#বোকামন
#পর্ব_০৭
#Tahsin_Atoshi
ঘরে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কারোই যেন হিসাব মিলছে না।
____শুভর বাবা সৈয়দ আসিফ ইসলামের প্রথম স্ত্রী হলো স্মৃতি মা উষা। খুব সুখের সংসার ছিল তাদের। কিন্তু সেই সংসারে কোনো বাচ্চা ছিল না। সবাই ধরেই নিয়েছে তাদের আর কখনো বাচ্চা হবে না। ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন মনে করেনি তারা৷ ভাগ্যের উপরই ছেড়ে দিয়েছে সবটা।
ব্যবসার কারণে শহরে আসার পরই পরিচয় হয় শুভর মা মৌমিতার সাথে। খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তাদের৷ কিন্তু শহরের হলেও সেখানকার মানুষদের চিন্তা ধারা তো আর বদলে যায় না। একদিন ঝড় বৃষ্টির কারণে তিনি থেকে যায় মৌমিতার বাসায়। সেটাই যেন তাদের জন্য কাল হয়ে ওঠে। পরেরদিন পারা প্রতিবেশীরা কুৎসা রটায় অবিবাহিত হয়েও তারা একই ঘরে বাস করেছে। তাই আর উপায় না পেয়ে বিয়ে করতে হয় মৌমিতাকে।
মৌমিতা জানে আসিফ ইসলামের স্ত্রী আছে৷ তাই কখনো স্বামীর অধিকার দাবি করেনি৷ ঠিক করেছিল ডিভোর্স নিবে। কিন্তু আসিফ ইসলাম না করে দেয়। তিনি রাখতে চায় তাদের সম্পর্কটা। ধীরে ধীরে সবটা ঠিক হয়। তাদের ঘরে একটা পুএ সন্তান হয় শুভ। কেটে যায় পাচ বছর।
এতোদিনে গ্রামের খবর তার অজানা বললেই চলে। শহরে জীবন আর নতুন সংসারে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পরেছিল যে তার প্রথম ভালোবাসার কথা সে ভুলেই যায়। তবুও বাবা মারা যাওয়ায় যেতে হয় গ্রামে। সেখানে গিয়ে কিছুদিন থাকলেও স্মৃতির মায়ের প্রতি সে আর কোনো টান অনুভব করে না। তবুও সে তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলে স্মৃতির মাকে।
স্মৃতির মা চুপচাপ শুনে যায়। কিছুই বলে না। তার কিছু বলারও নেই কিনা। কারণ সে তার স্বামীকে এতো বছরে একটা সন্তান দিতে পারেনি। প্রায় এক সপ্তাহ থাকার পর চলে আসেন তিনি সেখান থেকে। এরপরের খবর তার আর জানা নেই। মাঝে খবর পেয়েছিল স্মৃতির মা প্রেগন্যান্ট। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা ও নতুন সংসারে মগ্ন থাকায় সেদিকে তার তেমন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। এরপর একদিন জানতে পারে বাচ্চা জন্মের পরেই উষা বেগম মা*রা গিয়েছেন।
এতে বাচ্চার প্রতি তিক্ততা আরো বেশিই বেরে যায়। যার ফলে না গিয়েছে নিজের স্ত্রী-কে শেষবার দেখতে না ;গিয়েছে বাচ্চাকে দেখতে। তবে প্রতিমাসে খরচ দেয়া বাদ যায়নি তার। খাওয়া,পড়াসহ সকল খরচই সে মাসে মাসে পাঠিয়েছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই পাঠায় সে যাতে মেয়ের কষ্ট না হয়।
সবটা শোনার পর শুভ বোকার মতো তাকিয়ে থাকে তার বাবার দিকে। রাগ হচ্ছে তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-You know what তুমি আমার কাছে বেস্ট বাবা ছিলে। কিন্তু এই মুহূর্তে বেস্ট উপাধিটাও ডিজার্ভ করো না তুমি। এটা কেমন ভালোবাসা বাবা? যা দু’দিন পর কমে যায়। জীবনে অন্য নারী আসলে প্রথম নারী মন থেকে উঠে যায়? আর স্মৃতি? ওর কি দোষ এখানে?
আসিফ ইসলাম চুপ হয়ে আছেন। সে জানে সে ভুল করেছে। কিন্তু কখনো স্মৃতিকে দেখার জন্য মনও পোড়েনি তার। মৌমিতা আসিফ ইসলামের পাশে এসে বসে। কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বলে,
-যা হয়েছে তা বাদ দেই। স্মৃতিকে আমার কাছে নিয়ে এসো না।
– ও আসবে না।
-কেন আসবে না? আসতে হবে। জন্ম দেইনি তো কি মা কি হতে পারবো না ওর?
আসিফ ইসলাম অবাক হয়ে তাকায়। কিন্তু কিছু বলে না। নিজের উপর রাগ হচ্ছে তার। কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ কীভাবে করবে সে জানে না। তবুও কৌতুহল জাগে পরিবারের মানুষ কেন বললো না স্মৃতির শহরে আসার কথা। তাই আর সময় নষ্ট না করে কল দেয় নিজের ভাইকে। দুইবার রিং হতেই কল রিসিভ হয়। অপরপাশ সালাম দেয় লোকটা। আসিফ ইসলামও সালামের উওর দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
– সব ঠিকঠাক?
-হ্যাঁ ভাই সব ঠিক আছে। হঠাৎ করে কল করলে যে?
-করতেই হলো। স্মৃতি কোথায়?
-আছে কোথাও একটা।
-না জানার ভান করবি না একদম। তোরা কি ভেবেছিস না বললে আমি জানতে পারবো না?
-এই বিশ বছরে তো খোঁজ নেওনি। তাহলে এখন জেনে কি করবে?
-না বললে জানবো কীভাবে? কম টাকা তো পাঠাইনা তোকে।
-ওই মেয়ের কথা ভেবে এখন লাভ আছে ভাই। তোমার বউটার মতো ওই মেয়েও আমাদের মুখে চুনকালি দিয়ে পালিয়েছে।
-পালিয়েছে মানে?
-তোমাকে তো বলেছিলামই ওর বিয়ে ঠিক করেছিলাম। বিয়ের রাতে পালিয়েছে কোন ছেলের হাত ধরে । বংশের মুখে চুনকালি দিয়েছে তোমার মেয়ে।
আসিফ ইসলাম আর কথা বাড়ালো না। মুখের উপরই কলটা কেটে দিলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-ও বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছে!
-হ্যাঁ। বুড়ো লোকের সাথে বিয়ে ঠিক করলে পালাবে না তো কি করবে? আর ওর বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি।
শুভর কথায় আসিফ ইসলাম অবাক হয়ে তাকালো। জিজ্ঞেস করলো,
-বুড়ো লোক মানে?
-ওহ আচ্ছা এতোটা বেপরোয়া হয়েছ যে বর দেখতে কেমন সেটাও জানো না বাবা!
আসিফ ইসলাম কিছু বলতে যাবেন তার মধ্যেই মৌমিতা থামিয়ে বললেন,
-হয়েছে বাবা ছেলের মাঝে তর্ক করার কোনো মানেই হয় না। স্মৃতির কাছে চলো না।
কেউ আর কোনো কথা বাড়ালো না। তিনজন মিলে রওনা দিলো স্মৃতির উদ্দেশ্যে।
.
অমিত,অনিল মাএই বাসায় এসে পৌছেছে। বাকিরাও নিজেদের বাসায় চলে গেছে। ভেবেছিল স্মৃতিকে একটু শান্তনা দিবে। কিন্তু তার আর প্রয়োজন পরেনি তাদের। মেয়েরা মায়ের বুক পেলে সবটাই ভুলে যায়। স্মৃতিরও একই অবস্থা। নিজের মা না হোক নীলা বেগমের মায়ের মতো আদর,স্নেহ যেন যথেষ্ট ছিল ওর জন্য। কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে গেছে স্মৃতি। রাতের খাবার আর খায়নি।
হুমায়রাও না খেয়ে পাশেই বসে আছে। কখন আবার উঠে কান্না শুরু করে। এই ব্যাপারটায় হুমায়রা কিছুটা অভ্যস্ত। কারণ গ্রামে থাকা কালীন কোনো না কোনো বাহানায় স্মৃতিকে তার কাছেই রাত কাটাতে হতো।
স্মৃতির চাচাও কিছু বলতে পারতো না। কারণটা হুমায়রার বাবা। হাজার হোক স্মৃতি তার বন্ধুর মেয়ে। যখন ইচ্ছে তার বাড়িতে থাকতে পারবে। গ্রামের আদরের মেয়ে হুমায়রা ও স্মৃতি। তবুও মানুষের অগোচরে অত্যাচার তো সহ্য করতেই হতো। হাজার হোক মেয়ে হয়ে জন্মেছে কি-না।
শুভ, আসিফ ইসলাম ও মৌমিতা মাএই অনিলদের বাসায় এসে পৌছেছে। স্মৃতিকে ঘুমাতে দেখে আর জাগানোর প্রয়োজন মনে করেনি তারা। সকলে মিলে সোফায় বসে আছে। হুমায়রার কেন জানি আসিফ ইসলামকে দেখলেই বিরক্ত লাগছে। এর কারণটা স্মৃতি ও তার দায়িত্বহীনতা। তবুও চুপচাপ বসে আছে। সবার নিস্তব্ধতা আরো বিরক্তি বোধ হচ্ছে। তাই সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-আমি ঘুমাতে গেলাম। তোমরা শোক প্রকাশ করো বসে বসে।
এরই মাঝে আসিফ ইসলাম ডেকে বলল,
-বসো কথা আছে।
-আমার সাথে আপনার কি কথা? যা বলার স্মৃতির সাথেই বলবেন না হয়।
হুমায়রার এমন ব্যবহার দেখে নীলা বেগম বলল,
-হুমু এটা কেমন ব্যবহার বড়দের সাথে?
-তাহলে কেমন ব্যবহার করবো মামনী তুমি বলে দেও৷ আমার তো কথা বলতেই ইচ্ছে করছে না।
-কেন কি এমন করেছে উনি? মানছি মেয়েকে দেখতে যায়নি,খেয়াল রাখেনি। কিন্তু এমন তো না ওর খরচ বহন করেনি।
-তাহলে মামনী ওকে অনাথ আশ্রমে দিয়ে আসলে ভালো হতো না৷ একই কথা। ওখানেও ওর খরচ বহন করতো। অন্তত একটু শান্তি তো পেত। কারো মা’র খেতে হতো না, আজেবাজে কথা তো শুনতে হতো না।
এইটুকু বলেই হুমায়রা হনহন করে ঘরের দিকে চলে গেল। নীলা বেগম বিরক্তি নিয়ে বললেন,
-বেয়াদব হয়েছে মেয়েটা।
আসিফ ইসলাম থামিয়ে দিলেন। বললেন,
-ভুল বলেনি ও। আমিই ইরেসপন্সিবল যে নিজের মেয়ের খেয়াল রাখতে পারিনি।
-আচ্ছা ভাই রাত হয়েছে। চলুন খাবার দিচ্ছি। খেয়ে ঘুমাবেন না হয়৷ কাল সকালে স্মৃতির সাথে কথা বলবেন।
সবাই সম্মতি জানালো। কিন্তু আসিফ ইসলাম আর খাবার খেলেন না। পেটে খাবার ঢুকবে না তার যতক্ষণ না নিজের মেয়ের সাথে সবটা মিটমাট করতে পারছে। কেউ তেমন জোরাজোরিও করলো না তাকে।
_______________
সকাল সকাল ঘুম ভাঙতেই রুমটা ফাকা পেল স্মৃতি। না চাইতেও গতদিনের কথা মনে পড়ে গেল। নিজের উপর হাসি পাচ্ছে তার। জন্মের পর কখনো বাবাকে কাছে পায়নি। যাকে এতবছর ছবিতে দেখে এসেছে ভাগ্য সেই মানুষটাকে তার সামনে এনে দিয়েছে। কিন্তু সে তো চায়নি দেখা করতে, কখনো ইচ্ছাও পেষণ করেনি এক নজর দেখার। তাহলে কেন তার সামনে এসে পড়লো।
আজ ভার্সিটি বন্ধ। পরেরদিন নবীনবরণ অনুষ্ঠান। চুপচাপ উঠে ফ্রেশ হলো সে। স্টুডেন্ট পড়াতে যেতে হবে। একেবারে রেডি হয়ে নিচে আসতেই থমকে গেল। সকলে নিচে বসে গল্প করছে। সেখানে তার বাবাও উপস্থিত। ইচ্ছে না হলেও জোরপূর্বক সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিলো। সকলেই সালামের উওর দিলো। নীলা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
-সকাল সকাল কোথায় যাচ্ছো মা?
-স্টুডেন্ট পড়াতে আন্টি। আসি।
-খেয়ে যাও।
-ক্ষুধা নেই।
কারো সাথে আর বাড়তি কথা না বলেই বেরিয়ে গেলো স্মৃতি। সকলেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সকলের মাঝ থেকে শুভ জিজ্ঞেস করল,
-কখন আসবে?
-দশটার মধ্যে চলে আসবে।
হুমায়রার কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেললো সকলে। সকলের মাঝ থেকে মৌমিতা বলে উঠলো,
-হুমায়রা তুমি তো ওর বেস্টফ্রেন্ড তাই না। তাহলে ওর পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে তো জানো।
-হুম।কেন?
-যা রেগে আছে এতো সহজে অভিমান তো কমবে না ওর। যদি ওর পছন্দ মতো কিছু করে মন জয় করতে পারি তাই।
মৌমিতার কথায় হুমায়রা এবার শব্দ করেই হাসলো। বললো,
-আচ্ছা তা ওর পছন্দ মতো সব করে ওর অতীতটা সুন্দর করে দিতে পারবেন আন্টি?
মৌমিতা চুপ রইলো। আসিফ ইসলাম বললেন,
-তা সম্ভব না। কিন্তু বর্তমানটা তো সুন্দর করতে পারি তাই না। একটুও কি ক্ষমার যোগ্য না আমরা?
-তা আমি কীভাবে বলবো আঙ্কেল? স্মৃতি আসুক ও বলবে না হয়।
-বাসায় তো সব সময় খোঁজ নিয়েছি। কেউই তো তেমন কিছু বলেনি। সকলেই বলেছে ও খুব সুখে আছে।
আসিফ ইসলামের কথায় হুমায়রার হাসি পেলেও ঠোঁট টিপে নিজেকে সামলিয়ে নিলো। বললো,
-তা আঙ্কেল আপনি কি এটা আশা করছেন আপনার ভাই,ভাবিরা আপনাকে কল করে বলবে যে ভাই আমি আপনার মেয়েকে ভালোমতো খেতে দেই না, ওকে খুব মা’রধো’র করি,ওর বিয়ে এক বাচ্চা ওয়ালা ছেলের সাথে ঠিক করেছি। আজব প্রশ্ন!
হুমায়রার এমন কথায় অনিলের হাসি পেলেও ঠিক রাখলো নিজেকে। সব জায়গায় তো আর হাসা যায় না। সবার মাঝেই আবারো নিস্তব্ধতা বিরাজ করলো।শুভর কিছু একটা মাথায় আসতেই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো।
#চলবে…..

