরুর_টানে
#পর্ব_২২
#লেখনীতে_আরিবা_নাওশীন
চৌধুরী ভিলার রাতটা আজ বড্ড ভারী হয়ে আছে। বৃষ্টির শব্দ নেই, কিন্তু চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। আরাভের ঘরের হালকা নীল আলোটা রিন্নির ফ্যাকাসে মুখে পড়ে এক অদ্ভুত করুণ দৃশ্যের অবতারণা করেছে। রিন্নির জ্বর এখনো কমার নাম নেই। সে জ্বরের ঘোরে অসংলগ্ন কথা বলছে, মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছে।
ফাহিম দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আরাভ লাল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “ফাহিম, বুয়াকে ফোন করেছিস? ও কি কাল আসবে?”
ফাহিম আমতা আমতা করে বলল, “ভাইয়া, বুয়া ফোন ধরে বলেছে ওর নাতি পা ভেঙে গেছে। সে নাতির কাছে থাকবে… ও আর এই বাসায় কাজ করতে আসতে পারবে না। এখন কী হবে ভাইয়া? আম্মুও অসুস্থ, ভাবীও এই অবস্থা…”
আরাভ চোয়াল শক্ত করে বলল, “তোর ভাবীর এই অবস্থার জন্য তুই দায়ী। যা এখান থেকে, কালকের মধ্যে নতুন বুয়া অ্যারেঞ্জ না করলে তোকে দিয়ে আমি ঘর মোছাব।”
ফাহিম চলে যাওয়ার পর আরাভ ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। সে ধীর পায়ে রিন্নির বিছানার পাশে এসে বসল। রিন্নি তখন প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় আধোবোজা চোখে পড়ে আছে।
আরাভ রিন্নির কপালে রাখা জলপট্টির কাপড়টা সরিয়ে নিল। তার হাতটা কাঁপছে, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত নেশাক্ত আর হিংস্র আভা। সে রিন্নির তপ্ত কপালে নিজের হাত রেখে বিড়বিড় করতে শুরু করল।
“কেন অসুস্থ হলে রিন্নি? কেন?” আরাভের কণ্ঠস্বর একদম নিচু, কিন্তু তাতে এক ধরণের উন্মাদনা মিশে আছে। “এই জ্বর… এই দুর্বলতা তোমাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। আমি এটা সহ্য করতে পারছি না।”
আরাভ রিন্নির অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিল। তার দৃষ্টি এখন রিন্নির ঠোঁটের ওপর স্থির। জ্বরের তাপে রিন্নির ঠোঁটগুলো শুকনো আর লাল হয়ে আছে। আরাভ রিন্নির মুখের একদম কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল
“তুমি কি জানো জেরি? যখন তুমি সুস্থ থাকো, তখন আমি তোমাকে শাসন করি। কিন্তু এখন তুমি নিথর হয়ে পড়ে আছো, এটা আমাকে পা*গল করে দিচ্ছে। তুমি আমার অধীনে থাকবে, কিন্তু এভাবে অসুস্থ হয়ে নয়। এই জ্বরটাকেও আমি ঘৃণা করি কারণ ওটা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি ছাড়া অন্য কিছু তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে। এটা আমি কিভাবে মেনে নি?”
আরাভ হঠাৎ রিন্নির একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে জোরে চাপ দিল। সে রিন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসল। “সবাই ভাবে আমি একজন জিনিয়াস প্রফেসর। কিন্তু তারা জানে না, তোমাকে নিজের আয়ত্তে রাখার জন্য আমি কতটা নিচে নামতে পারি। ওঠো রিন্নি! ঝগড়া করো আমার সাথে!”
রিন্নি কোনো সাড়া দিল না, শুধু একটা অস্ফুট শব্দ করল। আরাভ এবার রাগে আর আক্ষেপে রিন্নির ওপর ঝুঁকে এল। রিন্নির ওপর তার অধিকারের নেশাটা আজ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সে রিন্নির ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। রাগের মাথায় সে রিন্নির নিচের ঠোঁটে সজোরে একটা কামড় বসিয়ে দিল।
“উহ… মা…” ঘুমের ঘোরেই রিন্নি যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল। জ্বরের প্রচণ্ড দুর্বলতার মাঝেও ওই তীক্ষ্ণ ব্যথাটা তার স্নায়ুকে নাড়া দিয়ে গেল। রিন্নির চোখ দিয়ে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে ঘুমের ভেতরই ডুকরে কেঁদে উঠল, যেন কোনো এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখছে সে।
রিন্নির কান্না দেখে আরাভ হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেল। সে এক ঝটকায় সরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন একরাশ আতঙ্ক আর অনুশোচনা। সে কী করল এটা? সে তো রিন্নিকে ভালোবাসে, তাকে রক্ষা করতে চায়; তবে কেন নিজের ভেতরের এই হিংস্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না?
আরাভ পা*গলের মতো আবার রিন্নির পাশে বসে পড়ল। সে রিন্নির হাত দুটো নিজের চোখের ওপর চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলতে লাগল “সরি রিন্নি! আই এম সরি! আমি… আমি বুঝতে পারিনি। প্লিজ কেঁদো না। আমি জানোয়ার, আমি শয়তান। প্লিজ জেগে ওঠো জেরি!”
আরাভ সারারাত রিন্নির পায়ে মাথা রেখে মেঝেতে বসে রইল। প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে অপরাধবোধের মতো বিঁধছিল। মাঝে মাঝে সে রিন্নির ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেখছিল র”ক্ত বেরোচ্ছে কি না। তার ভেতরের সাইকো সত্তাটা আবার শান্ত হয়ে গেছে, এখন সেখানে শুধু এক অসহায় প্রেমিকের হাহাকার।
পরদিন সকাল। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা রোদে রিন্নির ঘুম ভাঙল। শরীরটা এখনো ম্যাজম্যাজ করছে, তবে জ্বরটা অনেকটাই নেমে গেছে। সে দেখল আরাভ ল্যাপটপ নিয়ে পাশের চেয়ারে বসে আছে, কিন্তু ওর চোখমুখ বড্ড শুকনো, যেন সারা রাত এক মুহূর্তও ঘুমায়নি।
রিন্নি ধীরস্থিরভাবে উঠে বসার চেষ্টা করতেই আরাভ এগিয়ে এল। “উঠো না, শুয়ে থাকো। কেমন লাগছে এখন?”
রিন্নি নিজের ঠোঁটে হাত দিল। ঠোঁটটা একটু ফোলা লাগছে আর সেখানটা চিনচিন করছে। সে ভ্রু কুঁচকে আরাভের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্যার, কাল রাতে আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।”
আরাভ একটু থতমত খেয়ে গেল। সে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, “কী স্বপ্ন?”
রিন্নি ঠোঁটে জিব বুলিয়ে বলল, “স্বপ্ন দেখলাম—একটা বিশাল বড় লাল রঙের বল্লা (বোলতা) উড়ে এসে আমার ঠোঁটে হুল ফুটিয়ে দিয়েছে। মাগো! কী যে ব্যথা! মনে হলো ব্যথাটা স্বপ্নে না, সত্যিই পেয়েছিলাম। আমি কান্নাও করেছিলাম স্বপ্নে!”
আরাভ এবার ঘামতে শুরু করল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ডং করে বলল
“বল্লা কামড়াবে না তো কী মৌমাছি আসবে? ওই যে জামিল সাহেবের বাড়িতে গিয়ে সোনিয়া মেয়েটার সামনে বেশি পকপক করেছিলে, হয়তো ওখান থেকেই কোনো বল্লা তোমার পিছু নিয়েছিল। আর তুমি যে ঘুমিয়ে থাকলে কী যে করো! নিজেই হয়তো নিজের ঠোঁট কামড়ে দিয়েছো। একদিন কাজে জ্বর চলে আসে আর সারারাত বল্লার স্বপ্ন দেখে। কি মেয়ে বিয়ে করলাম রে বাবা!”
রিন্নি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “হ্যাঁ! সব দোষ আমার। বল্লা স্বপ্নে কামড়ালো আর আপনি বকা দিচ্ছেন আমাকে। কিন্তু বিশ্বাস করেন স্যার, ব্যথাটা এখনো পাচ্ছি।”
আরাভ মনে মনে বলল, “ব্যথা তো পাবেই জেরি। ওই বল্লাটা যে আমি নিজেই ছিলাম।”
আরাভ রিন্নির সামনে এক গ্লাস গরম দুধ রেখে দিয়ে বলল, “খাও এটা। বল্লা তাড়ানোর ওষুধ আছে এতে। আর আজ থেকে তোমার ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ, যতক্ষণ না নতুন বুয়া আসছে।”
আরাভ চৌধুরীর এই শাসন আর ডায়ালগগুলোর মাঝে কোথাও একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। আরাভের এই শান্ত রূপের আড়ালে একটা ভয়ঙ্কর সাইকো সত্তা বাস করে, যে কেবল রিন্নিকে নিজের করে পাওয়ার জন্য যেকোনো সীমা লঙ্ঘন করতে পারে।
চলবে,,,,

