#বুকের_পাঁজর
#লেখনিতে : #ভরসা_জান্নাত
#পর্ব :১৫
“হিরা মা,যা তো হিম কে কফিটা দিয়ে আয়।তারপর চা খা।”
সকাল ছয়টার কাছাকাছি। পাঁচ বোন নিচে নেমেছে চা খাওয়ার জন্য। পুরুষ রা সবাই স্ট্যাডি রুমে থাকায় ড্রয়িংরুমে টিভি ছেড়ে দিয়ে বসেছে ওরা। রোকেয়া বেগম ওদের সবাইকে চা দিয়ে হিরাকে কফি ধরিয়ে দিয়ে বললেন কথাটা।
“হিম ভাইয়া বাড়ি এসেছে?”
হাওয়ার প্রশ্নে মাথা দোলালেন রোকেয়া বেগম।রোকেয়া বেগমের হ্যাঁ বলায় ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল হাওয়ার।চোখ মুখ উৎফুল্লতায় ছেয়ে গেল।ওর চোখ মুখের উজ্জ্বল ভাবটা দেখলো বাকি বোনেরা।হাবিবার ঠোঁটের কোণে ফুটল তাচ্ছিল্যের হাসি,হাওয়া হিম কে যতই ভালোবাসুক না কেনো তা সবই বৃথা।হিমের যে নিজস্ব হিমানী আছে,#হিমের_হিমানী।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল হালিমা,হাবিবার হাসিও ও দেখেছে।হাবিবার হাসিই বলে দিচ্ছে যে হাওয়ার এত প্রেম, ভালোবাসা,চিন্তা সবই বৃথা,অপাত্রে দান করা।অপাত্র বললে ভুল হবে,সুপাত্র ঠিকই তবে হাবিবার জন্য সেই পাত্রে সামান্যতম জায়গা নেই।
“ওহ বড়মা,হাওয়াপু কে বলো না গো।সব সময় তার কাজে আমাকেই কেনো পাঠাও?হাবিবাপু কেও তো পাঠাতে পারো নাকি?”
বড্ড বিরক্ত হিরা,হিমের কাজে ওকেই কেনো ঠেলে সবাই?আগে তো হিমের প্রায় সব কাজ বড়মা ই করতো তবে কিছুদিন যাবত ওকে দিয়ে করাচ্ছে।হাওয়াপু কে কি কেউ চোখে দেখে না?
“এই বেয়াদব,বড়দের মুখে মুখে কথা বলিস!!তোকে যখন যে কাজে দেওয়া হবে কোনো কথা ছাড়াই তা করবি।দিন দিন বেয়াদব হচ্ছে, একটু আদব কায়দা,ভদ্রতা বলতে কিছু নেই এই মেয়ের মধ্যে।”
খুন্তি হাতে তেড়ে আসলেন আসমা বেগম।মাকে নিজের দিকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালো হিরা, মুখ ফুলিয়ে রোকেয়া বেগমের হাত থেকে কফি নিয়ে চলে গেল।
হাওয়ার বুক টা ধক করে উঠল,চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনের প্রতিচ্ছবি যেদিন হিম হিরার কপালে চুমু দিয়েছিল।ও তখন কেবল বাড়ি ফিরেছে, দাদুর শরীর টা সকাল থেকেই নাকি ভালো না,তাই তার শরীরের খোঁজ নিয়েই উপরে যাবে। কিন্তু… ,ভাবতেই চায় না ও।সেই দিনের ঐ স্মৃতিটুকু মুছে যাক ওর মাথা থেকে।
___________________________________________________________________________
“ঠক ঠক ঠক”
“দরজা খোলা আছে”
হিমের উত্তর শুনে ভেতরে প্রবেশ করল হিরা। কাঁধে তোয়ালে রয়েছে চুল গুলোও ভিজে মানে গোসল করেছে তাও এত সকালে!!!কালো ট্রাওজার আর সাদা টিশার্ট পড়া।চশমার আড়ালে থাকা চোখ গুলো হালকা লালচে।এই মানুষটার ঘর স্বাভাবিকের থেকে ঠান্ডা,সাথে আলোর অভাব। তাদের সকলের ঘর কৃত্রিম আলোয় আলোকিত থাকে শুধু এই মানুষটার ঘরে বাইরের আলো ছাড়া কৃত্রিম আলো খুবই কম দেখেছে ও, রাতেই দেখা যায়।
“আপনার কফি”
বিনাবাক্যে হিম নিলো কফি।হিরা বেরিয়ে যেতে লাগলো।
“দাঁড়া”
হিরা ঘুরে দাঁড়ালো।হিম কফির কাপ টা বিছানায় রেখে ওর দিকে তাকালো।বলল,
“আমি কি তোকে যেতে বলেছি?”
“না বলেননি তবে আমি এখানে দাড়িয়ে থেকেই বা কি করবো?”
বলতে না বলতেই হিম নিজের কাঁধে রাখা তোয়ালে ওর গায়ে ছুঁড়ে মারলো।হুট করে এমন করায় হিরা একটু ভয় ই পেলো।
“যা,এটা বেলকনিতে রেখে আয়”
বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও মাথা নাড়িয়ে তোয়ালে টা নিয়ে চলে হিরা।দু মিনিটের মধ্যে ফিরে এলো।
“বস ওখানে।আমার খাওয়া হলে কাপ নিয়ে তবেই যাবি।”
বিরক্তিতে গা জ্বলে উঠল হিরার।তাও হিমের কথা মতো চুপচাপ বসে পড়ল সোফায়।বসে বসে হিমের রুমের চারিদিকে তাকিয়ে দেখছে কিন্তু চশমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক জোড়া চোখ যে ওকে দেখে যাচ্ছে তাতে ওর কোনো হুস নেই।
ধীরে সুস্থে কফিটা শেষ করল হিম।
“এই নে কাপ”
হিরা উঠে এসে নিল কফির কাপ টা।কাপ নিয়েই বেরিয়ে যেতে লাগলো কিন্তু বের হওয়ার আগে শুনতে পেলো গম্ভীর এক কন্ঠস্বর,
“কোনো কিছুতে খুব দ্রুত বিরক্ত বা অসহ্য হতে নেই,তাহলে দিন শেষে দেখা যায় সেই বিরক্তিকর,অসহ্য কাজ বা মানুষ ই আমাদের কপালে জোটে।”
হিরা একটু থমকে গেছিল কিন্তু পরমুহূর্তেই তার পা জোড়া হিমের ঘরের বাইরে চলে গেল।
“তুই আমার জন্য শুধু একটা চাল ছিলি রে,তোর যে বয়সে তোকে চেয়েছি তা কোনো যুক্তিতে আসে না। বিশ্বাস কর,আমি চাইনি তোর প্রতি দুর্বল হতে,চাইনি দেশে আসতে তবে ব্রেন ওয়াশ বলে একটা কথা আছে যা তোর বড় ভাই আমার সাথে করেছে।তার জন্য তুই পস্তাবি।”
হামিমের কাছে হিমের হাসি দুর্লভ, দুষ্প্রাপ্য জিনিসের মতো,তবুও দেখলেই হৃদয় জুরিয়ে যায়।তবে হিমের এই মূহুর্তের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা যদি হামিম দেখতো, নিঃসন্দেহে বলে উঠতো,
“তার ভাইয়ের হাসি মনোরম নয়, বরং ভয়ঙ্কর।খুবই ভয়ঙ্কর!!”
___________________________________________________________________________
“বিয়ের দিন এগিয়ে আসছে।এখনো তেমন কিছু কেনা হয়নি।তাই আজকে সবাই বাইরে যাবে কেনা কাটা করতে।আমরা সবাই যেহেতু হাসপাতালে আর অফিসে থাকবো তাই তোমাদের সাথে থাকতে পারব না।”
কথাগুলো বলে থামলেন আকরাম শিকদার। তাকালেন ছোটো ছেলের দিকে যে কিনা খাবার খেতে ব্যস্ত।গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“হিম,আজকে কি তুমি ওদের সাথে থাকতে পারবে?জানি তোমার কাজ আছে কিন্তু একটা দিন কাজ না করলে তেমন কিছু হবে না।তোমার চয়েস অনেক ভালো,তাই তোমাকেই বলছি।”
নিজের খাবার টুকু শেষ করে উঠে দাঁড়ালো,হাত মুছতে মুছতে বলল,
“সন্ধ্যায় বাড়ি আসবো আমি,সবাই যেন রেডি থাকে।ছয়টার মধ্যেই বেরিয়ে যাব।”
বলেই চলে গেল হিম।হিমের যাওয়ার পর বাকি পুরুষেরাও বেরিয়ে গেলেন, আকরাম শিকদার যাওয়ার আগে তিন গিন্নিকে বললেন,
“আমি গাড়িতে অপেক্ষা করছি।দ্রুত আসো তোমরা।”
ওনার কথায় তিন গিন্নি দ্রুত হাতের কাজ শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন, যাওয়ার আগে অবশ্য পাঁচ মেয়েকে জ্ঞান দিতে ছাড়লেন না।
এতসবের মধ্যে নিরব দর্শক পাঁচ মেয়ে।তারা সবাই রেডি নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য।বাকি খাবার টুকু আনন্দের সহিত গিলে ফেলল সবাই।
সবার মনেই খুশির জোয়ার তবে কারণ ভিন্ন।কেউ খুশি নিজের জীবনসঙ্গী কে পাওয়ার জন্য,কেউ খুশি একসাথে দুই ভাই বোনের বিয়ের জন্য,কেউ খুশি নিজের ভালোবাসার মানুষটার সাথে বাইরে যাবার জন্য বা কেউ খুশি নতুন কিছু কেনার জন্য।এত খুশির মধ্যে যে কারো কারো খুশি খুবই ক্ষণস্থায়ী তা হয়তো তারাও জানে না।সামনে কি আছে তাই কে ই বা জানে?জানলে হয়ত কেউ কখনো ভুল মানুষ কে ভালোবাসতো না,তার জন্য নিজেকে উজাড় করতো না।
___________________________________________________________________________
“আমি গায়ে হলুদ আর মেহেন্দীর জন্য শুধু শাড়ি কিনবো।বিয়ে, রিসেপশন সব কিছুর জন্য লেহেঙ্গা।”
সাড়ে ছটার কাছাকাছি বাজে।বাড়ির মহিলারা সবাই চলে এসেছে মার্কেটে।তাদের সাথে যদিও হিমের একা আসার কথা ছিল তবে হামিমও এসেছে। অনেকদিন পর বাইরে বেরোনো হয়েছে সবাই মিলে তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সবকিছু কিনে তারা বাইরেই ডিনার করবে।সঠিক সময়ে হাসিবসহ বাড়ির তিন কর্তা চলে আসবে,নীড়ও আসতে পারে।
হামিম সবার কাছে জিজ্ঞেস করছিল বিয়েতে কে কি কিনবে।কেউ কিছু বলার আগেই হিরা নিজের টা বলে নিল।লেডিস ফার্স্ট বলেও তো একটা কথা আছে,আর ছোটোরা এ ব্যাপারে একটু বেশিই ফার্স্ট হয়।
“কোনো শাড়ি কেনা হবে না। শিকদার বাড়ির অবিবাহিত মেয়েদের মধ্যে শুধু হাবিবায় শাড়ি পড়তে পারবে, তাছাড়া আর একটা মেয়েও শাড়ি পড়তে পারবে না।”
“ওর কথা বাদ দে তো হিম।আগে এদিকে আয়। সুমাইয়া আর হাবিবার জন্য বেনারসী শাড়ি দেখ তো, কোনটা বেশি ভালো। সুমাইয়া আর হাবিবার সব কিনে ইমরান আর হামিমের জন্য কিনতে হবে।”
“বিয়ের শাড়ি আর শেরওয়ানি অর্ডার করে দিয়েছি। তাছাড়া বাকি যা নিতে হবে সব শোরুম থেকেই।তোমরা দেখে পছন্দ করো, সমস্যা হলে আমাকে বলো।”
আসমা বেগমের কথার উত্তরে বলে উঠল হিম।ওদিকে হিরার চোখ মুখে অন্ধকার নেমেছে।কত কিছু ভেবেছে,বোনের সাথে শাড়ি পড়বে,মজা করবে,ছবি তুলবে। তাছাড়া একজন মানুষ তাকে শাড়িতে দেখতে চেয়েছে,সে অনুরোধ ও কি করে ফেলবে?এই লোক সবকিছু ভেস্তে দিচ্ছে।
ওর চোখ মুখের অন্ধকার ভাব টা দেখলো হাবিবা। শুধু ওর না,হাওয়া বাদে সবার চোখ মুখের ই একি অবস্থা।
“ভাইয়া ওরা একটু শাড়ি পড়ুক না।কত কিছু প্লান করা রয়েছে,ওরা শাড়ি পড়লে আমারও তো ভালো লাগবে।”
হাবিবার কথায় হামিমও সায় জানালো।
“শাড়ি পড়তে চাইছে পড়ুক না।কি হয়েছে কি তাতে?”
চোখ মুখের অন্ধকার ভাবটা কেটে গেছে।এখন যদি রাজি হয়!!!
“থাক না,ভাইয়া তো ভেবে চিন্তেই কিছু বলেছে।শাড়ি না পড়লে তো আর গা ক্ষয়ে যাবে না।”
হাওয়ার কথায় চটে গেল বাকি চার বোন। তুই না পড়বি না পড়,তোর আশিক বারণ করেছে তুই শোন তাই বলে বাকি দেরও শুনতে হবে নাকি।
এত সবে হিম বুঝি পাত্তা দিল!!
“আম্মু,তোমরা সবাই দেখে শুনে কেনো।আর মেঝ মা,তোমার ছোটো মেয়েকে সবকিছু যদি আমি কিনে দি তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?”
হিমের কথাতে তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ালেন আসমা বেগম।বলে উঠলেন,
“কি যে বলিস না তুই হিম।এতে তো আমার ই শান্তি।”
“তাহলে আর কি,আমি হিরা আর নূর কে সবকিছু কিনে দিচ্ছি।ভাইয়া তোর এই বোন কে আমি দেখছি,তুই আমার বাকি বোনগুলো রে দেখ।আর চাইলে তোরা শাড়ি কিনতেও পারিস,পড়তেও পারিস।আমি কিছু বলব না।”
কথা গুলো বলেই হিরাকে আসতে বলে নিজে সামনে এগোলো।মন খারাপ করে পিছু পিছু হিরা গেলেও নূর গেলো খুশি মনে। কিন্তু সেখানে থাকা সকলের চোখে খুশি থাকলেও ছলছল করে উঠল এক জোড়া চোখ।চোখ দুটো দেখলো হিম হিরা কে যেতে,হয়ত সেই চোখের মালিকের মন চিৎকার করে বলছে,
“হিরার বদলে আমাকে কেনো নিলেন না হিম ভাইয়া।ওমন অধিকার টুকু তো আমার উপরেও দেখাতে পারতেন,আমি সব মেনে নিতাম।আপনার একটুও অবাধ্য হতাম না।”
কিন্তু সেই চোখের মালিক ভুলে গেছে একটা বাস্তব কথা, মানুষ সবসময় তার বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষের উপর দুর্বল হয়।হিম কে লোহা ভেবে ঐ দু চোখের মালিক লোহা হতে চেয়েছে কিন্তু… ‘লোহা তো চুম্বক কে আকর্ষন করে!!’
#চলবে?

