#বোকামন
#পর্ব_০৫
#Tahsin_Atoshi
কোচিং থেকে বাসায় ফিরছে হুমায়রা। বাসায় ফেরার পথেই সামনে পড়ে একটা বাগানবাড়ি। লোকের কাছে শুনেছে এখানে কিছু ছেলে শহর থেকে এসেছে গ্রাম ঘুরে দেখার জন্য। শহরের ছেলেরা দেখতে অনেক হ্যান্ডসাম সুন্দর হয় কিনা৷ গ্রামের মানুষের কাছে তারা ভিনদেশ থেকে আশা মানুষদের মতোই। আদর আপ্যায়নের শেষ নেই। তবে হুমায়রার এতে তেমন একটা খেয়াল দেয় না বললেই চলে। কারণ তার ভাইয়েরাও শহরে থাকে। এর আগে অনেকবারই গিয়েছে। এসব দেখেই অভ্যস্ত কিনা৷ এসব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ সামনে কেউ একজন পথ আটকে দাড়ায়।
হুমায়রা কিছুটা ভরকে গেলেও প্রকাশ করে না। চুপচাপ সামনে তাকালেই একটা ছেলেকে দেখতে পায়। ফর্সা গায়ের রঙ, চোখে কালো সানগ্লাস, পড়ে একটা টিশার্ট ও ট্রাউজার। এতেই দেখতে সুদর্শন লাগছে। কিন্তু হুমায়রার আবার সুন্দর ছেলেদের প্রতি এলার্জি আছে। তার মতে যেসকল ছেলেরা দেখতে সুন্দর, অতিরিক্ত স্মার্ট তারাই প্লে-বয় হয়। তা ক্রাস খাওয়া তো দূরের কথা চেহারা দেখলেই বিরক্তি চলে আসে।
এবারও একই ঘটনাই ঘটলো। বিরক্তি নিয়ে পাশ কেটে চলে যাবে এর মাঝেই সামনের ছেলেটা হাত বাড়িয়ে বলল,
-হেই কিউট গার্ল। আমি রোদ ;আর তুমি?
হুমায়রার খুব বিরক্ত লাগলো ব্যাপারটা। দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলল,
-আপনাকে কেন বলবো?
-হেই রাগ করছো কেন? কিছু মনে কোরো না প্লিজ। আসলে এখানে নতুন তেমন জায়গাও চিনি না৷ তাই পরিচিত হতে চাইছিলাম।
-তো ছেলেদের সাথে পরিচিত হন না৷ আমাকে কেন ডিস্টার্ব করছেন।
– আসলে তোমাকে সামনে পেলাম তাই জিজ্ঞেস করলাম। সরি বুঝিনি তুমি ডিস্টার্ব ফিল করবে।
রোদের এইটুকু কথাতো হুমায়রার মন গললো যেন। তার ব্যবহারে কেউ মন খারাপ করুক তা সে চায় না। তাই নিজেকে ঠিক করে বলল,
-সরি এভাবে ব্যবহার করার জন্য। আমি হুমায়রা।
-ও নাইস নেইম। আমাকে একটু ঘুরিয়ে দেখাবে?
-দুঃখিত আমি পারবো না। তবে..
-তবে?
-আমি একটা ছেলেকে পাঠিয়ে দিবো সে ঘুরিয়ে দেখাবে না হয়৷
-ওকে। স্কুলে পড়ো?
– ভার্সিটিতে এডমিশন দিবো।
-ও আই সি.. নাইস টু মিট ইউ।
-মি টু।
এইটুকু বলে হুমায়রা চুপচাপ চলে গেল। এইটুকু কথাতেই মনে হলো লোকটা ভালো। প্রতিদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে এদের কথা হতো।
স্মৃতির সাথেও সব কথা শেয়ার করায় সেও দেখার জন্য খুবই ইন্টারেস্টেড হয়ে ওঠে। কিন্তু তার পরিবারটা একটু অন্যরকম হওয়ায় দেখা করার সুযোগ আর হয়না। এভাবেই চার-পাঁচদিন কেটে যায়।
হঠাৎ-ই একদিন রোদ হুমায়রাকে প্রপোজ করে বসে। হুমায়রাও কিছু না ভেবে মুখের উপর না বলে দেয়। এটাই যেন তার কাল হয়ে দাড়ায়। এরপর থেকেই বিভিন্ন ভাবে বিরক্ত করা শুরু করে রোদ। প্রতিদিন কোচিং-এর সামনে আসা, হুমায়রাকে বিরক্ত করাটা যেন রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাপারগুলো স্মৃতি অনেকদিন যাবৎ খেয়াল করার পর একদিন রাগ দেখিয়ে কোচিং-এ সকলের সামনেই চড় মেরে বসে রোদকে। এতেই ভিড় জড়ো হয় ওদের কাছে। স্মৃতি যা মাথায় আসে আবোলতাবোল বলে ফেলে।
পরেরদিনই রোদ চলে যায়। কিন্তু তবুও যেন সব থামেনি। রোদের বাগানবাড়ির মালি কুৎসা রটায় শহর থেকে আসা তার বাবুকে স্মৃতি প্রেমের জালে ফেলে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু না পেরে সবার সামনে মিথ্যা বলে অপমান করেছে। যার কারণে বাসার সকলে সম্মান বাঁচাতে স্মৃতির বিয়ে ঠিক করে সেই গ্রামেরই এক লোকের সাথে। যার বউ মারা গিয়েছে দুইমাস হয়েছে। একটা ছোট্ট বাচ্চা আছে।
সবটা শোনার পর সবাই বোকার মতো তাকিয়ে আছে হুমায়রার দিকে। আহান ও অনিলের হাসি পেলেও নিজেকে অনেক কষ্টে আটকে রেখে।হুমায়রা তখনও নাক টেনেই যাচ্ছে। এদিকে স্মৃতি পাশে বসে শান্তনা দিচ্ছে। শুভ এবার নিজের হাসিটা আটকে রেখে বলল,
-শোনো মেয়ে সবার কথায় এতো গলে গেলে হয় না। ছেলেদের কাজই ভালোভাবে কথা বলে মেয়েদেরকে পটানো। এটাই স্বাভাবিক তাই না।
হুমায়রা নাক টানতে টানতে বলে,
-আমি কি বুঝেছিলাম নাকি এমন হবে।
-আচ্ছা এরপর থেকে সাবধানে থাকবে। অন্যের কথায় গলে যাবে না।
এতোক্ষণ নিস্তব্ধতার পর তুহিন কৌতুহল নিয়ে বলল,
-স্মৃতি তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল!
-জ্বী।
– ভাঙলে কীভাবে?
-পালিয়ে এসেছি।
সবাই একসাথে বিস্ময়কর স্বরে বলে উঠলো,
“মানে?”
সবার এভাবে চমকাতে দেখে হুমায়রা রাগ দেখিয়ে বলল,
-মানে আবার কি হ্যাঁ? পালিয়ে এসেছে তো পালিয়ে এসেছে। না বোঝার কি আছে।
তুহিন কৌতুহল নিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করল,
-কোথায় থাকো এখন?
স্মৃতি এবার একটু হাসলো। কি বলবে বুঝতে পারছে না। তবুও বলল,
-থাকি এদিক সেদিক আরকি।
-মানে?
-এখনো বাসা পাইনি । রাস্তায় একটা আন্টির সাথে দেখা হয়েছে। আপাতত ওনার সাথে আছি আরকি।
-কোথায়?
-এদিকে একটা বস্তি আছে সেখানেই।
হুমায়রা এবার চমকে তাকালো। বলল,
-তুই বস্তিতে থাকিস কেন? তোর না কোন ফুপি থাকে এখানে বলেছিলি। তাহলে সে কোথায়?
-ফুপিকে দেখেছি ছোটবেলায়। শুধু চেহারা মনে আছে। কিন্তু তারা এখন দেশের বাহিরে থাকে।
-তুই আমার সাথে থাকবি।
-আরে বাসা দেখেছি তো। মাস শেষ হলেই সেখানে যাবো।
-আমার সাথে থাকলে কি হবে?
-আমি কারো বাসার বোঝা চাইনা।
এবার অমিত মুখ খুলল,
-আমাদের বাসায় বোঝা হবে সেটা কে বললো। হুমু আর তুমি একসাথে থাকবে।
-কিন্তু..
-আচ্ছা ঠিক আছে। ফ্রী ফ্রী থাকা লাগবে না। মাস শেষে এক হাজার টাকা ভাড়া দিয়ো ওকে চলবে? তাহলে তো আর বোঝা বা অন্যকিছু মনে হবে না তাই না?
এরই মাঝে হুমায়রা বলল,
-টাকাটা আমার হাতে দিস ওকে?
অনিল রাগ দেখিয়ে বলল,
-কেন কেন তোকে কেন দিবে?
-তোমাদের হাতে দিলে তোমরা টাকা মেরে দিবা। তাই আমাকে দিবে আমি মামনিকে দিবো।
অনিল এবার রাগ দেখিয়ে তাকাতেই হুমায়রা জোরপূর্বক হাসি দিয়ে স্মৃতির হাত ধরে উঠে বলল,
-আমাদের ক্লাস আছে যাই। কালকে আবার নবীন বরণ। আর হ্যা আমার কথাই ফাইনাল।
অনিল বোকার মতো অর্নির দিকে তাকিয়ে বলল,
-দেখলে কি পরিমাণ অসভ্য। বলে আমরা টাকা মেরে খাবো!
-ভুল কি বলেছে। ঠিকই আছে। তোমাদের বিশ্বাস নেই। ক্লাস আছে চলো।
অনিল এবার আরো বোকাবনে গেল। পাশে থাকা বেঞ্চে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল,
-শা*লার জিন্দেগী। কেউ বিশ্বাসও করে না, সম্মানও দেয়না।
শুভও কাঁধে হাত রেখে বলল,
-আরে মামা রাগ করিস না। পুরুষ হয়ে জন্মেছ ভাই। লাইফে সবার কাছে দাম পেলেও মা,বউ আর বোনের কাছে কখনোই দাম পাবে না।
বলতেই ছেলেরা সকলে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
••••
মাএই সকলে মিলে বাসায় ফিরেছে। স্মৃতিকে দেখে নীলা বেগমের খুশির শেষ নেই। দুটো মেয়ে হয়েছে তার। এখন তার ঘরটা ভরা হয়েছে। কিন্তু স্মৃতির মনে এখনো দ্বিধা কাজ করছে। এভাবে কারো বাসায় থাকাটা তার কাছে ঠিক লাগছে না। কিন্তু যাওয়ার কোনো জায়গাও নেই। তাই থেকে রইলো। সবাই মিলে রুমে বসে আছে। আর হুমায়রা কাভার্ড থেকে নিজের জামাগুলো সাইড করে স্মৃতির জামাগুলো রাখছে। সবার মাঝ থেকে শুভ কৌতুহল নিয়ে বলল,
-আচ্ছা স্মৃতি তোমার বাবা-মা তোমার খোঁজ নেয়নি? না মানে হাজার হোক পালিয়ে এসেছো। তবুও বাবা-মা তো তাই না।
স্মৃতি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
-আমার কেউ নেই। আমি অনাথ।
এরই মাঝে হুমায়রা বলল,
-জ্বী জ্বী ম্যাডাম তারপর? আপনার বাবা এখনো বেঁচে আছে ওকে।
-কোথায় আছে?
স্মৃতির প্রশ্নে হুমায়রা চুপ হয়ে গেল। হ্যা এটা ঠিক স্মৃতির বাবা বেঁচে আছে। কিন্তু জন্মের পর থেকে সে কখনো তার বাবাকে দেখেনি। বাসার ফ্যামিলি ফটোতেই দেখেছে আর চাচা-চাচিদের কাছে শুনেছে। শুনেছে এই শহরেই কোথাও আছে সে। কিন্তু খোঁজার কোনো প্রকার ইচ্ছে নেই তার৷ তুহিন কৌতুহল নিয়ে বলল,
-আপনার বাবার সাথে দেখা হয় না?
-আমার বাবা আমার কাছে মরে গেছে। এই টপিকে আর কথা বলতে চাচ্ছি না।
সবাই চুপ হয়ে রইলো এবার। আহান টপিক চেঞ্জ করতে বলল,
-আচ্ছা স্মৃতি আপনার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই?
আহানের এমন প্রশ্নে সকলে ওর দিকে বোকার মতো তাকালো। আহান এবার থতমত খেয়ে বলল,
-না মানে এখনকার যুগে কেউ সিঙ্গেল থাকে নাকি। তাই জিজ্ঞেস করলাম।
পাশ থেকে তুলি রাগ নিয়ে বলল,
-তুই যেমন তোর প্রশ্নও তেমন। ডিজগাস্টিং।
-যাহ বাবা কি এমন বললাম।
অর্নি রাগ দেখিয়ে বলল,
-সবাই কি তোর মতো নাকি যে একশো একটা প্রেম করবে?
হুমায়রা এবার অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
-একশো একটা প্রেম করেছে মানে! আহান ভাইয়া আপনি প্লে-বয় নাকি।
ভাইয়া ডাকটা শুনেই আহান বোকার মতো তাকালো। জোরপূর্বক হেসে বলল,
-মায়রা প্লিজ ভাইয়া ডাকটা ডেকো না। সুন্দরী মেয়েদের মুখে ভাইয়া ডাক শুনলে বুকের ভেতর চিনচিন ব্যথা হয়।
অনিল এবার পাশ থেকে আহানের মাথায় একটা গাট্টি মেরে বলল,
-কিরে শালা! সব মেয়ের দিকে লাইন মারো। আমার বোনের দিকে চোখ দিও না মামা। ফল খারাপ হবে ।
-আরে তোর বোনটা সুন্দরী আছে। চোখ দিলেই বা কি।
এরই মাঝে অমিত এবার গম্ভীর কন্ঠে বলল,
-আহান!
-আরে মামা সিরিয়াস হও কেন। ঠিক আছে দিলাম না চোখ। মনটা দিয়ে দেই কেমন। যাই হোক। স্মৃতি আর মায়রা তোমরা বললে না প্রেম করো কিনা।
স্মৃতি ও হুমায়রা একে অপরের দিকে দু’জন একসাথে বলে উঠলো,
”প্রেম! ইউউউ।”
বলেই বমি করার ভান করলো। তা দেখে আহান বলল,
-আরে আরে যেভাবে বলছো যেন প্রেম ব্যাপারটা খুব খারাপ। প্রেমও একটা আর্ট। যা সবাই পারে না।
স্মৃতি এবার আহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
-আপনার প্রেম আপনার কাছেই রাখুন। প্রেম করে জান, সোনা, মিস ইউ,কিস ইউ এসব আমাদের দ্বারা হয় না।
-হুম বুঝলাম তোমরা খুবই ব্যাগডেটেড ও আনরোম্যান্টিক।
হুমায়রাও কাবার্ড গুছাতে গুছাতে বলল,
-থাক ভাই ওসব রোম্যান্স আমাদের দ্বারা হবে না। আপনিই করুন একশো একটা। পারলে আরো বেশি করুন। উফফফ বোরিং।
এরই মাঝে নিচ থেকে নীলা বেগমের ডাক পড়লো খাবার খাওয়ার জন্য। সকলে মিলে নিচে চলে এলো। খাবার খাওয়ার মাঝেই শুভ বলল,
-আজ বিকেলে কিন্তু আমাদের বাসায় যেতে হবে। আর রাতে সকলে সেখানেই থাকছো। বাসায় বলে রেখেছি।
এবার সকলে একসাথে বলে উঠলো ,
“ওকে।”
#চলবে……

