একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #সূচনা_পর্ব

0
4

একটা ছিলো সোনার কন্যা মেঘ বরণ কেশ,
ভাঁটি অঞ্চলে ছিলো সেই কন্যার দেশ!
দুই চোখে তার আহারে কি মায়া
নদীর জলে পড়লো কন্যার ছায়া…..

ক্যাসেটে বেশ কয়েকবার ধরে গানটা বাজতেই আছে। কেউ একজন খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গানের সুরে এবং শব্দে মগ্ন হয়ে আছে। তার দৃষ্টি জানালার বাহিরে। ঘরে হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে। আঁধার ঘরে হ্যারিকেনের কমলা আলোয় উচ্চ গড়নের পুরুষটির সুদর্শন মুখশ্রী জ্বলজ্বল করছে। তবে দেখে বুঝা মুসকিল ভেতরে কি চলছে। খাটে বসে থাকা সাঈদ আরহাম কে চোখের ইশারা করলো। কি হয়েছে বুঝতে পারছে না দুজনে। সাঈদ খাট থেকে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে গিয়ে ক্যাসেটের গান পাল্টে দিতে দিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার উদ্দেশ্য বলল,

“এক গান কত শুনবি? এক নাগারে কমছে ছয়, সাতবার শুরু ও শেষ হলো।”

মাহাদের মগ্নতা নষ্ট হলো। মতিষ্ক বর্তমানে ফিরলো। সাঈদের কন্ঠে পিছনে ফিরে তাকালো তক্ষনাৎ । পরনের সুট বুট এখনো খোলেনি সে। সাঈদের দিকে তাকিয়ে হাসলো কেবল। বসলো গিয়ে খাটে। আরহামের পাশে বসে জুতো খুলতে খুলতে উত্তর দিলো,

“ গানটা শুনতে ভালো লাগছে। কেমন জীবন্ত লাগছে। মনে হচ্ছে আশে পাশে গানটার অস্তিত্ব আছে। ”

“ হঠাৎ এতো ভালোলাগা কেন? তোর কি হয়েছে মাহাদ?” ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো। সাঈদের প্রশ্নে মাহাদ থমকে গেলো। যেভাবে থমকে গিয়েছিলো সন্ধ্যা বেলাতে। সেই শেষ বেলার মুহূর্ত টা এখনো চোখে ভাসছে। কি অপরুপ দৃশ্য দুচোখের পাতায় খেলা করছে। ফুরিয়ে যাওয়া সময়টার জন্য তার আফসোস লাগছে। মাহাদের দিকে ওরা দুজনে উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। চোখে সন্দেহ বিরাজ করছে। মাহাদ উঠে দাঁড়ালো। তাদের সন্দেহ ভাজন দৃষ্টি দেখে স্মিত হাসল। বলল,

“ভালোলাগার কারণ সোনার কন্যা। আমি সেই সোনার কন্যা কে খুঁজে পেয়েছি। ঠিক বর্ননার সোনার কন্যার মতোই দেখতে। হুবহু একই যেন।”

ওরা দুজনে বিস্মিত হলো। চাহনি বড় বড় করে তাকালো। আরহাম জানতে চাইলো,

“ কে সে?”

“অচেনা এক কন্যা। যার শ্যাম বরণ, মেঘ বরণ কেশ, মায়াময় চাহনি, বাসতি সবই মিলেছে। যেন সে জীবন্ত সোনার কন্যা।”

মাহাদ উত্তর দিয়েই উঠে গিয়ে গানটা আবারো চালু করলো। একই সুরে বেজে উঠলো গানের শব্দ গুলো। ওরা দুজনে বিস্মিত চোখে চেয়ে আছে। সবটা কেমন ঘোলাটে তাদের কাছে। মাহাদ চোখ বন্ধ গানটা অনুভব করতে লাগলো। মেলাতে লাগলো বাস্তব কে। মনে পড়লো আজকের সন্ধ্যে বেলার আকস্মিক ঘটনা।

*************

সময়টা ২০০০ সাল। বিধান নগরের সোনাইমুড়ী গ্রামে হঠাৎ নাম না জানা এক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। অসুস্থতার ঢল নেমেছে গ্রামে। একের পর এক মানুষ অসুস্থ হতে থাকে। দুদিন পেরোতেই ছড়িয়ে পড়ে আশে পাশের আরো দুই গ্রামে। বিধান নগর হলো এক বিচ্ছিন্ন জনপদ। নদী ও হাওড়ে বেষ্টিত এই ভাটি অঞ্চলের আটটি গ্রাম নিয়ে তৈরি এই নগর। আধুনিকতার ছোঁয়া নেই, জেলা শহর তো দূর উপজেলা শহরে যেতেও পানি পথে প্রায় ঘন্টা সময় লাগে। তার পর রাস্তা পাড়ি দিয়ে যেতে হয় আরো খানিকটা। এককালে বিধান নগর প্রাচীন রাজ্য ছিল। জমিদার আসলাম আলীর ছোট রাজ্য। কালের বিবর্তনে জমিদারি শাসন, প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। শোনা যায় জমিদার বংশের সকলে যুদ্ধের সময় মারা গেছেন। কেবল দূরসম্পর্কের এক ভাই বেঁচে ছিলেন। সূত্র এবং দখলদারি অনুযায়ী সে ভাই এবং তার ছেলে হয়ে যায় সবকিছুর মালিক। যুদ্ধের পর পর জমিদার বাড়ির নাম পরিবর্তন করে নাম দেওয়া হয়েছে মাতবর বাড়ি। বর্তমানে বিধান নগর ও ইউনিয়ন পরিনত হয়েছে। জমিদারি না থাকলেও তবে সেই বিধান নগর আজও রয়ে গেছে। সকলে এই নাম এবং জমিদারের সম্মান হিসাবে হারিয়ে যেতে দেয়নি। বর্তমানে মাতবর কেই জমিদারের মতোই মান্য করে সকলে। যেকোনো বিপদে-আপদে সাহায্য চাইতে ছুটে আসে।

ভাটি অঞ্চলের সাধারণ মানুষগুলো অনেক কষ্টে দিন পার করে । নদীর জল ঘরে আসার আশঙ্কায় বর্ষায় দিন কাঁটায়। ফসলের ক্ষতি ও হয় সময়টাতে। এই কষ্টের মাঝে আরেক দুঃখ নিয়ে হাজির হয়েছে নতুন রোগ। গায়ে জ্বর, বমি এমনকি ডায়রিয়া ও দেখা দিয়েছে। অনেকের ধারণা কলেরা আবারো ফিরেছে। বিনাশ করতে মহামারি আকার নিতে সময় নিবে না। বৃদ্ধ এবং শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত বেশি হচ্ছে। দুটো শিশু এবং এক বৃদ্ধা ইতিমধ্যে মারাও গেছেন।

এদিকে শ্রাবণ মাসের বৃষ্টিতে চারদিক ভরে উঠেছে। মেঘের গর্জন আর টানা বৃষ্টি লেগেই ছিলো গত দুদিন আগে থেকে। কাল থেকে বৃষ্টির রেশ একটু কমেছে তবুও ঝিরিঝিরি হচ্ছে। নিচু জায়গায় কিছু বাড়িগুলোর উঠোন পর্যন্ত পানি প্রবেশ করেছে। এই দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে রোগ হচ্ছে। খাওয়ার উপযুক্ত পানি কষ্টে মিলছে। কারণ নলকূপ প্রায় সব পানিতে ডুবেছিলো। পানি পেলেও সেগুলো বিশুদ্ধ ছিলো না। অসুখ এবং অসুস্থতার সংখ্যা বাড়ায় কিছুজন কে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং ভালো ডাক্তার নেই। জেলা শহরে সবাই কে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় গ্রাম বাসি চিন্তায় পড়ে। আট গ্রামের প্রধান নুরুল আলম যাকে সকলে মাতবর মানে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং চেয়ারম্যান এর সহযোগিতায় শহরে যোগাযোগ করে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী মেডিকেল টিম আনার ব্যবস্থা করলেন। আশার আলো দেখে সকলে একটু সস্থি পেলো। বাহবা দিলো অনেকে। যেটা তিনি চেয়েছিলেন। ক্ষমতায় থাকার জন্য হলেও মানুষের ভালো করতে হয়।

*******
২ দিন পর…..

বাড়ি,বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা ও সেবা দিচ্ছে কয়েকজন তরুন ও তরুনি। মেডিকেল টিমের সঙ্গে শহর থেকে চিকিৎসা দিতে এসেছে। মেডিকেল টিম এ মোট নয়জন। তিনজন মেয়ে আর ছয়জন ছেলে। তাদের মধ্যে তিনজন ডাক্তার আর বাকিরা মেডিকেল স্টুডেন্ট। ওরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে বাড়ি, বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করছে। অসুস্থতা থেকে বাঁচতে পরামর্শ দিচ্ছে।

মেয়েদের মধ্যে আফসানা, রাজিয়া আর রত্না। মাত্র এক ভাঙা ছনের বাড়ি থেকে বেরোলো তারা। রত্না এতক্ষণ দম বন্ধ করে ছিলো যেন। বাহির হতেই নিঃশ্বাস ছেড়ে বিরক্ত নিয়ে ধীরে বলল,

“এমন প্রত্যন্ত গ্রাম জানলে কখনো আসতাম না। যেখানে হাতে জুতো নিয়ে ঘুরতে হয়,কাঁদায় অবস্থা নাজেহাল।”

আফসানা আর রাজিয়া শুনলো। কাঁদায় পা বাড়াতে গিয়ে পড়ে যেতে নিলো রত্না। আবার নিজেকে সামলে নিলো। তাদের দলের আরহাম আর সাঈদ কিছুটা পিছনে রইলো। সামনে দলের প্রধান ডাক্তার মাহাদ রহমান এগিয়ে যাচ্ছে । বয়স খুব একটা বেশি নয়, আটাশ হতে পারে। শরীরে জড়ানো এপ্রোন হাতে স্টেথোস্কোপ। এক বছর আগে এমবিবিএস এর পর ইন্টার্নশিপ শেষ করেছে। তাকে সামনে গ্রামের একটা ছেলে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। হঠাৎ সে থেমে যায়। তাকায় পিছনে। নজর রাখলো আফসানা আর রত্নার দিকে। আফসানা তার দৃষ্টি দেখে সামান্য ভয় পেলো বোধহয়। জানা শঙ্কা বাঁধলো মনে। সেই শঙ্কা সঠিক হলো যখন মাহাদ রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠলো,

“সেবা করতে এসে ঘৃণা আসলে এই পেশায় এসেছো কেন? আমাদের কাজ যেকোনো পরিস্থিতিতে মানুষের সেবা করা। এখানে ঘৃণার জায়গা নেই। পরবর্তী এমন কথা শুনলে টিম থেকে আলাদা করে দিবো মনে রেখো।”

গম্ভীর রাগ মিশ্রিত কন্ঠে রত্না মাথা নিচু করলো। এমন জায়গায় আগে কখনো আসেনি এবং অভস্ত্য ও নয় সে, মুখ ফস্কে মাহাদ কে খেয়াল না করেই বলে ফেলেছে। এখন বুঝতে পারছে ভুল সময়ে, ভুল মানুষের সামনে বলেছে। মাহাদ অন্য রকম মানুষ। উপর দিয়ে রাগী গম্ভীর হলেও দায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি রাখে না। তার কাছে সকলে সমান। বাবার মতোই সৎ নীতিবান ডাক্তার হয়েছে অনেকে বলে শহরে। বিত্তবান শ্রেণির বংশের ছেলে সে। তার বাবাও একজন ডাক্তার।

এর মধ্যে আরহাম আর সাঈদ ও চলে আসলো। তারা দুজন ও ডাক্তার। তার পর তিনটে ছেলে এসে দাঁড়ালো। আফসানা বুদ্ধিমতি। সে পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,

“দেরি হচ্ছে স্যার চলেন। ও ভুলে বলে ফেলেছে।এমন আর হবে না। ”

মাহাদ হাতে এপ্রোন নিয়ে হেঁটে চললো। কথা বাড়ানো মানে সময় নষ্ট। যা এই মূহুর্তে করতে চাচ্ছে না সে। এ গ্রামে রোগি দেখা শেষ করে অন্য গ্রামে যাওয়ার জন্য নৌকায় চড়ে বসলো।

*******

শিউলি ঘর থাইকা বাহির হবি না কইয়্যা দিনু। রোগ শরীরে বাঁধলে নিস্তার নাই। আগের যুগের কলেরা ফিরে আইছে। তোর বাপ জানে কইছে তোরে বাড়িত থাইকা বাহির না হতে দিতে। শুনলি কি কইছি?”

আমেনার কথা শিউলির কানে পৌঁছাল তবে উত্তর করলো না। নিশ্চুপ চৌকিতে বসে রইলো। মন খারাপ বাসা বেধেছে তার মনে। আমেনা তখন উঠোনে উঁচু চুলায় রান্ধন বসিয়েছে। তাদের সোনাইমুড়ী গ্রামটা সামান্য উঁচুতে হওয়ায় কারণে আঙ্গিনা পর্যন্ত পানি এসেছিলো, উঠোনে আসতে পারেনি। কারণ এখানে প্রায় সকলে অনেক উঁচু করে উঠোন তৈরি করে। যাতে বর্ষায় সহজে বৃষ্টির পানি উঠোন ছুঁতে না পারে। একদিন বৃষ্টি না হওয়াতে সে পানি আঙ্গিনা থেকেও চলে গেছে তবে বাহিরে কাঁদা, পানি রয়েছে কিছুটা। শিউলি ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে এবার উত্তর করলো,

“আম্মা দাদির নাকি শরীর টা খারাপ। পাতলা পায়খানা হইতাছে, শোয়া থেকে উঠবার পারতাছে না। আমি যাই একটু চাচাগো বাড়িত?”

“না। কোথাও যাইতে হইবো না। তোর আব্বায় গেছে। আসলে শুনবি কেমন আছে।” আমেনা সঙ্গে সঙ্গে নারাজ। শিউলির মুখ ভার হলো। ওর ঘরে বসে থাকতে মন চাচ্ছে না। একটু আগে তার সখি মালা এসে জানিয়ে গেছে শহর থাইকা ডাক্তার আসবো। তাদের দেখতে সকলে যাইবো। শহরে মানুষ দেখেনি কিনা, ডাক্তার তো আরো নয়। কিন্তু তার আম্মা তো বাহির হতে দিচ্ছে না।

প্রহর কাটলো এভাবে। শিউলি সুযোগ খুঁজলো কিভাবে বাহির হতে পারবে। ঘর হতে আঙ্গিনায় এসে দাঁড়ালো। উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখলো আশে পাশে। বাড়িতে নেই দেখে পা বাড়ালো দুয়ারের দিকে। বাহিরে কাঁদা মাটি। কতজন ছুটছে এদিক সেদিক। শিউলি দ্রুত বেরিয়ে গেলো। দাঁড়ালো কাঁঠাল গাছের আড়ালে। সেখান থেকে নদী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। তার ছোট চাচা নদী পেরিয়ে ওপারের গ্রামে থাকে। শশুড় বাড়িতে ছেলে না থাকার কারণে ঘর জামাই রয়েছিলো। দাদা নেই,দাদি কখনো এখানে তো কখনো ওখানে থাকে।
শিউলি এক দৌঁড়ে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালো। পরিচিত মাঝিরে দেখে বলল,

“চাচা ওপারে নিয়া যান।”

শিউলি উত্তরের অপেক্ষা না করেই উঠে পড়লো নৌকায়। যেন সে জানে মাঝি নিষেধ করবে না। হলো ও তাই। পরিচিত মধ্য বয়সী লোকটা বৈঠা বাইতে বাইতে বলে উঠলো,

“তোর বাপে কই? হের নৌকা থাকতে আমার নৌকায়?”

“আব্বায় শহর থাইকা ডাক্তার এসেছে তাদের আনতে গেছিলো ও-ই পারেতে । এখন মনে হয় তাগো নিয়ে গ্রামে, গ্রামে ঘুরতাছে।”

******
গ্রামের শত রোগি দেখে নিস্তার মিললো সকলের। এখন তারা মাতবর বাড়ি ফিরবে। সেখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রসাই গ্রাম হতে তারা নৌকা করে সোনাইমুড়ী গ্রামের দিকে অগ্রসর হলো। রত্না বিকেল থেকে মুখ ভার করে আছে। আফসানা তার পাশে। রাজিয়া বরাবরের মতো চুপচাপ। সে একটু কথা কমই বলে। এখন সন্ধ্যে নামবে মনে হচ্ছে। পশ্চিম আকাশ হলদেটে হতে শুরু করেছে। হাওরের রূপ জল থৈথৈ করছে। আরহাম আর সাঈদ পানিতে পা ডুবিয়ে গল্প করছে। মাঝে মধ্যে সাঈদ তাকাচ্ছে ডানপাশে। আরেক নৌকায় বাকি তিনটে ছেলে আসছে। তারা একটু পিছিয়ে পড়েছিলো দরকারে।
মাহাদ বসে আছে মাঝি করিম মিয়ার পাশে। দৃষ্টি হাওড়ের জলের দিকে নিবন্ধ। আঁকাবাকা ঢেউ খেলছে জল, শেষ আলোর চিকচিক করছে হাওরের স্থল। করিম মিয়া বৈইঠা বাইছে আর তাকাচ্ছে মাহাদের পানে। কিছু বলতে চায় দেখেই বুঝা যাচ্ছে।

“ কিছু বলবেন?”

সাহস পেয়ে করিম মিয়া একগাল হাসে। তার পর বলতে শুরু করে,

“ডাক্তার সাহেব আপনেরা তো শহরে থাকেন গেরাম কি ভালা লাগতাছে? এই রোগ কি সারবো?”

মাহাদ হাসে। সামান্য প্রশ্ন করতেও কত দ্বিধা। শহরে মানুষ বলে রোগি দেখতে গিয়েও কত মানুষ তাদের দেখতে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। কত জনের কত মন্তব্য। মাহাদ করিম মিয়ার প্রতিত্তোরে বলে,

“ ইনসআল্লাহ ভালো হয়ে যাবে। চিকিৎসা অনুযায়ী আশা করছি সকলে সুস্থ হবে খুব শিগগিরই। ”
একটু থেমে আবারো বলে,
“আর গ্রাম? গ্রাম ভালো লাগে, গ্রামের প্রকৃতি ভালো লাগে তবে চারদিকে কাঁদা উপভোগ যোগ্য নয়। চিকিৎসা দিতে এসেছি এজন্য ঠিকই আছে।”

“কতদিন থাকবেন এহানে?”

“এক সপ্তাহর জন্য এসেছি। আশা করি এর আগে ভালো হতে পারে। আগে হলে আগে চলে যাবো শহরে।”

করিম মিয়া আর প্রশ্ন করে না। নৌকা ভিড়ায় ঘাটে। ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। তবুও চারপাশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখনো। রত্না, আফসানা, রাজিয়া সহ সকলে নেমে পড়লো। অন্য নৌকায় থাকা কায়সার,জাজিম ও কবির রা’ও ঘাটে পৌঁছালো। নেমে পড়লো প্রায় একসাথে। তার পর করিম মিয়া নির্দেশনা দিয়ে মাতবর বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। পিছনে কেউ একজন রয়ে গেলো তা সকলের মধ্যে খেয়াল করলো না কেউ ।
মাহাদ নৌকা থেকে নেমে যেতে নিয়েও গেলো না। কিছু একটা মনে হতেই ফিরে তাকালো পিছনে।
আরেকটা নৌকা ভিড়লো তখনই ঘাটে। নৌকার ছইয়ের ভেতরে একটি মেয়ে বসে আছে। তড়িঘড়ি করে নামলো সে। যেন গন্তব্যে যেতে তার মহা তাড়া। মাহাদ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মিশ্রিত রঙের শাড়ি পরে আছে। আঁচল টেনে রেখেছে মাথা পর্যন্ত। বিকেলে এক বাড়িতে দেখেছিলো এই মেয়েটাকেই। সেবা করছিলো এক বৃদ্ধার। তার জন্য কি মায়া আর চিন্তা মনে। তখন অবশ্য কেবল দুটো চোখ দেখতে পেয়েছিলো খনিকের জন্য । হঠাৎ কেমন করে উঠেছিলো বুকের পাশটাতে মুখশ্রী দেখার বাসনা জেগেছিলো। যার চোখ এতো সুন্দর সে কতটা মায়াবী তা দেখবার ইচ্ছে পোষণ করেছিলো। তবে হয়ে উঠেনি। কাজের জন্য বেরিয়ে পড়তে হয়েছিলো।

মেয়েটি তড়িৎ গতিতে নোকা থেকে নেমে ছুটে যেতে নিলো। কিন্তু কিছুটা সামনে গিয়েই থেমে গেলো। দৌঁড়ে লুকিয়ে পড়লো নদীর পাড়ে আম গাছটার আড়ালে। মাহাদের কৌতুহলী দৃষ্টি তারই পানে। কেন মেয়েটা লুকাচ্ছে তা দেখতে তাকিয়ে আছে। দূরত্ব খুব বেশি নয়। তবে মেয়েটা তাকে খেয়াল করেনি। সূর্য ডুবে গেলেও এতটুকু কাছে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঠিক তখনই হুট করে দমকা হাওয়া বইতে শুরু করলো। সে হাওয়ায় মেয়েটির শাড়ির আঁচল মাথা থেকে উড়ে নিচে নামলো।
খোঁপা করা চুল খুলে গেলো। এলোমেলো হয়ে গেলো দীঘল কালো কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত চুল। কানের পিঠে চুলে গুঁজে রাখা জবা ফুলটা পড়ে গেলো মাটিতে। মাহাদের ভ্রূদ্বয় উঁচু হলো সামান্য। স্তদ্ধ হয়ে গেলো খনিকের জন্য। আবছা আঁধারে শ্যাম বরণ গড়নে থমকে গেলো, মেঘ বরণ কেশ নজর কাড়লো। তার হৃদয়ে হুট করে দোলা লাগলো। দমকা হাওয়া তখনো তীব্র বেগে বইছে। মেয়েটা বসে পড়েছে ফুলটা নিতে। মাহাদ এখনো দৃষ্টি স্থির রেখেছে। সেভাবেই এগিয়ে গেলো সামান্য। মেয়েটি ফুল কুড়িয়ে নিয়ে উঠতে যাবে তখনই সামনে নজর পড়লো। নিজের দিকে এক অচেনা পুরুষ কে এগিয়ে আসতে দেখে তড়িঘড়ি করে শাড়ির আঁচল টেনে মুখ ঢাকলো। ভয় ও অসস্থি নিয়ে ছুটে পালালো সে। মাহাদ যখন বুঝতে পারলো মেয়েটি চোখের আড়াল হয়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে না একটুও। ততক্ষণে চারপাশ আঁধার হয়ে এসেছে। দূর থেকে তার নাম ধরে কেউ ডাকছে। সে ওই গাছের পাশে পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। মুখ থেকে অস্পষ্ট কন্ঠে বেরিয়ে আসলো,

“ সোনার কণ্যা। যে এক পলকে হৃদয়ে নাড়া দিলো। তবে কি এই ভাটি অঞ্চলে সত্যিই সোনার কন্যার বসবাস?”

_______

বর্তমান—

ডাক্তার বাবু রা খাইতে আহেন। মাতবর সাহেব ডাকতাছেন আপনাদের।”
মাহাদের মগ্ন ভঙ্গ হলো। দরজায় ঠকঠক আওয়াজে উঠে দাঁড়ালো। আরহাম গিয়ে কাঠের দরজা টা খুলে দিলো। একজন মধ্যবয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছে। এই বাড়িতে কর্মরত থাকেন সম্ভবত। বাড়িটা রাজপ্রসাদের চেয়ে কম নয়। জমিদারি জাঁকজমক আজও রয়ে গেছে যেন। চারদিকে একের পর এক ঘর দাঁড়িয়ে আছে। মাহাদ, সাঈদ, আরহাম সহ বাকি সকলে খেতে গেলো। নুরুল আলম খাবার ঘরে উপস্থিত ছিলেন। অতিথি সেবায় যেন ক্রুটি না থাকে সেই জন্য স্ত্রী সালেহা বেগম কে বার বার বললেন, “ আতিথেয়তায় যেন কমতি না হয়। গ্রামের মানুষদের সেবা করতে এসেছে। সকলের ভালো করছে। তাদের যত্ন করতে হবে। ”

“আব্বা আমি দিতাছি।” শাশুড়ির সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে এগিয়ে দিতে শুরু করলো পাপিয়া। বাড়ির বড় বউ সে। দেখতে অতিব সুন্দরী। মাতবর বাড়ির সকলেই অনেক সুন্দর। সেজন্য বউ ও এনেছে সুন্দরী।

খেতে খেতে মাহাদ মাথা তুলে চাইলো। খেয়াল করলো নুরুল আলম এর বড় ছেলে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখ গম্ভীর করে আছে। কিন্তু ব্যাপার কি বুঝতে পারলো না। সে আবার বেশি আগ্রহ ও দেখালো না। উনার দুই ছেলে দুই মেয়ে। বড় ছেলের নাম সাহেল আর ছোট জনের নাম নাজির।
মেয়ে দুটো জমজ। একটার নাম নীরা আরেকটার নাম নিধি। নাজির ছেলে হিসাবে ছোট হলেও নিধি আর নীরার বড়। সকলকে দেখতে পেলেও নাজির কে দেখতে পায়নি এখনো। মাহাদ নজর সরিয়ে মাতবরের উদ্দেশ্য হেসে বলল,

“কৃতজ্ঞতা জানাই। মানুষের সেবা আমাদের কর্তব্য। আপনাদের এতো উতলা হতে হবে না।”

“ তা বললে কি হয়? মাতবর বাড়ির সম্মান অতিথি সেবায় ও প্রমাণ হয়। কোনোকিছু লাগবে বলবেন অবশ্যই।”

নুরুল আলম সহ তার ছেলে মেয়ে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। মাঝে মধ্যে গ্রাম্য ভাষাও বলে। জেলা শহরে যাতায়াত মাঝে মধ্যে হয় তাদের।

খাওয়া শেষ করে সকলে নিজ, নিজ ঘরে চলে গেলো। রত্না, রাজিয়া আর আফসানা এক ঘরে। কায়সার,জাজিম আর কবির আরেক ঘরে। মাহাদ, সাঈদ আর আরহাম একটা ঘরে। তিন জন বৈঠক খানায় নুরুল আলম এর সঙ্গে জুরুরি কিছু কথা শেষ করে নিজেদের বরাদ্দকৃত ঘরের দিকে রওনা দিলো।
পথে মাহাদ মনে মনে কিছু একটা ভাবছিলো আর হাঁটছিলো। ভাবনার জন্য পায়ের গতি কমে গেলো। সাঈদ আর আরহামের থেকে কিছুটা পিছনে পড়লো। সে মশগুল ছিলো নিজ ভাবনাতেই। হঠাৎ কাঁধে কারো শক্ত ধাক্কায় সামান্য পিছিয়ে গেলো। ভাবনার সুতো ইতিপূর্বে ছিঁড়েছে। মাহাদ নিজেকে সামলে নিয়ে সামনে তাকালো।

“দুঃখিত আমি দেখতে পাইনি।”

নারী কন্ঠে মাহাদ তাকালো এক পলক। তার পরই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। এক পলকে চোখে পড়লো মেয়েটা একরঙা কমলা রঙের শাড়ি পরে আছে। বিনুনি বেধেছে লাল ফিতে দিয়ে। দেখতে বেশ সুন্দরী এতে কোনো সন্দেহ নেই। মাহাদ খাওয়ার সময় মেয়েটাকে দরজা এবং জানালার আড়ালে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখেছে। নুরুল আলমের মেয়ে তাও সে জানে। নীরা একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে মাহাদের দিকে। দুঃখীত বলেও উত্তর না পেয়ে বোধহয় হতাশ হয়েছে। মাহাদ এবার উত্তর দেয়,

“ ঠিক আছে। ভুল আমারই ছিলো আমি আনমনা হয়েছিলাম। ” বলেই মাহাদ আসতে নিলো। কয়েক ধাপ বাড়াতেই পিছন থেকে শুনতে পেলো,

“ডাক্তার সাহেব রা এতো সুন্দর হয় আপনাকে না দেখলে জানতাম না। জানেন বাহিরে আপনাকে দেখার জন্য কয়েকজন এসে উঁকিঝুঁকি মারছিলো?”

মাহাদ শুনলো তবে প্রতিত্তোর করলো না।
সৌন্দর্য খনিকের। যে এবং যারা সৌন্দর্যে মোহিত হয়,এক সময় সেই মোহ কেটে যায়। নিধি কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে চলে গেলো নিজ গন্তব্যে।

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#সূচনা_পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here