#বোকামন
#পর্ব_০২
#Tahsin_Atoshi
আজ ভার্সিটির প্রথমদিন হুমায়রার। তাই সে খুবই খুশি। ভার্সিটি নিয়ে সবারই স্বপ্ন থাকে। হুমায়রারও আছে। সকাল সকাল উঠে ফজরের নামাজ পড়ে খাওয়া দাওয়া করে, সব কাগজপত্র গুছিয়ে রেডি হয়ে নিলো সে। পরনে সাদা রঙের একটা শার্ট ও আকাশি রঙের স্কার্ট। সাথে গলায় কালো ও আকাশি রঙের মিশ্রণের একটা স্কার্ফ।
অনিলের শর্তানুযায়ী তারা একসাথে ভার্সিটিতে যেতে পারবে না। তাই হুমায়রা একা যাওয়ার জন্য বের হতে গেলেই নীলা বেগম হুমায়রাকে ডেকে থামায়। নির্দেশ দেয় অমিত অনিলের সাথে যাওয়ার জন্য। অমিত, অনিল বিরক্ত হলেও মায়ের উপরে কথা বলার সাহস তারা করে না। তাই হুমায়রাকে নিয়েই তারা বের হলো। হুমায়রা অবাক হলেও কিছু বলে না। চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসে।
ভার্সিটির কাছাকাছি আসতেই অনিল গাড়ি থামিয়ে হুমায়রাকে নেমে যেতে বলল। হুমায়রা কৌতুহল নিয়ে তাকাতেই অনিল বলল,
-ওই যে রাস্তার ওপারে ভার্সিটি। চুপচাপ চলে যা। আর শর্ত তো মনে আছে নিশ্চয়ই।
হুমায়রা রাগ নিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু বলার মতো কিছু পায়না। অমিত,অনিলও পাওা না দিয়ে চলে যায়। এখন হুমায়রা পরেছে আরেক বিপদে। মেইন রাস্তা হওয়ায় গাড়ির যাওয়া আসা লেগেই থাকে। রাস্তা পার হওয়াটা হুমায়রার জন্য তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের থেকে কম না।
-রাস্তা পার হতে পারেন না?
হঠাৎ পুরুষ কন্ঠ শুনে হুমায়রা কিছুটা ভয় পেয়ে তাকায়। তাকাতেই দেখতে পায় পাশের মানুষটা তার ভাইয়েরই বন্ধু শুভ। শুভ হুমায়রার কথার উওরের অপেক্ষা না করে হাত ধরে রাস্তা পার করে দেয়। হুমায়রা ধন্যবাদ দিতে যাবে তার আগেই শুভ বলে,
-চলি। আপনার ভাইদের শর্তও তো মানতে হবে।
হুমায়রা কিছুক্ষণ শুভর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু কিছুই বললো না। ধীরে ধীরে সেও ভার্সিটি প্রাঙ্গনে প্রবেশ করলো। মনের মাঝে কেমন একটা ভয় ও শান্তি দুটোই কাজ করছে। কতদিন চলতে পারবে এভাবে তা সে নিজেও জানে না৷
ধীরে ধীরে অফিস রুমের দিকে গেল ভর্তি হওয়ার জন্য। ভর্তি হওয়া শেষে রাস্তার পাশ দিয়ে হাটতে হাঁটতে ভার্সিটি বিল্ডিংগুলো দেখতে রইলো।
——-
অমিত,অনিল, অর্নি,তুলি ও শুভ মিলে গল্প করায় ব্যস্ত। এরই মাঝে হঠাৎ একটা মেয়েকে দেখে অর্নি বলে ওঠে,
-হেই ফার্স্ট ইয়ারের মেয়ে মনে হয়। নতুন! চল একটু র্যাগ দেই।
অর্নির কথা শুনে অনিল মেয়েটার দিকে তাকালো। মেয়েটাকে দেখেই একটা হাসি দিয়ে বলল,
-হুম দেয়াই যায়।
অনিলের বলতে দেরি বাকিদের মেয়েটাকে ডাক দিতে দেরি হলো না। তুলি ইশারায় বলল,
-Come here.
হুমায়রা প্রথমে বুঝতে না পেরে আশেপাশে তাকালো ভালোমতো। কাউকে দেখতে না পেয়ে নিজেকেই ইশারা দিয়ে জিজ্ঞেস করল তাকে ডাকছে কিনা। অর্নিও সেন্টার ফ্রুট চাবাতে চাবাতে হাতের ইশারায় আসতে বলল। হুমায়রা এবার এসে ওদের সামনে দাড়ালো। অর্নি জিজ্ঞেস করল,
-ফার্স্ট ইয়ার?
-জ্বী।
-নাম কি?
-হুমায়রা।
-পুরো নাম?
-তা জেনে কি করবেন?
-Hey! Don’t you know that we are your seniors?
-হুম জানি। তো এখন কি করবো?
-তুমি তো দেখি খুব বেয়াদব!
হুমায়রা কিছু বলতে যাবে তার আগেই পেছন থেকে কেউ একজন ডেকে উঠলো,
-এখানে স্মৃতি কে?
স্মৃতি নামটা শুনতেই হুমায়রা কৌতুহল নিয়ে তাকালো। তা দেখে অর্নি তুরি বাজিয়ে বলল,
-হেই ইউ তোমার নাম কি স্মৃতি নাকি?
হুমায়রা মাথা নাড়িয়ে না বললো। অর্নি একটু ভাব দেখিয়ে বলল,
-যেভাবে তাকিয়েছ যেন তোমার নামই স্মৃতি।
-তা নিয়ে আপনাদের না ভাবলেও চলবে।
হুমায়রার এমন উওরে অর্নি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। বলল,
-এই মেয়ে নিজেকে কি মনে করো হ্যা? সিনিয়রদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় জানো না? বাবা-মা শিক্ষা দেয়নি?
– নাহ দেয়নি৷ আপনারা শিখিয়ে দেন।
শুভ পেছন থেকে অর্নিকে বলল শান্ত হতে। অর্নি তবুও যেন শান্ত হতে পারছে না। তার সাথে এভাবে কেউই কথা বলেনি। এই মেয়ের দেমাক যেন তার সহ্য হচ্ছে না। এরই মাঝে কিছু ভাঙার শব্দ হতেই সবাই সেদিকে তাকালো। দেখলো ক্যান্টিনের কাছে কিছু ছেলে মা*রা*মা*রি করছে। তা দেখে তুলি বলল,
– হেই তুহিন না? ও হঠাৎ মা*রা*মা*রি করছে কেন? ও না ছেড়ে দিয়েছে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভ বলল,
-আরে রোদের ছেলেরা কয়েকজনকে মে*রে*ছে। তাই তুহিন মা*র*ছে।
-ওহ্। ঠিক হয়েছে।
হুমায়রা কিছুক্ষণ ওদের কথা শুনে তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগোতে থাকে অর্নি হাত ধরে থামিয়ে দিলো। জিজ্ঞেস করল,
-কোথায় যাচ্ছো মেয়ে?
-ওই দিকে।
-আমরা জানি আমাদের বন্ধু হ্যান্ডসাম। সব মেয়েই ক্রাস খায়। কিন্তু এই সময় ওর কাছে না যাওয়াই ভালো। এখন মাথা গরম।
হুমায়রা নিজের হাতটা ছাড়িয়ে বলল,
-কিছু হবে না।
-শুধু শুধু অপমানিত হওয়া কি জরুরি?
-দেখি কি হয়।
অর্নি আর থামালো না। কারণ সে জানে এই মেয়েকে থামিয়েও লাভ নেই৷ এই কিছুক্ষণের পরিচয়ে ওর বোঝা হয়ে গেছে এই মেয়ে কি পরিমাণে ঘারত্যারা। তাই চুপচাপ যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। আর তুহিনের রিয়েকশনের অপেক্ষায় বসে রইলো।
হুমায়রাকে দেখে তুহিনের পেছন থেকে আহান ইশারায় আসতে বারণ করলো। কিন্তু হুমায়রা সেই কথা না শুনেই গিয়ে চুপচাপ টেবিলের সামনে গিয়ে বসল। তুহিন তখনও মাথা নিচু করে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে রাগ নিবারণে ব্যস্ত। তখনই হুমায়রা বলে উঠলো,
-তুহিন ভাইয়া কেমন আছো?
হঠাৎ এই কথা শুনে মাথাটা তুলেই সামনে থাকা বোতলটা ছুড়ে ফেলে বলল,
-এখানে আমি আবার কার ভাই হলাম হ্যাঁ?
তুহিনের এক চিৎকারে সবাই থমকে যায়। অর্নি ফ্রেন্ডদের উদ্দেশ্য করে বলল,
-বারণ করেছিলাম। শুনলো না। বুঝুক এখন।
হুমায়রাও ভয় পেয়ে পিছু হটে যায়৷ মন খারাপ করে বলে সরি। সরি বলায় এবার তুহিন ভালো মতো খেয়াল করে দেখে আসলে মেয়েটা কে? হুমায়রার চেহারা দেখে তুহিন থমকে যায়। হুমায়রা সেদিকে আর পাওা দেয়না। চুপচাপ স্থান ত্যাগ করতে গেলেই তুহিন হুমায়রার সামনে চলে এসে কানে ধরে বলে,
-সরি সরি সরি বোন। আমি ভেবেছিলাম অন্য কেউ। রাগ করিস না প্লিজ। সরি।
তুহিনকে কান ধরতে দেখে উপস্থিত সকলে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে।
হুমায়রা তবুও মুখ ভার করে নিচের দিকে তাকিয়ে রয়। তুহিন এবার হাঁটু গেড়ে বসে কান ধরে আবারো বলে,
– সরি।
-ইটস ওকে।
এইটুকুতেই যেন তুহিনের শান্তি। উঠে হুমায়রাকে এনে চেয়ারে বসায়। জিজ্ঞেস করে,
-তুই এখানে কি করছিস? আর আমাকে বলিসনি কেন?
– এই ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। গতকালই এসেছি ঢাকায়।
-সব ঠিকঠাক?
হুমায়রা কিছু না বলে মন খারাপ করে তাকিয়ে থাকে। তুহিন বুঝতে পেরে টপিক বদলানোর জন্য বলে,
– আচ্ছা চল তোকে ভার্সিটি ঘুড়িয়ে দেখাই।
-আচ্ছা।
কথামতো দুজন ভার্সিটি ঘুরতে রইলো। পিছু পিছু আহানও হাটছে। এবার সাথে শুভও এসে হাজির হয়েছে পাশে। তুহিন শুভকে দেখে হুমায়রার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলল,
-হুমু ও শুভ আর ও আহান। আমার ফ্রেন্ড।
এভাবে পরিচয় করাতে আহান’র গতদিনের কথা মনে পড়ে গেল। হুমায়রা আবার একই কথা বলবে ভেবে মনটা মলিন হয়ে রইলো। কিন্তু আহানকে অবাক করে দিয়ে হুমায়রা হাই বলে হাত এগিয়ে দিলো।
আহান এক ভ্রুঁ উঁচু করে হুমায়রার দিকে তাকাতেই হুমায়রা হেসে দিলো। আহানও চুপচাপ হাত মেলালো। হুমায়রা সামনে থাকা শিউলি ফুল গাছ দেখে সেখানে চলে যায়। কয়েকটা শিউলি ফুল তুলে দিতে গেলেই তুহিন গাছের ডালটা ধরে একটা ঝাকির দেয়;সাথে সাথেই শিউলি ফুলগুলো ঝড়ে পড়ে হুমায়রার উপর। হুমায়রাও খুশি মনে আরোকিছু শিউলি ফুল নিয়ে নিলো। সেগুলো হাতে নিয়েই সামনে আবার হাটতে লাগলো। এরপর তিনজন মিলে মিউজিক রুমে গেল।
হুমায়রা তা ভালোমতো পরখ করলেও কিছু বলল না। একটা চেয়ারে বসে ফুলগুলো দিয়ে মালা গাথতে শুরু করলো। তুহিনও একটা গিটার হাতে টুংটাং শব্দে বাজাতে লাগলো। আর হুমায়রাকে বললো গান গাইতে। এর মাঝে অমিত,অনিলসহ বাকি বন্ধুরাও হাজির হলো সেখানে। হুমায়রা সেদিকে খেয়াল না করে কথা মতো গান গাইতে শুরু করলো,
“বকুল ফুল বকুল ফুল
সোনা দিয়া হাত কানও বান্ধাইলি।
বকুল ফুল বকুল ফুল
সোনা দিয়া হাত কানও বান্ধাইলি।
শালুক ফুলের লাজ নাই
রাইতে শালুক ফোটে লো
রাইতে শালুক ফোটে
শালুক ফুলের লাজ নাই
রাইতে শালুক ফোটে লো
রাইতে শালুক ফোটে
যার সনে যার ভালোবাসা,
যার সনে যার ভালোবাসা,
সেইতো মজা লুটে লো
বকুল ফুল বকুল ফুল
সোনা দিয়া হাত কানও বান্ধাইলি।
বকুল ফুল বকুল ফুল
সোনা দিয়া হাত কানও বান্ধাইলি।”
এইটুকু গেয়েই থেমে যায় হুমায়রা। বলে দেয় গানটার বাকিটুকু সে পারে না। এর মাঝে শুভ পাশ থেকে এসে বলে,
-বাহ! ভালো গান গাইতে পারেন তো আপনি।
হুমায়রাও একটা মুচকি হাসি উপহার দেয়। এরপর শিউলি ফুল দিয়ে গাঁথা মালার মতো হাতে পরে নেয়। দরজার দিকে চোখ পড়তেই পরিচিত কোনো চোখ দেখে উঠে সেখানে যায়। কিন্তু তার পৌছানোর আগেই সেই চোখ জোড়া স্থান ত্যাগ করে। হঠাৎ কোনো সুঠাম দেহের সাথে ধাক্কা খেতেই দূরে সরে নিজেকে সামলে নেয়। রাগ নিয়ে একটু কড়া কথা শোনাবে সেই মুহূর্তে পরিচিত আরেক মুখ তার চোখে পড়ে। অবাক হয়ে বলে,
– রোদ! আপনি এখানে কি করছেন?
রোদও কিছুটা অবাক হয়। হুমায়রার নাকে নিজের আঙুল ছুয়িয়ে বলে,
-হেই কিউটি..তুমি এখানে কি করছো? আমার পিছু করতে করতে এখানে চলে এলে নাকি? অবশ্য তোমার মতো কত মেয়ে এলো তার ঠিক নেই।
হুমায়রা দাঁতেদাত লাগিয়ে রাগ সংবরণ করে। জোরপূর্বক মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
-যদি জানতাম আপনার মতো অসভ্য এই ভার্সিটিতে পড়ে তাহলে জীবনেও আসতাম না। ডিজগাস্টিং!
বলেই তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
– তুহিন ভাইয়া আমি গেলাম। আগামীকাল দেখা হচ্ছে।
বলে বিড়বিড় করতে করতে বলে,
“দুনিয়ার সব পরিচিত মানুষ এই ইউনিভার্সিটিতেই কেন পরে। উফ আল্লাহ। কি লিলাখেলা দেখাচ্ছো!”
.
হুমায়রার যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ দেখে রোদ এবার তুহিনের দিকে তাকালো। ছোট একটা হাসি দিয়ে বলল,
-হেই তুহিন দোস্ত সরি সকালের ঘটনার জন্য। বুঝতে পারিনি।
বলেই মাথা চুলকে চলে যায়।
#চলবে……

