#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—২
ভোরের আলো ফুটেছে খানিক আগে। গ্রামের মানুষ খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে নিত্যকার কাজে লেগে যায়। আজ ও তার ব্যতিক্রম নয়। সকালের নাস্তা সেরে মাহাদ সহ পুরো টিম আবারো রোগী দেখতে বসেছে। তবে আজ গ্রামে গ্রামে গিয়ে নয় মাতবর বাড়ির উঠোনের পাশে বিশাল ঘরটাকে চিকিৎসালয় বানিয়েছেন । কাঠের চেয়ারে বসে আছে মাহাদ। সামনে টেবিলে সাজানো চিকিৎসার জিনিসপত্র। সাঈদ আর আরহাম ও বসেছে পাশে, পাশে। সোনাইমুড়ী গ্রাম সহ পাশে আর দুটো গ্রামের মানুষজন এসে ভীড় করেছে। একে একে রোগীরা আসছে। মাহাদ, সাঈদ, আরহাম শুনছে, ঔষুধ লিখছে কেউবা ঔষুধ দিচ্ছে। সকালে শহর থেকে আরেকজন এসেছে। নতুন করে আরো কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই রোগ থেকে বাঁচতে করনীয় কি তা রত্না,নিধি আফসানা ওরা বুঝচ্ছে, সর্তক করছে। গ্রামের মানুষজন সর্তকতা অবিলম্ব করে কম।
“দাদি আজ থেকে আমাদের সাথে থাকবা কিন্তু। চাচাগোর বাড়ি এখন আর যাওনের দরকার নাই।
ডাক্তার সাহেব রা মাতবর বাড়িতে আছেন। আব্বায় কইয়া গেলো আইজ আরেকবার যাইতে। সুস্থ হইতাছে কিনা জানাতে হবে। ”
শিউলির কথায় মাথা নাড়ালো জবেদা বিবি। খুব সকালে করিম মিয়া তাকে এনেছে এখানে। ডাক্তার যখন বাড়ির কাছে থাকছে সুবিধা বেশি হবে এই ভেবে এনেছে। এর মধ্যে ওদের ডাকলো পড়লো। করিম মিয়া চেঁচিয়ে উঠলো,
“ আম্মা আসো তোমরা। গ্রামের মানুষ সব মাতবর বাড়ির আঙ্গিনায় ভীড় করেছে এদিকে তোমরা এতো কাছে থেকেও বাইর হইতে পারতাছো না?”
“আসতাছি আব্বা।” শিউলি উত্তর দিয়ে জবেদা বিবি কে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বাহির হলো। দাদির হাত কাঁধে নিয়ে হাঁটতে লাগলো। শরীর অনেক দূর্বল হয়ে গেছে হাঁটতে একটু কষ্ট হচ্ছে।
বাহির হয়ে আসতেই করিম মিয়া তাড়া দিলো।
“হাঁটো,হাঁটো সবাই বুঝি ডাক্তার দেখিয়ে শেষ হয়ে গেলো।”
শিউলি তার আব্বার কথায় ফিক করে হেসে উঠলো। হাসতে,হাসতে বলল,
“আব্বা ডাক্তার শুনেছি চিকিৎসা করে তারা কি কোনো জিনিস যে শেষ হয়ে যাবে?”
“আম্মা ওটা কথার কথা। তাড়াতাড়ি হাঁটো দিনি।”
শিউলি মাতবর বাড়ির আঙ্গিনায় এসে থেমে গেলো। উঠোনে পা দিবে এমন সময়ই জানালার ফাঁক দিয়ে মাহাদ কে নজরে পড়লো। সাদা এপ্রোন আর গলার স্টেথোস্কোপ। রোগিদের সঙ্গে কথা বলছে এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কিছুটা অবাক হয়ে সে এবার করিম মিয়া কে ফিসফিস কন্ঠে শুধায় ,
“আব্বা উনিই কি ডাক্তার সাহেব? ”
“হ কাল দেখলিনা?”
“ হ দেখেছিলাম কিন্তু……
বলতে গিয়েও থেমে গেলো সে। করিম মিয়া ততক্ষণে জবেদা বিবি কে নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেছে। শিউলির দৃষ্টি জানালার ফাঁকেই রয়েছে। ভাবনায় মত্ত তার মতিষ্ক।
“সখী দেখেছিস ডাক্তার বাবুরা কি সুন্দর। শহরে থাকলে বুঝি মানুষ এমন সুন্দর দেখতে হয়? কেমন সুন্দর পোশাক। এমন তো আগে দেখিনি কখনো।”
শিউলি হুট করে মালার কন্ঠে শুনে জানালা থেকে নজর সরিয়ে তার দিকে চাইলো। মালা নিজেও জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। এবার নজর শিউলির পানে দিলো। উত্তর না পেয়ে আবারো শুধালো,
“ ডাক্তার আপা রাও কি সুন্দর! আমাদের সাথে মিল এনাও নাই। কথা কয় সুন্দর করে। কিছু বুঝি আবার কিছু বুঝিনা। কিন্তু শুনতে ভালোই লাগতাছে।”
“ হুম। তারা ডাক্তার পড়ালেখা মেলা করেছে। সুন্দর কথা তো হবেই।”
“চল ভেতরে যাই?”
মালা শিউলির হাত টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু ও গেলো না। থেমে গেলো সেখানেই। মালার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলল,
“ তুই রোগী যে তাই যাবি? অকারণে গেলে বিরক্ত হলে বকবে তখন?”
“ হুম তা ঠিক কইছিস।” মালাও সম্মতি জানালো। তার পর চোখে মুখে হাসি ভাব রেখে আবারো বলল,
“জানিস শিউলি আমার না খুব সখ উনাদের সঙ্গে একবার কথা কইবো। কিন্তু ভয় লাগে, সরম ও করে সামনে যাইতে।”
শেষ কথাটা একটু নিচু স্বরে বলল। যেন কথা বলতে না পারা বড় কোনো ব্যর্থতা। শিউলি শান্তনার সহিত বলল,
“ হবেক্ষণ কথা। চল এখন যাই। ”
মালা আর শিউলি সেখান থেকে চলে আসতে নিবে এমন সময় মালার বড় ভাই মিজান তার নাম ধরে ডেকে উঠলো,
“শিউলি তোরে করিম চাচা ডাকতাছে। দাদির শরীর টা হঠাৎ করে বেশি খারাপ লাগতাছে।”
শিউলি শোনামাত্র তড়িৎ গতিতে ঘরের ভেতরে ছুটে গেলো। দিক বেদিক ভুলে বসলো। অজানা ভয় খনিকের জন্য মনে জেঁকে বসেছিলো। হুট করে হন্তদন্ত হয়ে কারো আগমনে সকলে সামনে চাইলো কেবল মাহাদ ব্যতীত। কাজের সময় তীব্র শব্দ তার কাছে বিরক্তিকর লাগলো। প্রস্তুতি নিলো কিছু কড়া কথা শোনাবে বলে। মাথা উঠিয়ে অঁধর থেকে শব্দ ছুঁড়তে যাবে তার আগেই অঁধর খানা স্তদ্ধ হলো। সামনে সেই সোনার কন্যা দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধা কে নিয়ে ব্যস্ত সে। মনোযোগ আশে পাশে নেই। তার কাতর কন্ঠ।
“দাদি দেখো আমার পানে ? হাঁটতে কষ্ট হইতাছে? চলো বাড়িত নিয়া যাই।”
নিধি আর আফসানা ইতিমধ্যে উঠে পড়েছে।
মাহাদ নিজেও দাঁড়িয়ে পড়লো। সেখান থেকে উঠে বলল,
“ শরীর দূর্বল এজন্য এমন হচ্ছে। ঔষুধ দিয়েছি খেলে ঠিক হয়ে যাবে। বেশি,বেশি যত্ন নিবেন। বৃদ্ধ বয়সে রোগ বাসা বাঁধে বেশি। এ-সময় যত্নের প্রয়োজন হয়।”
করিমা মিয়া আর শিউলি জবেদা বিবি কে নিয়ে বাড়ির দিকে আসার জন্য বেরিয়ে গেলো। মাহাদ দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের কাজে মন দিলো। কাজের সময় অন্য কিছু ভেবে সময় নষ্ট করতে চায় না সে।
“পরবর্তী কে আসুন? নিধি তোমরা সকল কে সবটা বুঝিয়ে বলো। ”
মাহাদের নির্দেশ মতো ওরা কাজ করতে লাগলো। অনেকে একদিনের ভেতরে কিছুটা সুস্থবোধ করছে বলেও জানিয়েছে।
______
সময়টা তখন বিকেল। রোদ হীন প্রকৃতি। শ্রাবণ মাসের বৃষ্টিময় সেঁতসেঁতে পরিবেশ। শীতল হাওয়া নিত্যদিনের আবহাওয়া। রোদের দেখা নেই বললেই চলে।
মাহাদ মাতবর বাড়ি থেকে একা বেরিয়ে পড়লো। সারাদিন কাজের পর দুপুরে খেয়ে বাকিরা বিশ্রাম নিচ্ছিলো। আসার সময় অবশ্য সাঈদ জিজ্ঞেস করেছিলো ‘ কোথায় যাচ্ছিস?”
“ বাহিরে পুকুরপাড় টা একটু দেখে আসি। ঘাটে বসে একটু পরিবেশ টা অনুভব করি।”
এতটুকু বলেই বাহির হয়ে এসেছে মাহাদ। মাতবর বাড়ির পিছনে একটা পুষ্কুনি আছে। আয়তনে মাঝারি এবং বেশ গভীর। ওখানে আগে জমিদার পরিবারের মহিলারা গোসল করতো। এখন ও কেউ করে তবে গোসলখানা হওয়ার পর পুকুরে গোসল করা কমেছে। মাহাদ এক পা দু পা করে এগিয়ে চললো। পথে গ্রামের মানুষের সঙ্গে নানান কথা হলো। কত সহজ সরল তাদের মনোভাব , নেই কোনো রেশারেশি। এই সহজ সরলতায় মুগ্ধ হলো মাহাদ।
তবে এর মধ্যেও কিছু মন্দ লোক ও আছে যা এখনো তার নজরে পড়েনি। গ্রামের কাঁচা পথ। জায়গায় জায়গায় কাঁদা। তবে নিরিবিলি পরিবেশ সঙ্গে মাতাল হাওয়া বেশ ভালো লাগছে। নিজেরই প্রফুল্ল মনে হচ্ছে। মাহাদ হাঁটতে হাঁটতে সামনে একজনের দেখা পেলো। কালকে যে ছেলেটা তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। নাম হাবিব উল্লাহ তাকে ডাকে সে।
“ হাবিব শোনো এদিকে ?”
নিজের নাম সম্মোধন শুনে হাবিব তাকালো। মাহাদ কে দেখে হাসিমুখে দৌড়ে আসলো।
“কিছু কইবেন ডাক্তার ?”
ছেলেটার বয়স বারো কিংবা তেরো। বেশ সরল মনের সাদাসিধে। কালকে সারাটি দিন সঙ্গে থেকেছে। মাহাদ আশ পাশ এক পলকে দেখে নিলো। অতঃপর ধীরে বলল,
“করিম মিয়ার মেয়ে আছে ?”
“ হ আছে তো। আমাগোর শিউলি আপা।”
মাহাদ এবার আশস্থ হলো শিউলিই করিম মিয়ার মেয়ে। যাকে সে খুঁজে চলেছে। মাহাদ কে ভাবনা মত্ত থাকতে দেখে হাবিব শুধায়,
“কেন শিউলি আপার কোনো দরকার? সে তো ওই নদীর পাড়ে তার সখীর লগে বইসা আছে।”
মাহাদ উত্তর করলো না। কেবল ওকে যেতে বলে নিজেও পা বাড়ালো নদীর পাড়ের দিকে। ওই তো নদী এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে। সেখানে বিশাল মেহগনি গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। নাই ফুল ফল আছে কেবল পাতায় ভরপুর। যা হাওয়ায় দুলছে।
মাহাদ এসে দাঁড়ালো নদীর পাড়ে। শিউলি আর মালা তার থেকে সামান্য দূরে বসে আছে। দুজনে কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। শিউলির হাসিতে সাদা দাঁতগুলো মুক্তার মতো ঝকঝকে দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন মুক্তো ঝরছে হাসিতে।
অঁধর জুড়ে বসবাস করা শব্দ গুলো প্রকাশ পাচ্ছে ভীষণ আনন্দে।
মাহাদ আশে পাশে আরেকবার নজর বুলিয়ে নিলো। আরো একদিন পেরিয়ে যাওয়াতে নদীর পানি পাড় থেকে নেমেছে একটু। ভরা নদীর জল থৈথৈ করছে।
এদিকটায় কেউ নেই তবে ওপাশে নদীর ঘাটে দুজন মাঝিকে দেখা যাচ্ছে। শিউলি আর মালা মাহাদ কে লক্ষ্য করেনি। ওরা দুজনে নিজেদের মতো করে গল্পে মেতে আছে। নদীর পাড়ের পাশে একটা বাঁশের তৈরি ঢঙ ফেলানো আছে সেখানে ওরা দুজন বসে পা দুলিয়ে গল্প করছে,হাসছে। মাহাদ কি করবে বুঝতে পারছে না। ওখানে যাওয়া কি ঠিক হবে? কেউ কি খারাপ মন্তব্য করবে? মেয়েগুলো কে বা কি বলবে? আর তারা বা কি ভাববে?
খানিকটা সময় পর দ্বিধা নিয়েও এগিয়ে গেলো। ঘাসের উপর পদচারণের কারণে শব্দ খুব একটা হলো না। শিউলি তখন বখরির দড়ি টেনে নিয়ে এসে বাঁধছিলো গাছে।
“তোমার দাদি কেমন আছে এখন ?”
অপ্রত্যাশিত কন্ঠে শিউলি সহ মালা চমকে উঠলো। তাকালো পিছনে। মাহাদ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মালা মাহাদ কে দেখে একটু আনন্দিত হলো। তবে শিউলি বোধহয় আনন্দের পরিবর্তে ভয় পেলো কিংবা দ্বিধাবোধ করলো। তার চোখে মুখে তেমনটাই ফুটে উঠলো। শাড়ির আঁচল টানতে চাইলো কিন্তু কোমরে গুঁজে রাখার জন্য সময় পেলো না যেন।
মাহাদ ওর অসস্থি বুঝতে পেরে সরে আসতে নিলো। বলল,
“ আমাকে ভয় লাগছে? তাহলে চলে যাচ্ছি। আমি শুধু এদিকটায় ঘুরতে এসেছিলাম মাত্র।”
“ না,না সমস্যা নেই। আপনি থাকবার পারেন।”
শিউলি ছোট উত্তরে মাহাদ দাঁড়িয়ে গেলো। তার মিনমিনে কন্ঠ যেন মধুর শোনালো। মালা উচ্ছাসিত হয়ে বলল,
“ ডাক্তার বাবু ও আসলে অচেনা পুরুষ মানুষদের সামনে কম যায়,সেখানে কথা কইতে আরো দ্বিধাবোধ করে। কিন্তু আপনি তো গ্রামের মানুষদের সেবা করতে আইছেন। আপনারা ভালা মানুষ। ”
মাহাদ কিঞ্চিৎ হাসার চেষ্টা করলো। নজর শিউলির নিভু নিভু চোখের দিকে। পুরোনো একটা মিশ্রিত রঙের শাড়ি শরীরে জড়িয়ে আছে। কোমরের আঁচল গুঁজে রাখা। চুলগুলো লাল ফিতে দিয়ে ফুল করে বিনুনি বেঁধে রাখা। মাহাদের এমন নিষ্পলক দৃষ্টি শিউলির মন কে প্রশ্নবিদ্ধ করলো। যার উত্তর মিলছে না। সে এবার এগিয়ে আসলো। সাহস সঞ্চার করে বলল,
“দাদি তখনের থাইকা সুস্থ আছেন।”
মাহাদ শুনলো। তার পর আর কিছু না বলে পিছু ঘুরলো। খানিকক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো। জল থৈথৈ করছে। নৌকা বয়ে চলছে এঁকেবেঁকে। সেই চলন যেন উপভোগ যোগ্য লাগছে।
শিউলি কয়েকবার আড়চোখে তাকিয়েছে মাহাদের দিকে। দেখতে সুদর্শন পুরুষ। চুলগুলো সামান্য ক্যাকড়ানো এবং অগোছালো তবুও সৌন্দর্যে ভরপুর। ছোট ছোট দাঁড়ি-গোঁফে মুখে ফুটে উঠেছে পরিণত পুরুষালী আবহ। হাতের কব্জিতে থাকা ঘড়িটা কাপটে ধরে আছে। যে কেউ দেখলেই এক দেখাতে পছন্দ করে ফেলবে।
মালা কানের কাছে ফিসফিস করে মাহাদেরই সৌন্দর্যের বর্ননা দিয়ে যাচ্ছে। পরনে শার্ট আর প্যান্ট। শুভ্র রঙ মানিয়েছে সুন্দর চামড়ায়। এমন পোশাক গ্রামের কেউ পরেনা। পাওয়া যায় না বলা চলে।
মাহাদ বুকের মাঝ থেকে ভাজ করে রাখা হাতটা নামালো। চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আবারো তাকালো পিছনে।
টের পেলো পিছনে থাকা মানুষ দুটো বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাহাদ খানিকটা সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। শিউলি সবটা কেবল আড়চোখে দেখে যাচ্ছে। মালা ওর দুটো বখরি নিয়ে আগে চললো।
শিউলি একহাতে বখরি আরেক হাতে কঞ্চি নিয়ে কয়েকটা হাঁস খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে আর কেমন যেন লাগছে। সামনের মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে আবার বার,বার তাকাচ্ছে ও। শিউলি যাওয়ার পথে মাহাদের কাছাকাছি হলো। কেমন যেন নিজের ভেতর শীতলতা অনুভব করলো। লোকটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
“ আমায় কি ভয়ংকর দেখতে?”
শিউলির পা জোড়া থেমে গেলো। এমন প্রশ্নে থতমত খেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে মাহাদের দিকে তাকিয়েই আবার নজর নিচু করে নিলো। এমন প্রশ্নের কারণ কিছু আন্দাজ করতে পেরে মিথ্যা প্রমাণ করতে তড়িৎ গতিতে উত্তর দিলো,
“ না,না আপনি তো খুব সুন্দর মালা কইতাছিলো।”
“তুমি বলছো না?”
শিউলি লজ্জা পেলো সামান্য। মাথা উঁচু করে তাকালো একবার। চোখাচোখি হতেই সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। মিনমিনে কন্ঠে বলল,
“আপনি সুন্দর জানি আর আমিও মানছি।”
“আমার থেকেও তুমি বেশি সুন্দর। একদম সোনার কন্যা। ”
শিউলির দৃষ্টি বড়,বড় হলো। সোনার কন্যা সম্বোধনে তার মধ্যে বিস্ময় দেখা দিলো। জানতে চাইলো,
“সোনার কন্যা আবার কে?” তার অজানা প্রশ্ন শুনে মাহাদ হেসে উঠলো। শিউলির দৃষ্টি নিবন্ধ হলো হাসিতে। তার এমন হাসির কারণ খুঁজে পেলো না বোধহয়। মাহাদ কোনোমতে হাসি থামিয়ে বলল,
“তুমিই সোনার কন্যা। সেই গানটা শোনোনি?”
শিউলিও ডানে বামে মাথা নাড়ায়৷ যার অর্থ সে শোনেনি। গ্রামে ক্যাসেট এবং টিভি মাতবর বাড়িতে আছে। এন্টিনার সাহায্যে সাদাকালো আলোকচিত্র দেখা যায়। তাও আবার সপ্তাহে দুদিন। ক্যাসেটে গান শুনেছে কয়েকবার তবে এই গান শোনেনি সে। মাহাদ তার উত্তরে বলল,
“ আচ্ছা একদিন শোনাবো তবে।”
শিউলি আবারো মাথা নাড়ালো। অতঃপর পা চালাতে শুরু করলো। মাহাদ ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুটা দূর যাওয়া পর পিছন থেকে বলে উঠলো,
“ আমার কিন্তু সোনার কন্যা চরিত্র টা ভীষণ পছন্দ। ”
____________
ঘুটঘুটে অন্ধকারে গ্রামের বাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত আমাবস্যা চলছে প্রকৃতিতে। আঁধারে নিমজ্জিত আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মাহাদ। ছাঁদে এসেছে খানিক আগে। দু-চোখ ঘুম আসছে না কিছুতেই। এপাশ ওপাশ করতে করতে এক প্রকার বিরক্তি নিয়ে ছাঁদে আসা। গ্রামে এবং এ বাড়ির সকলে সন্ধ্যার একটু পরেই ঘুমিয়ে যায়। বিদ্যুৎ নেই,নেই কোনো আধুনিকতা। শহরে থাকলে বুঝা মুসকিল দেশে এমন গ্রাম ও আছে। মাহাদ প্যান্টের পকেট থেকে একটি জিনিস সামনে ধরলো। অন্ধকারেও চোখের সামনে নুপুরটি দৃশ্যমান হলো। নদীর ঘাটের আম গাছের নিচে সেই সোনার কন্যার পা থেকে খুলে পড়া নুপুরটি কুড়িয়ে যত্নে রেখেছিলো পকেটে। অথচ কত জিনিস রাস্তা ঘাটে পড়ে থাকলেও মাহাদ হাতে নেয় না। আজ কি হলো তার? পায়ের জিনিস এতো যত্নে?
মাহাদ নিজের উপর নিজেই বিস্মিত হলো। এটা কি বাড়াবাড়ি হচ্ছে না? ডাক্তারি পড়ার মাঝেও ও নন একাডেমিক বই ও পড়তো প্রচুর। ঘরের কোনে একটা লাইব্রেরি আছে, যার সবটা জুড়ে শত, শত বই। তবে হুট করে মনে বাঁধা বইয়ের চরিত্র কেন বাস্তবে মিল পাচ্ছে? কেন সেটাই মনে পড়ছে? প্রেক্ষাগৃহে দেখা সিনেমার গানটাই কেন বার বার তার সঙ্গে মিলাতে যাচ্ছে সে?
মাহাদ নিজের প্রতি আরেক দফার বিরক্তি নিয়ে ছাঁদ থেকে নেমে আসার জন্য পা বাড়ালো। কিন্তু কিছু একটার আওয়াজে পা থেমে গেলো। তাকালো পিছনে। এগিয়ে গেলো ছাঁদের কিনারার দিকে। সদর দরজার সামনে কারো অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। অন্ধকারে পুরুষ নাকি মহিলা তা বুঝতে না পারলেও কেউ একজন তো আছে তা বুঝতে অসুবিধা হলো না। কিন্তু কে এতো রাতে? হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো মাহাদ। এখন বাজে রাত এককটা।
গ্রামে এটা বিশাল রাত। মাহাদের ভ্রু কুঁচকে আসলো। শুনেছিলে গ্রামে চোর ডাকাতের উপদ্রপ বেশি। আবার তারা নয়তো? বাড়ির কাউকে জানানো উচিত কিনা এ নিয়ে একটুখানি ভাবলো। তার পর তড়িঘড়ি করে ছাঁদ থেকে নেমে আসলো। দাঁড়ালো অন্দরমহলের দরজার কাছে। টের পেলো এদিকে এগিয়ে আসছে কেউ। তবে একজন নয় দুজন। ফিসফিস কন্ঠ শুনে মাহাদ আড়ালে লুকালো। চোর ডাকাত কিনা তা বুঝতেও পারছে না। তবে অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলো পাশের ঘরে থাকা নুরুল আলম এর বড় ছেলে সাহেল কে ডাকবে। সে মোতাবেক পিছিয়ে আসতে নিলো ধীরে। হুট করে কিছু একটার সাথে আঁটকে গেলো ঘড়িটা। টান দিতেই হাত থেকে ঘড়িটা পড়ে গেলো। শব্দ হলো সামান্য। সামান্য যেতেই থেমে যেতে হলো। খনিকের জন্য তার নজর অন্ধকার মেঝেতে নিবন্ধ হলো। তখনই আবার সামনে তাকালো কিন্তু নেই আর কেউ । মাহাদের চোখের পলকে উধাও হয়ে গেলো জ্যান্ত মানুষ দুটো। সদর দরজার দিকে কাউকে ছুটে যেতে দেখতে পেলো শেষে। মাহাদ ও তখন ছুটে গেলো। কিন্তু অন্ধকারে কাউকে দেখতে পেলো না কেবল ছাঁয়া ছাড়া।
“কে ওখানে?”
চলবে……………..?

