#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—৭
সূর্য উঠেছে সবে। শিউলি খুব ভোরে উঠে পড়েছে। ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ালো। মেঘলা আকাশ আজও। শিউলির মন ঘর থেকে বেরিয়ে বাহিরে ছুটতে চাইলো। শরীর যদিও একটু ম্যাজম্যাজ করছে। আমেনা বেগম অসুস্থ শরীর নিয়ে উঠতে দেখে এগিয়ে এলো। কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“ উঠলি কেন? যা শুইয়া থাক। অসুস্থ শরীর নিয়া ঘর থাকি বাহির হইতে হইবো না আইজ।”
শিউলি মুখ কুচকিয়ে ফেললো। বাহির ছাড়া ঘরে বন্ধি থাকার মতো স্বভাব তার না। সে বলল,
“আম্মা অসুস্থতা আরো বাড়বে ঘরের ভেতর বইসা থাকলে। আর এখন আমি ভালা আছি। ডাক্তারের ঔষুধ ভালো কাজে দিছে। কেমন রাত্রির মধ্যেই জ্বর নাইমা গেছে। এখন দেখো জ্বর নাই তেমন গাঁয়ে।”
শিউলি কপাল এগিয়ে দিলো। আমেনা বেগম হাত রাখলো কপালে। রাতের মতো গরম না হলেও এখনো কিছুটা আছেই। তিনি সাবধানী বানী ছুড়লেন,
“ বাইরে রোদ নাই, শীতল আবহাওয়া। গাঙের দিকে ঠান্ডা বেশি। এই সময়ে ঠান্ডা লাগানো বারণ শিউলি। তোর আব্বায় কইয়া গেছে তোরে দেইখা রাখতে।”
“ আব্বায় কই গেছে আম্মা?”
“ মাষ্টার বাড়ি কি এক কাজে গেলো। মাষ্টার মশাই বাড়ি আইছিলো খানিক আগে। ”
“ ওহ।”
আমেনা বেগম আঙ্গিনা পরিষ্কার করতে লাগলো আবারো। ঝ্যাঁটা দিয়ে পেটাচ্ছে আঙ্গিনার বুক। বৃষ্টি ফলে পাতাগুলো মাটির সঙ্গে লেপ্টে আছে। উঠতে চাচ্ছে না দ্রুত। এ নিয়ে তিনি বেশ বিরক্ত।
শিউলিকে মুখ ধুঁতে দেখে বলল,
“ ঘরে গুড় মুড়ি আছে খাইয়া নে।”
শিউলির খেতে ইচ্ছে করছে না তবে এই কথা ওর মা কে বলল না। পাশে ঘরটাতে প্রবেশ করলো। জবেদা বিবি ঘরে শুয়ে আছে। শিউলি রে দেখে আনন্দিত হলো। আঁধ শোয়া হয়ে বসলো।
“ জ্বর সারছে তোর? বউ রে কত কইলাম তোরে দেখতাম কিন্তু নিলো না ও ঘরে।”
“ হ সারছে তুমি চিন্তা কইরো না। গুড় মুড়ি দিবো খাইবা?”
জবেদা বিবি আগের মানুষ এসব খাবার তার অতি প্রিয়।
“ হ দে।”
শিউলি ঘর থেকে বাহির হলো। গুড় মুড়ি আর পানি নিয়ে আবারো হাজির হলো। কুলি করে দুই দাদি নাতনী খেয়ে নিলো গল্প করতে করতে। তবে শিউলি স্বাদ না লাগাতে দু মুট খেয়েছে। খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ শিউলির মনে পড়লো শালিক পাখিটারে খাওন দেওয়া হয়নি কাল সন্ধ্যা থেকে। বিকেলে দিয়েছিলো একটু। ও দৌঁড়ে ঘর থেকে বাহির হলো।
রান্ধন ঘরের চালার নিচে ঝুলে থাকা বাঁশের তৈরি খাঁচাটার কাছে গেলো। শালিক পাখিটা তাকে দেখে চেঁচাতে লাগলো। মুঠো ভর্তি খুদ দিলে প্লাস্টিকের তৈরি ছোট বাটিতে। খাবার দেওয়া মাত্র খেতে শুরু করলো গপগপিয়ে। শিউলির কষ্ট লাগলো। না খেয়ে নিশ্চয়ই পাখিটার ও কষ্ট হয়েছে ভেবে।
“ ইসস রাত্রে না খাইয়া ছিলো। বেখেয়ালি মন নিয়ে বড় মুশকিলে যে আছি।”
খাওয়া শেষ হতেই শিউলি খাঁচা নিয়ে এলো। দাঁড়ালো উঠোনের মাঝে। আমেনা বেগম নদীতে গেছে থালা বাসন মাজতে। এই সুযোগে বাড়ি থেকে বাহির হয়ে গেলো। দুয়ার পেরোতেই মালার দেখা পেলো। সে হন্তদন্ত হয়ে আসছে। তার একটু পিছনে নিধিও আছে। দুজনকে একসাথে দেখে সে অবাক হলো। মালা এসেই চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
“ জ্বর আইছিলো শুনলাম? সে জ্বর নাকি মেলা খারাপ অবস্থা করছে।”
“ আইছিলো চলেও গেছে। ডাক্তার আইছিলো বলে।”
এর মধ্যে নিধিও তাদের কাছে এসে দাঁড়ালো। শিউলি তারে শুধালো,
“ তুমিও অসুস্থ শুইনা আইছো? তোমারে কে কইলো?”
“ ডাক্তার সাহেব।”
এই শব্দ টুকু উচ্চারণ করতেই শিউলির রাতের কথা মনে পড়লো। মালারে জানানো প্রয়োজন বলেও মনে করলো।
“ আপা আমি এখন ঠিক আছি। তুমি এতো সকালে উইঠা চইলা আসছো?”
“ ডাক্তার সাহেব রা কইলো তাই শুনে থাকতে পারলাম না। একটু পর হয়তো উনিও আসবেন?”
“ কে?”
অচেতন মনে শুধায় সে। নিধি উত্তর দেয়,
“ ভিনদেশী ডাক্তার।”
শিউলি সামনের পথের দিকে তাকালো। আসবে শুনে মনটা কেমন অস্থির হলো। দুচোখ খুঁজলো কাউকে। নিধি আরো কিছু কথা বলে বাড়িতে ফিরে গেলো আবারো। শিউলি আর মালা হাঁটতে লাগলো সামনের দিকে।
কিছুটা এগোতেই দেখা মিললো তিনটে মানুষের।
দুজন খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে রইলো কেবল একজন এগিয়ে আসছে। শিউলি হাতের খাঁচা হতে পাখিটা বাহির করে হাতে রাখলো। মূহুর্তেই ডানা মেলে পাখিটা উঠে গেলো আকাশে। উড়ন্ত শালিকের দিকে তাকিয়ে শিউলি হেসে উঠলো। আনন্দে তার চোখে মুখে উপচে পড়লো। এ বুঝি সরল জীবনের খুশি।
বেঁচে গেলো শুধু একটি পাখি নয় তার সংসার ও। মানুষের মতো তাদের ও তো সঙ্গী ও সংসার আছে।
এর মধ্যে মাহাদ তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। শিউলির মুখপানে চেয়ে আগে শুধালো,
“ জ্বর কি আছে?”
শিউলি আকাশের দিক থেকে নজর সরিয়ে ডানপাশে ঘাড় ঘুরালো। মাহাদের প্রতিত্তোরে বলল,
“ না এখন কইমা গেছে। আপনি ঔষুধ দিছেন যে একবার খাইয়াই জ্বর নাইমা গেছে আর আসেনি।”
“ পাখির জীবন বাঁচিয়ে এতো আনন্দ পাও,
যদি কখনো কোনো হৃদয় বাঁচানোর সুযোগ আসো বাঁচাবে কি?”
শিউলি পুরো বুঝলো কিনা কে জানে। তবে উত্তর দিলো না ভেবেই,
“ যাকেই বাঁচানোর হোক,সুযোগ পেলে অবশ্যই বাঁচাবো।”
মাহাদ হেসে উঠলো। শিউলি তাকালো তার পানে। মাহাদের দৃষ্টি পড়তেই সে চোখ সরিয়ে নিলো। হাসির কারণ বুঝতে না পেরে শুধালো,
“ ভুল কিছু কইছি?”
মাহাদ হাসি থামায়। দূর থেকে সাইদ আর আরহাম অবাক চিত্তে তাকিয়ে আছে। ভাবছে এই কি সেই মাহাদ? প্রেমের কত চিঠি, টেলিফোন অবজ্ঞা করা ছেলে আজ এই একটা গ্রামের মেয়ের উপর মজলো? আরহাম তো জিজ্ঞেস ও করলো,
“ কি আছে মেয়েটার মধ্যে? যার জন্য মাহাদ ছুটে আসে? পরিচয় ও তো ক’দিনের।”
সাঈদ স্থির দৃষ্টি শিউলি আর মাহাদের রেখেই উত্তর দিলো,
“ কি আছে সেটা মাহাদ বলতে পারবে। তবে হ্যাঁ মেয়েটার মন মানসিকতা সুন্দর। শ্যাম বরণ হলেও চেহারা মায়াবী, চোখ দুটো নিখাদ গহবর যেখানে মাহাদ ডুবেছে।”
“এসব প্রেমের অনুভূতি নেই তাই এতো কথা জানিনা। তোদের মনে প্রেমের বাতাস বয় তোরা জানিস।”
সাঈদ দৃষ্টি রাখলো পাশে। আরহাম কে শুধালো,
“ প্রেম আমি?”
“হু। দেখিনি মনে করেছিস? মাতবর কন্যার দিকে তাকাস, একটা কথায় মন খারাপ করে বসে থাকিস। এর কারণ কি?”
সাঈদ নিজেই ভাবতে লাগলো। অসম্ভব জিনিসের প্রতি টান থাকতে নেই। আর নিজের ব্যক্তিত্বের প্রশ্ন তুলে যখন, তখন তো আরো নয়। চলে গেলে আর আসা হবে না এই গ্রামে। এটা তার মনকে বললো সে। তবে মাহাদ যে ডুবছে তার কি হবে?
শিউলি উত্তরের আশায় মাহাদের দিকে চেয়ে আছে। সে উত্তর দিলো,
“ভুল বলোনি শুধু বোঝার ভুল।”
“ কি ভ….
শিউলি কথা শেষ করতে পারলো না। তার আগে মালা বলে উঠলো,
“ আব্বাজান আইতাছে চইলা যাই। মাইনষে দেখলে খারাপ কইবো কইয়া বকা দিবো পরে।”
মালা শিউর কে নিয়ে তড়িঘড়ি করে সে স্থান থেকে নিয়ে আসলো। মাহাদ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। শিউলি খানিকটা এগিয়ে গিয়ে একবার পিছনে তাকালো। এই মুহূর্তটার অপেক্ষায় ও ছিলো। পাশে কখন সাঈদ আরহাম দাড়িয়েছে খেয়াল করেনি।
“ শেষ পরিনতি ভাবিস আগে। শেষে ডুবলে উঠতে পারবি না।”
মাহাদের হাস্যজ্বল চেহারা থমথমে হলো। সাঈদের কথা মন্দ ও নয়। তবে কি করবে?
“ দেখ ওদের সামনে কেউ। ”
মাহাদ আর সাঈদ তাকালো। শিউলি আর মালার সামনে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে। কি জানি বলছে ওদের। একটু পর মালা সরে গেলো। রয়ে গেলো শিউলি আর ছেলেটা। মাহাদের সন্দেহ ভাজন দৃষ্টি। তাকিয়ে রইলো অপলক। কেমন যেন আঁধার নেমে এলো মন আকাশে। খানিকক্ষণ কথা বলার পর শিউলি মালাকে হাতের ইশারার ডেকে নিয়ে চলে গেলো। পিছনে ফিরে আর তাকালো না পর্যন্ত।
যা মাহাদের হৃদয়ে কিঞ্চিৎ ব্যথা অনুভব করালো। না পেয়েও হারানোর ভয় পেলো।
___________
“ কি বলছিস সব সত্যি? ”
অবাক হয়ে শুধালো মালা। শিউলি মাথা নাড়ালো। বলল,
“ হ্যাঁ সত্যি। আস্তে বল আম্মা শুনবে।”
মালার হাতে মাহাদের দেওয়া চিরকুট। সে খানিক ভেবে বলল,
“ তোর কি মনে হয়? উনি তোরেই বুঝিয়াছে?”
“ কেমনে কইবো? আমারে তো নাম ধরে কয়নি।”
“ কি ভালো পেয়েছে তাহলে?”
“ জানিনা।”
মালা আবার বলল,
“ লক্ষ্য করেছি তোর দিকে কেমন করে যেন তাকান। দৃষ্টি সরাতে চান না। আজও তাই দেখিলাম। তুই নিজেও তাকাস। উনি সামনে আসলে কেমন যেন হয়ে যায় মুখশ্রী।
শিউলির ভেতর অজানা অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে।
তাকানোর নাম নিতেই আনমনে বলে ফেললো,
“ভিনদেশী মানুষ কি জাদু করিলো আমারে?
চোখের দিকে তাকালেই বুকের ভেতর কম্পন উঠে।”
মালা আরেক দফায় অবাক হয়। হা হয়ে যায় ওর মুখ। বিস্ময় নিয়ে বলল,
“ সখি এ তো মনের অসুখ। ডাক্তার সাহেব কি এই অসুখ সারানোর দায়িত্ব নিবো?”
শিউলি নিজেও চমকায়। আকাশকুসুম ভাবনায় নিজেকে ধিক্কার জানায়। বলে,
“ ভিনদেশী শহরে মানুষ চলে যাইবো কাল নয় পরশু। আমরা ভাবতাছি হয়তো মেলা বেশি।”
“ হইতে পারে। ”
মালাও সহমত পোষণ করলো তবে কিছু একটা কিন্তু রয়ে গেলো। এ বিষয় জানতে হবে বলে ঠিক করলো।
________
“ আব্বা ডেকেছেন?”
সাহেল কে দেখেই নুরুল আলম তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। রেগেমেগে ছেলের গালে থাপ্পড় ও বসালো। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“ তোমারে কইছিলাম এতো আঘাত না করতে। বাড়িতে এতো মানুষ তারা দেখলে বা শুনতে পেলে কি বলবে? মাতবর বাড়ির বদনাম করতে চাও?”
সাহেল গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রাগে এমনিতে শরীর জ্বলছিলে এখন এই চড়ে রাগ আরো বাড়লো।
“ আব্বা আমি ওই বন্ধা মা*** রে তালাক দিবো নতুন করে আবারে বিয়ে করবো। আমার সন্তান লাগবে।”
নুরুল আলম রাগে ফুঁসছে। রাগলে হবে না ভেবে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। বলল,
“ বিয়ে অবশ্যই দিবো কিন্তু তালাক দিতে হবে না।
থাকুক সে পড়ে এখানে। বংশের উত্তরাধিকারী লাগবে। এভাবে মারলে মানুষ জানাজানি হলে খারাপ বলবে। নিধির উপর রাগ হয়েছিলি কেন?”
“ আব্বা ওদের বিয়ে দিয়ে দেন। নিধি আজকাল বেশি বাড়তাছে। আমারে পশু বলে কত সাহস!
“ শান্ত হ। ভাবতাছি ওদের বিয়ের কথা। আগে নীরার দিতে হবে। ঘটককে সমন্ধ আনতে বলতে হবে।”
সাহেল শান্ত হতে পারলো না। সে রাগে গিজগিজ করতে করতে নুরুল আলম এর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ঘরের বাইরে সালেহার সঙ্গে দেখা হলো। ছেলের দিকে ঘৃণার দৃষ্টি রাখলো। বলল,
“ তোকে পেটে ধরেছিলাম এমন অমানুষের মতো আচরণ করতে? একজন নারীর গর্ভে জন্ম নিয়ে আরেক নারীর গায়ে হাত তুলিস লজ্জা করে না?”
“ আম্মা কথা বলে আর রাগ বাড়াবেন না। নয়তো এই রাগ ও পড়বে তার উপর যার জন্য এতো মায়া লাগছে।”
“ তুই অ…
“ সালেহা আজকাল বেশি কথা বলছো। মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে বলছো?”
সালেহার কথা বন্ধ হয়ে গেলো। অর্ধ কথা গিলে চলে গেলো। অসহায় তিনি। এই সংসারে অবস্থান কেবল সংসার সামলানো আর সন্তান জন্ম দেওয়াই ছিলো একমাত্র কাজ। তার মতো আরো অনেক নারীর জীবন কেবল এই গন্ডিতেই আঁটকে আছে।
_______
বিকেলে রাজিয়া,রত্না,আফসানা, জাজিম,কবির আর কায়সার মিলে মাতবর বাড়ির পিছনে পুকুর পাড়ে বসে গল্প করছিলো। কথায়,কথায় কায়সার বলে উঠলো,
“ মাতবর বাড়িতে একটা মেয়ে আসে দেখেছিস? কি সুন্দর!
“ কে শিউলি?”
আফসানার সঠিক উত্তরে কায়সার অবাক হয়।
“ তুই কিভাবে বুঝলি?”
“ মাতবর বাড়িতে দুটো মেয়ের আনাগোনা মালা আর শিউলি। দুজনে ভালো হবে শিউলি একটু অন্য রকম। মুগ্ধকর মেয়েটার ব্যবহার এবং মানসিকতা।”
জাজিম বলে,
“ কায়সার কি প্রেমে পড়লি?”
সে চমকায়। সকলের চাহনী তার দিকে দেখে হেসে তড়িৎ গতিতে মাথা নাড়ায়। বলে,
“ না,না তেমন কিছু না। আমি তো শুধু বললাম এই যা। তবে স্যার কে তার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলাম একবার কাল।”
মাহাদ তাদের কিছু কথা বলতে এসেছিলো। মাত্র ও গ্রামের একটা ছোট ছেলের হাত ব্যান্ডেজ করে দিয়ে আসলো দা দিয়ে কেটে গেছিলো আঙ্গুলের মাথা। সামান্য লেগে আছে শুধু। কি র*ক্তপাত আর তার মায়ের কান্না।
মাহাদ ওখান থেকে বাড়ি এসে শুনে সকলে পুকুর পাড়ে আছে। তাদের খোঁজে এসেই তাদের কথোপকথন শুনতে পেলো। কেন জানি ভীষণ রাগ লাগলো। মন চাইলো সবগুলো কথোপকথন হতে শিউলির নাম মুছে দিতে। তবে সে রাগ প্রকাশ করতে পারলো না। কেন পারবে? রাগের কারণ দেখাতে হবে। সে মানুষটা যখন কারো নয় যেকেউ স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু মন মানছে না। মাহাদ সেখান থেকে সংগোপনে পিছু ফিরে চলে এলো। মাতবর বাড়ির পিছনে হওয়াতে খানিকটা ঘুরে আসতে হয়। পাশে বিশাল আম বাগান। সেখানে দেখা মিললো নীরার। সে দাঁড়িয়ে আছে হাসিখুশি হয়ে। পরনে নতুন শাড়ি সাথে সাজগোছ ও আছে। মাহাদের নজর এড়ালো না তা। ও না থেমেই চলতেই থাকলো। নীরা পিছু ডেকে বলল,
“ শুনুন?”
মাহাদ না চাইতেও দাঁড়ালো। নীরা সামনে গিয়ে লাজুক কন্ঠে বলল,
“ আমারে কেমন লাগতাছে? ”
“ মাহাদ এমন প্রশ্নে খানিক বিরক্ত হলো। তবুও শান্ত হয়ে বলল,
“ ভালো। ”
“ শুধু ভালো?” কিছুটা নাটকীয় স্বরে বলল নীরা। মাহাদের রাগ এবার আকাশ ছুলো। কড়া কথা বলতে নিবে ওমন সময়ই সামনে নাজিরের দেখা পেলো। আর বলতে পারলো না কিছু। শুধু চুপচাপ চলে আসলো। নীরা আশাহত হলো। মন কাড়তে কত সুন্দর করে সেজে আসলো কিন্তু সেই দেখলো না একটু।
মাহাদ এগিয়ে আসলে নাজিরের সঙ্গে আরেকজন কেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। যার দৃষ্টি মাতবর বাড়ির পানে।
মাহাদের অপরিচিত লোকটাকে চিনতে অসুবিধা হলো না। ভুলবে কি করে? দেখলো তো আজকেই।
সে নাজির কে জিজ্ঞেস করে,
“ কে উনি?”
“মাস্টার বাড়ির ছেলে। বড় ভাই হন সম্পর্কে।”
“ ওহ।” মাহাদ শুনে তাকিয়ে রইলো। কিছু একটা ভেবে চলেছে সে। তখনই লোকটি তাদের কাছে এলো। মাহাদের সঙ্গে ভাব বিনিময় হলো।
কথা বলতে বলতে ঢুকলো মাতবর বাড়ির ভেতরে।
___________
বহুদিন পর পরিচিত মানুষটাকে দেখে থমকে গেলো কেউ একজন। চিরচেনা মানুষটার কি পরিবর্তন। এগিয়ে গেলো পা পা করে। দাঁড়ালো সামনে। হঠাৎ কেউ সামনে দাঁড়ানোতে ভয় পেলো পাপিয়া। সাহেল মনে চমকে উঠলো। বলল,
“ মারবেন না।”
“ কে তোমায় মারে পাপিয়া?”
“ চিরচেনা কন্ঠ শুনে চমকে তাকালো পাপিয়া। সামনের মানুষটাকে দেখে ভয় পেলো। বুক কাঁপলো। তাকালো আশে পাশে। কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“ কেউ না। আপনি এখান থেকে যান। কেউ দেখলে আমায় খারাপ বলবে। আপনি কেন এসেছেন?”
জিহান শুনলো না। দাঁড়িয়ে রইলো। পাপিয়ার গাল আর গলার দাগ তার নজরে পড়লো। নিজের গালের দিকে দৃষ্টি দেখে পাপিয়া তড়িৎ গতিতে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে নিলো। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।
“ কি হয়েছে গালে?”
পাপিয়া বার, বার আশে পাশে তাকাচ্ছে। গলা শুকিয়ে আসছে কি উত্তর দিবে? কাল থেকে ঘর থেকে বেরোয়নি মাত্র বেরিয়েছিলো তখনই জিহানের আগমন। যা ছিলো অপ্রত্যাশিত।
“ কি হলো বলো?”
পাপিয়া চমকে উঠলো।থতমত কন্ঠে উত্তর দিলো,
“ কিছু হয়নি। পড়ে ব্যথা পেয়েছি।”
বলেই ছুটে পালালো পাপিয়া। আর কোনে প্রশ্ন করার সুযোগ দিলো না। জিহান ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। তার বিশ্বাস হয়নি উত্তর। স্মৃতি ভুলতে চোখের সামনে থেকে চলে গেছিলো শহরে। শেষ দেখা পথে এক বছর আগে হয়েছিলো। স্মৃতি বড় কষ্ট দায়ক। তার চেয়েও বেশি কষ্টকর প্রিয়তমার গালে আঘাতের চিহ্ন দেখা। গোপন ভাবে খবর পেয়েছিলো তা সত্যি হবে কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি।
চলবে……………..?

