একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা #শ্যামলী_রহমান #পর্ব—১৩

0
1

#একটা_ছিলো_সোনার_কন্যা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—১৩

রাত্রি পেরিয়ে দিনের সূচনা হলো। আঁধার ফুরিয়ে আলোর দেখা মিললো। কর্মব্যস্ত মানুষেরা ভোর বেলায় নিজেদের কাজে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। গাছের ডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাখিটাও ছুটলো খাবারের খোঁজে। নদীর জল থৈথৈ করছে তারই বুকে খেলে বেড়াচ্ছে একপাল রাজহাঁসের বাচ্চা। শিউলি ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠেছে। বর্তমানে নদীর পাড়ে বসে আছে। মাথাটা হাঁটুর উপর রেখেছে। কাল সারাটি দুন আনন্দে কাটলেও আজ মন খারাপ লাগছে। ওর মা থালা বাসন আর কিছু হাঁড়ি পাতিল মাজতেছে। এতগুলো একসাথে নিয়ে যেতে পারবে না বলে শিউলি কে ডেকে এনেছে। ওর দৃষ্টি ভরা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের দিকে। ভাবছে মাহাদের কথা। কাল সারারাত ঘুমাতে পারেনি। দুটো চোখের পাতা বুঁজে আসেনি চেয়ে থেকেছে রাতভর। ডাক্তার সাহেব রা সকালে চলে যাবে এই খবর জানে সে। মাতবর বাড়ি একবার এক নজর দেখতে যাবে বলে ভেবেছে। তখনই করিম মিয়া ডাকতে ডাকতে নদীর পাড়ে আসলো। শিউলি তাকালো। তিনি ওকে বললেন,

“ আম্মা তোমারে নিধি মা ডাকতাছে। আর আমেনা শোনো ডাক্তার রা শহরে চইলা যাবে সকালে খাওয়া হইলেই। একবার দেখা কইরা আইসো পারলে।”

আমেনা মাথা নাড়ালো। বলল,

“ হাতের কাজ শেষ কইরা যামু। আগে রান্ধন শেষ করি। হাঁড়ি গুলো হাতে নেন তো শিউলি যাক তবে মাতবর বাড়ি।”

করিম মিয়া হাসতে হাসতে এগিয়ে গেলো। নদীর ঘাটে নেমে আমেনা বেগমের হাত থেকে হাঁড়ি পাতিল গুলো নিয়ে নিলো। আরো কিছু নিতে চাইলে আমেনা দিলো না। নিষেধ করে বলল,

“ ওগুলোই নিয়া যান। আমি পারমু এ কয়টা নিয়া যাইতে।”

“শোনো আমেনা তুমি পারবা আমি জানি আমি নিয়া গেলে ক্ষতি কি? তোমারে কিন্তু সবুজ শাড়িতে মানাইছে খুব।”

আমেনা মুখ বাঁকালো। আড়ালে হাসলেও বুঝতে না দিয়ে বলল,

“ এই বয়সে ভীমরতি গেলো না? মাইয়া পাশে আছে ভুইলা গেলেন নাকি? আর এই পুরাতন শাড়িতেও সুন্দর লাগতাছে?”

করিম মিয়া হেসে উঠলো। একবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে আবারো বউয়ের দিকে নজর রাখলো। ফিসফিস করে বলল,

“তোমারে এই রঙে মানাইছে কইছি এতে পুরোনো শাড়িতে কি আসে যায়? এক নজর দেইখাই তোমারে ঘর তুলছিলাম সে ভালোবাসা আজ আছে, সারাজীবন থাকবো আমেনা।”

আমেনা বেগম লজ্জা পেলো। লাজুক হেসে আঁচল টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করলো। অভাবের সংসারেও সুখ তিনি এই মানুষটার জন্য অনুভব করেন।

শিউলি কথা শুনতে না পেলোও কিছু একটা বুঝতে পারলো। বাবা মায়ের একসাথে হাসির মুহূর্ত দেখে সে নিজেও হেসে দিলো। করিম মিয়া শিউলির দিকে চেয়ে তার মুখের হাসি দেখে আরেকটুখানি হাসির রেশ বাড়লো। শিউলি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখলো। মনে মনে বলল,

“সবাই মায়ের সুন্দর হাসির কথা বলে,
তারা কি কখনো বাবার হাসি দেখেছে?
দূর্লভ জিনিসটি দেখলে বলতে পারতো,
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বাবার মুখের হাসি।”

“ শিউলি মা খাড়াই আছো কেন? আসো বাড়িত। তোমার আম্মায় শহরে ডাক্তারদের জন্য নাড়ু বানাইছে দিয়ে আইসো।”

করিম মিয়ার ডাকে শিউলি ধ্যান ফিরলো। ভাবনায় মত্ত হতে, হতে কখন কি হয় আজকাল বুঝতে পারে না। চোখ দুটো জ্বলছে ভীষণ। হয়তো না ঘুমানোর ফলে। নদীর ঘাটে গিয়ে চোখ মুখ ধুলো। শাড়ির আঁচলে মুখ মুছতে গিয়ে আঁচলের গিটে বাঁধা মাহাদের দেওয়া আংটিটার কথা মনে পড়লো। গিট খুলে জিনিসটি বাহির করলো। এক এক করে সব আঙ্গুলে লাগানোর চেষ্টা করলো কিন্তু একটাতেও হলো না। তাগড়া যুবকের ওর মতো সরু আঙ্গুল হবে না নিশ্চয়ই। আবারো আংটিটা আগের স্থানে রাখলো। বাড়ি গিয়ে সযত্নে কোথাও লুকিয়ে রাখবে বলে ভাবলো। তার পর পা বাড়ালো বাড়ির দিকে। পথে দেখা হলো সাহেলের সঙ্গে। শিউলির পানে কেমন করে যেন তাকালো। দৃষ্টি ছিলো অস্বস্তিকর।
যা শিউলির ভালো লাগলো না। এড়িয়ে চলে গেলো ও।

_______

খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকেছে। মেডিকেল টিম এর সকলে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেয়েরা আগে তৈরি হতে শুরু করেছে। মাহাদ তৈরি হয়ে ঘর থেকে বেরোলো। একটু আগে নাজির বলে গেলো শিউলি এসেছে এ বাড়িতে। ঘর পেরিয়ে খোলা বারান্দায় দাঁড়াতেই দেখতে পেলো শিউলি আর নিধি কিছু একটা বিষয়ে নিয়ে কথা বলছে। শিউলি মাঝে মধ্যে লাজুক হাসছে। লাজুকলতা চেহারায় ওকে লাবন্যময়ী লাগছে। অধিক ফর্সা না হলেও উজ্জ্বল শ্যামলা চেহারায় মেয়েটাকে কি দারুণ লাগে। সবচেয়ে আর্কষণীয় শিউলির দুটো চোখ ও দীঘল কালো কেশ। খোঁপা করে রাখা কেশ পদ্ম ফুলের মতো লাগছে। নিধি হঠাৎ খেয়াল করলো মাহাদ তাদের দিকে চেয়ে আছে। ও শিউলি কে চোখের ইশারা করলো। শিউলি প্রথমে ইশারা বুঝতে না পারলেও এমনিতেই বারান্দার দিকে তাকালো। মাহাদ দাঁড়িয়ে তাকেই দেখছে। লজ্জা লাগছে ভীষণ। কালকে থেকে লজ্জা আর হাসি দুটোই ওর সঙ্গী হয়েছে। মাহাদ আশে পাশে নজর বুলিয়ে এগিয়ে এলো তাদের কাছে। নিধি বুঝতে পারলো না চলে যাবে কিনা? কিন্তু এটা বাড়ি এখানে একলা কথা বলতে দেখলে অনেকে সন্দেহ করবে তাই গেলো না। শিউলি একবার মাহাদের দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার নিধির পানে। মাহাদ ওর কান্ডে মিটিমিটি হাসলো। বলল,

“ আজ থেকে একমাসের মধ্যে ফিরবো এই গ্রামে। তুমি অপেক্ষায় রবে তো? মনে পড়বে আমায়? তোমাকে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে একমাস মতো।”

শিউলির লজ্জা বাড়লো। নিধি আপা আছে তবুও এসব কইতাছে ভেবে লজ্জায় মরতে ইচ্ছে করছে।
একটুখানি পর প্রতিত্তোরে বলল,

“ অপেক্ষা করবো, মনেও পড়বে সাথে আপনার অপেক্ষায় কাঁটবে সারাটি মাস।”

“ অপেক্ষা শেষ করে শিগগিরই ফিরবো শিউলি।
বাহির হবো এখনই। শেষ কথাটা বলে নিলাম। ”

মাহাদ আর দাঁড়ালো না চলে গেলো ঘরের দিকে। শিউলি তাকিয়ে রইলো যতক্ষণ দেখা যায় তার অস্তিত্ব। নিধি মনে মনে খুশি হলো। ভাবলো, ‘ সবার ভাগ্যে ভালোবাসা জুটে না।’

“ নিধি শুনুন।”

কারো ডাকে নিধি ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলো। তাকালো কন্ঠস্বর টা যেদিক থেকে এসেছে।
সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার শেষ প্রান্তে। নিধি ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে গেলো। শিউলি না গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। দৃষ্টি রাখলো আকাশের উপরে কা কা করতে থাকা কাকটার দিকে। অসময়ে এই আওয়াজ ওর বিরক্ত লাগলো। তাড়ানোর জন্য হুস,হুস ও করলো।

নিধি সাঈদের সামনে যেতেই সাঈদ শুধু একবারই তাকালো তার পর একটা সাদা খাম বাড়িয়ে দিলো।

“ এটা আপনার জন্য। আমরা যাওয়ার পর খুলবেন।”

এতটুকু বলেই চলে গেলো। এক পলকের পর আর তাকালো না পর্যন্ত। শুধু নিধি শূন্য চোখে তাকিয়ে রইলো। যে চোখে আকাশ সম শূন্যতা বিরাজিত।

এর মধ্যে মাহাদ সহ মেডিকেল টিম এর সকলে নিজ,নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে মাতবর বাড়ির আঙ্গিনায় এসে দাঁড়ালো। সকলের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। থামলো গিয়ে নদীর ঘাটে।
ওখানে শিউলির মা সহ আরো কিছুজনের সঙ্গে দেখা হলো। জিহান কে মাহাদ গোপনে কিছু কথা বলে নৌকায় পা বাড়ালো। উঠতেই পিছনে শেষ বারের মতো তাকালো। শিউলি এখনো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লজ্জা পাচ্ছে না আজ। এখনই কেমন না দেখার তৃষ্ণা ভর করছে তাকে। সকলে বসে পড়লো ছইয়ের ভেতরে। কেবল মাহাদই ছইয়ের বাইরে রইলো। দেখতে থাকলো প্রিয়তমা, সোনার কন্যা কে। এদিকে সাঈদ এদিক সেদিক তাকিয়েও নিধিকে দেখতে পেলো না। নৌকা ছাড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা রাখলো। কিন্তু তার দৃষ্টি নিরাশা হলো। সকলের মাঝে একটি মুখই দেখতে পেলো না। যা সে শেষ বারের মতো একবার দেখার আশা রেখেছিলো। তার পর নিজেই নিজেকে তাচ্ছিল্য করে বলল,

“ যেখান থেকে পালাতে চাই,সেখানেই কেন আবার যেতে চাচ্ছি? খনিকের মোহ কেটে যাবে সময় পেরোলেই।”

মুখে বললেও মন কি আর মানছে। নীরাও সকলের মধ্যে মাহাদের দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ মাহাদ একেবারে জন্যেও তাকায়নি ওর পানে। লক্ষ্য করেছে প্রায় সময় শিউলির দিকে দৃষ্টি। এজন্য মনে মনে ফুঁসে উঠলো। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গালিও দিলো কয়টা। মাতবর বাড়ি গেলে শায়েস্তা করবে বলেও ভেবে রাখলো।

নৌকা ছেড়ে দিয়েছে শিউলি তাকিয়েই আছে। বুকের ভেতর কেমন হা হা কার করছে। মনে হচ্ছে অতি প্রিয় কেউ বহুদূরে চলে যাচ্ছে। অবশ্য মাহাদ তো প্রিয়ই। যে বুকের ভেতর কম্পন উঠতো এখন হু হু করছে। চোখ জ্বলছে অকারণে। না দেখতে পাওয়ার তৃষ্ণা বোধ-হয় কি তা টের পাচ্ছে এখনই মন।
মাহাদ তাকিয়ে রইলো যতক্ষণ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখতে পেলো। এক সময় মিলিয়ে গেলো নদীর পাড় এবং শিউলি। তখনই হৃদয়ে ফাঁকা অনুভব করলো সে। সাঈদের নিরস মুখ। কোনো কথা নেই চুপচাপ। মনে হচ্ছে মূল্যবান কিছু জিনিস রেখে যাচ্ছে এই গ্রামে। আসলেই ভালোবাসার চেয়ে মূল্যবান আর কি হতে পারে? কিন্তু সে তো বাঁধা আছে অন্য ঘাটে। হৃদয়ের খবর কয়জন রাখে?
দু’জন বিষাদ নিয়ে ফিরে গেলো শহরের পথে। একজন আশার আলো রেখে আরেকজন নিরাশায় রেখে। সময় কোনদিকে নিয়ে যায় সেই অপেক্ষায় থাকবে হবে সকলকে।

_____________

গভীর রাত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দূরে কোথাও শেয়ালের হাঁক শোনা যাচ্ছে। বর্ষায় শীতের তোপে গায়ে লেপ জড়িয়ে মানুষ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কেবল কিছু নিশাচর পাখি জেগে আছে আকাশে উড়ছে অবিরত। নিঃশব্দের মাঝেও তাদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পাচ্ছে নিধি। নিশাচর পাখিদের সঙ্গ দিতে জেগে আছে সে। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধতায় মোড়া। নিধির চোখে ঘুম নেই। বারান্দা পেরিয়ে গেইটের পূর্বে একটা চেয়ার পাতা থাকে ও সেখানেই বসে আছে। হাতে একখানা পত্র। যেটা ও কয়েকবার পড়েছে। শেষ বারের মতো আরেকবার পড়তে শুরু করলো,

‘সঙ্কোচে প্রিয় সম্মোধন করতে পারিনি। প্রিয় ডাকতে বোধহয় প্রিয় হওয়াও প্রয়োজন। জানেন আপনি মানুষটা নারকেলের মতোন। বাহিরে কঠিন ভেতরে নরম। নিজেকে কঠিন আবরণে ঢেকে রাখেন কেন? আপনাকে দেখলে আমার ভয় লাগতো। ভাবছেন আপনাকে কিসের ভয়? কঠিন আবরণে ভেতরে নরম আপনাকে দেখার পর হৃদয় যখন আপনার দিকে টানতে চাইছিলো সেটারই ভয়। আমি চাইনি ভয়টা সত্যি হোক। আপনার দৃষ্টি আমাকে থমকে দিতো, এজন্য সুন্দর দুটো নিষিদ্ধ চোখের দিকে তাকানোর সাহস আর করলাম না। ও চোখে আমার জন্য ভয়ংকর সর্বনাশ অপেক্ষা করে। তার পরেও মন মানে না চেয়ে ফেলি আড়ালে আবডালে। আপনার মনেও হয়তো আমার জন্য সুপ্ত অনুভূতি আছে আমি তা টের পেয়েছি। অনুভূতি গুলো চলে গেলে ফিঁকে হয়ে যাবে। আচ্ছা আপনি আমাকে মনে রাখবেন? মনে রাখার মতো বিশেষ কেউ বোধ-হয় আমি নই। আজকের পর হয়তো আরো কেউই থাকবো না।
মনে না রাখাই ভালো সম্ভবত। যদি আমি প্রতিজ্ঞা বদ্ধ না থাকতাম তবে আপনার দু’চোখে চেয়ে নিজের সর্বনাশই ডেকে আনতাম। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে নিজে সুখী হয়ে আরেকজন কে দুঃখী করা এটা হয়তো সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করবেন না। তাই সবটা ভুলে চলে গেলাম।
শুনুন,আপনি জীবনে ভীষণ সুখী হন। আপনার অঁধরের মিষ্টি হাসি বহাল থাকুক সব সময়। আপনার সঙ্গী আপনার মনমতো হোক এই দোয়া ও প্রার্থনা রইলো। ভালো থাকবেন।’

ইতি,
সাঈদ।

চিঠিটা পড়ে নিধির চোখের কোনে জল চিকচিক করে উঠলো। যা কেউ দেখলো না,শুনলো না ওর মনের আর্তনাদ। যে মন শুধু ওই নিষিদ্ধ মানুষটাকেই ডাকছে। না বলেও প্রেম হয় তার প্রমাণ নিধি পাচ্ছে। চিঠিটা রেখে দিলো হাতের মুঠোয়। তার পর তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে আওড়ালো,

“ আপনি আমার জীবনে বসন্তের ঝরা পাতা সাঈদ,
নতুন পাতার আগমন ঘটলেও আপনি আমার না চাইতেও মনে রাখাতে রয়ে যাবেন।”

_______

শিউলি জবেদা বিবি কে সকালের খাবার খাইয়ে দিচ্ছে। খাওয়ার মাঝে তিনি নাতনী কে প্রশ্ন করলেন,

“তোর বিয়া হইয়া গেলে আমারে কে খাওয়াই দিবো? তোরে কাছে কূলে বিয়া দিমু দাদি।”

শিউলির হাত থেমে গেলো। প্রথমেই মাহাদের কথাই মনে পড়লো। তাকে সঙ্গী করতে হলে পাড়ি দিতে হবে বহুদূর শহরে। সবাই কে ছাড়া থাকবে কি করে? আর মনের ভেতরে মানুষটাকেও ছাড়বে কি করে? দুই ভাবতে বসে শিউলির মধ্যে দ্বিধা চললো।

“ কি লো শিউলি খাওন কি আর দিবি না?”

জবেদা বিবির কথায় শিউলি ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলো। চমকে উঠে বলল,

“ হু দিতাছি।”

শিউলি খাওয়ানো শেষ করে উঠে পড়লো। আজ সকালে ওর মা নানী বাড়ি গেছে। দুই গ্রাম পরেই নানীর বাড়ি। করিম মিয়া নদীর দিকে আছে হয়তো। এখন মাছ ধরার মৌসুম। চাষাবাদ নাই এই মাছ ধরাই একমাত্র জীবিকা নির্বাহের আশ্রয়। সরকারের অনুদান মাঝে একবার এসেছিলো। আরেকবার আসতে পারে।

শিউলি ওর আব্বার অপেক্ষায় ছিলো। করিম মিয়া তখন জাল নিয়ে ফিরলো। হাত মুখ ধুয়ে বসে পড়লো। একসাথে বাবা মেয়ে গল্প করতে করতে খেতে শুরু করলো। খাওয়া শেষ হওয়ার আগ মূহুর্তে শিউলি হাসিমুখে শুধালো,

“ আব্বা আমার যদি দূর কোথাও থেকে সম্মন্ধ আসে, ছেলে ভালো হয় তখন কি করবা?”

হঠাৎ লজ্জাবতী কন্যার মুখে এমন প্রশ্ন শুনে একটু অবাকই হলো তবে নিছকই জানতে চাওয়া ভেবে হাইসা উত্তর দিলো,

“ আমার মেয়েরে আমি দূরে যাইবার দিমু না। তাছাড়া এইখানে দূরের মানুষ আসবো কই থাইকা?
আইলে তখন ভাবা যাইতো। না চাইতেও তো কত কিছু হয়। আমি আমার শিউলি রে কাছে কূলে রাখবার চাই।”

কাসার থালায় হাত ধুয়ে উঠতে উঠতে কথাটা শেষ করলো করিম মিয়া। শিউলি নিশ্চুপ পিঁড়িতে বসে রইলো। শহুরে মানুষ রে তার মন দেওয়া ঠিক হয় নাই এটাও ভাবলো তবে মন তা মানলো না। ভাবনার দেওয়াল ভেঙে দিয়ে নিজ অনুভূতির সত্তা বলে উঠলো,

“ জীবনে সঠিক মানুষের কাছে দূরত্ব হার মানতে বাঁধ্য শিউলি, এই স্বার্থের দুনিয়ায় সত্যি’কারের ভালোবাসা পাওয়া, মরুর বুকে একফোঁটা বৃষ্টির মতোই বিরল।”

চলবে……………..?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here