বোকামন #পর্ব_৬

0
2

#বোকামন
#পর্ব_৬
#Tahsin_Atoshi

গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। উদ্দেশ্য শুভর বাসায় যাওয়া। হুমায়রা চুপচাপ বাইরের দৃশ্য দেখেই চলেছে। আর শুভ ড্রাইভ করার পাশাপাশি আড় চোখে হুমায়রাকে দেখে চলেছে। কিন্তু একবারের জন্যও হুমায়রা সেদিকে তাকায়নি। পেছনের সিটে স্মৃতি, তুলি ও অর্নি বসে আছে। আর বাকিরা অন্য গাড়িতে। সবার মাঝেই নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। শুভর ঠিক ভালো লাগছে না৷ তাই কিছু একটা ভেবে গান ছাড়লো। গান ছাড়ার কারণে হুমায়রা একবার শুভর দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থেকে তারপর জিজ্ঞেস করল,

-আপনার বাসা কি বেশি দূর?

-না তো। জ্যাম না থাকলে পনেরো মিনিটের মতো লাগে যেতে। কেন?

-আমার কাছে মনে হচ্ছে একঘন্টা হয়ে গেছে।

শুভ এবার একটু হাসলো। একটু কাশি দিয়ে বলল,

-তোমরা সবাই যেভাবে চুপ করে আছো মনে হচ্ছে কোনো মরা বাড়ি যাচ্ছি। বোরিং তো লাগবেই।

-ও আচ্ছা৷ কথা বলার টপিক বের করুন কথা বলছি। আমি বাবা কোনো টপিক খুজে পাচ্ছি না।

-হুম কি টপিকে কথা বলা যায় বলো তো।

-বললাম তো জানি না। আচ্ছা ভালো কথা ভার্সিটিতে রোদকে আর দেখলাম না৷ আপনারা কি কিছু করেছেন?

-কেন মিস করছো মনে হয়?

-ন্ না। এমনি জিজ্ঞেস করলাম।

-হাসপাতালে আছে। এতদিনে সুস্থ হওয়ার কথা।

-মানে! আপনারা মেরেছেন?

-তেমন একটা মারিনি। খুব সামান্য। কিন্তু আবারো যদি তোমাদের দিকে চোখ তুলে তাকায় তাহলে পারমানেন্ট হাসপাতালে পাঠিয়ে দিবো।

এইটুকু শুনেই হুমায়রা চুপ হয়ে গেল। গাড়ি ধীরে ধীরে একটা বড় গেট দিয়ে ঢুকতে রইলো। গেটের সামনে বড় করে লেখা সৈয়দ মেনশন। সবাই মিলে গাড়ি থেকে নামতেই সামনের বড় বাড়িটার দিকে স্মৃতি ও হুমায়রা অবাক হয়ে রইলো। স্মৃতি হালকা নিচু হয়ে হুমায়রার কানের কাছে এসে বলল,

-দোস্ত এদের বাড়ির কাছে আমার বাড়ি তো দেখি চুনোপুঁটি।

-হ্যারে দোস্ত। তবুও আমাদের ছোট্ট বাড়িই ভালো।

কলিং বেল বাজিয়ে শুভ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণের মাঝেই একটা ছেলে এসে দরজা খুললো। বয়স আনুমানিক দশ-পনেরো বছর হবে। হুমায়রা ও স্মৃতিকে দেখে কৌতুহল নিয়ে বলল,

-শুভ ভাই এই কিউট আপু দুটো কারা?

-ভেতরে ঢুকতে দে এরপর বলছি।

সবাই মিলে ভেতরে প্রবেশ করলো এবার৷ ভেতরে ঢুকতেই হুমায়রা ও স্মৃতি হা হয়ে রইলো। হুমায়রা স্মৃতির দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলল,

-ভাই এদের এতো বড় বাড়ি আর এতো সুন্দর। ইশ আমারও যদি এমন একটা বাড়ি থাকতো।

স্মৃতি ভ্রু কুঁচকে তাকালো হুমায়রার দিকে। দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বিরবির করে বলল,

-বড় বাড়ি দিয়ে কি হবে যদি সুখ, শান্তি, আর সকলের মাঝে মিলই না থাকে।

– তোকে কে বলল?

– কেউ না। চুপ থাক এখন।

এরই মাঝে ছেলেটা ওদের সামনে এসে হাত বাড়িয়ে বলল,

-হায় আমি শান্ত। আর তোমরা?

স্মৃতি জোরপূর্বক একটা হাসি দিয়ে বলল,

-আমি স্মৃতি আর ও হুমায়রা।

-ও কিউট নেইম। একদম তোমাদের মতো।

ছেলেটার কথায় হুমায়রা ও স্মৃতি একে অপরের দিকে তাকালো। এরই মাঝে পাশ থেকে তুহিন বলল,

-এর নাম শান্ত হলেও কাজ অশান্তর মতো। তো সাবধানে।

তুহিনের কথা শুনতেই শান্ত এবার বিরক্তি নিয়ে বলল,

-তুহিন ভাইয়া! তুমি একদম আমার নামে বাজে কথা বলবে না।

বলেই হুমায়রা ও স্মৃতির হাত টেনে সোফায় বসায়। শুভও সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,

-তোমরা বসো আমি বাবা,মা-কে ডেকে আনছি।

সবাই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয় এবার। শান্ত এবার লুডু খেলার জন্য সবকিছু নিয়ে আসে। হুমায়রা ও স্মৃতিও উৎসাহ নিয়ে ওর সাথে খেলতে বসে। শান্ত ছোট ও খেলায় পারদর্শী না হওয়ায় হুমায়রা ও স্মৃতি তাকে বার বার গুটি কেটে ফেলছে। তাতেই রেগে শান্ত সবগুটি এলোমেলো করে ফেলে। তা দেখে তুহিন বলে,

-বলেছিলাম না।

হুমায়রা ও স্মৃতি এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুটিগুলো গোছাতে শুরু করে। কিছু কিছু নিচে পরে যাওয়ায় সেগুলোও উঠাতে থাকে। এর মাঝেই শুভ তার বাবা মাকে নিয়ে হাজির হয়। সবাই মিলে তাদেরকে দেখে সালাম দেয়। স্মৃতিও মাএই গুটিগুলো সব গুছিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে,

-তোমার নাম শান্ত না রেখে অশান্ত রাখলে ভালো হতো।

বলেই একটু হাসি দিয়ে শুভ বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

-সরি আন্…..

এইটুকু বলতেই স্মৃতি থমকে দাড়ালো। কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো সে হয়তো ভুল দেখছে। তাই এদিক-সেদিক তাকিয়ে নিজেকে ঠিক রাখার চেষ্টা করলো। এরপর আবারো তাকালো। কিন্তু না সে সঠিক দেখেছে। রাগে মাথাটা গরম হয়ে গেল। কি বলবে বুঝতে পারছে না। রাগ হচ্ছে তার। চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

-আমি বাসায় যাবো৷

স্মৃতির এমন কথায় শুভ ভরকে গিয়ে বলল,

-এটা কেমন কথা স্মৃতি! আমি কিন্তু বলেই এসেছি আজকে তোমরা আমাদের বাসায় থাকবে। তাহলে?

-আপনারা থাকুন। আমার কোনো সখ নেই।

বলেই হাঁটা দিলো। হুমায়রা গিয়ে পেছন থেকে স্মৃতির হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলল,

-এই তোর হঠাৎ হঠাৎ কি হয় বলতো? থাকি সবাই। মজা হবে।

-তুই কর মজা।

-কি হয়েছে বলবি তো।

স্মৃতি যেন এবার নিজের রাগটা কন্ট্রোল করতে পারলো না। একটু উচ্চস্বরেই বলে উঠলো,

-কিছু হয়নি। আমি বাসায় যাবো ব্যাস। থাক তোরা।

-স্মৃতু তুই…

এইটুকু বলেই হুমায়রা থামলো। কিছুক্ষণ স্মৃতির যাওয়ার পানে তাকিয়ে কৌতুহল নিয়ে পেছনে তাকালো। গভীর ভাবে শুভর বাবাকে দেখতে রইলো৷ একটু দ্বীধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-আঙ্কেল আপনার নাম কি সৈয়দ আসিফ ইসলাম?

শুভর বাবার একটু হেসে উওর দিলো,

-হ্যাঁ মা। কিন্তু কেন বলোতো? আর তোমার ফ্রেন্ডের কি হলো?

-আঙ্কেল আপনার গ্রাম কি চন্দনপুর গ্রাম?

-হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আমাকে কীভাবে চেনো মামনি?

হুমায়রা এবার উৎসাহ নিয়ে বলল,

-আমি আপনার বন্ধু সুনিল খন্দকারের মেয়ে।

-আচ্ছা তাই বুঝি। সুনিল তো বললে না আমাকে তুমি এই শহরে এসেছো। আমার বাসায় থাকতে৷ যাই হোক সেই নিয়ে পরে আলাপ করা যাবে। কিন্তু তোমার বান্ধুবীর কি হলো?

-আঙ্কেল স্মৃতি!

-হুম শুভ বলেছে তোমার ফ্রেন্ডের নাম স্মৃতি।

আসিফ খানের এমন কথায় হুমায়রার রাগ হলো। তবুও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

-আঙ্কেল ও আপনার মেয়ে স্মৃতি। নিজের মেয়েকে চিনতে পারছেন না? ও অবশ্য চিনবেন কীভাবে কখনো দেখতে গিয়েছিলেন নাকি। যাই হোক। আমি ওর কাছে যাই।

এইটুকু বলেই হুমায়রা দৌড় দিল স্মৃতির কাছে যাওয়ার জন্য। বাকিরা সবাই বোকার মতো শুধু তাকাচ্ছে একে অপরের দিকে।

স্মৃতি একা একা রাস্তায় হাঁটছে। গায়ের যত জোর আছে সবটা দিয়েই যেন সে ফুটপাতে হেঁটে চলেছে। কোথায় যাচ্ছে নিজের অজানা। বাসায় যাওয়ারও ইচ্ছে নেই তার। মন চাচ্ছে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যেতে। কিন্তু এই পাপটাও সে করতে চায় না৷ কান্না পাচ্ছে খুব। কিন্তু কার জন্য কাঁদবে সে নিজের বাবার জন্য? নাকি নিজের ভাগ্যের জন্য। যার বাবা বেঁচে থেকেও কাছে ছিল না। কখনো দেখতে আসেনি তাকে।
পেছন থেকে হুমায়রা স্মৃতিকে ডেকে যাচ্ছে। কিন্তু স্মৃতি শুনতে নারাজ। এখন সে একা থাকতে চায়। কারো কাছে যেতে চায় না। চুপচাপ একটা রিকশা নিয়ে নিলো। রিকশায় ওঠার সময় এক নজর হুমায়রাকেও দেখে নিলো। কিন্তু থামলো না।

প্রায় পনেরো মিনিট পর বাসায় পৌছে গেল। কলিং বেল বাজাতেই নীলা বেগম এসে দরজা খুলে দিলেন। স্মৃতিকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন তিনি। স্মৃতি কোনো কথা ছাড়াই ঘরের দিকে যাচ্ছে দেখে তিনি নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করলেন,

-চলে এলে যে। তোমরা না আজ ওই বাসায় থাকবে।

কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে স্মৃতির। তবুও নিজেকে সামলে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,

-এমনি আন্টি ভালো লাগছিল না। ওরা থাকবে।

নীলা বেগম কৌতুহল নিয়ে যাওয়ার পানে তাকিয়ে দরজা আটকে আবারো সোফায় গিয়ে বসলেন। গল্পের বই পড়ছিলেন তিনি। আবারো পড়া শুরু করলেন। দ্বিতীয়বার আবার কলিং বেল বাজায় এবার বিরক্ত হলেন তিনি। দরজা খুলতেই হুমায়রাকে পেলেন। কোনো কথা ছাড়াই হুমায়রা উপরে যাচ্ছে দেখে বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

-বাকিরাও আসছে নাকি?

পেছনে না তাকিয়েই হুমায়রা না সূচক উওর দিলো।

হুমায়রা চুপচাপ দরজার কাছে আসতেই দেখলো ভেতর থেকে দরজা লক করা। কয়েকবার ডাকলো স্মৃতিকে। কিন্তু সে কঠোর কন্ঠে বলে দিয়েছে এই মুহূর্তে সে একা থাকতে চায়। হুমায়রা জানে এই মুহূর্তে ও ডাকলেও স্মৃতি শুনবে না৷ নিচে নীলা বেগমকে দেখে মাথায় এলো অন্যবুদ্ধি। নীলা বেগম উপরেই তাকিয়ে ছিলেন। তাই হুমায়রা ইশারায় ডাকলো উপরে। নীলা বেগমও উপরে এসে ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে।

-পরে বলছি তোমাকে। আগে দরজাটা খোলার ব্যবস্থা করো প্লিজ।

ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ হুমায়রাকে দেখে এবার দরজায় টোকা দিয়ে ডাকতে লাগলেন,

-স্মৃতি দরজা খুলো মা। কি হয়েছে আমাকে বলো।

-আন্টি আমি একা থাকতে চাই প্লিজ।

-এভাবে কীভাবে হয় মা। একা থাকলে আরো বেশি মন খারাপ হবে। দরজা খোলো।

স্মৃতি আর কথা বাড়ালো না। দরজা খুলে আবারো ভেতরে এসে বসলো। নীলা বেগমও পাশে এসে বসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

-কি হয়েছে মা?

-কিছু না আন্টি।

-দেখি আমার দিকে তাকাও।

বলেই নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। চোখের পানি মুছে দিয়ে পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন,

-কি হয়েছে আমাকে বলো।

-আন্টি আমি একা থাকতে চাই৷

-একা থাকলে কি সব ঠিক হয়ে যাবে?দেখি আমার কাছে এসো।

স্মৃতিও যেন মায়ের বুকটা পেয়ে গেল। না চাইতেই শব্দ করে কান্না করে দিলো এবার৷ নীলা বেগম আটকালেন না বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন।

………………

সৈয়দ বাড়িতে সকলে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। আর বোঝার চেষ্টা করছে মাএ হুমায়রা কি বলে গেল। স্মৃতি কীভাবে তার বোন হয়। এটা তো সম্ভব না। শুভর বাবাও কিছুটা স্তব্ধ। শুভর মা মৌমিতা কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-আসিফ স্মৃতি কি আপার মেয়ে?

সৈয়দ আসিফ ইসলাম বোকার মতো তাকালেন। বললেন,

-তা কীভাবে হয়?

কিছুই যেন মিলছে না। তারা স্তব্ধ হয়ে আছে। শুভ এবার কৌতুহল নিয়ে বলল,

-তোমরা কি নিয়ে কথা বলছো? কার আপা? স্মৃতি আমার বোন? কি হলো বলছো না কেন? ও আমার বোন তাই না? তাহলে ও আমাদের কাছে কেন থাকে না। বলো!

অমিত, অনিলসহ বাকিদের ইতস্তত বোধ হলো। অন্যের ফ্যামিলি ম্যাটারের মাঝে তাদের না থাকাটাই সঠিক মনে হচ্ছে। তাই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারাও স্থান ত্যাগ করলো।

#চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here