#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—১০
সবাই যখন মুখিয়ে আছে মাহাদের থেকে উত্তর জানতে। তখন মাহাদ মুখ খুললো। সামনের পানে তাকিয়ে সকলের আগ্রহের অবসান ঘটিয়ে বলল,
“ রাতের আঁধারে কেউ একজন গাছতলায় কিছু একটা পুতে রাখছিলো ছাঁদ থেকে দেখছিলাম। আমাবস্যা হওয়াতে ছায়া মূর্তির মতো ছাড়া আর কিছু দেখা যায়নি। হতে পারে চোর চেনা-জানা কেউ। যে এখানে লুকিয়ে রেখেছিলো পরে সবটা ধামাচাপা গেলে নিয়ে যেতো।”
মাহাদের কথায় নুরুল আলম চিন্তায় পড়লেন। নাজির ভাবছে কিছু। সাহেল রাগ ঝারছে অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছে রহমত আলী কে। তার বেখেয়ালিতে এমন হয়েছে বলে জানালো। মাহাদ কেবল নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। নুরুল আলম কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। সকলের মধ্যে এ নিয়ে ফিসফিস এখনো চলছে। মাহাদ ও হাঁটতে শুরু করলো। সাঈদের মাথায় এখনো পুরোটা ঢুকেনি। আরহাম ও তাদের সঙ্গে হলো। ও মাহাদ কে জিজ্ঞেস করলো,
“ তুই রাতে ছাঁদে গিয়েছিলি? কখন? পানি খেতে তো উঠেছিলাম মধ্য রাতে তখন তো তুই একটু পরেই ঘরেই এলি।”
“ ছাঁদে উঁড়ে গিয়ে আবার উপর থেকে নিচে নেমে এসেছিলাম।”
মাহাদের হেয়ালি কথা আরহাম সাঈদ কারো পছন্দ হলো না তবে আর জিজ্ঞেস ও করলো না। আশে পাশে সকলে আছে। সুযোগ বুঝে শুনে নিবে। কিছু একটা মাহাদ জানে যা ওর মুখের হাসি দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
“ আপনারা খেতে আসেন সকলে।”
বাড়ির ভেতরে যেতেই নিধির কন্ঠে তাকালো ওরা।
মাহাদ উত্তর দিলো, “ যাচ্ছি।”
নিধি যেতে নিলে মাহাদ পিছু ডাকে। বলে,
“আপনার হাতের তৈরি পায়েস সাঈদের খুব পছন্দ হয়েছে আজ আরেকবার বানাবেন তো। বেচারা রোজ বলে স্বাদ ভুলতে পারে না। আজ বাদে কাল তো চলেই যেতে হবে। ”
সাঈদ বোকা বনে গেলো। মাহাদ কে আটকাতে চেয়েও পারলো না। এদিকে নিধি তার দিকে চেয়ে আছে। সে এখন কথা হারিয়ে ফেলেছে। মাহাদ তার অবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসছে। ও এমন কথা একবার শুধু বলেছিলো প্রশংসা করে। আরহাম ও মাহাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলে উঠলো,
“ হ্যাঁ বানান। শেষ স্বাদ টুকু গ্রহণ করে চলে যাক বেচারা!”
দুজনের মজায় ফেঁসে গেছে সাঈদ। কিছু বলতেও পারছে না। নিধি বাঁধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ালো। যেতে যেতে হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু কেন? কাল চলে যাবে এই শব্দটা শুনতে কেন যেন ওর ভালো লাগলো না। না এই ব্যাপার টা মোটেও ভালো না। কিছুতেই না। নিজে নিজেকে শাঁসালো তার পর চলে গেলো রান্ধন ঘরে। কাজে সাহায্যকারী তিনজনে খাবারের থালা সাজাচ্ছে। নিধি তাদের মধ্যে দুজনকে বলল,
“ সানু সুগন্ধি চাল বাহির করে আন তো। আর চম্পা চাচি আপনি একটু গাভীর দুধ দুয়ে এনে দেন তো।”
উনারা দুজনে নিজেদের কাজ করতে বেরিয়ে গেলো। পাশ থেকে সালেহা বেগম বলল,
“ কি করবি এসব?”
“ আম্মা পায়েস রাঁধবো।”
“ কার জন্য? ” মায়ের এই প্রশ্নে নিধি থমকে গেলো। ভাবনায় মত্ত হলো কি উত্তর দিবে? মেয়েকে নিরুত্তর দেখে আবারো শুধালো,
“ কি হলো বল?”
নিধি খনিকের জন্য ভাবনার পথে হারিয়ে গেছিলো। মায়ের প্রশ্নে ভাবনায় সুতো ছিঁড়ে বেরিয়ে আসলো। অঁধরে শব্দ আসছে না। একটু সময় নিয়ে বলল,
“ শহুরে ডাক্তার রা কাল চলে যাবে এজন্য মিষ্টিমুখ করাবো। গ্রামের মানুষদের সেবা করলো, কত ভালো কাজ তাই।”
সালেহা বেগম হয়তো বিশ্বাস করলো তাই আর কোনো প্রশ্ন করলো না। নিধিও ব্যস্ত হয়ে পড়লো নিজ কর্মে।
________
করিম মিয়া মাত্র বাড়ি ফিরলো। সেই ভোরে নদীতে মাছ ধরতে গিয়েছিলো। যা মাছ পেয়েছে ভালোই। বাড়িতে কিছু পাঠিয়ে সবটা পৌর শহরে বিক্রি করে দিয়ে এসেছে। এমন মাছ ধরে কিছুজন মিলে নিয়ে যায় বেঁচতে মাঝে মধ্যেই। এতে কিছু টাকা আসে হাতে। আজ একটু বেশি পেয়েছে। আসার পথে শিউলির জন্য কাঁচের চুড়ি আর আর একটা নাসারন্ধ্রে পরার টুলটুলি (নথ) এনেছে। ওগুলো ফতুয়ার পকেটে রেখে দিয়েছে। বাড়ির আঙ্গিনায় আসতেই ডাক ছাড়লো,
“ শিউলি আম্মা কই ? আমেনা কই গেইছো?”
আমেনা না আসলেও শিউলি ঠিকই ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। আব্বা কে দেখে বলল,
“ আম্মা কাপড় কাঁচতে নদীর ঘাটে গেইছে। তুমি আইলে খাইতে দিবার কইছে। আব্বা নদীর বড় মাছটার মেলা স্বাদ। বেলা হওয়াতে আম্মা অপেক্ষা করতে দিলো না। নইলে তোমার সঙ্গে খাইতাম।”
প্রথম কথাগুলো উচ্ছাস নিয়ে বললেও শেষ করলো মন খারাপ করে। করিম মিয়া মন খারাপ টিকতে দিলো না। হাসতে হাসতে বলল,
“ একসাথে না খাই আম্মা তুমি আমারে খাইতে দেও তুমি পাশে বইসা থাকো। আর তোমার লাগি এইটা আনছি, নেও।”
ফতুয়ার পকেট থেকে কাঁচের লাল চুড়ি বাহির করে দিলো। শিউলি আনন্দে নেচে উঠলো। হাত থেকে নিয়ে আনন্দের সহিত বলল,
“ আব্বা কি সুন্দর চুড়ি! কতদিন চুড়ি পরিনাই।”
শিউলির এতো উচ্ছাস দেখে করিম মিয়া আনন্দিত হলো। পরে নথটাও বাহির করে দিলো। আনন্দ দ্বিগুণ হলো শিউলির। মনে হচ্ছে ঈদ আনন্দ পেয়েছে। তার আনন্দ পাখির মতো উড়তে ইচ্ছে করছে।
শিউলি চুড়ি গুলো হাতে পরলো। রিনিঝিনি আওয়াজ তুলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। তার পর দৌড়ে ঘরে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। নাসারন্ধ্রের ছিদ্রিতে নথটা পরে নিলো। নাক ফুল আগে থেকেই পরা ছিলো। একটুখানি নিজেকে আয়নায় দেখে নিয়ে ঘরে থেকে বেরিয়ে করিম মিয়ার সামনে দাঁড়ালো। হাসতে হাসতে জানতে চাইলো,
“ আব্বা কেমন লাগতাছে?”
“ মেলা সুন্দর লাগতাছে আম্মা। একদম রাজকন্যার মতো।”
“ তুমি রাজা আব্বা তাই আমি তোমার রাজকন্যা তাই না?”
করিম মিয়া হাসে। মাথা নাড়িয়ে শায় জানায়। তার পর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ এইবার পৌর শহরে গেলে সুন্দর একখানা শাড়ি আনমু তোমার লাগি।”
“ আম্মা আর দাদির জন্য আনবে আব্বা। আমার আছে ম্যালা।”
করিম হাসলেন মেয়ের কথায়। অভাবের সংসারে অঢেল না থাকলেও মেয়ে, বউ, মা সব পেয়েছে চাঁন কপাল করে। কেনো দিন বাড়তি আবদার কিংবা অভিযোগ করেনি কেউ। এই ভেবে অজান্তে চোখের কোনো জল চলে এলো। ঠোঁটের কোনো হাসিও রইলো। শিউলি তা দেখে বলল,
“ আব্বার তোমার মুখে হাসি মেলা সুন্দর মানায়।
কর্মব্যস্তর মধ্যি একটু হাসবে আমার সামনে।”
করিম মিয়ার হাসি প্রগাঢ় হয়। চোখের কোনের জল লুকিয়ে। হাসতে হাসতে বলে,
“ আমার মেয়ে সাথে থাকলে হাসমু সারাজীবন।”
“ কিন্তু আব্বা মেয়েরা তো পর সকলে কয়,পরের ঘরে মাইয়া মানুষের বসবাস।”
শিউলি মুখ ভার করে বলে কথাটা। শিউলির মুখে এই কথা শুনে করিম মিয়ার হাসি মাখা মুখ মিলিয়ে গেলো। পরিনত হলো আঁধারে। এইটা ভাবলেই বুকের ভেতর হা হা কার লাগে। শিউলি উত্তরের আশায় চেয়ে আছে। তা দেখে তিনি মিথ্যে হাসার চেষ্টা করে উত্তর দিলেন,
“ মেয়েরা কখনো পর হয় না। বাপ মায়ের কাছে ছেলে-মেয়ে সব সময় আপনই থাকে। পৃথিবীর নিয়মের লাইগা মেয়েদের অন্যের ঘরে পাঠাতে হয়।
যদি সম্ভব হইতো আম্মা তবে তোমারে আমি নিজের কাছেই রাইখা দিতাম। কিন্তু যা নিয়ম তা মানতেই হইবো।”
শেষ শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে করিম মিয়ার কন্ঠ কাঁপলো। অতি আদরের সন্তান শিউলি। ওর পর আর সন্তান হয়নি। সমাজের সবাই যখন ছেলে না হওয়া নিয়ে মন খারাপে ব্যস্ত করিম মিয়া তখন মেয়েকে নিয়ে উচ্ছাস করতো, ছুটে বেড়াতো মেয়ের পিছু,খেলতো মেয়ের সঙ্গে বন্ধু হয়ে। এসব আবার অনেকের সহ্য হতো না। অধিক মানুষ মেয়েদের নিয়ে এতো উচ্ছাস আদিখ্যেতা হিসাবে খেতাব দিতো, মুখ বাঁকাতো। তাদের মতে ছেলে সন্তানই অধিক আহ্লাদের হবে মেয়েরা নয়। অথচ সেই মানুষটাও কেনো নারীর গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া। কি র্নিমম কথা না? সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা গ্রামের অধিক নারী ও এই কথা বলে যাদের বয়স ত্রিশ থেকে শুরু করে আশির ঘরে। মেয়েরা অবহেলার বস্তু হিসাবে সমাজে জায়গা পাবে এটাই তাদের চাওয়া যেন।
____________
সাঈদ হাঁটতে হাঁটতে মাতবর বাড়ি ছেড়ে অনেকটা দূরে চলে আসলো। সঙ্গে আর কেউ নেই। মূলত ও একাই এসেছে। হুট করে কেন যেন কিছু ভালো লাগছে না। সময়টা এগারোটা বাজছে ঘড়িতে।
সাঈদ হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালো একটা খোলা জায়গায়। যেখানে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা খেলছে কুতকুত, জুতো ছোড়াছুড়ি। যা দেখে ওর নিজের শৈশবের রঙিন দিনগুলোর কথা মনে পড়লো। তবে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সঙ্গে শিউলিকে দেখে হেসে উঠলো। কেমন বাচ্চাগুলোর সঙ্গে ছুটছে। যেন সে নিজেও তাদের মতো এখনো আছে। যদিও কিশোরী বয়সে অস্বাভাবিক নয়। বয়স কত? চৌদ্দ, পনেরো হবে বলে আন্দাজ করলো। শিউলি খেলারর মাঝে খেয়াল করলো সামান্য দূরে সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে। ও এগিয়ে আসলো। কাছাকাছি এসেই নজর আশে পাশে ঘুরিয়ে খুঁজলো কাউকে। সাঈদের বুঝতে অসুবিধা হলো না কাকে খুঁজছে। সাঈদ মজা নিতে প্রশ্ন ছুড়লো,
“ শিউলি ফুল খুঁজতেছো কাউকে?”
শিউলি তড়িৎ গতিতে মাথা নাড়ালো। তার ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করতে ব্যস্ত হলো। বলল,
“ না। কাকে খুঁজবার যাবো? কেউ তো হারাই যায় নাই।”
সাঈদ মিটিমিটি হাসছে। শিউলি ভ্রু কুঁচকে তাকালো। দূর থেকে নিধি সবটা দেখে অন্য ধারণা করলো। সে মূলত সাঈদের পিছু নিয়ে এখানে এসেছিলো। কিন্তু আর থাকলো না চলে গেলো ফিরে।
শিউলি এবার সামান্য ভেবে শুধালো,
“ আপনি ডাকলেন, ‘শিউলি ফুল’ কেউ ডাকে, ‘সোনার কন্যা’। আচ্ছা আপনারা শহুরে মানুষরা কি নতুন,নতুন নামে ডাকেন সবাই রে।”
শিউলির এহেন অবুঝ প্রশ্নে সাঈদের হাসির রেশ বাড়লো। হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা অনুভব করলো। কোনোমতে হাসি থামালো। শিউলির অবুঝের ন্যায় মুখখানা নজরে আসলো। সাঈদ বলল,
“ সবাই কে ডাকে না। যাদের ভালো লাগে তাদের ডাকে বুঝলে?”
“ আপনার ভালো লাগে কেন? আপনার লগে আমার তেমন কথা তো হয়নি আগে।”
“ কারণ তোমার মতো আমার একটা বোন আছে তাই।”
শিউলি মাথা চুলকাতে চুলকাতে কিছু একটা ভাবলো। তার পর আবার শুধালো,
“ তাহলে কি আপনার বন্ধু ওই ডাক্তার সাহেবের ও বোন আছে? ”
সাঈদ বোধহয় হাসতে হাসতে মরেই যাবে। একটা মানুষ আর কত হাসবে? কিন্তু আঁটকানো কঠিন।
তার এই প্রশ্ন মাহাদ শুনলে অক্কা পেতো নিশ্চত। শিউলি উত্তরের আশার চেয়ে আছে। একই উত্তর হলে মনে কষ্ট পাবে একটু। এটা আগেই ভেবে নিলো। তবে উত্তর আসলো মন মতো,
“ না ওর কেনো বোন নেই। বউ বানানো সখ আছে কাউরে।”
শিউলি খুশি হলো কিনা তা বুঝা গেলো না। তবে সাঈদ আর সেখানে থাকলো না। উত্তর দিয়েই পিছু ঘুরে হাঁটতে লাগলো আবারো। শিউলি এবার ফিঁক করে হাসলো। ছুটে গেলো আবারো খেলতে।
__________
মালার আনাগোনা মাতবর বাড়িতে আজকাল বেড়েছে। তবে সেটা আগে ডাক্তারদের জন্য হলেও এখন তা নাজিরের জন্যে। এই তো সে উঁকি ঝুঁকি মারছে। নীরা ওকে দেখতে পেয়ে চোখ মুখ আঁধার করে তাকালো। সামনে এসে বলল,
“ এখানে কি কাজ তোর? এতো ঘুরঘুর করিস আইজ কাল ব্যাপার টা কি?”
মালা চমকে উঠলো। ভয় ও পেলো সামান্য। নীরা যে ওকে আর শিউলি কে খুব একটা পছন্দ করে না সেটা টের পায় এ বাড়ি এলেই। মালা মসিবতে পড়লো। ও আমতা আমতা করতে থাকলো। তখনই মাহাদ সেখানে উপস্থিত হলো। ওর উত্তর মাহাদই দিলো,
“ আমি ডেকেছি মালা কে।”
নীরার সন্দেহ হয়। কন্ঠ নরম করে শুধায়,
“ কেন? ওর সাথে আবার কাজ আপনার? আমারে কইতে পারেন।”
মাহাদ সসম্মানে অপমান করলো। হেসে প্রতিত্তোর করল,
“ সব কাজ কি সবার দ্বারা হয়? সাহায্য করতেও সুন্দর মন মানসিকতা লাগে। একটু আগেই রন্ধন ঘরে কাজ করতে দেরি হয়েছে বলে বকাঝকা করে এলেন।”
নীরা অপমানিত বোধ করলেও মাহাদের মুখের উপর কিছু বলতে পারলো না। কেবল মাথা নিচু করে চলে গেলো। যাওয়ার আগে মালার দিকে রাগি দৃষ্টি র্নিক্ষেপ করে ফুঁসতে ফুঁসতে গেলো। মালা হেসে উঠলো শব্দ করে। জব্দ হওয়াতে বেশ মজা পেয়েছে। হাসতে হাসতে মাহাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ আচ্ছাসে জব্দ হয়েছে। এতো অহংকারী মেয়ে।”
“ বাবার হাত পেয়েছে। তোমাকে কিন্তু এদের সাথে বসবাস করতে হবে এটাও মাথাও রাখো, নিজেকে প্রস্তুত করিও।”
মালার মুখ আঁধার হলো। ওই পর্যায়ে ভাবলেই ভয় লাগে। পরিনতি কি হবে? জীবন কোথায় নিয়ে যাবে? ভবিষ্যৎ পাপিয়ার মতো হবে না তো? এসব ভাবনাও হানা দিচ্ছে। মাহাদ বোধ-হয় ওর ভাবনা টের পেলো। বলল,
“ সব পুরুষ তো আর কাপুরুষ নয়, নাজির যথেষ্ট ভালো ছেলে। স্ত্রী’র পাশে স্বামী ঢাল হয়ে থাকলে পৃথিবীর কারো সাঁধ্যি নাই আলাদা করবে। আশা করি তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবন সুন্দর গড়ে উঠবে।”
মালা বোধ-হয় আশার আলো দেখলো। আঁধার সরে গিয়ে আলোর দেখা পেলো। তবে ভয় পেলো পিছনে কাউকে দেখে। মাহাদ ওর ভয়ার্ত দৃষ্টি খেয়াল করলো। তাকালো পিছনে। পাপিয়া নিরস প্রাণহীনের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটে নেই হাসি আছে শুধু বিষাদের ছায়া। দুজনের দৃষ্টি নিজের দিকে দেখে পাপিয়া এগিয়ে আসলো। হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ সুখী হতে স্বামীর ভালোবাসা আর প্রেরণাই যথেষ্ট,
নাজির তার ভাইয়ের মতো নয় এটা সকলে জানি।
কাউকে বলবো না চিন্তা কইরো না।”
মালা সস্থি পেলো। যাওয়ার জন্য উদত হতেই মাহাদ বলল,
“ ঘন্টা মতো পর এদিকে এসো তো। তোমার সঙ্গে একটু দরকার আছে। ”
মালা মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। পাপিয়া রন্ধন ঘরের দিকে পা বাড়ালো। হাঁটছে থমকে থমকে।
এবার পুরোই থমকে গেলো। মাহাদের কথা তাকে স্থির করে দিলো।
“ আপনি যখন ওই সুখ পাচ্ছেন তবুও এ বাড়িতে পড়ে আছেন কেন? সুখের সন্ধানে চলে যান।”
পাপিয়া হাসলো। যা মাহাদের দৃষ্টিতে পড়লো না। ও না তাকিয়েই উত্তর দিলো,
“ গ্রামের সমাজ কেমন তা জানেন? যদি সুখের সন্ধানে যাই তবে নষ্টা তকমা দিতে মুহূর্ত সময় নিবে না, বলবে সুখের জন্য ঘর ছেড়েছি। অথচ এ তো ঘর নয় জাহান্নাম তারা কি আর জানে?”
মাহাদ উত্তর দিতে পারলো না। পাপিয়া আবারো চলতে শুরু করলো। আফসোস হা হা কার নিয়ে বাঁচতে হবে ভেবে সে কাঁদার পরিবর্তে হাসলো। মাহাদ ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। আশ্চর্য হয়নি পাপিয়ার কথায়। প্রথম দিকে গ্রামের মানুষ সহজ সরল ভেবে কতই না প্রশংসা করলো মনে মনে। তবে বুঝতে পারছে গ্রাম্য সমাজে নারীর মূল্য কতটুকু। সহজ সরল অনেকে হলেও কুসংস্কারে ভরা চারদিক।
______________
সময়টা ঠিক দুপুর। মাহাদ কাঠের চেয়ারে বসে আছে। টেবিলে সাদা পৃষ্ঠা খোলা পড়ে আছে । হাতে কলম ধরে ভাবছে কি লিখবে সে? চিঠির শুরুতে কি সম্মোধন করবে?
প্রিয়? সে অধিকার কি পেয়েছে? ভাবনার মাঝে আরহাম ডেকে উঠলো,
“ চল আজ ভরা নদীতে গোসল করতে যাই সকলে।”
মাহাদের ভাবনা ভঙ্গ হলো। আরহামের দিকে তাকালো। ও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সাঈদ আগেই গেছে। চেয়ারেই নড়েচড়ে বসে উত্তর দিলো,
“ ভরা নদী। সাঁতার জানিস যে যাবি?”
আরহাম মাথা নাড়ালো। সাঁতার ওরা কেউ জানেনা। আরহাম একটু দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেলো। মাহাদ আবারো মনোযোগ দিলো ভাবনায়। হাতের কলমের পিছনের অংশ দাঁতের ডগায় আঁটকে। অনেক ভাবাভাবির পরই সম্মোধনহীন চিঠি লিখতে শুরু করলো।
“শোনো, সোনার কন্যা তোমাকে দেখার পর আমার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা অজানা অনুভূতি হুট করে দোলা দিয়ে উঠেছিলো। এখনো মনে পড়ে তোমার দুটো চোখ কিভাবে আমার হৃদয় থমকে দিয়েছিলো, মায়াময় চাহনি,শ্যাম বরণ, মেঘ বরণ কেশ নজর কড়েছিলো। আমি ভুলতে পারিনা না কিছুতেই। শহরে কত চিঠি, টেলিফোনে প্রেমপত্র পেলাম, কত জনকে দেখলাম, তোমার মতো অনুভূতি কারো বেলায় অনুভব হয়নি। তুমি কি জাদুকরী? কি জাদু করলে বলো তো? চোখ বন্ধ করলে সেই নদীর পাড়ে দমকা হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া তুমি এবং বৃষ্টিতে ভেঁজা মুহূর্তটা ভেসে উঠে দুচোখের পাতায়। হৃদয় ডেকে বলে, “বৃষ্টি ভেজা প্রহরে দেখেছিলাম তোমাকে, তার পর থেকে ব্যাকুল হৃদয় কেবল তোমাকেই খুঁজে ফিরে।”
তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লাগে, বোধ-হয় ভালো ও বাসি। আমার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায় না লুকোচুরি,তাই জানিয়ে দিলাম আমার মনের অনুভূতি। আমার গুচ্ছ অনুভূতি তুমি যত্নে আগলে নিবে নাকি পায়ে ঠেলে ফেলবে তা একান্তই তোমার ব্যাপার। তবে তুমি আমার অনুভূতিতে সিক্ত হলে পৃথিবীর বুকে চাওয়া থেকে পাওয়ার সংখ্যা বাড়তো, ভালোবেসে জিতে যাওয়ার আনন্দ আরেকজন গ্রহণ করতে পারতো। তোমাকে এবং তোমার অনুভূতিকে আমি সম্মান করবো। সেই চিরচেনা নদীর ঘাটে সন্ধ্যা বেলাতে তোমার উত্তরের অপেক্ষায় রবো।”
ইতি,
তোমার ডাক্তার সাহেব।
চলবে………………….?
নতুন,নতুন গল্প পেতে আমার পেইজ,গ্রুপ ফলো দিন।
পেইজ লিংক:👇
https://www.facebook.com/profile.php?id=61557427230773
গল্পের গ্রুপ লিংক:👇
https://facebook.com/groups/1854365618395145/
পারসোনাল আইডি:👇
https://www.facebook.com/shamoli.rahman.666286

