বুকের_পাঁজর #লেখনিতে:#ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা) #পর্ব:১৩

0
2

#বুকের_পাঁজর
#লেখনিতে:#ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা)
#পর্ব:১৩

হামিম হাবিবার বিয়ের আর মাত্র পনেরো দিন আছে।বিয়ের দশ দিন আগেই তারা গ্রামের বাড়ি যাবে।এখানের সবকিছু গুছিয়েই তবে যেতে হবে।হিম আপাতত বাড়ি কি,দেশেই নেই।ঘুরতে গেছে বলেই জানে সবাই।হামিম চট্টগ্রাম গেছে ওদের ব্যবসার কাজে। আলামীন শিকদার গেছেন রাজশাহী।ঢাকায় আপাতত আকরাম শিকদার আর আসলাম শিকদার ই আছে।

সময়টা বিকালের। বাড়িতে হাবিবা,হালিমা,রাবেয়া বেগম,হিরা আর শিউলি ছাড়া কেউ নেই।নূর গেছে ব্যাচে পড়তে আর হাওয়া গেছে পড়াতে।হিরা কিছুক্ষণ আগেই কলেজ থেকে এসেছে। হঠাৎ মাথা ব্যাথা করায় রাবেয়া বেগম আর হাসপাতালে যাননি।রোকেয়া বেগম আর আসমা বেগম গেছেন হাসপাতালে,সবকিছু গুছিয়ে সবার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তবেই তো যেতে হবে।এর মধ্যে অনেক কেনা কাটাও আছে। আকরাম শিকদার হাসপাতালের সকল যন্ত্রপাতি, ওষুধ,খরচ সবকিছু ভালোভাবে চেক করছেন।ওদিকে আসলাম শিকদার আর হাসিব মিলে আপাতত অফিস সামলাচ্ছে।

আপাতত মেয়েরা সব আসলাম শিকদারের ঘরে।এতক্ষণ রাবেয়া বেগম ওদের সাথে থাকলেও কেবল গেছেন কিছু হালকা খাবার বানাতে। শিউলি কে নিয়েই গেছেন।কার জন্য কি কি কিনতে হবে তার হিসাব করছে ওরা।আপাতত একটা প্লানিং করা থাকুক, দোকানে গেলেই সব বোঝা যাবে যে কে কি কিনবে।

“হাবিবাপু? ও হাবিবাপু?”

“কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান না করে কি বলবি তাই বল।আলগা পিরিত দেখাতে এসো না,কি লাগবে তাড়াতাড়ি বলে দেও”

এতক্ষণ আঙুল দিয়ে হাবিবাকে খোঁচাচ্ছিল আর ডাকছিল হিরা।ওর এই এক স্বভাব,কাউকে কোনো কাজে বা কিছু চাইতে গেলেই আঙুল দিয়ে খোঁচাবে, মানুষ টা রাজি না হওয়া পর্যন্ত ওর খোঁচানো আর ডাক কোনোটাই থামবে না।হালিমাও হিরার দিকে তাকিয়ে রয়েছে,কি চাইবে কি মেয়েটা!!

“বলছিলাম কি,হামিম ভাইয়া তো বাড়িতে নেই, সুমাইয়া আপুকে একটু ডাকবে প্লিজ। আঙ্কেল আন্টি কে কোনো রকমে ম্যানেজ করে দেখো না,যদি আজকের রাত টা আমাদের সাথে থাকতে পারে।”

“খারাপ বলিসনি।আমি দেখছি ওর আব্বু আম্মুর সাথে কথা বলে। কিন্তু তার আগে একটা কথা বলে দি,আগে পড়ালেখা সব কমপ্লিট করতে হবে।সামনে অনেকদিনের ছুটিতে যেতে হবে,তখন খুব একটা পড়ালেখা করতে পারবি না।তাই এখন সময় আছে তাই একটু বেশি বেশি পড়।ওঠ,তোর ম্যাম চলে এসেছে।যা তাকে নিজের ঘরে নিয়ে যা।”

হাবিবার কিছু বলার আগেই পাকোড়া নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জবাব দিলেন রাবেয়া বেগম। রাবেয়া বেগমের কথায় মাথা নাড়িয়ে একটা পাকোড়া নিয়ে চলে গেল হিরা।

ওর জন্য বাড়িতে যে রুম তাতে ও খুব একটা তাকে,তবে না থাকাও হয় না।এখানেই ওর বেশিরভাগ জিনিসপত্র,বই খাতা পড়ার টেবিল সবকিছু।হাওয়ার রুমে ওর দু একটা জামায় রয়েছে।ওর রুমেই ওকে পড়িয়ে দিয়ে যায় ওর প্রাইভেট টিচার। মেয়েটা ওকে ইংরেজি পড়িয়ে দিয়ে যায়,নাম মিষ্টি।দেখতেও মিষ্টি কিন্তু গরীবের মেয়ে।নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হয়,তাই যত্নের অভাবে রূপ লাবণ্য কিছুটা কমলেও যথেষ্ট সুন্দরী দেখায় তাকে।নম্র,ভদ্র,নামের মতোই তার ব্যবহার।

মিষ্টি কে নিয়ে উপরের যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রাবেয়া বেগম ওকে পাকোড়া দিয়ে আসলেন।মেয়েটা যদিও বারণ করেছে অনেকবার তবে কার কথা কে শোনে!! ততক্ষণে হাওয়া,নূর এসে পড়েছে।
___________________________________________________________________________

সন্ধ্যার পরপরই দুই গিন্নি বাড়ি ফিরলেন।রাতে তারা খুব দরকার ছাড়া বাইরে থাকেন না।তাদের আসার সময় সুমাইয়া কে নিয়ে এসেছেন।রাবেয়া বেগম তাদের ফোন করে বললে তাদেরও খারাপ মনে হয়নি। তৎক্ষণাৎ সুমাইয়ার বাবা মার সাথে কথা বলে নিলেন।

সবাই নামাজ পড়ে সুমাইয়া কে নিয়ে গল্পে মজলেও সবচেয়ে ছোটো কন্যা ঘরের দরজা আটকে বসে আছেন।রাত নয়টার আগে সে দরজা খুলবে না।এমনিতে তো সবাই একসাথেই পড়ালেখা করে তবে আপাতত কারো পড়া হবে না কিন্তু তার তো পড়তে হবে।তাই সুমাইয়ার সাথে টুকটাক কথা বলেই উপরে চলে গেছেন তিনি।

সবাই আড্ডা দেওয়ার সাথে সাথে সুমাইয়ার বডির মাপটাও নিয়ে ফেলল।বাড়ির তিন কর্তী রান্না ঘরে রয়েছেন,রাবেয়া বেগম রান্নার সব জিনিস গুছিয়ে রেখেছিলেন আর এখন তিন জা মিলে তাই রান্না করবেন।রান্নাঘরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই সুমাইয়া উপস্থিত হলো সেখানে।

“আন্টি আমি হেল্প করব,প্লিজ!!”

সুমাইয়ার কথায় তিন গিন্নি তিনজনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। মেয়েটা মূলত তাদের সাথে সহজ হতেই এসেছে।

“আপাতত আমরা বেঁচে আছি। যতদিন নিজেরা কাজ করে খেতে পারছি ততদিন তোমার এদিকে ফেরা লাগবে না। যেদিন আমরা পারব না,সাথে তোমার কয়েকজন জা’ও আসবে তখন খেয়াল করো এদিকে।তবে আমাদের সাথে বসে গল্প করতে পারো,যদি চাও তো।”

রোকেয়া বেগমের কথায় হেসে মাথা নাড়ালো সুমাইয়া।রোকেয়া বেগম সেমাই আর আসমা বেগম পায়েশ রান্না করছেন।এ বাড়ির প্রায় সবার নাকি মিষ্টি খুব পছন্দ।ওরও মিষ্টি ভালো লাগে।রাতে খাওয়ার জন্য কি রান্না করা হবে তা ও বুঝছে না যদিও। রাবেয়া বেগম ভাত তুলে দিয়ে রুটি বেলছেন।

“এমনিতে তো তোমাদের আদরের রাজকন্যা পড়তে বসেন না,সবাই বসলেই তবে বসেন।বাড়িতে একজন মানুষ এসেছে তার বিয়াদব দরজা আটকে রয়েছে।এর কোনো আক্কেল জ্ঞান আছে।মাঝে মাঝে মনে হয় মেরে পিঠের ছাল তুলে দি।”

“আমার সাথে তোমার কি শত্রুতা মা?সবসময় বকো খালি।আমি সিওর তুমি আমার আপন মা না,হতেই পারো না।আজকে আব্বু বাড়িতে আসলে জিজ্ঞেস করব আমার মা কোথায়”

হয়ত ও মজা করে বলেছে কিন্তু ঘোর অন্ধকার নেমে এলো তিন বউয়ের চোখে।চোখ জ্বলে উঠল আসমা বেগমের।কান্নাগুলো গলা ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু সামলে নিলেন।পায়েস রান্নায় খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।বাকি দুই বউ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

জবাব না পেয়ে হিরা পুনরায় বলে উঠল,
“দেখলে তো সুমুভাবি,আমি মিথ্যা কথা বলিনি।একটা কথা আছে না,নিরবতায় সম্মতির লক্ষণ।দেখো নিরব হয় গেছে।ইস,আমার আসল মা’টা যে কোথায়,কেনো যে আমারে এই ঘষেটি বেগমের কাছে রেখে গেছে কে জানে!!”

“দেখেছো বড় ভাবি, শুধু শুধু আমি বকি ওরে।কষ্ট করে কোলে পিঠে করে এত বড় করলাম আর সে আজকে আমাকে সৎ মা বলছে,ঘষেটি বেগম বলছে।তোমাদের আহ্লাদে মাথায় উঠে নাচছে ও।”

“জন্ম দেওয়ার কষ্ট টাই বা বাদ দিলে কেনো?ওটাই তো তোমার মেইন কষ্ট ছিল,কত কষ্ট করে নয় মাস পেটে রেখে জন্ম দিলে আমাকে!!”

“যেদিন মা হবি সেদিন বুঝবি আসল কষ্ট কোনটা?জন্ম দেওয়া নাকি বড় করা!!”

“বাবা,আমার মা ইমোশনাল হতেও জানে। শুধু শুধু ইমোশনাল হচ্ছো মা,জন্ম দেওয়া থেকে বড় করা তো তুমিই করেছো,তাই যেটাই বড় কষ্ট হোক না কেনো, দুইটাই করেছো তুমি।যায় হোক,আমার সেমাই আর পায়েশ কতদূর গো?”

আসমা বেগমের কথা গুলো একটু অন্যরকম লাগলো হিরার কাছে,তাই কথা বাড়ালো না।

এতক্ষণ সবাই নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।মা মেয়ের মধ্যে ঢোকার দরকার কি?আপন হোক বা পর,মা মেয়ে তো!!

সেমাই পায়েশ হয়ে যেতেই সেগুলো সুমাইয়া টেবিলের উপর রাখলো।আর হিরা গেলো সবাইকে ডাকতে। ড্রয়িং রুমে বসে আড্ডা দেবে এখন।দরজা বন্ধ করলেও ঘরে ওর মন টিকছিল না,তাই চলে এসেছে।অন্য একসময় পড়ে নেওয়া যাবে।
___________________________________________________________________________

মেয়েরা সবাই ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে।গিন্নি রা সবাই ছোটো ছেলের ঘরে।বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই।রাত সাড়ে এগারো টা বা বারোটার দিকে ফিরবে সবাই।

“আচ্ছা ভাবি,সত্যি করে বলো তো হামিম ভাইয়া কে তোমার কেমন লাগে?”

“কাকে কি জিজ্ঞেস করছিস হিরা!!ও বাইরে যেমন ভেতরেও তেমন ভাবিস না কিন্তু।সেই কবেই তোদের সুমু ভাবি তোদের ভাইয়ের প্রেমে পিছলে পড়েছে।অবশ্য কার ভাই দেখতে হবে না!!”

হাওয়ার কথায় হাবিবা বাদে সবাই একটু অবাক হলো বোধ হয়। সুমাইয়া লজ্জা লুকানোর বৃথা চেষ্টা করল।

“ও হো হো,পানি তাহলে অনেক আগেই গড়িয়েছে শুধু দেখতে পারিনি।বাই দ্যা রাস্তা,ভাইয়ার প্রেমে কেমন ডুবেছিলে গো ভাবি,বিয়ে না হলেও কি ডুবে থাকতে।”

“যা হয়নি তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই।বিয়ে যখন হয়েই গেছে তখন মিসেস হাসান শিকদার হামিম কে মিস্টার হাসান শিকদার হামিম এর প্রেমেই ডুবে থাকতে হবে আমৃত্যু।”

হঠাৎ পুরুষ কন্ঠে বলা কথা শুনে সবাই চমকেই উঠল।কাশি না দিয়ে কেউ ঢোকে না।আর হামিম যে আজ আসবে তাও তো কেউ জানতো না।সত্যিই কি জানতো না!!

“বাহ বাহ”

সবার মিলিত কথায় চমকিত সুমাইয়া নিজেকে লজ্জার আবরণে ঢেকে ফেলল।কেমন একটা পরিস্থিতিতে পড়ল ও,লজ্জায় মুখ লুকাবে কোথায় ও?

“একটু পানি পাওয়া যাবে?”

সোফায় বসেই সুমাইয়ার দিকে তাকিয়ে হামিম বলে উঠল।সবাই মিটিমিটি করে হেসে উঠল।লজ্জায় হাঁসফাঁস করছে মেয়েটা।

“যাও ভাবি যাও।নিজের স্বামীকে একটু পানি খাওয়াও।বউ থাকতে কি আর কেউ মা বোনের হাতে পানি খাই নাকি!!”

হিরার কথায় একটু শব্দ করেই হেসে উঠল নূর।বাকিরা ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টায় আছে।লজ্জায় অস্বস্তিতে পানি আনতে উঠল সুমাইয়া।হামিম কে পানি দেওয়ার সময় ইচ্ছাকৃত ভাবেই ছেলেটা হাত ধরল ওর।

“হে হে,দেখে ফেলেছি।”

মুখ চেপে হাসছে সবাই।হামিম পানি খেয়েই উপরে চলে গেলো।আজকে বিকালেই সব কাজ শেষ হয়েছে ওর। ভেবেছিল সকালে আসবে তবে হালিমা ফোন করে বলল সুমাইয়া আসছে।তাই তৎক্ষণাৎ ই রওনা দিয়েছে ও।

সবাই যখন সুমাইয়া কে খোঁচাতে ব্যস্ত তখনই হাবিবার ফোন বেজে উঠল, ঠোঁটে ফুটে উঠল লজ্জা সাথে ভালোলাগার হাসি।

হালিমা,নূর আর হিরা তাকালো পরস্পরের দিকে।সমস্বরে বলে উঠল,

“আজকে কেউ নেই বলেএএএএ”

ততক্ষণে হাবিবা নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে উঠে পড়েছে, বোনেদের কথা শুনে একটু লজ্জা পেলো বোধহয়।

___________________________________________________________________________

সবাই খেতে বসেছে।হিরা গেছিল হামিম কে ডাকতে।হিরা নিচে আসার দুমিনিট পর হামিম নামলো।কালো ট্রাওজারের সাথে সাদা টিশার্ট। বলিষ্ঠ হাতের মাসেল কি সুন্দর ফুটে উঠেছে!!লোকটা যে জিম করে তা তার শরীর দেখেই বোঝা যায়।এমন সুদর্শন পুরুষ সত্যিই তার ভাগ্যে ছিল!!না জানি কত মেয়েরা নজর দেয় তার ব্যক্তিগত পুরুষের দিকে।

সুমাইয়ার এসব ভাবনার মাঝেই ঠিক ওর সামনাসামনি বসলো হামিম।চেয়ারের শব্দে হুস ফিরল সুমাইয়ার,সবার অলক্ষ্যে চোখ টিপ দিল হামিম।লজ্জায় নুয়ে গেল মেয়েটা।

“বুঝলি হিরা,আজকাল চোখটা যেদিক সেদিক চলে যায়। গোয়েন্দা হওয়া উচিত ছিলো রে”

“ঠিক বলেছিস রে,চোখটা আজকাল লাফাইও বেশি,চোখের কি যে হয়েছে,কারো দিকে তাকালেই এক চোখ খুলে যায় আবার আরেক চোখ বন্ধ হয়ে যায়।”

নূরের কথায় সহমত পোষণ করল হিরা।হামিম ওদের কথায় মুচকি হাসলেও সুমাইয়ার কাশি উঠে গেল।আসমা বেগম বকে উঠলেন,

“খাওয়ার সময় এত কথা কিসের রে?ভদ্রতা বলে আজো কিছু শিখলি না”

মায়ের কথায় মুখ বাঁকালো হিরা।যত দোষ হিরা ঘোষ,কথা বলা আগে কে শুরু করেছে শুনি,ওকেই শুধু বকা শুনতে হয়।

#চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here