#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—৪-৫
রসাই পুর গ্রামে আজ একজনের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়েছে। মাহাদ আর নাজির চলে যায় সেখানে। সুনাম পুর গ্রামে আরহাম, কবির আর রাজিয়া গেছে। বাকিরা থেকে গেছে মাতবর বাড়িতে। এ গ্রামে সাঈদ আর সঙ্গে থাকা বাকিদের কাজ। রসাই পুরে অনেকে সুস্থ হয়ে উঠছে। কিছুজনের অসুস্থতা বাড়ছে ও। মাহাদ নাজির কে সঙ্গী হিসাবে নিয়ে বেরিয়ে গেছে। সেখানে গিয়ে দেখে লোকটি অসুস্থতায় নয় মৃগী রোগে আক্রান্ত। কাপছে অবিরত। চামড়ার জুতো শুকিয়ে ভালো করে তাকে। বাকিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা এবং অসুস্থতার খবর শুনে আবার মাতবর বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দেয় তারা। নদীর ঘাটে নৌকা নিয়ে বসে আছে লস্কর। আজ করিম মিয়া আসেননি। তিনি উনুনের চাল বাঁধছে। ঘরের টিন ঠিক থাকলেও উনুনের উপর খড়ের চাল দেওয়া ছিলো তা অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় তীব্র বাতাসে ভেঙে পড়েছিলো। সময়ের অভাবে গড়ে তুলতে না পারাতে আজ গড়ছে সুযোগ পেয়ে।
“চলো উঠে পড়ো।”
নাজিরের কন্ঠে মাহাদ এগোলো। নৌকায় পা রাখতেই পিছন থেকে কেউ একজন ডেকে উঠলো,
“ ডাক্তার সাহেব খাঁড়ান।”
মাহাদ নৌকা থেকে পা নামিয়ে পিছনে ঘুরলো। নাজির এবং মাঝির দৃষ্টি ও সামনে গেলো। একটা মধ্য বয়সী লোক তাদের দিকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে। কিছুটা কাছে আসতেই হাসিহাসি মুখ করে মাহাদের দিকে হাতে থাকা থলেটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ আপনাদের জন্য আমার আমাগোর গাছের নেওয়া আর কিছু বারোমাসি আম আছে। শহরে পাওন যায় কিনা তা জানিনা। নেওয়া ফল কিন্তু মজা বেশি, মিষ্টি ও আছে।”
মাহাদ ছোট থলে টা হাতে নিলো। জানতে চাইলো,
“ নেওয়া কি?”
লোকটি কি বলবে বুঝতে পারলো না। নেওয়া তো নেওয়া এর নাম কি তা তো অজানা। মাহাদ থলে খুলে দেখেনি। নাজির পিছন থেকে বলল,
“ নেওয়া মানে আতা ফল। গ্রামে নেওয়া বলে।”
“ ওহ আচ্ছা। ধন্যবাদ আপনাকে।”
কৃতজ্ঞতার হাসি দেয় মাহাদ। লোকটি খুশি হয়ে চলে যায়। মাহাদ ও গিয়ে বসে নৌকার ছইয়ের ভেতরে। নাজির কে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ সহজ সরল জীবনযাপনে কষ্টের মধ্যেও শান্তি থাকে তা এখানে না আসলে বুঝতে পারতাম না।”
নাজির শুনে প্রতিত্তোরে বলে,
“ হ্যাঁ তা ঠিক। তবে সবাই যে সহজ সরল এমনটা ভাবাও ঠিক নয়। জানো কিছু মাস আগে কাঞ্জিপুরে একজন লোকের ভাসমান লা*স পাওয়া গেছিলো।”
মাহাদ চমকে উঠে। গা শিউরে ওঠে। এমন ঘটনা যেন তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগলো। আগ্রহী দৃষ্টি র্নিক্ষেপ করলো।
“ আসলেই? তার পর কি হলো? কে ছিলো লোকটা? কারা এসব করেছে?”
“ জানা যায়নি। পুলিশ একবার এসেছিলো তার পর আর তারাও আসেনি। লোকটা সে গ্রামের এক মাঝি ছিলো।”
মাহাদের ধারণা মুহূর্তে বদলে গেলো। যতটুকু ভেবেছিলো ততটা আর রইলো না। তবে এমন ঘটনা শহরে অহরহ। একটা ঘটনা দিয়ে সবাই কে বিচার করাও ঠিক নয়। এই ভেবে নিজেকে বুঝালো। নৌকা চলতে থাকলে। ছঁইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে দাঁড়ালো। ওই তো ঘাট দেখা যাচ্ছে।
দুটো ঘাট এদিকে। একটায় নৌকার সারি ওদিকটায় কিছু জনকে গোসল করতে দেখা যাচ্ছে। মাহাদ সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।
গ্রামের অধিক মানুষ নদীতে গোসল করে। সেই জলে আবার গরু,ছাগল ও গোসল করায়,কাপড়,থালা বাসন সবই মাজে। এমনকি মলমূত্র অবধি খোলা জায়গায় ত্যাগ করে এজন্য অসুস্থ বাড়ে।
নদীর ঘাটে নৌকা না ভিড়তেই হুট করে আকাশ মেঘলা হয়ে এলো। চারদিকে কেমন আঁধারে নিমজ্জিত হলো। যেন মনে হলো ধমনীতে রাত নেমেছে এসেছে সঙ্গে যোগ দিয়েছে ঘোর আমাবস্যা। চারদিক আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে।
তখনই নৌকা ভিড়লো ঘাটে। মাঝি তড়িঘড়ি করে নেমে নাজির আর মাহাদ কে নামতে বলে। এদিকে ঝড় হাওয়া আর ফুরফুরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। মাঝি নৌকা ঘাটে বেঁধেই দৌঁড়ে গেলো বাড়ির দিকে। নাজির আর মাহাদ ও দৌড়ে যেতে লাগলো। রেশ আরো বাড়লো। এভাবে আর একটু থাকলে বৃষ্টি জোরে আসবে আর পুরো শরীর ভিজে যাবে। নাজির অনেকটা এগিয়ে গেলেও মাহাদ পিছনে পড়ে আছে। দৌঁড় ঝাপ তার অভ্যাসে নেই। হঠাৎ করে জুতো কাঁদা পানিতে লেগে যায়। উঠতে চায় না আঁটকে যায় জুতো কাঁধার গর্তে। মাহাদ নিচু হয়ে জুতো তুলছিলো। এর মধ্যে বৃষ্টি জোরে শুরু হয়েও গেছে। তবে হঠাৎ মনে হলো মাথার উপরে বৃষ্টির পানি আর পড়ছে না। অথচ সামনে মাটিতে পড়ছে অবিরত। গাছের শুঁকনো পাতায় টিপটপ শব্দ হচ্ছে। খনিকের আশ্চর্যজনক ব্যাপার টা খটকা লাগলো। জুতো তুলেই মাথার উপরে তাকালো। দেখতে পেলো মাথার উপরে বিশাল একটি মান পাতা। যার কারণে বৃষ্টির পানি পড়ছিলো না গায়ে। কিন্তু কে ধরে আছে? তা দেখার জন্য মাথাটা আরেকটু উঁচু করে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলো। নজরে পড়লো বৃষ্টিতে ভিজে এক কন্যা দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তারই পানে। তিরতির করে কাঁপছে শরীর। বৃষ্টির পানি মাথা থেকে বয়ে পড়ছে চোখ মুখ বেয়ে। কিছু চুল লেপ্টে আছে মুখে। মাহাদের ঘোরলাগা দৃষ্টি। নড়তে চড়তে ভুলে গেছে। এই স্থির চাহনি থাকলো না বেশিক্ষণ।
“এইটা মাথায় দিয়া জলদি যান। বৃষ্টির রেশ বাড়তাছে। আপনারা ডাক্তার হয়ে অসুস্থ হইলে তখন আমাদের চিকিৎসা করবে কে?”
মাহাদের হুস ফিরলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলির পানে চাইলো। সে তার মাথার উপরে মান পাতা ধরে আছে অথচ সে নিজে ভিজছে। মাহাদ পাতাটা হাতে নিলো। শিউলি একটু হেঁসে বাড়ির দিকে দৌঁড় দিলো। মাহাদ তাকিয়ে রইলো। ওদিকে নাজির তাকে ডেকে যাচ্ছে। মাহাদ একহাতে জুতো আরেক হাতে মাথার উপর মান পাতা ধরে ছুটতে লাগলো। নদীর একটু বাদেই করিম মিয়ার বাড়ি নাজির তাকেই সেখানেই নিয়ে গেলো। এদিকে বৃষ্টি মুষলধারে নামতে শুরু করলো। করিমা মিয়া তখন বাড়িতেই ছিলো। নাজির আর মাহাদ কে দেখে উঠোনে ডাকলো। স্ত্রী কে বলল,
“ শিউলির মা গামছা টা দেও তো। ”
আমেনা বেগম ঘর থেকে বাহির হলেন গামছা হাতে। দুয়ার থেকে নাজির আর ডাক্তার কে দেখেছে। একটা গামছা মাহাদের হাতে আরেকটা দিলো নাজির কে। করিম মিয়া আবারো বলল,
“ বসতে পিড়ি দেও তো। চেয়ার তো নাই বাবা।”
করিম মিয়া কি করবে বুঝতে পারছে না। শহুরে মানুষ এমন বাড়ি ঘরে কি অভ্যস্ত আছে? মাহাদ মাথা আর শরীর মুছে বসে পড়লো উঠোনে পেতে রাখা খেঁজুর পাতার মাদুরে বসে পড়লো। বলল,
“এতো অধৈর্য হতে হবে না। এই মাদুরে বসতে আমার অসুবিধা নেই।”
করিম মিয়া কি আর শোনে? সে অধৈর্য হয়ে শিউলি কে ডাকতে লাগলো।
“ শিউলি কই গেলো শিউলির মা?”
“ কইছিলাম গরুটা আনতে। সে গরু এনে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিঁজতে মালার সঙ্গে ছুটেছে।”
“ মাইয়া কথা শোনেনা। জ্বর আইলে তখন হইবো কি? আষাঢ় – শ্রাবণ মাসা জ্বর বড় ভয়ংকর হয়। ”
করিম মিয়ার চিন্তিত কন্ঠ। নাজির মালার নাম শুনে মুখের আদল পরিবর্তন করলো। এর মধ্যে শিউলির মা ঘর থেকে বিন্নি ধানের খই আর বাতাসা এনে দিলো মাহাদ আর নাজিরের সামনে।
“ গরিব মানুষের ঘরে এ ছাড়া কিছু নাই। কষ্ট হইলেও একটু খাইলে বড় খুশি হবো।”
“ কি যে বলেন চাচি আমাকে কি কখনো দেখেছেন আপনি কিছু দিয়েছেন আর আমি খাইনি?”
“তুমি তো বাপ আমাগোর নিজের পোলা সে তো শহুরে মানুষ। ”
শেষ কথাটা মাহাদ কে ইঙ্গিত করে বলেছে। মাহাদ খই আর একটা বাতাসা খুলে তুললো। যদিও এসব কখনো খায়নি তবে শুনেছে নাম। বেশ ভালো লাগছে। পাশে নারকেল আর গুড়ের তৈরি নাড়ু এনে রাখলেন করিম মিয়া। একটু নাড়ুও মুখে পুরলো। খেতে খেতে বলল,
“ চাচি আম্মা আপনার হাতের তৈরি নাড়ু চমৎকার! খই বাতাসা কখনো না খেলেও নারকেল নাড়ু খেয়েছি কিন্তু এতো মজা আগে কখনো খাইনি।”
প্রশংসা শুনে তিনি আনন্দিত হলেন। কাসার গ্লাসে পানি ঢেলে দিলেন। নাজির, মাহাদ করিম মিলি খেতে খেতে গল্প শুরু করলো।
________
“ সন্তান জন্ম দিতে না পারলে বাপের বাড়ি চলে যা। বিয়ের গত চার বছর হলে তবুও সন্তান হয় নাই। মানুষ যে ফিসফিস করে কানাঘুষা করে আমার কানে আসে, রাগ উঠে। এই মাতবর বাড়ির উত্তরাধিকী লাগবে।”
পাপিয়ার চোয়াল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে সাহেল বলল কথাগুলো। রাগে হিসহিস করছে। সমস্ত শরীর কাঁপছে। পাপিয়া ব্যথায় কাঁদছে। চোয়াল ছাড়াতে ছটফট করছে কিন্তু সাহেল ছাড়ছে না। পাপিয়া অনুরোধ করে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
“ দয়া করে ছেড়ে দিন। সন্তান সৃষ্টি কর্তার দান তিনি না দিলে কিভাবে হবে? এখানে আমার দোষ কোথায়? পাড়া প্রতিবেশীর কথায় আমারো খারাপ লাগে কিন্তু আমি করবো আপনি বলুন?”
পাপিয়ার কথায় সাহেলের রাগ আরো বাড়লো। এক ঝটকায় তাকে ফেলে দিলো মেঝেতে। পাপিয়া ব্যথার কুঁকড়ে উঠলো। কাঠের চেয়ারে লেগে হাতে পায়ে প্রচন্ড ব্যথা পেলো। কান্নার সঙ্গে আর্তনাদ ও যোগ হলো। তবে সে আর্তনাদ চার দেওয়ালে বন্ধি থাকলো। ঝড়ো হাওয়া আর তুমুল বৃষ্টির কারণে কেউ কিছু শুনতে পেলো না। সাহেল চেয়ারে একটা লাথি মারলো। বলল,
“ তোর দোষ সন্তান দিতে না পারা। এবারেও না হলে তোকে বাপের বাড়ি রেখে আসবো। সন্তানের জন্য দরকার পড়লে আবারো বিয়ে করবো। সেই বন্দোবস্ত করছি।”
পাপিয়া শরীরের ব্যথার চেয়েও বেশি ব্যথা অনুভব করলো সাহেলের কথায়। ভয়ে আঁতকে উঠল। সংসার হারানোর ভয়, মানুষের কটু কথা, সম্মান হারানোর ভয়। সে মেঝে থেকে উঠে সাহেলের পা চেপে ধরলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ আপনি ছাড়া আমার আর কে আছে? আব্বা আম্মা এসব শুনলে কষ্ট পাবে। আপনি এমন কিছু চিন্তা কইরেন না দয়া করে। ”
সাহেল পা ঝটকা মেরে সরে গেলো। পাপিয়া ব্যথার কথা ভুলে ভবিষ্যৎ ভেবে উন্মাদ হলো। খুব বড়লোক ঘরের মেয়ে নয় সে। সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়েও অতিব সুন্দরী বলে মাতবর নুরুল আলম এই বাড়ির বউ করে এনেছিলো। কিন্তু বিয়ের চার বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তান হচ্ছে না। কত ঝাড় ফুক,পানি পড়া খেলো তবুও কোনো ফল পায়নি। ধীরে ধীরে সাহেলের হিংস্রতা বাড়ে, অবহেলা তো আছেই।
কিন্তু সন্তান জন্ম দিতে না পারা কি তার দোষ? সে ও তো চায় তার কোল আলো করে একটা সন্তান আসুক। আল্লাহ না দিলে কি করবে?
তার ভাবনার মাঝে সাহেল এগিয়ে আসলো। পাপিয়ার দিকে নিচু হয়ে বলল,
“ এটাই শেষ। এর পর নতুন কেউ এই ঘর দখল করবে। তুই চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নে।”
বলেই পাপিয়া কে টেনে তুললো। ফেললো খাটের উপরে। কোমরে দ্বিতীয় দফায় ব্যথা পেয়ে চোখ খিজে সহ্য করলো। তার পরই অনুভব করলো স্বামী নয় একজন হিংস্র পশু তার উপর অধিকার ফলাচ্ছে। উদ্দেশ্য ভালোবাসা নয় পুরোটাই স্বার্থ।
যে স্বার্থ হাসিল না হলে হারিয়ে ফেলবে সংসার নামক নারীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি।
********
“নিধি এই গুলো অতিথিদের দিয়ে আয় তো।”
“ পারবো না আম্মা তুমি দিয়ে আসো।”
বিরক্তি নিয়ে নাকোচ করলো নিধি। সায়মা বেগম রান্ধন ঘর থেকে ক্ষেপে উঠলো।
“ দিয়ে আয়। নীরা ঘুমিয়েছে নইলে ও যাইতো। তুই কবে এতো অবাধ্য হইলি? নীরা কামচোরা থেকে এখন ভালো হলো আর তুই কি ওর হাত পাইলি?”
নিধি রাগ নিয়ে বারান্দা থেকে রন্ধন ঘরে প্রবেশ করলো। বৃষ্টির মূহুর্ত তার খুবই প্রিয়। এই মুহূর্তে ডাক পড়াতে আরো বেশি রাগ হলো। তবুও শুনলো। মায়ের কথা ফেলতে পারে না। সামনে নাস্তার বড় দুটো থালায় সাজানোর হরেক রকমের নাস্তার বাটি। একটা সায়মা বেগম এর হাতে আরেকটা সামনে। একটা তিনি নিয়ে যাবেন আর এটা নিতে নিধি কে ডাকছিলো। সে সায়মার হাতের টা এক প্রকার ছো মেরে নিয়ে চলল। মনে মনে বলল, “ তার এতো ভালো হওয়ার কারণ জানলে এতো গুনগান করতে না আম্মা।”
নিধি এসে থামলো অতিথি শালার দিকে। যেখানে শহুরে মানুষদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। পিছনে তাকিয়ে দেখলো ওর আম্মা এসে হাজির হয়েছে। তিনি গেলেন প্রথমে ডান দিকের ঘরে। আর নিধি ঘুরলো বামদিকে। দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো সে। বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টির আওয়াজ হচ্ছে। দরজার দুইবার কড়া নাড়তেই কেউ একজন দরজা খুলে দিলো। নিধি তাকালো দেখতে পেলো অপরপ্রান্তের মানুষটা চেয়ে আছে। আগে কখনো সামনাসামনি হয়নি তারা তবে চিনে দুজন দুজন কে সে ডাক্তার আর ও মাতবর কন্যা এই হিসাবে।
“ আপনাদের নাস্তা।”
নিধি থালা বাড়িয়ে দিলো। সাঈদ আপাতত ঘরে একেলা। আরহাম নেই গেছে পাশের গ্রামে হয়তো সেখানেই বৃষ্টিতে আটকা পড়েছে। সাঈদ নিতে চাইলো কিন্তু হাত বাড়াতে নিয়েও পিছিয়ে আনলো। তার দু হাতে কাঁচের কিছু শিশি আছে। নিধি তা খেয়াল করলো। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো।থালাটা টেবিলের উপর রাখলো। এক পলকে পুরো ঘরটা দেখে নিলো। সঙ্গে নজরে পড়লো ঘরের মানুষটাও। কেমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে যেন কথা বলতে জানে না,নড়তেও পারে না। নিধি ও চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে নিলো। দরজার কাছে আসতেই শুনতে পেলো,
“ আপনার দৃষ্টি সুন্দর, ব্যবহার ও ভদ্র তবে আপনার জমজ সে এতো বেহায়া কেন? পারে না গায়ে পড়ে যেন।”
নিধির হাসি পেলে বেশ! আড়ালে ফিঁক করে হেসেও দিলো। সাঈদ উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। নিধি হাসিমুখ সরিয়ে কঠিন মুখ করে পিছনে ঘুরলো। এমন মুখশ্রী দেখে সাঈদ একটু থতমত খেলো। ওর উত্তরের অপেক্ষা না করে আবারো বলল,
“নিজের বোন হয় এজন্য কি রাগ করেছেন? আমি সত্যিটা বললাম। মাতবর বাড়ির মেয়ে এমন কেন হবে?”
নিধি তবুও চুপ। শুধু তাকিয়ে আছে। সাঈদ বুঝতে পারছে হয়তো মেয়েটা রাগ করছে। কেমন ভ্রু উঁচু করে তারই দিকে তাকিয়ে আছে।
“ ঠিক আছে যান আপনি। আপনার বোন অনেক ভালো।”
সত্যি বলার পর তার ভয়ে মিথ্যে বলাতে নিধি এবার জোরে হেসে দিলো। হাসির শব্দে মুখরিত হলে ঘর। বৃষ্টি আর হাসি দুই মিলিয়ে সৃষ্টি হলো চমৎকার সুর। সাঈদ তার ভাবভঙ্গি বুঝতে পারছে না তাই চুপচাপ দেখে যাচ্ছে। নিধি কোনো মতো হাসি থামালো। দৃষ্টি র্নিক্ষেপ করলো সাঈদের পানে। বলল,
“ আপনাদের ভালো লেগেছে বলেই একটু পিছে পড়েছে। ভালোলাগা তো মন্দ নয় তাই না?”
“ মন্দ নয়, কাউকে ভালে লাগতেই পারে কিন্তু এমন বেহায়াপনা করা তো ঠিক নয়। ভালো লাগলে বলে দিবে। কিন্তু উনি নিদিষ্ট কাউকে নয় যে কাউকে কেমন করে। মাহাদের দিকে একটু বেশিই দৃষ্টি রাখে। ”
নিধির অঁধরে আরেকবার হাসি দেখা দিলো। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেলো,
“এবার থেকে আপনার দিকে বেশি,বেশি দৃষ্টি রাখতে বলবো তাহলে।”
“ এই না,না এমন করবেন না।”
নিধি ততক্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। সাঈদ বোকাসোকা ভাব নিয়ে খাটের উপর বসে পড়লো।
নিজের কথায় নিজে ফেঁসে গেলো কিনা তা নিয়ে ভাবতে লাগলো। এদিকে নিধি হাসতে হাসতে পাগল প্রায়। হাসি যেন থামছে না তার। হঠাৎ নুরুল আলম সামনে আসলো। এমন হাসি ভ্রু কুঁচকে দেখে শুধালো,
“এমন হাসির কারণ কি? পাগল হলি?”
নিধির হাসি ধপ করে উধাও হয়ে গেলো। স্বাভাবিক মুখশ্রী বজায় রেখে জবাব দিলো,
“আব্বা একজন কাঁদায় ধপাস করে পড়ে গেছে সেটা দেখে হাসছিলাম।”
“ সাহেল কে দেখেছিস?”
“ ঘরে মনে হয় আব্বা। এতো বৃষ্টির মধ্যে ঘরে ছাড়া কোথায় যাবে?”
নিধি উত্তর দিয়ে চলে গেলো। নুরুল আলম কিছু একটা ভাবছেন। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়ালেন ছেলের ঘরের সামনে। একটুখানি দাঁড়িয়ে থেকে কিছু একটা ভেবে আবারো ঘুরে আসলো। এ বাড়িতে কর্মরত থাকেন তিনজন। একটা মেয়ে বাকি দুজন নারী। এই গ্রামেই তাদের বাড়ি। নুরুল আলম রন্ধন ঘরে তাদের খুঁজলো কিন্তু পেলো না। হয়তো বাড়ি গেছে ভেবে সেখান থেকে প্রস্থান করলো।
____________
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বৃষ্টির রেশ একটু আগেই সামান্য কমেছে তবে পুরোপুরি ছাড়েনি। পড়তে আছে অনবরত। মাহাদ আর নাজির এখনো বসে আছে করিম মিয়ার ঘরে। ঝড়ো হাওয়া বৃদ্ধি পেলে উঠোন ছেড়ে ঘরের ভেতর আসে। টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে আর ঝুম ঝুম আওয়াজ তুলছে। মনে হবে কেউ ঘুঙুর পরে নাচছে। এই আওয়াজ মাহাদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন। টিনের চালে বৃষ্টির আওয়াজ তার কাছে বেশ মধুর শোনালো। চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে লাগলো।
তখনই করিম মিয়ার কন্ঠ শুনতে পেলো।
“আম্মা এভাবে কেউ ভিজে? শরীরে জ্বর আইলে কি হইবো? এখনের রোগ ভালো না বুঝো না ক্যান?”
“ আব্বা অল্প ভিজেছি। এতক্ষণ মালাগোর বাড়িত আছিলাম।”
শিউলি ঘরে যেতে নিলো। তখনই ওর মা বলে উঠলো,
“ ও ঘরে যাস না তোর দাদির ঘরে যা।”
শিউলি ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে শুধায়,
“ক্যান আম্মা? ও ঘরে কি হইছে?”
“শহরে ডাক্তার আর নাজির বাবা আছে। পানি হইতাছে তাই এখানে আশ্রয় নিছে। ”
শিউলির ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা শরীরে হিম বয়ে গেলো। কেন যেন ডাক্তারের নাম শুনলেই অন্য রকম অনুভূতি হয়। শিউলি দৌঁড়ে অন্য ঘরে গেলো। একটু বাদেই কাপড় পাল্টে ঘর থেকে বেরোলো। আমেনা ভাত বাড়তাছে। তা দেখে শিউলি শুধালো,
“এতো আগত ভাত কারে দিতাছো আম্মা?”
“ অতিথি আইছে তাদের খাইতে দিতে হইবো না?
খাওনের সময় তো হইয়া আইতাছে। তুই এই মাছের তরকারি টা নিয়া আয়।”
আমেনা ভাতের গামলা আর পানির জগ নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো। শিউলি তারকারির বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
“ আম্মা লইয়া যাও খাড়াই আছো কেন?”
“ হুম? যাইতাছি।”
শিউলি ঘরে প্রবেশ করলো। অন্ধকার ঘরে হ্যারিকেন আর কুপির আলোতে খাটের পাশটায় বেশি আলোকিত হয়েছে। ঘরে আরো কারো আগমন বার্তা পেয়ে মাহাদ তাকায় সামনে। শিউলি এদিকে আসলো। হাতের বাটিটা আমেনার দিকে এগিয়ে দিলো। মাহাদ হাত ধোঁয়ার জন্য পানি নিতে গ্লাস এগিয়ে দিলো। আমেনা বেগম চোখের ইশারায় শিউলিকে পানি দিতে বললে সে জগ হাতে নিয়ে পানি দিতে এগিয়ে যায়। তখন না চাইতেও নজর পড়ে মাহাদের দিকে। হ্যারিকেনের আলোয় দুজনের মুখশ্রীই জ্বলজ্বলে লাগছে। শিউলি আর তাকাচ্ছে না সরমে। কেমন যেন লজ্জা লাগে উনার সামনে আসলেই। মাহাদ হাত ধুয়ে খেতে শুরু করলো। নাজির তো আগেই শুরু করেছে। শিউলি ঘরের এক কোনে দাঁড়িয়ে দেখছে। মাহাদ এখন আর তাকাচ্ছে না বলে তার তাকানো সুবিধা হচ্ছে।
কিন্তু এভাবে তাকানো কি বেহায়াপনা নয়? এই ভেবে শিউলি আর তাকালো না। এর মধ্যে মাহাদ আর নাজিরের কন্ঠে রান্নার প্রশংসা শুনতে পেলো।
মাহাদের কাছে এই গ্রাম আঞ্চলের রান্নার স্বাদ নতুন।
“ রান্না অনেক সুস্বাদু হয়েছে।”
মাহাদের প্রশংসায় খুশি হয়ে আমেনা আরেটু তরকারি দেয় পাতে। মাহাদ মানা করলেও শুনলোই না।
“নদীর টাটকা ছোট মাছ সুস্বাদু তো হবেই।”
নাজিরের কথায় মাহাদও সম্মতি জানালো। এর মধ্যে শিউলি বেরিয়ে গেলো। জবেদা বিবি কে ভাত খাইয়ে দিবে বলে। ধীরে ধীরে বৃষ্টিও কমে গেলো। নাজির আর মাহাদ ঘর থেকে বেরোলো।
“এবার তাহলে আমরা যাই চাচা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
করিম মিয়া শেষের অর্থ বুঝলো না তবে হাসলো। কথা শুনে বুঝতে পেরেছে ভালোই বলেছে হয়তো।
“ ঠিক আছে সাবধানে দেইখা যাইয়ো। পানিতে আশে পাশে ভইরা গেছে আবার।”
নাজির করিম মিয়ার থেকে টর্চ লাইক টা নিয়ে নিলো। উঠোন থেকে নেমে যেতে শুরু করলো।
মাহাদ পা বাড়ালো। উঠোন ছেড়ে নেমে একবার পিছু ঘুরলো। কাউকে দেখার আশায় তবে সে আশা পূর্ন হলো না। নজরে কাঙ্ক্ষিত মানুষটি পড়লো না। অতঃপর সামনে দিয়ে অগ্রসর হলো। দুয়ার পেরিয়ে যেতেই শিউলি ঘরের জানালার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসলো। মাহাদের দৃষ্টি সে লক্ষ্য করেছে। কাকে খুঁজ ছিলো? কেন তাকায় এভাবে? শুধু কি এমনি? নাকি আমার ভুল? আমিও তো তাকাই এমনিতেই। হয়তো তিনিও একই কারণে। নিজ মনে কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর আওড়াতে থাকলো। এক সময় মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
চলবে………….?

