একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—৬

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—৬

জীবনে সুখের পৃষ্ঠা ফুরিয়েছে,দুঃখই আমার অলংকার হয়েছে। সংসার যে ভালোবাসার হবে এমন ভাগ্য আমার ছিলো না, তাই তো কপালে সুখের বদলে দুঃখ জুঁটেছে। দূর প্রান্তে ডাকছিলো সুখ অথচ দুঃখ ভেবে অবজ্ঞাই হয়েছিলো তার মূল্য।”

“ভাইজান তোমারে আবার মেরেছে?”

নিধির প্রশ্নে পাপিয়া উপরোক্ত উত্তরটি দেয়। তার চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরছে অনবরত। ঠোঁটের কোনো তাচ্ছিল্যের হাসি। ব্যথা তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। চোয়ালে হাতের দাঁগ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। রাতের খাবার সময় যখন সকলে খেতে আসলো শুধু পাপিয়া ছাড়া। সায়মা বেগম খোঁজ করলেও আর কেউ করলো না। সাহেল কে জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘ তার কি ঢঙের শেষ আছে? অসুস্থতার বাহানায় শুয়ে আছে ঘরে। ”

সালেহা বেগমের সন্দিহান দৃষ্টি। কিছু বলতে চেয়েও পারলো না। নুরুল আলম চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বললেন। তিনি আফসোস করলেন নিজ গর্ভে দুটো ছেলে অথচ এতো অমিল কিভাবে হলো? কিভাবে এমন স্বভাব পেলো? সন্দেহ করার কারণ প্রায়শই ঘটা কিছু ঘটনা। কেবল নিধি খাবার খেয়ে পাপিয়ার জন্য খারাব নিয়ে এলো। তার পর এসে দেখে সন্দেহ সঠিক। ও খাবারের থালা সামনে ধরলো।

“ খেয়ে নাও।”

“ খেতে ইচ্ছে করছে না।”

পাপিয়া মুখ ফিরিয়ে নিলো। খাট থেকে নেমে কোনো মতো দাঁড়ালো। হাঁটতে কোমরে লাগছে। তখন ছুঁড়ে ফেলাতে ব্যথা পেয়েছে প্রচন্ড। নিধি তাকে গিয়ে ধরলো।

“ এভাবে এখানে আর কতদিন সহ্য করে থাকবে?
শুধু নিজের ভাই বলে কিছু বলতে পারিনা আব্বার কারণে। চলো যাও এখান থেকে। তোমার জন্য কাঁটা নয় আজও পুষ্পে ভরা গোলা অপেক্ষা করে ভাবি।”

পাপিয়ার গা শিউরে উঠলো। ভেসে উঠলে কিছু স্মৃতি। যা কেবল অতীত। তার অশ্রুর রেশ বাড়লো। ঘৃণাও বাড়লো নিজের প্রতি।
চোখের জল হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিলো। প্রতিত্তোরে বলল,

“ চলে যাওয়া এতো সহজ নয়। এই সমাজ কে চিনো নিধি? সন্তান না হওয়াতে বন্ধা খেতাপ পেয়েছি, সংসার ছাড়া হলে তখন আরো দশটা খেতাপ দিবে। জানো বিষের চেয়েও বিষাক্ত মানুষের তিক্ত কথা। সেই কথার আঘাতে অনেকে আত্মহত্যাও করে।”

নিধি চমকে উঠে। ভয় পায়। কোনো ভুল কিছু করে বসলে? এই ভেবে বলে,

“ তুমি কিন্তু এসব কিছু করো না। তুমি আমার ভাবি তার আগে সঙ্গী। পুরোনো স্মৃতি আজও মনে পড়ে। আমি তোমায় ভাবি হিসাবে দেখতে চেয়েছিলাম তবে আমার ভাইজানের স্ত্রী নয়, চেয়েছিলাম জিহ..

“ থাক আর ব্যথা বাড়িও না। যা হয়নি তা ভেবে কি হবে বলো? ভাগ্যে আমার দুঃখই লেখা ছিলো।”

“ ঠিক আছে। আগে খেয়ে নাও। আব্বাজান কে আজ বলবো। এভাবে চলতে পারে না।”

নিধির কথায় হেসে উঠলো পাপিয়া। এই কথা যেন ওর কাছে হাস্যকর লাগলো। নিধি অবাক চিত্তে তাকিয়ে রইলো। মনে,শরীরে ব্যথা নিয়েও কেউ হাসতে জানে? সে হাসি অবশ্য সুখের নয় তাচ্ছিল্যের,তা নিধির অজানা রইলো। পাপিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কেবল একটি কথাই বলল,

“এই দীর্ঘ শ্বাস ও বন্ধ হতো যদি আত্মহত্যা মহাপাপ না হতো। ঘরে জাহান্নাম,বাহিরে দোজখ অপেক্ষারত। কোনদিকে যাবো বলো?”

একটু থামে। নিধি কেবল তাকিয়ে আছে। তার ভীষণ খারাপ লাগছে। পাপিয়া শেষ কথাটা বলে,

“ এখানেই পড়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। সম্মান হারানোর ভয় আছে তোমার আব্বার এবং আমার আব্বার। কথার চেয়ে বড় অস্ত্র আর কিছু নেই। যা মানুষ কে মৃত্যু পর্যন্ত দিতে পারে।”

তখনই দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। দুজনে তাকালো সেদিকে। সাহেল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। নিধি থালাটা এগিয়ে দিলো। ঘর থেকে বেরোনোর প্রস্তুতি নিয়ে বলল,

“ খেয়ে নাও আমি যাচ্ছি।”

দরজার কাছে এসে নিধি থামলো। ঘৃণার দৃষ্টি র্নিক্ষেপ করলো সাহেলের পানে। দাঁত পিষে বলল,

“ আপনি মানুষ নাকি পশু?”

“ এটা গিয়ে আব্বাজান কে জিজ্ঞেস কর।”

“জানেন তো কখনো কখনো ভালো মানুষের গর্ভেও মানুষ নানক পশুর জন্ম হয়।”

সাহেল মুহূর্তে রেগে গেলো। থাপ্পড় দিতে হাত এগিয়ে নিয়ে গেলো। তখনই সেখানে কিছু দূরে আগমন ঘটলো সাঈদের। ওকে আসতে দেখে সাহেল থেমে গেলো। মনে পড়লে নুরুল আলম এর বলা কথা। হাত নামিয়ে নিলো।
নিধি চড় না খেয়ে পিছনে তাকালো। সাঈদ কে দেখে বুঝতে পারলো না মারার কারণ।
সাহেল ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলে হড়াম করে। নিধি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার পর এক পা দু পা করে এগিয়ে গেলো। সাঈদের সামনে পড়লো সে। নিধির ভার চেহারা দেখে শুধায়,

“ কি হয়েছে? আপনার মুখশ্রী ভার কেন?”

নিধি তাকালো সাঈদের দিকে। সে সম্ভবত কিছু শুনতে বা দেখতে পায়নি। বাহিরের মানুষ কে বলাও ঠিক না । ও নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করলো। হাসি-হাসি বদনখানি করে উত্তর দিলো,

“ কিছু হয়নি। আপনার দেখার ভুল।”

এতটুকু বলেই নিধি সাঈদ কে এড়িয়ে পা চালালো।

“আপনার নিভে যাওয়া দুটো চোখ তো অন্য কথা বলছে।”

নিধি থেমে গেলো। পিছু না ফিরেই উত্তর দিলো,

“অচেনা মেয়ের চোখের ভাষা বুঝতে চাওয়া কোনো ভদ্রলোকের স্বভাব নয়।”

সাঈদ বিস্মিত হলো। নিজেকে ছোট মনে হলো। নিভে গেলো ভেতরের আগ্রহ। এই সামান্য কথায় এমনটা শুনতে হবে ভাবেনি কখনো। তখনই মনে পড়লো সন্ধ্যার কথা। তার বোনকে বেহায়া বলায় এখন হয়তো তাকেও বলছে। যেচে জানতে চাওয়াও বুঝি বেহায়ার মধ্যে পড়ে? উত্তর মিললো না তবে নিধি সেখানে আর থাকলো না। চলে গেলো নিজের ঘরের দিকে। সাঈদ সেভাবেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো আরো কিছুক্ষণ।
তখনই আরহামের ডাক পড়লো। মতিভ্রম ভুলে সেও চলে গেলো ঘরে। তবে মন খারাপ সামান্য থেকেই গেলো।

______________

বিকেল থেকে রাতের প্রথম প্রহর পর্যন্ত বৃষ্টি হওয়ার পর এখন নিস্তব্ধ শুনশান নীরবতা। নিরিবিলি প্রাকৃতি। হাওয়ায় দুলছে গাছের পাতা। এই হাওয়া কেবল সতেজতায়। সময়টা এখন মধ্য রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হ্যারিকেন হাতে মাতবর বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একজন। তার মনে অস্থিরতা।
পা এগোচ্ছে তড়িৎ গতিতে। মাতবর বাড়ির কিছুটা পূর্বে হুট করে গেলো পড়ে। কাঁদা পানিতে লেপ্টে গেলো পুরো শরীর। পড়ে গিয়ে নিভে গেলো হ্যারিকেনের আলো সঙ্গে ভেঙে গেলো চিবনি ও।
কোনোমতো উঠে দাঁড়ালো। মাতবর বাড়ি সামান্য দূরে বলে যেতে পারলো। দূরের পথ দেখা না গেলেও কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে। মাতবর বাড়ির সদর দরজার তালা লাগানো থাকে রাত্রে। এখন কি করবে? কয়েক ডাকলো মাতবর সাহেবের নাম ধরে কিন্তু কোনো সাড়া এলো না। এই মধ্য রাতে সকলে গভীর ঘুমে। সদর দরজা থেকে অন্দরমহলের ঘরগুলো আরো দূরে। এখন কি করবে? আশেপাশে তাকিয়ে একটুখানি ভাবলো।
দিক দিশা না পেয়ে মাতবর বাড়ির পিছনের দিকে গেলো।

মধ্য রাতে জানালায় ঠকঠক আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় মাহাদের। পাশে আরহাম আর সাঈদ ঘুমিয়ে আছে। এই মধ্য রাতে কে ডাকছে? মাহাদ দ্রুত উঠে পড়লো। ঘরের কোনে নিভু নিভু হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে। তেল যেকোনো সময় ফুরিয়ে আলো নিভে যেতে পারে। জানালায় আবারো ঠকঠক আওয়াজে এগিয়ে গেলো। খুলে দিলো জানালা। অন্ধকারে প্রথমে কাউকে নজরে পড়লো না। তাই শুধালো,

“কে?”

“ আমি, আমিই বাবা।”

মাহাদের কন্ঠ চিনতে অসুবিধা হলো না। আবছা মানুষটাকেও এবার নজরে পড়লো। জানালার নিচের দিকে তার অবস্থান। মাহাদের হঠাৎ মনের ভেতর ধুক করে উঠলো। অজানা শঙ্কা বাঁধলো। শুধালো,

“আপনি এতো রাতে এখানে? কিছু হয়েছে? ”

“ মাইয়াডার জ্বর আইছে। জ্বরের তাপে গাঁ পুড়ে যাচ্ছে। এমন জ্বর আগে কখনে আসেনি ঘরে।
এই মধ্য রাতে কেবল তোমারেই মনে পড়লো এজন্য ছুটে আইলাম।”

করিম মিয়া কে কথা শেষ করতে দিলো না। মাহাদ তার আগেই বলল,

“আমি আসছি আপনি দাঁড়ান।”

তার ভেতর অস্থিরতা শুরু হলো। উতলা হলো হৃদয়। অচেনা এক কন্যার এমন উতলা লোকে শুনলে হয়তো মন্দ ও বলবে। তবুও হৃদয় কি আর লোকের কথা শুনে থামে?

************
জ্বরের তাপ শরীর পুড়িয়ে দিচ্ছে আর ভেতরের শীতলতায় কাঁপছে শিউলি। শরীর গরমে পুড়ে গেলেও শীত লাগছে বলে জানায় সে। গায়ে একটা লেপ তার উপর কাঁথা জড়িয়ে রাখা হয়েছে। তবুও কাঁপতেই আছে। চোখ দুটো বন্ধ করে আছে। কুর্নিশ বেয়ে জল ও পড়ছে। আমেনা বেগম মেয়ের সিথানে বসে কাঁদছে তার হাতে পায়ে তেল ঘষে দিচ্ছে। এতো জ্বী আগে কখনো আসেনি তার। হ্যারিকেন জ্বলছে। ছোট চৌকিতে শিউলির দেহখানা নিথরের মতো পড়ে আছে দূর থেকে দেখলে এমনটাই মনে হবে। জ্বরের তোপে কথা বলতেও পারছে না সে।

তখনই হন্তদন্ত হয়ে করিম মিয়া আর মাহাদ ঘরে ঢুকলো। শিউলির এ অবস্থা দেখে মাহাদের বুকের ভেতর অস্থিরতা শুরু হলো। এগিয়ে গেলো দ্রুত। শিউলি শীতে কাঁপছে। দাঁত গুলো কেমন শব্দ করছে। মাহাদ কে বসতে দিয়ে আমেনা সিথান থেকে সরে আসলো। ছোট চৌকিতে দুটো মানুষ থাকার মতো। মাহাদ বসলো মাথার কাছে। কপালে ভিজে কাপড় দেওয়া আছে। মাহাদ কাপড়টা তুলতে গিয়ে কপাল স্পর্শ করলো। চমকে উঠলো সে। গা গরমে পুড়ে যাচ্ছে। জ্বর পরীক্ষা করে দেখলো একশ চার ডিগ্রি জ্বর। এই জ্বরের দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সমস্যা হবে। মাহাদ তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় ঔষুধ বাহির করলো।

“ চাচি আম্মা এটা খাইয়ে দিন।”

আমেনা বেগম দৌড়ে গিয়ে ভালো পানি নিয়ে আসলো। ঔষুধ গুলো খাওয়াতে শিউলিকে তুলতে হবে। আমেনা মাথা তুলে কোলে নিলো। একহাতে ধরে আরেক হাতে ঔষুধ খাওয়ানো সমস্যা হচ্ছে। মাহাদ দ্বিধা করলেও করিম মিয়ার কথায় সাহস পায়।

“ ধরো বাবা ঔষুধ খাওয়াক।”

মাহাদ শিউলির কাঁধ ধরে অল্প উঁচু করলো তাকে।

“ হা করো শিউলি।”

মাহাদের কন্ঠে শিউলি নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকায়।
আমেনা বেগম ঔষুধ খাইয়ে দেয় কোনো মতো।
কিন্তু এর মধ্যে শিউলি হুট করে বমি করে দেয়।
মুখে একহাত রাখে আরেক হাত অজান্তে মাহাদের হাত চেপে ধরে। করিমা মিয়া চিন্তিত কন্ঠে বলে,

“ ঔষুধ খাইয়াই বমি কইরা দিলো কাজ হইবো?”

“ চিন্তা করবেন না হবে। আরেকটা ঔষুধ আছে ওটাও খাইয়ে দিতে হবে। ”

আমেনা বেগম উপর থেকে কাঁথাটা সরিয়ে ফেললো। বমি ভাগ্যিস কারো গায়ে লাগেনি। ডাক্তারের গায়ে লাগলে একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হতো বলে ভাবলো তারা। শিউলি কে আরেকটা ঔষুধ ও খাইয়ে দিলো। আমেনা মেয়ের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মাহাদ ও পাশে বসে আছে। শিউলির হাতটা কাঁথার আড়ালে বলে আর কারো নজরে আসলো না। মাহাদ একবার নিজের হাতের দিকে তাকালো। কেমন অনুভূতি বলতে পারছে না। উত্তাপ কি মেলবন্ধনে থাকা আঙুল গুলো। শীতল হাতের স্পর্শ হয়তো ভালো লাগছে তাই তো শক্ত করে চেপে ধরে আছে। বিরবির করে কিছু শব্দ আওড়াচ্ছে শিউলি। মাহাদ কান পেতে শোনার চেষ্টা করলো। শিউলি ধীরে আওড়াচ্ছে,

“ আম্মা,আম্মা….

“ এবার বাবা তোমারে তাইলে রাইখা আসি। রাত মেলা হইছে। তোমারে কষ্ট দেওয়ার লাইগা কিছু কওয়ার নাই তবে এই সময়ে আসার লাইগা সারাজীবন মনে থাকবো। এই বিপদে তোমারই মনে পড়লো। গ্রামে ডাক্তার আছে তয় সে আইজ বাড়িত নাই। ভাগ্যিস তোমরা আইছিলা।”

মাহাদের দৃষ্টি হাত থেকে বামে র্নিক্ষেপ করলো। করিম মিয়ার কৃতজ্ঞতার কন্ঠ। মাহাদ তা শুনে বলে,

“ সমস্যা নেই। ডাক্তারদের ধর্ম মানুষের চিকিৎসা করা। আমি শুধু দায়িত্ব পালন করেছি।”

“ আগাই দিয়া আসি না একা যাইবা?”

মাহাদ কি বলতে বুঝতে পারছে না। তার তো এখান থেকে যেতে মন টানছে না। বাহানা খুঁজলো হয়তো।

“ চাচা আরেকটু অপেক্ষা করি। ঔষুধ তাড়াতাড়ি কাজে দেয়। জ্বর নেমে যাচ্ছে কিনা তা দেখে ফিরি?”

“ আইচ্ছা।”
মাহাদের এই আন্তরিকতা এবং মহৎগুনে করিম মিয়া মুগ্ধ হলো। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলো তার জন্য। পৃথিবীতে সেই মানুষ সেরা যে সৃষ্টির সেবা করতে সব সময় এগিয়ে আসে। যে শুধু নিজের নয় অন্যের ভালোর কথাও ভাবে।

প্রায় আঁধা ঘন্টা মতো সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর শিউলি চোখ খুললো। গা থেকে সমস্ত লেপ কাঁথা ফেলে দিলো। শরীর ঘেমে একাকার।

“ আম্মা গরম লাগছে সরাও। ”

আমেনা বেগম তড়িঘড়ি করে সব লেপ কাঁথা সরিয়ে ফেললো। মাথার কাছে মাহাদ বসে আছে তা ওর খেয়ালে নেই। করিম মিয়া মাহাদের ঠিক অপরপ্রান্তে মেয়ের সিথানে গিয়ে বসলো। মেয়ের মাথায় হাত রাখলো। যত্ন এবং র্দূচিন্তার প্রভাব।

“ আম্মা এখন ঠিক আছো? তোমারে কত করে কইলাম বৃষ্টিতে ভিঁজো না। শ্রাবণ মাসের পানি ভালা না।”

শিউলি জ্বরের মাঝেও হাসে। ধীর কন্ঠে বলে,

“ আব্বা তোমার এই শাসন আমার মেলা পছন্দ। এখন জ্বর নাইমা গেছে। ঔষুধ তেঁতো হলেও আম্মার যত্ন আর তোমার ভালোবাসার বকা বড় ভালো লাগছে। ”

ছেলেমানুষী কান্ডে করিম মিয়া চুপ রইলো। কি বলবে ভাষা পাচ্ছে না। মাহাদের দিকে নজর যেতেই বলল,

“আইজ কিন্তু ভালো হইছো ডাক্তার বাবার কারণে। সে না আইলে কি হইতো তা ভাবতে পারতাছি না। এই রাত্তিরে কেউ কি থাকে? অথচ তারে একবার কইতেই ছুটে আসলো।

শিউলি ওর বাবার চাহনি অনুযায়ী তড়িৎ গতিতে মাথা ঘুরালো। তড়াক দৃষ্টি পড়লো মাহাদের দিকে। ও স্বাভাবিক ভাবে তাকিয়ে আছে। মাহাদ এবার উঠে পড়লো। হাত ছাড়িয়ে গেছে শিউলি উঠার কিছুক্ষণ আগে। মাহাদ সবার উদ্দেশ্য বলল,

“ এবার তাহলে আসি আমি?”

“ হ বাবা চলো তোমারে রাইখা আসি। আমেনা আরেটা কুপি ধরিয়ে দেও। হ্যারিকেন টা পড়ে ভাইঙ্গা গেছে।”

তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। করিম মিয়া ও উঠে পড়লো চৌকি হতে। মাহাদ নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছে কাঠের টেবিল থেকে। শিউলি অপলক তাকিয়ে আছে তারই পানে। যা তার অজান্তে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবনায় আসে কিছু প্রশ্ন,

“ যেখানেই যাই সেখানেই কেন সামনে আসে?
আগের ভয়টা কেন যেন এই তিনটে দিনে কেটে গেছে। স্থির চাহনি বুকের ভেতর ধুকপুক অনুভূতি জাগায় কেন?”

মাহাদ ঘর থেকে বাহির হওয়ায় আগে শিউলির দিকে চায়। সাবধানী কন্ঠে বলে,

“ সাবধানে থাকবেন বৃষ্টির পানি যেন আর শরীরে না লাগে। ঔষুধ ঠিকমতো খাবেন।”

শিউলি তার কথার উত্তর দিলো না। বরং আন্য কথা বলে উঠলো,

“ধন্যবাদ আপনাকে।”

মাহাদের অঁধরে সামান্য হাসি দেখা গেলো। সে এবার ব্যাগ গুছিয়ে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। করিম মিয়া ও বেরিয়ে গিয়েছে তার আগে।
দরজার কাছে গিয়ে আবারো ফিরে আসলো মাহাদ। শিউলি তাকিয়ে ছিলো। আবার আসতে দেখে বড় আগ্রহ নিয়ে চাইলো। মাহাদ একটি ভাঁজ করা সাদা পৃষ্ঠা তার পাশে রেখে চলে গেলো। শিউলি একবার দরজা আরেকবার হাতে নেওয়া সাদা পৃষ্ঠার দিকে চাইলো। নজরের বাহিরে মানুষটা যেতেই শিউলি ভাঁজ খুললো।
উপরে সাদা দেখা গেলেও ভেতরে কালো কালিতে কিছু শব্দ লেখা আছে। হ্যারিকেনের আলোতে শিউলি শব্দ গুলো মনে মনে উচ্চারণ করলো,

“এই শ্রাবণ তোমার জন্য ক্ষতিকর হলেও আমার জন্য কিছু একটা ভালো বয়ে এনেছে। তুমি বড় চঞ্চলতা মেয়ে। তোমার এই চঞ্চলতা আর চাহনি দেখেই নাম দিয়েছি সোনার কন্যা যে।”

একটু ফাঁকা দিয়ে আবার লেখা,
“অথচ তোমায় ডাকা উচিত ছিলো চঞ্চলতা কিশোরী কন্যা। কিন্তু সেদিন প্রথম দেখাতেই নাম দিয়ে ফেলেছি সোনার কন্যা।”

চলবে…………….?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here