#বোকামন
#পর্ব_০৪
#Tahsin_Atoshi
আজ থেকে ভার্সিটির ক্লাস শুরু। ক্লাসে চুপচাপ বসে আছে হুমায়রা। প্রথম দিন তাই টিচাররা নিজেদের মতো জ্ঞানের কথা বলছে। হুমায়রার মন টিকছে না আর। মনে মনে ঠিক করলো সে লাইব্রেরিতে যাবে। গল্পের বই পড়লেও মন বসবে একটু।
কিন্তু ক্লাস থেকে এভাবে বের হয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা সে জানে না৷ আর তার বেস্টফ্রেন্ড সাথে থাকলে হয়তো আর বোরিং ফিল হতো না৷ কিন্তু ফ্রেন্ডটাও নেই। কোথায় আছে,কি করছে একমাত্র উপরওয়ালা জানে।
এরই মাঝে টিচার একটি মেয়ে দাড় করিয়ে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। এই হলো সেই মেয়ে যে ঢাকা জেলায় সবার মাঝে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। হুমায়রার সেদিকে খেয়াল নেই। সে কীভাবে ক্লাস থেকে পালাবে সেটাই ভেবে চলেছে। প্রায় চল্লিশ মিনিট ঝিম মেরে বসে থাকার পর অবশেষে ক্লাস শেষ হলো। হুমায়রাও যেন হাফ ছেড়ে বাচল। জলদি জলদি ক্লাস থেকে বের হতেই আবারো শক্ত কোনো এক দেহের সাথে ধাক্কা খেলো। এবার নাকে ব্যথা পেয়েছে। দোষটা ওর থাকলেও সে তো স্বীকার করার মানুষ না। তাই রাগ দেখিয়ে বলল,
-দেখে চলতে পারেন না?
কথাটুকু বলে মানুষটাকে দেখতেই ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,
-ওহ আপনি৷ সরি।
শুভ এবার একটা মুচকি হাসি দিলো। হুমায়রার নাকে একটু আঙুল দিয়ে ছুয়িয়ে দিয়ে বলল,
-বেশি ব্যথা পেয়েছ?
হুমায়রা জোরপূর্বক হাসলো। বলল,
-নাহ ঠিক আছি।
-এতো তারাহুরো করে কোথায় যাচ্ছো?
-লাইব্রেরিতে। আসলে স্যারটার ক্লাস এতো বোরিং লাগছিল তাই আরকি।
শুভ চোখ ছোট ছোট করে একটু দেখলো। তারপর বলল,
-কে আনিস স্যার নাকি?
-হুম। খুব বোরিং লাগলো আজকে। এতো জ্ঞান দেয় কীভাবে!
-আসলে উনি আবার মামা…
এইটুকুতেই হুমায়রার আরেকদফা অবাক হলো। কোনোরকমে দুঃখিত বলে দিলো দৌড়। এছাড়া আর কি-ই বা করার। শুভ হুমায়রার দৌড়ের পানে তাকিয়ে রইলো। না চাইতেও ঠোঁটে হাসি চলে এলো। কিন্তু হাসির কারণটা তার কাছে অজানা। নিজের মাথায় নিজেই একটা গাট্টি মেরে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে যেতে রইলো।
হুমায়রা মাএই লাইব্রেরিতে এসে বসেছে। একা একা বিরবির করে নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করল,
“পৃথিবীর সব পরিচিত মানুষ, আত্মীয়, সবার বাবা মা কি এই ইউনিভার্সিটিই পেয়েছে! কপাল আমার। ও আল্লাহ! আগে বলতে তাহলে জীবনেও ভর্তি হতাম না। তার মধ্যে আছে আরেক ঝামেলা রোদ। এটা তো গ্রাম না আর স্মৃতিও নেই যে শায়েস্তা করবে। কি যে হবে আল্লাহ ভালো জানে। ”
-আমাকে মনে করছিলে নাকি?
কন্ঠ শুনতেই হুমায়রা বুঝতে কষ্ট হলো কে লোকটা। মনে মনে নিজেকে চার পাচটা গা*লি দিয়ে নিলো। কেন এই লোকটার কথা মাথায় আসলো। রোদ এবার হুমায়রার পাশের চেয়ারে বসলো। হাতের এক ইশারাতেই সেখানে উপস্থিত সকলে স্থান ত্যাগ করলো। এখন শুধু হুমায়রা ও রোদ আছে লাইব্রেরীতে।
ব্যাপারটায় আরো ভয় হানা দিলো হুমায়রার মনে। তাকে উপর থেকে যতটা স্ট্রং মনে হয় সে ততটাই দূর্বল। তা রোদ গ্রামে থাকা কালিনই বুঝে গিয়ে। এরা দুই বান্ধুবীর চেহারা দেখে বোঝা যায়। চেহারায় যতটা দেখায় ভেতর থেকে তারা ততটাই উল্টো। হুমায়রা এবার আর কিছু না ভেবেই দ্রুত বাইরে যাওয়ার জন্য উঠে দাড়ালো। সেই মুহূর্তেই রোদ একটানে হুমায়রাকে বুক সেলফের সাথে মিশিয়ে নিলো। হাত দুটে শক্ত করে ধরে বলল,
-কোথায় পালাচ্ছো? কি ভেবেছো গ্রামের কথা আমি ভুলে গিয়েছি? এখন যে শাস্তি পেতে হবে।
-আপ্ আপনি আমাকে বিরক্ত করতেন বলেই আমি আপনাকে শাস্তি দিয়েছি। বে্ বেশ করেছি। ছাড়ুন আমাকে।
-You know what? আজ পর্যন্ত আমার সাথে এমন ব্যবহার কেউ করেনি তুমি যতটা করেছ। কিসের এতো দেমাক তোমার? এই রুপের?
বলেই হুমায়রার গালে নিজের হাতের বিচরণ করতে লাগলো। ঠোঁটে হাসি নিয়ে বলল,
-এখন কে বাঁচাবে তোমাকে? তোমার বান্ধুবীও তো নেই। তুহিন বাঁচাবে?
বলেই হাসতে থাকলো। হুমায়রার কান্না পাচ্ছে এখন। এমন পরিস্থিতিতে কখনোই তার পরতে হয়নি। না বাহিরের কোনো ছেলে তার হাত ধরার সাহস করেছে। মনে মনে শুধু উপরওয়ালাকেই ডাকতে রইলো। এছাড়া কি করার আছে। রোদ হাসতে হাসতে গাল থেকে তার হাতটা হুমায়রার গলার কাছে আনতেই কোনো এক হাত তার হাত ধরে থামিয়ে দিলো। দু’জনই অবাক হয়ে পাশে তাকাতেই দেখলো একটি মেয়েকে। পরণে বোরকা শুধু চোখদুটোই দেখা যাচ্ছে। সেই চোখে রাগ স্পষ্ট। তবুও ভয় পেলো না রোদ। একটু রাগ নিয়ে বলল,
-সবাইকে বাহিরে যেতে বলেছি না। তুই এখনো কি করছিস?
-তোকে আপ্যায়ন করতে এলাম। একবারের মা’র খেয়ে পেট ভরেনি বুঝি?
বোরকা পরা মেয়েটার মুখ থেকে গম্ভীর কন্ঠ বেরিয়ে এলো। রোদ বিস্ময়ের স্বরে বলল,
-মানে? কে তুই?
-এতো জলদি ভুলে গেলি। ওকে আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি। স্মৃতি.. নাম তো সুনাহি হোগা।
বলেই রোদের হাতটা ধরে হুমায়রার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিলো। স্মৃতির এক ঝটকাতেই দূরে গিয়ে পরলো রোদ। তা দেখে স্মৃতি অবাক হয়ে বলল,
-কি-রে তুই আদেও পুরুষ মানুষ তো নাকি? বাসায় খেতে দেয় না। আমার সামান্য জাটকা খেয়েই পরে গেলি!
রোদ কোনো রকম উঠে বসলো। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে রাগ নিবারণের চেষ্টা করতে রইলো। আর হুমায়রা বিস্ময়কর দৃষ্টিতে শুধু মেয়েটাকে দেখছে। এরই মাঝে রোদ সামনে এসে স্মৃতির হাত ধরতেই রোদের স্পর্শকাতর জায়গায় একটা লাথি মেরে হুমায়রার হাত ধরেই বলে,
-হুমু পালা..
বলেই দুজন মিলে দেয় দৌড়। এক দৌড়ে ভার্সিটির মাঠে এসে হাজির হয় দুজন। হুমায়রা কিছু না ভেবেই স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
-তুই কোথায় ছিলি এতদিন। যদি পালানোরই ছিল আমাকে বলিসনি কেন? খুব তো বলেছিলি ওই অসভ্যকেই বিয়ে করবি৷ আমার ভাবতে হবে না। তাহলে? বল কথা বলছিস না কেন?
স্মৃতি এখনো জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। হুমায়রার প্রশ্ন শুনে বলে,
-বলার সুযোগ তো দে। এক নিশ্বাসে সব বললে কীভাবে হবে?
-তুই কেন করলি এমন হুম? সেদিন তো আমাকে খুব কথা শুনিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলি।
-আরে বাবা ভেবেছিলাম বিয়ে করেই নিবো। আবার ভাবলাম ওই অসভ্যটাকে বিয়ে করে নিজের জীবন বরবাদ করার প্রশ্নই আসে না। তাই পালিয়ে একটু রিস্ক নিয়ে দেখলাম। আর তোকে বললে বাড়ির লোক তোর বাবা- মাকে ছাড়তো বল।
-কোথায় থাকিস এখন?
-থাকি কোনো এক জায়গায়। কেন?
-আমার সাথে চল। মামনির বাসায় একসাথে থাকবো।
-যাহ বোকা তা হয় নাকি। আর কারো ঝামেলা বাড়াতে চাই না। ঠিক আছি আমি।
হুমায়রা এবার মন খারাপ করে রইলো। স্মৃতির মন ভালো করতে ইচ্ছে করলেও পারলো না। হুমায়রার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
-কাল দেখা হবে এখন যাই। একটা টিউশনি পেয়েছি। প্রথম দিন দেরি করলে কেমন দেখায়। থাক তাহলে।
-আচ্ছা।
এইটুকু বলতেই হুমায়রার গলা আটকে এলো। না চাইতেও কান্না করে দিলো। স্মৃতি অবাক হয়ে বলল,
-শুরু কাদুনে বুড়ির কান্না। মাঝে মাঝে মনে হয় কি জানিস? তুই আমার ফ্রেন্ড না বাচ্চা মেয়ে। আরে বাবা কাঁদছিস কেন?
-তুই কোথায় থাকিস?
-কাল বলি। এখন যাই।
-বারণ করেছি আমি?
-কান্না না থামালে কীভাবে যাবো?
হুমায়রা এবার ঠোঁট উল্টে হাতের উল্টো পাশ দিয়ে নিজের চোখ মুছে নিলো। বলল,
-ঠিক আছি যা। কাল দেখা হচ্ছে।
-ওকে ডিয়ার।
বলেই স্মৃতি চলে গেল। হুমায়রারও একা বোরিং লাগছে। তেমন ক্লাস হয়না বললেই চলে। নবীন বরণের পর পুরোপুরি ক্লাস শুরু হবে। তাই আর না ভেবে সেও বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। সেই মুহূর্তেই তুলি দেখে বলল,
-এই যে স্লিপিং কিউটি এদিকে আসো। গল্প করি।
হুমায়রা এক নজর ওদেরকে দেখে মুখ ভার করেই বাসায় উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। তুলি বোকার মতো সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-বুঝলাম না এই মেয়ের সমস্যা কি? কীভাবে ইগনোর করে চলে গেল।
তুহিন কৌতুহল নিয়ে বলল,
-চেহারা এমন মলিন লাগছিল কেন? কান্না করেছে নাকি?
অনিল এবার রাগ দেখিয়ে বলল,
-শুধু শুধু কান্না করবে কেন? কিছু হলে তো বলতোই তাই না?
এর মাঝেই আহান বলল,
-কীভাবে বলবে মামা? শর্ত দিয়ে বসে আছো যে।
অর্নি বলল,
-কোনো শর্তটর্ত নেই। সব বাদ।
-সেটা কি মায়রা জানে?
সবাই অবাক হয়ে এবার আহানের দিকে তাকালো। তুহিন বলল,
-মায়রা কে?
আহান একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। জোরপূর্বক হেসে বলল,
– না মানে সবাই হুমায়রাকে হুমু বলিস তাই আমি মায়রা বললাম। হুমুর চাইতে মায়রা নামটা কিউট লাগে।
সবাই একসাথেই এবার বলে উঠলো,
-আচ্ছাআআআআআ!
-হ্যাঁ। তা আজও কি অনিলদের বাসায় আড্ডা দিবি নাকি আমার বাসায় যাবি?
সবার মাঝ থেকে অমিত বলল,
-না বাসায় যেতে হবে। হুমুকে ঠিক মনে হচ্ছে না। কিছু একটা হয়েছে। থাক তোরা।
বলেই গাড়ির দিকে যেতে রইলো। বাকিরাও পিছু পিছু রওনা দিলো। শুভ বলল,
-আরে আমরাও যাবো তো… চল।
.
সবাই মিলে হুমায়রার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হুমায়রা দরজা খুলতে নারাজ। কারণও বলছে না কাউকে। অমিত এবার সবাইকে থামিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
-হুমু বনু বল না কি হয়েছে? ভার্সিটিতে কেউ খারাপ ব্যবহার করেছে? কোনো টিচার বকা দিয়েছে? না বললে বুঝবো কীভাবে বল তো।
ভেতর থেকে হুমায়রার নাক টানার শব্দ শোনা গেল একটু। কান্না মাখা কন্ঠে বলল,
-কিছু হয়নি। তোমরা চলে যাও। আমাকে একা থাকতে দেও।
-বনু বল না প্লিজ।
-চলে যাও।
এবার তুহিন সামনে এলো। বলল,
-হুমু তোকে রোদ কিছু বলেছে? ও কি কিছু করেছে? হ্যা বা না বল শুধু।
রোদের নামটা শুনতেই হুমায়রার কান্নার তোপটা বাড়লো। কাথার মুড়ি দিয়ে মন খারাপ করে কাদতে রইলো। কিন্তু শব্দ করে সে খুব কমই কাঁদে। তাই হয়তো বাইরের কেউ বুঝতে পারলো না। শুভ জিজ্ঞেস করল এবার,
-আচ্ছা আমার মামা কি বকা দিয়েছিল? ক্লাসে কিছু বলেছে?
এরই মাঝে তুলি শুভর মাথায় গাট্টি মেরে বলে,
-কিছু বললেই বা কি। টিচাররা তো বকেই। তাতে কান্না করবে কেন?
-ও সামান্য ব্যাপারেই কাঁদে। সেটা টিচারই বকুক বা আমরা বকি না কেন। এমনও হয়েছে ওর জন্য টিচারকেও মা’র খেতে হয়েছে।
অনিলের বলা কথাটুকুতেই সকলে বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকালো। অনিল আবারো বলল,
-যত আদর দেখাবে ততবেশি ঢং করবে। আয় সব।
এরই মাঝে অর্নি অনিলের মাথায় একটা চড় বসিয়ে বলল,
-এমন কেন তুমি? বোন কাঁদছে। আর তুমি শাওয়ার নিয়ে খাওয়াও শেষ করে ফেলেছো!
-তো কি ওর ন্যাকামো দেখবো?
এরই মাঝে আহান দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
-মায়রা? দরজা খুলতে বলছি তো। বলবে তো কি হয়েছে।
এবার দরজা খুললো হুমায়রা। কান্না করার কারণে চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। অমিত এবার কাছে এসে দাড়ায়। চোখ দু’টো মুছে দিয়ে গালে হাত রেখে আবারো জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে। হুমায়রা কিছু বলার আগেই আহান কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-মায়রা রোদ কি কিছু…
রোদের নামটা শুনতেই হুমায়রা আরো জোরে কান্না শুরু করে দেয়। সবার আর বুঝতে সময় লাগে না হুমায়রার কান্নার কারণ। অমিত তুলি ও অর্নিকে ইশারা করে হুমায়রার কাছে থাকার জন্য। আর তারা চলে যায় নিজেদের উদ্দেশ্যে।
#চলবে…

