বোকামন #পর্ব_০৮

0
2

#বোকামন
#পর্ব_০৮
#Tahsin_Atoshi

টিউশনি শেষে মাএই বের হয়েছে স্মৃতি। ভেবেছিল বাসায় দেরি করে যাবে। এর মূল কারণ তার বাবা। তাই আশেপাশে কোথাও হাঁটবে ভেবে রেখেছি। হঠাৎ গাড়ির হর্ণে না চাইতেও বিরক্তি নিয়ে সেদিকে তাকালো। শুভ এসেছে। এতে যেন আরো মাথা গরম হয়ে গেছে। চুপচাপ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

-আপনি এখানে কি করছেন?

-তোমাকে নিয়ে যেতে এলাম। পড়ানো শেষ না? গাড়িতে ওঠো।

-আমি বাসায় যাবো না এখন।

-কি করবে?

-কাজ আছে।

-কি কাজ?

-আপনাকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না।

-গাড়িতে ওঠো।

-বললাম তো কাজ আছে। চলে যান। আপনার বাবা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।

বলেই হনহন করে হাটা শুরু করলো স্মৃতি। শুভও গাড়িটা এক সাইডে পার্ক করে দৌড় দিলো স্মৃতির পিছু পিছু। কিছুটা দৌড়াতেই ধরে ফেললো স্মৃতিকে। স্মৃতির পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

-আচ্ছা মেয়ে মানুষের রাগ সব সময় নাকের ডগায় থাকে কেন বলো তো।

-মেয়ে মানুষ যে তাই। এখন যাবেন?

শুভ এবার একটু বাচ্চাদের মতো করেই নিচু কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

-কি কাজ আছে?

-কিছু কেনাকাটা করবো।

-কি কিনবে?

স্মৃতি এবার হাঁটা থামিয়ে চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলো। রাগটা কন্ট্রোল করে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলল,

-আগামীকাল নবীন বরণ অনুষ্ঠান। তো শাড়ি পড়তে বলেছে। তাই কিনবো।

-তাহলে এখানে কি মার্কেটে চলো।

-ফুটপাত থেকে কিনবো।

-কেন?

স্মৃতি আবারো বিরক্তি নিয়ে এক নজর দেখে ফুটপাতে শাড়ির দোকানের সামনে দাড়ালো। নিজের মতো করে একটা একটা শাড়ি দেখতে রইলো। সবশেষে একটা টিয়াল গ্রীন রঙের শাড়ি পছন্দ হলো তার। চুপচাপ দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার বললো শাড়ির দাম পাঁচশো টাকা। এতেই স্মৃতির হয়েছে। এই মুহূর্তে তার হাতে আছে মাএ তিনশো টাকা। এই বাজেটেই সে শাড়ি কিনবে ভেবেছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল,

-দুইশো বা তিনশো টাকার মধ্যে নেই?

দোকানদার তার সামনে থাকা কিছু শাড়ি স্মৃতির সামনে রাখলো। শাড়ি গুলো একদম রঙচটা, দেখে মনে হচ্ছে কেউ অনেকদিন পড়ে ফেলে দিয়েছে। তা দেখে স্মৃতির আরো মন খারাপ হয়ে গেল। পাশ থেকে শুভ বলল,

-এসব শাড়ি অবশ্যই নবীব বরণে পড়ার যোগ্য না। মার্কেট থেকে কিনে নেও। ওখানে সুন্দর সুন্দর কালেকশন আছে।

-আমার কাছে এতো টাকা নেই।

-আমি কিনে দিচ্ছি।

-প্রয়োজন নেই।

বলেই রঙচটা শাড়িগুলোর মধ্য থেকে একটা চুজ করলো। কিন্তু মন মানছে না। তাই আবার রেখে দিলো। শুভ বলল,

-তাহলে পাঁচশো টাকা যেটা ওইটা নেও। ওইটাও সুন্দর আছে।

স্মৃতি এবার অসহায় মুখ করে তাকালো শুভর দিকে। বলল,

-হাতে মাএ তিনশো টাকা আছে। লাগবে না থাক। দেখি আন্টির শাড়ি পেলে তাই পড়ে যাবো।

-আমি কিনে দেই মার্কেটে চলো।

-দামি জিনিসে আমি অভ্যস্ত নই। বলার জন্য ধন্যবাদ।

বলেই আবার বাসার উদ্দেশ্যে হাটা শুরু করল। শুভ এখনো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কি করবে ভাবছে। আর উপায় না পেয়ে টিয়াল গ্রীন রঙের শাড়িটাই কিনে দৌড়ে স্মৃতির কাছে দৌড়ে এসে ব্যাগটা হাতে ধরিয়ে দিলো। তা দেখেই স্মৃতির মাথাটা আরো বেশি গরম হয়ে যায়। রাস্তার মাঝেই এবার জোরে উচ্চস্বরে বলে ওঠে,

-সমস্যা কি আপনার? আমার পেছনে কেন পরে আছেন৷ নিজের কাজে যান না। বাবার টাকার গরম দেখাচ্ছেন আমাকে?

আশেপাশের মানুষের ভিড় জমেছে । এতে শুভ কিছুটা লজ্জা বোধ করছে। জীবনে প্রথমবার এমন পরিস্থিতিতে পরতে হলো তার। তবুও সে হার মানার মানুষ না। হালকা নিচুস্বরে বলল,

-বাসায় গিয়ে কথা বলি প্লিজ?

স্মৃতি আশেপাশের মানুষদের তাকিয়ে থাকতে দেখে সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-সার্কাস হচ্ছে এখানে? যার যার কাজে যান।

এইটুকু বলে আবারো হাঁটা শুরু করলো। রাস্তার পাশে নদীর পাড়ে গিয়ে হাঁটু ভাজ করে হাটুতে মুখ গুজে বসলো এবার। ভালো লাগছে না তার। সব বিরক্ত লাগছে৷ শুভও পাশে এসে বসল। একটু কাশি দিয়ে বলল,

-তোমার রাগের কারণটা বুঝতে পারছি। কিন্তু একটা সুযোগ কি দেয়া যায় না বাবাকে?

-…..

-আচ্ছা আমাকে ভাই হিসেবে মানতে হবে না,আমার মা কেও মা বলে ডাকতে হবে না। বাবার জন্য প্লিজ। উনি অনুতপ্ত ওনার কাজে। স্মৃতি…!

হাঁটু মুখ গুজে কাঁদছে স্মৃতি। সেভাবে থেকেই কান্নামাখা কন্ঠে বলল,

– এতে কি আমার জীবনটা সুন্দর করে দিতে পারবেন, আমার অতীত ভুলিয়ে দিতে পারবেন বলুন।

-তা হয়তো সম্ভব না স্মৃতি। কিন্তু বর্তমানটা তো সুন্দর করে দিতে পারি। বাবার হয়ে আমি সরি বলছি। প্লিজ বাসায় চলো। সবাই অপেক্ষা করছে।

-আমি একা থাকতে চাই।

-একা থাকলে কি সব ঠিক হয়ে যাবে।

– আপনি চলে যান না।

– তোমাকে না নিয়ে যাবো না।

এবার মাথা তুললো স্মৃতি। শ্যামলা হওয়ায় অল্প কান্নাতেই চোখ মুখ লালের বদলে হালকা কালআে বর্ণ ধারণ করেছে। চোখের পানি মুছে নিলো। চুপচাপ উঠে দাড়ালো। শুভও জিজ্ঞেস করল,

– যাওয়া যাক?

স্মৃতিও আর কথা বাড়ালো না। হাজার হোক দু’জন একই রক্ত এবং দু’জনই ঘারত্যারা।

প্রায় আধঘন্টা পার হতেই দু’জন মিলে বাসায় পৌছালো। দেরি হওয়ায় অনিল জিজ্ঞেস করল,

– এতো দেরি হলো যে?

স্মৃতি কিছু বলার আগেই শুভ বলল,

– শাড়ি কিনতে গিয়ে লেট হয়ে গেছে। কাল নবীনবরণ অনুষ্ঠান না।

হুমায়রা এবার মন খারাপ করে বলল,

– এটা ঠিক না স্মৃতু। আমারও তো কিনতে হতো। আমারও শাড়ি নেই।

– পরে কিনে নিও।

শুভর কথায় থামলো হুমায়রা। আসিফ ইসলাম মেয়ের সাথে কীভাবে কথা শুরু করবেন তাই ভাবছেন। একটু কাশি দিয়ে স্মৃতির সামনে এসে দাড়ালেন এবার। স্মৃতিও নিজেকে সংযত রেখে তাকালো আসিফ ইসলামের দিকে। কিছুক্ষণ চোখাচোখি হতেই আসিফ ইসলাম বললেন,

– স্মৃতি মা আ্….আই… আই এম সরি। আমি জানি আমি ভুল করেছি, কখনো তোকে দেখতে যাইনি। তোর খোঁজ খবর নেইনি। প্লিজ ক্ষমা করে দে। আ্… আমি্…. আমি প্রমিস করছি আর কখনো এমন হবে না। দেখবি আমি বেস্ট বাবা হবো তোর। সব কথা শুনবো। ক্ষমা করে দে মা প্লিজ।

বলেই স্মৃতির কাঁধে হাত রাখলো। কাধে হাত রেখে আবারো বলতে লাগলো,

– সরি রে মা। ক্ষমা করে দে। আমি জানি আমি ভুল করেছি। একটা সুযোগ দে।

সকলেই স্মৃতির উওরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে ওর দিকে। স্মৃতির কি হলো জানা নেই। আসিফ ইসলামের হাত নিজের কাঁধ থেকে ছাড়িয়ে নিলো। ধীরে ধীরে পেছনের দিকে পেছাতে লাগলো। তা দেখে শুভ কাছে এগিয়ে এলো। বলতে লাগলো,

– স্মৃতি ক্ষমা করে দেও না৷ জানি বাবা ভুল করেছে। একটা সুযোগ দেও প্লিজ।

স্মৃতি ধীরে ধীরে আরো পেছনে এগোতে লাগলো। কিছুক্ষণের মাঝেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল। চোখ বন্ধ করে বলতে লাগলো,

– আ্… আমাকে টাচ করবেন না। দূরে সরুন। টাচ করবেন না আমাকে৷ ছেড়ে দিন। কাছে আসবেন না।

– স্মৃতি ক্ষমা করে দেও না। আচ্ছা মানছি তোমার অতীতটা আমরা ঠিক করতে পারবো না। বর্তমানটা তো ঠিক হতে পারে তাই না। প্লিজ একটা সুযোগ দাও।

শুভর কথা যেন কানে আসছে না তার। শুধু হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করে বলতে লাগলো,

– আমার কাছে আসবেন না একদম। প্লিজ। আমাকে ধরবেন না। আমার থেকে দূরে সরুন। আমার কাছে আসবেন না।

স্মৃতির এমন ব্যবহারে হুমায়রা কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রইলো। নীলা বেগম বললেন,

– স্মৃতি মা বাবা ক্ষমা চাইছে তো। ক্ষমা করে দেও।

অমিত, অনিলও পাশ থেকে একই বাক্য বলতে লাগলো। আসিফ ইসলাম আবারো স্মৃতির কাছে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই হুমায়রা বলে উঠল,

– আঙ্কেল থামুন। ও্….ওর সামনে যাবেন না।

বলে হুমায়রা নিজেই দৌড়ে স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরলো। জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো,

– স্মৃতু কি হয়েছে তোর। এমন করছিস কেন?

-আ্…. আমার কাছে আসতে বারণ কর না প্লিজ। আ্… আমা্… আমাকে টাচ করছে কেন লোকটা। আ্… আমার…

– স্মৃতু এটা তোর বাবা। কিছু করবে না৷ এই পাগলি কি হয়েছে তোর।

– ও্…. ওই লোকটা আমার সাথে…

– কেউ কিছু করবে না। আমি আছি তো। শান্ত হ। কেউ কিছু করবে না৷ কেউ নেই এখানে। দেখ ভালোমতো।

হঠাৎ এমন আচরণে সকলে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ কাটতেই হুমায়রা ধীরে ধীরে স্মৃতিকে সোফায় বসিয়ে দিলো। তখনও স্মৃতি হুমায়রার হাত শক্ত করে ধরে আছে। নীলা বেগম একগ্লাস পানি এনে দিলেন স্মৃতিকে। এক নিশ্বাসে পুরো পানি পান করে আবারো হুমায়রাকে জড়িয়ে ধরলো। হুমায়রাও ছাড়লো না আর। কেটে গেল কিছুক্ষণ। স্মৃতি হুমায়রাকে জড়িয়ে ধরে সেভাবেই ঘুমিয়ে আছে। কয়েকবার সুয়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও স্মৃতি হুট করে ভয় পেয়ে ওঠার কারণে আর ছাড়লো না হুমায়রা। নিজের সাথে জড়িয়ে রাখলো।

সকলেই নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। স্মৃতির এমন আচরণের কারণটা জানার জন্য কৌতুহল জাগছে সবার মনে। কিন্তু এই মুহূর্তে কেউই জিজ্ঞেস করার সাহস করে উঠতে পারছে না। সবার মাঝ থেকে মৌমিতা বলে উঠলো,

-হুমায়রা স্মৃতি এমন আচরণ কেনো করলো হঠাৎ? কিছু কি হয়েছিল?

-আমিও সঠিক জানি না আন্টি। পরিচিত হওয়ার পর থেকেই হুটহাট ও এমন করে। রাতে তো ঠিকমতো ঘুমায়ও না। ভয় পেয়ে ওঠে বারবার। পুরুষ মানুষের স্পর্শ পেলেই কেমন ভয় পেয়ে যায়। জিজ্ঞেস করেছিলাম কয়েকবার বলেনি। এই মেয়ে কিছু বলতে চায় না। বুক ফাটবে কিন্তু মুখ ফুটবে না।

সকলেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

.

স্মৃতির ঘুম ভাঙে ঠিক দুপুর তিনটার দিকে। ততক্ষণ হুমায়রা তাকে জড়িয়ে ধরে ছিল। এই প্রথম হয়তো সে স্মৃতিকে এতটা শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেছে। ঘুম ভাঙতেই সকলকে বসে থাকতে দেখে স্মৃতিও নিজেকে ঠিক করে বসলো। মৌমিতা স্মৃতির পাশে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

-ঠিক আছো?

স্মৃতি মাথা নাড়িয়ে বুঝালো সে ঠিক আছে। আবারো কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা কেটে গেল৷ পরিস্থিতি নরমাল করতে হুমায়রা বলল,

-স্মৃতু যা হাত মুখ ধুয়ে আয় তো। খাবার খাবো।

স্মৃতিও কথা না বাড়িয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে এলো। মৌমিতা ও নীলা বেগম সবাইকে খাবার সার্ভ করতে ব্যস্ত। আসিফ ইসলাম আড়চোখে শুধু মেয়েকে দেখছেন। স্মৃতি একবারও চোখ তুলে তাকিয়ে দেখেনি তাদেরকে। সকলের মাঝ থেকে শুভ বলল,

-তাহলে স্মৃতি আজকে তুমি আমাদের সাথে বাসায় যাচ্ছো ওকে?

এইটুকু বলেই স্মৃতির রিয়েকশনের অপেক্ষায় রইলো সবাই। হুমায়রা পাশ থেকে নিচু হয়ে কানে কানে বলল,

-শেষমেষ এতো বড় রাজপ্রাসাদ তোরই হলো বল। ইশ আমার যদি এমন বাড়ি থাকতো দৌড়ে চলে যেতাম। কিসের রাগ কিসের কি..

এইটুকু বলতেই স্মৃতির চোখের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেল। স্মৃতির চেহারায় রাগ স্পষ্ট। শুভ আবারো জিজ্ঞেস করল,

-স্মৃতি যাবে তো।

স্মৃতি কিছু বলার আগেই হুমায়রা বলল,

-যাবে মানে আমি নিজে দিয়ে আসবো। ও কি বলবে হুম। আমার খাওয়া শেষ ওর জামা কাপড় গুছিয়ে দিচ্ছি আমি।

স্মৃতি আবারো কিছু বলবে তার আগেই হুমায়রা বলল,

-থাক থাক ধন্যবাদ দিতে হবে না। আর বেশি মেলোড্রামাও করবি না। তুই যাচ্ছিস ওই বাড়ি।

এইটুকু বলেই হুমায়রা ঘরে দৌড় দিলো। স্মৃতি তখনও চুপ হয়ে বসে আছে। ভাতের উপর আঙুল চালিয়ে যাচ্ছে নিজের মতো। তা দেখে মৌমিতা বলল,

-আমি খায়িয়ে দিবো?

স্মৃতি এক নজর দেখে নিলো মৌমিতাকে। তার মায়ের চেহারার সাথে মিল আছে কিছুটা। রাগ উঠলেও কেন জানি প্রকাশ করতে পারছে না। স্মৃতির মৌনতাকেই তিনি সম্মতি বুঝে ভাত মাখিয়ে খায়িয়ে দিলেন। কোনো বাড়তি কথা হলো না তার মাঝে। সকলে চুপচাপ তাকিয়ে আছে এদের দিকে। কারো মুখে খুশি, কারো মুখে চিন্তার ছাপ। খাওয়া শেষে কোনো কথা না বলে স্থান ত্যাগ করলো।

#চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here