#বিপরীত_মেরুর_টানে
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪৮
আরাভ রিন্নির শিয়রে বসে আছে। ভোরের আলোয় রিন্নির মুখটা বড্ড মায়াবী লাগছে। ড্রাগনের দেওয়া সেই বিষের নীল আভা কেটে গিয়ে ওর ত্বকে এখন স্বাভাবিক লাবণ্য ফিরে এসেছে। নয়না ল্যাবের সব রিপোর্ট চেক করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরাভের দিকে তাকাল।
নয়না মৃদু হেসে বলল, “ভাইয়া, বিপদ কেটে গেছে। অ্যান্টিডোটটা পারফেক্টলি কাজ করেছে। ভাবী এখন একদম সেফ, আর আমাদের ছোট্ট মেহমানও দিব্যি আছে।”
আরাভ নয়নার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। ওর লাল হয়ে থাকা চোখদুটো বলে দিচ্ছে গত কয়েকটা রাত ও কতটা নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছে। আরাভ রিন্নির কপালে আলতো করে হাত রেখে বিড়বিড় করল, “এবার কোনো ভুল হতে দিইনি জেরি। এবার আমি তোমায় আর আমাদের স্বপ্নকে হারতে দিইনি।”
বেলা বাড়ার সাথে সাথে রিন্নির জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলেই সে দেখল ঘরের চারপাশটা ফুলে ভরা। দুই পরিবারের সবাই সেখানে উপস্থিত। রিন্নির মা ওর জন্য সুজি আর গরম দুধ নিয়ে বসে আছেন।
রিন্নি হাসিমুখে সবার দিকে তাকাল। আরাভ ওর পাশে গিয়ে বসতেই রিন্নি ওর হাতটা শক্ত করে ধরল।
“স্যার, আপনি না থাকলে আজ হয়তো আমি আর…”
আরাভ রিন্নির মুখে আঙুল দিয়ে থামিয়ে দিল। “চুপ! একদম ওসব কথা বলবে না। তুমি আছো বলেই তো আমি আছি জেরি।”
রিন্নির বাবা এগিয়ে এসে আরাভের কাঁধে হাত রাখলেন। ওনার চোখে আজ কৃতজ্ঞতার জল। “আরাভ বাবা, তুমি আজ প্রমাণ করলে মাফিয়া পরিচয়টা তোমার মুখোশ মাত্র, আসলে তুমি একজন যোদ্ধার মতো নিজের পরিবারকে আগলে রাখতে জানো।”
বিকেলে আরাভ একবার বেসমেন্টের সেই গোপন কুঠুরিতে গেল যেখানে ড্রাগনকে আটকে রাখা হয়েছে। ড্রাগনের দুই পায়েই গুলি লেগেছে, সে এখন খাঁচায় বন্দি নেকড়ের মতো গোঙাচ্ছে।
আরাভ একটা চেয়ার টেনে ওর সামনে বসল। হাতে ওর সেই সিলভার পিস্তল।
আরাভ ঠান্ডা গলায় বলল, “জানো ড্রাগন, তোমাকে আমি এক গুলিতে মে-রে ফেলতে পারতাম। কিন্তু তাতে আমার ফাহিমের আর আমার প্রথম সন্তানের আত্মা শান্তি পেত না। তোমাকে আমি পুলিশের হাতে তুলে দেব না। কারণ আইনের ফাঁক দিয়ে তুমি বেরিয়ে যেতে পারো।”
ড্রাগন ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকাল। “তবে কি ম-ারবে না আমাকে?”
আরাভ হাসল, তবে সেই হাসিতে কোনো দয়া ছিল না। “না। তোমাকে আমি ডক্টর জামানের সেই পুরনো রিহ্যাব সেন্টারে পাঠাব। সেখানে তোমাকে প্রতি রাতে ওই নীল কেমিক্যালের ঘোরে রাখা হবে। তুমি জ্যান্ত থাকবে ঠিকই, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে নিজের কৃতকর্মের হ্যালুসিনেশন দেখবে। এটাই হবে তোমার নরক।”
আরাভ ইশারা করতেই গার্ডরা ড্রাগনকে টেনে নিয়ে গেল। শহরের বুক থেকে ড্রাগন নামক বিষাক্ত অধ্যায়টা চিরতরে শেষ হয়ে গেল।
মাস খানেক পর। ম্যানশনে এখন সাজ সাজ রব। রিন্নির প্রেগন্যান্সির দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার চলছে। আরাভ এখন এক অন্য মানুষ। সে এখন আর হ্যাকিং জন্য ল্যাপটপের সামনে বসে না, বরং ইন্টারনেটে সার্চ দেয় ‘প্রেগন্যান্ট স্ত্রীর জন্য সবচেয়ে পুষ্টিকর খাবার কী?’ অথবা ‘বাচ্চাদের জন্য সেরা খেলনা ব্র্যান্ড কোনটি?’
নয়না আর রিন্নি সোফায় বসে হাসাহাসি করছে। নয়না বলল, “ভাবী, ভাইয়ার কাণ্ড দেখেছেন? কাল রাতে দেখলাম বাচ্চার জন্য এক গাদা স্টোরিবুক কিনে এনেছেন। বাচ্চা তো এখনো পেটে, ও কি ওসব পড়বে?”
রিন্নি হাসতে হাসতে বলল, “তোমার ভাইয়ার প-াগলামি তো জানোই। উনি নাকি এখনই বাচ্চার নামও ঠিক করে ফেলেছেন।”
ঠিক তখনই আরাভ এক বাটি ফল নিয়ে ঘরে ঢুকল। রিন্নি ভ্রু কুঁচকে বলল, “স্যার, আবার ফল? আমি আর খেতে পারছি না।”
আরাভ গম্ভীর মুখে বলল, “নো আর্গুমেন্ট জেরি! এটা তোমার জন্য নয়, আমার ছোট্ট ফাহিমের জন্য।”
রিন্নি হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গেল। “স্যার, আপনি কি নামটা সত্যিই ভেবেছেন?”
আরাভ রিন্নির পাশে বসে ওর পেটে হাত রাখল। খুব আবেগি গলায় বলল, “যদি ছেলে হয়, তবে ওর নাম হবে ‘ফাহিম চৌধুরী’। আমাদের হারানো ফাহিম আবার এই নামেই আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। আর যদি মেয়ে হয়, তবে ওর নাম হবে ‘আরান্না’ তোমার আর আমার নামের মিশেলে।”
রিন্নির চোখে পানি এসে গেল। সে আরাভের কাঁধে মাথা রাখল। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। পাঁচ বছর আগের সেই বৃষ্টির রাত কেড়ে নিয়েছিল সব, আর আজকের এই বৃষ্টির দুপুর ফিরিয়ে দিচ্ছে সব। নয়না জানলা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাহাকার তো চিৎকার করতে চাইছে।
অন্ধকার রাতগুলো এখন আর ভয়ের নয়, বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তির। আরাভ আর রিন্নির সংসারে এখন চব্বিশ ঘণ্টা ছোটদের রাজত্ব। রিন্নি এক হাতে বড় ছেলে ফাহিমকে সামলাচ্ছে, যে হুবহু ওর মামা ফাহিমের মতোই ফাজিল আর ফাঁকিবাজ হয়েছে। অন্যদিকে, ছোট মেয়ে আরান্না যেন আরাভের কার্বন কপি জেদ আর জেদ!
রাত এগারোটা বাজে। আরাভ ল্যাপটপ বন্ধ করে বিছানায় এসে বসল। রিন্নি তখন আরান্নাকে দোল দিচ্ছে। আরান্নার দুচোখ একদম বড় বড় করে খোলা। ঘুমানোর কোনো নামগন্ধ নেই।
আরাভ বিরক্তি নিয়ে রিন্নির দিকে তাকিয়ে বলল, “রিন্নি, আজ আমার কাছে ঘুমাও না প্লিজ? আরান্নাকে বুয়ার কাছে দিয়ে আসো না আজ এক রাতের জন্য!”
রিন্নি চোখ কপালে তুলে বলল, “আরাভ, বোকার মতো কথা বলো না তো! আরান্না সারাদিন যেখানেই থাকুক, রাতে আমাকে ছাড়া কান্না করে। তুমি তো জানো ও কতটা সেনসিটিভ।”
আরাভ এবার বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “দূর! করবে না কান্না। আমি বুঝি না, আমি সারাদিন বাইরে কাজের চাপে থাকি। তখন তো ও তোমার সাথে থাকতেই পারে, তা না দিনে ও ঠিকই নাক ডেকে ঘুমায়। আর রাতে যখন আমি একটু তোমার কাছে আসব, তখন ও ঠিক জেগে থাকবে। এটা কোনো কথা?”
রিন্নি খিলখিল করে হেসে ফেলল। আরান্নাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ও আরাভের দিকে ফিরে বলল, “আরাভ, তুমি তোমার মেয়েকেই হিংসা করছো? সিরিয়াসলি! তাও আবার তোমার বউকে নিয়ে? যেখানে দুটাই তোমার রেজিস্ট্রি করা!”
আরাভ ঝট করে উঠে বসল। ওর চোখেমুখে ঘোর অন্যায় হওয়ার ছাপ। “হ্যাঁ তো! ও কেন বারবার আমার বউকে নিয়ে টানছে? ও আসার পর থেকে আমি আমার বউকে এক মুহূর্তের জন্য একান্তে পাচ্ছি না। সবসময় মাঝখানে দেয়াল হয়ে থাকে!”
রিন্নি আলতো করে আন্নির চিবুক ছুঁয়ে দিয়ে বলল, “স্বাভাবিক। খুব নাচছিলা না যে আরান্না একদম তোমার কার্বন কপি হয়েছে? এখন বুঝো, তোমার মতো দেখতে হয়েছে তো স্বভাব চরিত্রও তো তোমার মতোই হবে।”
আরাভ হাত উল্টে বলল, “তো আমি বউ পা-গল হলে ও জামাই প-াগল হবে, সেটা মানতাম। তা না, ও কেন মা পা-গল হয়েছে? এটা তো ডিসক্রিমিনেশন!”
রিন্নি বাঁকা হাসল। “ওই যে তোমার স্বভাব। তোমার যেসব জিনিস ভালো লাগে, ওরও ঠিক সেই সব জিনিসই লাগবে। তুমি যেমন আমাকে ছাড়া এক ফোঁটা চলতে পারো না, ও-ও ওর বাবাকে নকল করছে।”
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় শুয়ে পড়ল। পাশেই আরান্না মিটিমিটি হাসছে, যেন ও বাবার সব কথা বুঝতে পারছে। আরাভ আরান্নার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “মেয়ে হইছে নাকি সতিন হইছে বুঝলাম না! সব সময় আমার বউ নিয়ে টানাটানি করাই লাগবে। জীবনডা আমার পুরো বেদনার হয়ে গেল রে!”
রিন্নি হাসতে হাসতে আরাভের হাতটা ধরল। অন্যপাশে ফাহিম ওর মতোই শান্ত ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে। আরাভ ফাহিমের দিকে তাকালে ওর মনটা জুড়িয়ে যায়। ঠিক পাঁচ বছর আগে যাকে হারিয়েছিল, আজ যেন সেই ফাহিমই এই ছোট্ট দেহের মাঝে ফিরে এসেছে। ফাহিমের শান্ত স্বভাব দেখে আরাভ শান্তি পায়, কিন্তু এই মিনি মাফিয়া আরান্নাকে সামলাতে গিয়ে ওর হিমশিম অবস্থা।
রিন্নি আরাভের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, “রাগ করো না স্যার। তোমার জেরি এখন মা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তোমার ওই অবাধ্য জেরিটা কিন্তু এখনো তোমার বুকেই আছে।”
আরাভ রিন্নিকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে আরান্নার হাতটা ধরল। বাইরের চাঁদের আলোয় পুরো ঘরটা এখন এক পূর্ণিমার সাজে সেজেছে।
চলবে,,,
(শেষ করে দি🐸)

